
নিন্দুকদের রবীন্দ্রনাথ
‘উড়িস নে রে পায়রা কবি
খোপের ভিতর থাক ঢাকা।
তোর বকবকম আর ফোঁস ফোঁসানি
তাও কবিত্বের ভাব মাখা!
তাও ছাপালি, গ্রন্থ হলো
নগদ মূল্য একটাকা!!’
১৮৮৮ সালে এই ব্যঙ্গ কবিতটি লিখলেন কালীপ্রসন্ন কাব্যবিশারদ। ‘মিঠে কড়া’ নামে ব্যঙ্গছড়ার বইতে এই যে ‘পায়রা কবি’-র কথা আছে, তিনি যদি কবিতার বই না ছাপাতেন, কালীপ্রসন্নের কী লাভ হতো জানা নেই, বাংলা সাহিত্যের বড়ো ক্ষতি হয়ে যেত। কারণ রাহু ছদ্মনাম নিয়ে কালীপ্রসন্ন স্বয়ং রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরকেই লক্ষ করে ব্যঙ্গ ছড়াগুলি লিখেছিলেন। অবাক হলে চলবে কেন ? কবিগুরুর কাব্যজীবনে এমন রাহু-কেতুর আক্রমণ প্রায়ই হয়েছে। আজকে সেই নিন্দুকদের কথাই বলি। নিজের সত্তর বছর পূর্তি উপলক্ষ্যে যে জয়ন্তী অনুষ্ঠান হয়েছিল, তাতে রবীন্দ্রনাথ বলেছিলেন, ‘এমন অনবরত, এমন অকুন্ঠিত, এমন অপ্রতিহত অসম্মাননা আমার মতো আর কোনো সাহিত্যিককেই সইতে হয়নি।’ এখন সবকটি প্রসঙ্গ আলোচনার পরিসর এখানে নেই। কিছু রেখার টানে সেই নিন্দার কালোমেঘের একটা অবয়ব দিতে পারি মাত্র।
সে এক সময় ছিল, কিশোর রবীন্দ্রনাথের নীল কবিতার খাতাটা ভরে উঠছিল কবিতায়। অথচ স্কুলের বন্ধুরা অনায়াসে সেই কবিতাকে ছাপার বই থেকে চুরি বলেই মনে করেছিল। তারপর লেখকজীবনের আনাচকানাচ থেকে বারবার ছুটে আসবে অভিযোগের বিষাক্ত তির। রবীন্দ্রনাথ সেই সব বিষ সহ্য করে এগিয়ে যাবেন আলোর শিখার মতো। রবীন্দ্রনাথ যখন ‘রামমোহন রায়’ প্রবন্ধ লিখলেন ১৮৮৫ সালে, তখন মহেন্দ্রনাথ রায় রবীন্দ্রনাথের তিনটে দুষ্প্রবৃত্তি আবিষ্কার করলেন—
রামমোহনের চরিত্রহনন, অক্ষয় কুমার দত্তের ভারতবর্ষীয় উপাসক সম্প্রদায় থেকে ভাবনা চুরি এবং বাংলা ভাষাকে কিম্ভূতকমাকার করে তোলা। রবীন্দ্রনাথের ‘কড়ি ও কোমল’ প্রকাশিত হলে কালীপ্রসন্ন কাব্যবিশারদ প্রায় কোমরে গামছা বেঁধে নেমে পড়েছিলেন রবীন্দ্রবিদূষণে। ‘সাহিত্যকল্পদ্রুম’ পত্রিকায় জনৈক খগেন্দ্রনাথ চাটুজ্যে রবীন্দ্রনাথের কবিতায় ছন্দের ভুল ধরেছিলেন। আরেকজন সমালোচকের কথা মনে পড়ে— নিত্যকৃষ্ণ বসু! তিনি ‘নব্যভারত’ পত্রিকায় রবীন্দ্রনাথের ‘কড়ি ও কোমল’ কাব্যের সনেটগুলির নিন্দা করেছিলেন এবং বলেছিলেন , 'যিনি মানুষের সুখদুঃখের সঙ্গীত গাঁথিয়া ‘অমর আলয়’ রচনা করিতে চান, যুবতীর ‘স্তনের ছায়ায়’ শয়ন করে কেবল ‘অঞ্চলের বাতাস সেবন করিলে তাঁহার চলিবে না। ’ হেমেন্দ্রপ্রসাদ ঘোষ রবীন্দ্রনাথের ব্যক্তিগত জীবনের প্রতি কুৎসিত ইঙ্গিত করে লিখে ফেলেছিলেন ‘প্রণয়ের পরিণাম’ নামের গল্প। ‘আমি বড় ঘরের ছোট ছেলে’— এই বলে কাহিনির আরম্ভ, গল্পের শেষে অনেক কুৎসিত ইঙ্গিতের পর আছে— ‘কেবল আমার কবিতারোগের সাক্ষ্য আছে— স্কন্ধবিলম্ব কুঞ্চিত কুন্তলরাশি, সেগুলির মায়া কাটাইয়া উঠিতে পারি নাই, তাহাদের জন্য অনেক অর্থ ও সময়ের অপব্যয় হইয়াছিল।' ভাবুন, কেমন করে একজন কিংবদন্তী কবি লাঞ্ছিত হয়েছেন তাঁর সমকালের কাছে।
১৩০৮ বঙ্গাব্দের বৈশাখ মাসে রবীন্দ্রনাথের সম্পাদনায় নবপর্যায় বঙ্গদর্শন প্রকাশিত হয়। ‘সাহিত্য’ পত্রিকার সম্পাদক সুরেশচন্দ্র সমাজপতি বলেছিলেন, গর্হিত, অপবিত্র কাজ! রবীন্দ্রনাথের ভাষাকে বলেছিলেন, ‘ভ্যালসা!’ 'চোখের বালি’-র প্লট আসলে পাঁচকড়ি বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘উমা’থেকে চুরি করা— এমন অভিযোগও শুনতে হয়েছিল রবীন্দ্রনাথকে। সুরেশচন্দ্র সারাজীবন যত্ন নিয়ে রবীন্দ্র বিদূষণ করে গিয়েছেন।
এইবার রবীন্দ্রনিন্দুকদের দলে নাম লেখালেন দ্বিজেন্দ্রলাল রায়। সরাসরি অভিযোগের মুষল আঘাত করলেন রবীন্দ্রনাথের ‘সোনার তরী’ কবিতার উপর। বললেন, ‘সুর নাই, তাল নাই, অথচ এই কবিতা পড়িয়া তাঁহার অন্ধ ভক্তগণ মোহিত।’ দ্বিজেন্দ্রলাল গলা চড়িয়ে বললেন, রবীন্দ্রনাথের সাহিত্য দুর্নীতির সাহিত্য, তাঁর সাহিত্যের প্রেম— টপ্পার প্রেম! তাঁর গান — লাম্পট্য। রবীন্দ্রনাথের ‘চিত্রাঙ্গদা’ সম্পর্কে দ্বিজেন্দ্রলালের শেষ কথা— ‘এ পুস্তকখানি দগ্ধ করা উচিত।’ রবীন্দ্রনাথকে ব্যঙ্গ করে লিখেছিলেন, ‘আনন্দ বিদায়’ নাটক। কিন্তু এই নাটক অভিনয়ের শেষে দ্বিজেন্দ্রলালকে জনরোষের মুখে পড়তে হয়েছিল।
জীবনের বিভিন্ন পর্যায়ে বিবিধরকম নিন্দা ঘিরে ছিল রবীন্দ্রনাথকে। বিপিনচন্দ্র পাল রবীন্দ্রসাহিত্যে নিয়ে এলেন বস্তুতন্ত্রহীনতার অভিযোগ। তিনি বলেছিলেন যে, 'রবীন্দ্রনাথ শতরঞ্চগালিচা মণ্ডিত ত্রিতল প্রাসাদকক্ষে বসিয়া মানসচক্ষে কর্দমপিচ্ছিল পল্লীপথ প্রত্যক্ষ করিয়াছেন।' অমরেন্দ্রনাথ রায় বলেছিলেন, রবীন্দ্রনাথের পক্ষে রাজনৈতিক বা ভাষাতাত্ত্বিক লেখা হল অনধিকার চর্চা। ‘জীবনস্মৃতি’ দুর্বোধ্য। অনেকে বলতেন, রবীন্দ্রনাথের ভারতবর্ষের ইতিহাসের ধারা নাকি ভাষার বিচ্যুতি। চিত্তরঞ্জন দাশ সম্পাদিত ‘নারায়ণ’ পত্রিকায় বিপিনচন্দ্র পাল ‘স্ত্রীর পত্র’ গল্পটিকে ব্যঙ্গ করে লিখলেন ‘মৃণালের কথা’, যা আসলে মৃণালকে ভুল প্রমাণের চেষ্টা।' আসলে প্রথাগত ধারণার বাইরে যখনই কিছু বলেছেন রবীন্দ্রনাথ, কটূক্তি এসেছে। রাধাকমল মুখোপাধ্যায় বলেছিলেন , রবীন্দ্রনাথ সাহিত্যে ইস্কুল মাস্টারি করেন। ১৩২৩ সালে প্রকাশিত হয়েছিল— অমরেন্দ্রনাথ রায়ের ‘রবিয়ানা’! তিনি বলেছিলেন, সুবিধাবাদী যেমন মিনিটে মিনিটে মতান্তরে গড়াইয়া চলে , রবীন্দ্রনাথও তেমনি গড়াইতেছেন। অমরেন্দ্রনাথ বলেছিলেন—‘Oh Inconsistency! Thy name is Rabindranath.’ ‘সবুজপত্র’ পত্রিকা রবীন্দ্রনাথের পক্ষে ছিল। তাই রবীন্দ্রনাথকে বলা হল , ‘সবুজতন্ত্রের পুরোহিত’। রবীন্দ্রনাথের ‘ঘরে বাইরে’ উপন্যাস তকমা পেল— উদ্দাম কামপ্রবৃত্তির পোশাকি রূপের। রবীন্দ্রনাথের যখন বাষট্টি বছর বয়স, তখন ‘প্রবাসী’ পত্রিকার সম্পাদকীয় বিভাগ তাঁকে আক্রমণ করে। রবীন্দ্রনাথের পক্ষে তা খুবই বেদনাদায়ক ছিল। এরপর নিন্দার ভূমিতে অবতীর্ণ হল ‘কল্লোল ’ পত্রিকা। রবীন্দ্রনাথকে সরাসরি অস্বীকার করেই কল্লোলের সাহিত্য আন্দোলন। রবীন্দ্রনাথের দীর্ঘ আয়ু নিয়েও কটাক্ষ তৈরি হল।
একবার ছাত্ররা রামমোহন ছাত্রাবাসে সরস্বতী পুজো করতে চাইলে , রবীন্দ্রনাথ তা সমর্থন করেননি। ফলে আবার বিদ্রূপ— 'রবীন্দ্রনাথের বার্ধক্যেও কি বুদ্ধি ফিরিল না?’ এরপর এল ‘অবতার’ পত্রিকা। সত্যিই অবতার । সেখানে বলা হল, রবীন্দ্রনাথ যৌবনে যৌনব্যাধি সিফিলিস-এ ভুগেছিলেন। ‘শনিবারের চিঠি’-র সজনীকান্ত দাস একদিকে ছিলেন রবীন্দ্রভক্ত। কিন্তু তিনিও ‘পুনশ্চ’ কাব্যগ্রন্থকে বলেছিলেন ‘সর্বনাশা কাব্যগ্রন্থ।’ তিনি রবীন্দ্রশাসিত বাংলা সাহিত্য সম্পর্কে হতাশার কথা লিখেছিলেন। শিবরাম চক্রবর্তী রবীন্দ্রনাথ ও কাবুলিওয়ালার মধ্যে ফারাক দেখেননি। কটাক্ষ করেছেন রবীন্দ্রনাথের আর্থিক স্বাচ্ছন্দ্যের প্রতি। রবীন্দ্রনাথ মোহন্ত, রবীন্দ্রনাথ ঋষি, রবীন্দ্রনাথ বুর্জোয়া, রবীন্দ্রনাথ বর্জনীয়— সবটাই শুনতে হয়েছে তাঁকে। আবার মৃত্যুর পর তাঁকেই ‘ঠাকুর’ বানিয়ে পুজো করছে সেই বাঙালি। কী আশ্চর্য নিয়তি !
রবীন্দ্রনাথ আসলে সময়ের থেকে এগিয়ে ছিলেন। তাই তাঁর সাহিত্য সমকালে সকলে বুঝতে পারেননি। অনেকটা ফরাসি সাহিত্যের ক্ল্যাসিসিস্ট আর রোম্যান্টিকদের সাহিত্যিক কলহের মতো। নীরদচন্দ্র চৌধুরী ‘রবীন্দ্রনাথের নিন্দা ও নিন্দাকারীরা' প্রবন্ধে রবীন্দ্রবিদূষণ প্রসঙ্গে এই তুলনাটি করেছিলেন। রবীন্দ্রনাথ আত্মভোলা মানুষ। এক অভিশপ্ত গন্ধর্ব যেন! এই জীবনব্যাপী নিন্দা তাঁকে কষ্ট দিয়েছে, কিন্তু বিচলিত করতে পারেনি। শুধু একবার, নোবেল পাওয়ার পরে কলকাতা থেকে আসা বাঙালিদের সম্বর্ধনা খোলা মনে গ্রহণ করতে পারেননি। তিনি জানতেন, আবার এই সম্মানের জোয়ার সরে গেলে পঙ্কতলের সব দৈন্য ধাপে ধাপে প্রকাশিত হতে থাকবে। তাই সেই সম্মানের সুরাপাত্র সম্পর্কে বলেছিলেন— ‘তা আমি ওষ্ঠের কাছে পর্যন্ত ঠেকাবো, কিন্তু এ মদিরা আমি অন্তরে গ্রহণ করতে পারব না। এর মত্ততা থেকে আমি চিত্তকে দূরে রাখতে চাই।’
দূরেই রেখেছিলেন রবীন্দ্রনাথ, যেকোনোরকম মত্ততাকে— স্তুতি হোক বা নিন্দা!
সহায়ক গ্রন্থঃ
১। রবীন্দ্র-বিদূষণ ইতিবৃত্ত, আদিত্য ওহদেদার
২। রবীন্দ্রসাহিত্য-সমালোচনার ধারা, আদিত্য ওহদেদার
৩। জ্যোতির্ময় রবি ও কালো মেঘের দল, সুজিত কুমার সেনগুপ্ত
৪। আত্মঘাতী রবীন্দ্রনাথ, নীরদচন্দ্র চৌধুরী
