
রবীন্দ্রনাথ সৃজন করেছেন অসংখ্য দেবচরিত্র, নিজের মতো করে
বিশ্বকর্মা হলেন স্বর্গের স্থপতি। একদিকে তিনি মহান কারিগর, আবার অন্যদিকে বর্মধারী যোদ্ধা! পৃথিবী তাঁর কর্মক্ষেত্র, তাই তিনি বিশ্বকর্মা। বৈদিক মতে, তিনি সর্বজ্ঞ। পুরাণ বলছে, তিনি দেবশিল্পী। স্বর্গের দেব-দেবীদের পোশাক, বিমান, অস্ত্র সব সৃজন করেছেন এই দেবতাটি। অগ্যস্তমুনির বাড়ি, কুবেরের অলকাপুরী, রাবণের স্বর্ণলঙ্কা, শ্রীকৃষ্ণের দ্বারকা — সব এই স্বর্গের আর্কিটেক্টের কাজ। মিথোলজি অনুসারে সুন্দ উপসুন্দকে বধ করেছিলেন যে তিলোত্তমা নারী, তিনিও বিশ্বকর্মার সৃষ্টি। শ্বেতাশ্বতর উপনিষদে বিশ্বকর্মাকে হৃদয়েরও অধিপতি বলা হয়েছে। আজ আলোচনা করবো, রবীন্দ্রসাহিত্যে বিশ্বকর্মার গতিবিধি নিয়ে।
ব্রাহ্ম বাবার বাধ্য সন্তান রবীন্দ্রনাথ। তথাকথিত হিন্দু দেবসংস্কার তাঁর না থাকারই কথা। কিন্তু সাহিত্যিক রবীন্দ্রনাথ দিব্যি সৃজন করেছেন অসংখ্য দেবচরিত্র, নিজের মতো করে। বিশ্বকর্মাও তার ব্যতিক্রম নয়। আজ আমি রাবীন্দ্রিক বিশ্বকর্মার কথা বলবো।
‘শ্যামলী’ কাব্যগ্রন্থের ‘আমি’ কবিতায় রবীন্দ্রনাথ মানুষের অহংকার পটে বিশ্বকর্মার বিশ্বসৃষ্টিকে গুরুত্ব দিয়েছিলেন। বিশ্বকর্মার হাতে কবি তুলি আর পাত্রভরা রঙ ধরালেন। ‘পলাতকা’ কাব্যের ‘ছিন্নপত্র’ কবিতার চরিত্রের কর্মব্যস্ততার সূত্রে স্রষ্টা বিশ্বকর্মাকে আনলেন রবীন্দ্রনাথ। ‘শুভদৃষ্টি’ গল্পের মূক ও বধির মেয়েটির সৌন্দর্য প্রসঙ্গে রবীন্দ্রনাথ লিখেছিলেন, ‘মেয়েটির সৌন্দর্য নিরতিশয় নবীন, যেন বিশ্বকর্মা তাহাকে সদ্য নির্মাণ করিয়া ছাড়িয়া দিয়াছেন।’
রবীন্দ্রনাথের প্রবন্ধে বিশ্বকর্মার সবচেয়ে বেশি উল্লেখ আছে। আমরা পুজোর মণ্ডপে যে বিশ্বকর্মাকে চিনি, তাঁর চেয়ে রাবীন্দ্রিক বিশ্বকর্মা কিন্তু আলাদা। রবীন্দ্রনাথের বিশ্বকর্মা আমাদের মনের গহনে বসে আড়াল থেকে আমাদের নিয়ন্ত্রণ করেন। ‘পঞ্চভূত’ বইয়ের ‘গদ্য ও পদ্য’ প্রবন্ধে সমীর বলবেন এই বিশ্বকর্মার কথা, আমাদের অন্তরের নির্জন সৃজনকক্ষে যাঁর বাস। রবীন্দ্রনাথ নিজের লেখক সত্তাকে মিলিয়ে দিয়েছিলেন বিশ্বকর্মার সঙ্গে —‘কারণ সৃষ্টিকর্তা তাঁর রচনাশালায় একলা কাজ করেন। সে বিশ্বকর্মারই মতন আপনাকে দিয়ে রচনা করেন।’ রবীন্দ্রনাথ মানুষের অন্তরের গুহায় কাজ করে যাওয়া এক ‘আনন্দিত বিশ্বকর্মা’-র কথা বলেছেন বারবার। রাণুকে চিঠিতে লিখেছিলেন, ‘বিশ্বকর্মার কাজে আমরা যখন যোগ দিই তখন যে পরিমানে তার সঙ্গে মিল রেখে, ছন্দ রেখে চলি সেই পরিমাণে আমাদের কাজ অক্ষয় কীর্তি হয়ে ওঠে, যে পরিমাণে বাধা দিই সেই পরিমাণে আমরা প্রলয়কে ডেকে আনি।’ মজা করে বিদ্যাসাগর চরিত-এ বলেছিলেন, ‘বিশ্বকর্মা যেখানে চারকোটি বাঙালি নির্মাণ করিতেছিলেন সেখানে হঠাৎ দু-একজন মানুষ গড়িয়া বসেন কেন তাহা বলা কঠিন।’ এখানে বিশ্বকর্মা মানুষ গড়ার কারিগর। ‘রাশিয়ার চিঠি’-তে বিশ্বকর্মা সমবেত শক্তির প্রতীক। ‘জাভাযাত্রীর পত্র’ এ ভৌগোলিক বর্ণনায় বিশ্বকর্মাকে দারুণ ভঙ্গিতে ব্যবহার করেছিলেন রবীন্দ্রনাথ— ‘এই জায়গাটাতে বিশ্বকর্মার মানিব্যাগ ছিঁড়ে অনেকগুলি ছোটো দ্বীপ সমুদ্রের মধ্যে ছিটকে পড়েছে।’ রবীন্দ্রকল্পনা আমাদের চোখের সামনে এনে হাজির করে আধুনিক পোশাক পরা, মানিব্যাগ সম্বলিত এক নতুন বিশ্বকর্মাকে। আবার কখনো বিশ্বকর্মাকেই বিজ্ঞান বলে বসেন। রবীন্দ্রনাথের বিশ্বকর্মা আবার উল্টোপথেও চলেন। তাঁর বাঁশিতে নাকি ছুটির সুরও বাজে।
রবীন্দ্রনাথের সৃষ্টির ক্যানভাসে বিচিত্র বিশ্বকর্মার ছবি খুঁজে পাই আমরা। যেমন— চপল বিশ্বকর্মা, যিনি খেলাঘর নিজে গড়েন আবার নিজেই ভাঙেন। আরেকজন আছেন ভাবলেশহীন রসিক বিশ্বকর্মা! আবার হাপর হাতুড়ি নিয়ে কর্মী বিশ্বকর্মাও খুঁজে পাওয়া যায় রবীন্দ্রনাথের সৃজনের ক্যানভাসে। যাঁর অকৃপণ দানের পরেও রসের ঝুলি শূন্য হয় না।
রবীন্দ্রনাথের বোধের জগৎ অধিকার করেছিলেন বিশ্বকর্মা। এমন এক দেবতা যিনি রবীন্দ্রনাথের সৃষ্টিসত্তাকে নিয়ন্ত্রণ করেন। কর্ম করেন অথচ ফলের আশা করেন না। কেবল রবীন্দ্রনাথের অন্তর্লোকের গুহায় নিভৃতে বসে কাজ করে যান। এই দেবতা রবীন্দ্রনাথের একান্ত আপন। কোনো ধর্মীয় বিশ্বাস তাকে প্রভাবিত করতে পারে না। এই রাবীন্দ্রিক বিশ্বকর্মা রবীন্দ্রনাথকে চলার পথে আলোর সন্ধান দিয়েছিলেন।
তথ্যসূত্রঃ
রবীন্দ্ররচনাবলী, পশ্চিমবঙ্গ সরকার
এবং
হিন্দুদের দেবদেবী-উদ্ভব ও ক্রমবিকাশ, হংসনারায়ণ ভট্টাচার্য

