রবীন্দ্রনাথকে ‘অশ্লীলতম’ প্রমাণ করতে চেয়েছিলেন দ্বিজেন্দ্রলাল

রবীন্দ্র বিরোধিতার অন্যতম কাণ্ডারী দ্বিজেন্দ্রলাল রায়

‘আজও মনে পড়ে আমার একটি অবিস্মরণীয় দিনের কথা। রবীন্দ্রনাথ সেদিন আমাদের সুকিয়া স্ট্রিটের বাসায় এসে “সে যে আমার জননী রে” গানটি গেয়ে সবাইকে মুগ্ধ করেন। গানের শেষে যখন পিতৃদেব তাঁকে আবীরে রাঙিয়ে দেন তখন কবিগুরু হেসে বলেছিলেনঃ “ আজ দ্বিজেন্দ্রবাবু শুধু আমাদের মনোরঞ্জন করেছেন তাই নয়- আমাদের সর্বাঙ্গ রঞ্জন করলেন”।’

-একথা তাঁর স্মৃতিচারণে লিখছেন দ্বিজেন্দ্রলাল রায়ের পুত্র দিলীপকুমার রায়। কিন্তু এই রাঙিয়ে দেওয়ার সম্পর্ক সরল ছিল না। সেই সন্ধ্যার সভাতেও রবীন্দ্রনাথের আগমন হেতু ছিল ভিন্ন। সে প্রসঙ্গে পরে আসছি।

রবীন্দ্রনাথ এবং দ্বিজেন্দ্রলাল, দুই অভিন্ন হৃদয় বন্ধুর সম্পর্কে ধরেছে চিড়। দু’জনের সুনিবিড় বন্ধুত্ব থাকলেও কাব্য-আদর্শে তাঁরা ছিলেন ভিন্ন মেরুর। তা সত্ত্বেও বারবার দ্বিজেন্দ্রলাল রায়ের রচনার প্রশংসা করে কলম ধরেছেন রবীন্দ্রনাথ। ১৯০২ সালে প্রকাশিত দ্বিজেন্দ্রলাল রায়ের ‘মন্ত্র’ কাব্যগ্রন্থ প্রসঙ্গে বঙ্গদর্শনে রবীন্দ্রনাথ লেখেন, ‘ …ইহার কবিতাগুলির মধ্যে পৌরুষ আছে। ইহার হাস্য, বিষাদ, বিদ্রূপ, বিস্ময় সমস্তই পুরুষের-তাহাতে চেষ্টাহীন সৌন্দর্যের সঙ্গে একটা স্বাভাবিক সরলতা আছে।’ রবীন্দ্রনাথের এহেন মুক্ত কন্ঠের প্রশংসাকে সেদিন অনেকেই মেনে নিতে পারেননি। নিন্দুকদের বক্তব্য ছিল দ্বিজেন্দ্রলালের স্তাবকতা করেছেন রবীন্দ্রনাথ।

আর দ্বিজেন্দ্রলালও রবীন্দ্রপ্রতিভাতে ছিলেন মুগ্ধ, তন্নিষ্ঠ। কিন্তু সেই দ্বিজেন্দ্রলালও নাম লেখালেন রবীন্দ্র বিরোধীদের দলে। রবীন্দ্রনাথ এবং তৎকালীন আরও কয়েকজন বাঙালি কবির বিরুদ্ধে তাঁর অভিযোগ ছিল অস্পষ্টতার। প্রবাসীতে ১৩১৩ বঙ্গাব্দে ‘কাব্যের অভিব্যক্তি’ প্রবন্ধে তিনি লিখলেন, ‘ বঙ্গের অস্পষ্ট কবিগণ বড়োই অধিক শেলি, ওয়ার্ডসওয়ার্থ ও ব্রাউনিং এর দোহাই দেন। এই ইংরাজ কবিগণ স্থানে স্থানে দুর্বোধ্য বটে। কিন্তু (ব্রাউনিং ছাড়া) তাঁহাদের কাব্যের মূল বা কেন্দ্রস্থ ভাব ধরিতে কষ্ট হয় না। কিন্তু আমাদের বঙ্গীয় কবিগণের কাব্যের কোনও ভাবই ধরা যায় না। আমাদের দেশের এই অস্পষ্ট কবিদের অগ্রণী শ্রী রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর।’

এতদ সত্ত্বেও দ্বিজেন্দ্রলালের সঙ্গে সুসম্পর্ক ধরে রাখতে উদগ্রীব ছিলেন রবীন্দ্রনাথ। তাই শুরুতেই বর্ণিত ১৩১১ বঙ্গাব্দে দ্বিজেন্দ্রলালের বাড়িতে আয়োজিত পৌর্ণমসী সভায় গিয়ে গান গেয়েছিলেন তিনি। কিন্তু তাতে বরফ যে গলেনি, তার প্রমাণ পাওয়া যায় অচিরেই।

১৩১৭ বঙ্গাব্দে ‘সাহিত্য’ পত্রিকার সম্পাদক সুরেশচন্দ্র সমাজপতি রবীন্দ্রনাথের ভাষাকে আক্রমণ করে লেখেন, ‘রবীন্দ্রবাবু বাঙ্গালা ভাষাকে কোন পাতালে লইয়া যাইতে চান, তাহা আমরা অনুমান করিতে পারিতেছি না।’ সে সুরেশচন্দ্রই আবার ১৩০০ বঙ্গাব্দের আষাঢ় সংখ্যায় রবীন্দ্রনাথের ‘সোনারতরী’ প্রসঙ্গে লিখেছিলেন, …ইহার কবিত্ব ও সৌন্দর্য্য বচনাতীত, তাহা কেবল হৃদয় দিয়া অনুভব করা যায়; তাহা ভাষায় ব্যক্ত করা দুরূহ।’ কাজেই একসময়কার প্রশংসাবাণী কেন হঠাৎ নেতিবাচক সমালোচনায় রূপান্বিত হল তা ব্যাখ্যা করা সময়সাপেক্ষ। তবে এই রবীন্দ্র বিরোধিতার তরজায় মেতে দ্বিজেন্দ্রলাল কী করলেন সেটাই দেখার। ১৮৯৪-এ প্রকাশিত ‘সোনার তরী’ কাব্যগ্রন্থের নিন্দা শুরু করলেন তিনি ১২ বছর পর। প্রবাসীতে দীর্ঘ সমালোচনা লিখে বোঝাতে চাইলেন ওই কাব্যগ্রন্থটি অস্পষ্ট, অর্থশূন্য, স্ববিরোধিতায় পরিপূর্ণ। কবিতার আধ্যাত্মিক ভাব সম্পর্কেও ব্যাঙ্গের সুর রেখে নিশানা করলেন রবীন্দ্রঅনুরাগীদের, যারা ‘সোনার তরী’ প্রসঙ্গে উচ্ছ্বসিত ছিলেন। দ্বিজেন্দ্রলালের সমালোচনা পড়লে একথা মনে হয়, রবীন্দ্রনাথ নয়, তাঁর আসল নিশানা রবীন্দ্রনাথ নামক প্রতিষ্ঠানটি, এবং রবীন্দ্রনাথের অনুগামীরা।

দ্বিজেন্দ্রলালের সে সমালোচনা পড়ে তেলে বেগুনে জ্বলে ওঠেন রবীন্দ্রনাথে মশগুল পাঠকেরা। যদুনাথ সরকার, দীনেশচন্দ্র সেন প্রমুখরা সোনারতরীর আধ্যাত্মিক ব্যাখ্যা দিতে গিয়ে দ্বিজেন্দ্রলালকে কটাক্ষ করলেও রবীন্দ্রনাথ এ বিষয়ে বাক্যব্যয় করতে রাজি ছিলেন না। তিনি দীনেশচন্দ্রকে লেখা একটি চিঠিতে লেখেন, ‘ আমরা বৃথা সকল জিনিষকে বাড়াইয়া দেখিয়া নিজের মনের মধ্যে অশান্তি ও বিরোধ সৃষ্টি করি।’

রবীন্দ্রভক্তদের আক্রমণ করে ১৩১৩ বঙ্গাব্দের বঙ্গদর্শনে ‘কাব্যের উপভোগ’ প্রবন্ধে দ্বিজেন্দ্রলাল লেখেন, ‘ …রবিবাবু যা’ই লেখেন তাতেই তাধিন-তাকি-ধিন-তাকি ম্যাও এঁও-ওঁও- বলে কোরাস দিতে পারি না,-রবীন্দ্রনাথবাবুর সঙ্গে বন্ধুত্বের খাতিরেও নয়।’

এই লেখার পর স্বাভাবিক ভাবেই রবীন্দ্রভক্তদের মধ্যে ক্ষোভে ফেটে পড়ার উপযোগ হয়েছিল। রবীন্দ্রনাথ কিন্তু শান্ত স্বরে এ সমালোচনার জবাব দেন। নিজের অনুরাগীদের ক্ষোভ প্রসঙ্গে লেখেন, ‘ কিন্তু দ্বিজেন্দ্রবাবু এ কথা মনে রাখিবেন, এই ক্ষোভের দ্বারাতেও আমি তাঁহার বা তাঁহার বন্ধুদের সম্মানহানি করিতে চাহি নাই।’

কিন্তু দ্বিজেন্দ্রলালের মাথায় যেন তীব্র রবিবিরোধিতার ভূত মাথায় চেপে বসেছিল। ১৩১৬ বঙ্গাব্দে ‘সাহিত্য’ পত্রিকায় ‘কাব্যের নীতি’ রচনায় তিনি রবীন্দ্রনাথের প্রেমের গানগুলিকে ‘লম্পট বা অভিসারিকার গান’ বলে অভিহিত করলেন। ‘চিত্রাঙ্গদা’ কে পুড়িয়ে ফেলতে বললেন এবং রবীন্দ্রনাথকে ‘অশ্লীলতম’ প্রমাণ করতে উঠে পড়ে লাগলেন। রবীন্দ্রনাথ কিন্তু এ ঝগড়ায় উপস্থিত থাকতে নারাজ ছিলেন। এমনকী এই চরম বিরোধিতার সম্মুখীন হয়েও রবীন্দ্রনাথ দ্বিজেন্দ্রলালের লেখা ইংরাজি বইকে স্কুল পাঠ্য করার সুপারিশ করে চিঠি দিচ্ছেন ক্ষিতিমোহন সেনকে।

দ্বিজেন্দ্রলালের রবীন্দ্রবিরোধিতার চরম অধ্যায় হল রবীন্দ্রনাথকে ব্যঙ্গ করে তাঁর ‘আনন্দ বিদায়’ প্রহসন রচনা। স্টার থিয়েটারে এর প্রথম দৃশ্যের পর প্রবল গোলমালে নাটকটির অভিনয় বাতিল করতে হয়। চরম অপদস্থ হন দ্বিজেন্দ্রলাল। তাঁর জীবনীকার দেবকুমার রায়চৌধুরীর লেখা থেকে জানা যায়, স্টার কতৃপক্ষ সেদিন দ্বিজেন্দ্রলালকে পিছনের দরজা দিয়ে বার করে দিয়েছিলেন।

কেন রবীন্দ্রবিরোধিতায় মাত্রা ছাড়া হয়ে পড়েছিলেন সে যুগের অত্যন্ত যোগ্য গীতিকার, সুরকার, কবি দ্বিজেন্দ্রলাল? এ প্রশ্ন উঠলে সমালোচকরা কেউ কেউ বলেন রবির ছটায় ঈর্ষান্বিত হয়ে পড়েছিলেন তিনি। অথচ সেই দ্বিজেন্দ্রলালই ‘গোরা’ উপন্যাস সম্পর্কে বলেছিলেন, ‘ বস্তুতঃ এত সুন্দর সামাজিক উপন্যাস কদাচিৎ নয়নগোচর হয়…ইহা শুদ্ধ উপন্যাস নহে, ইহা ধর্মগ্রন্থ। … এ বাংলা সাহিত্যের গৌরব।’ দ্বিজেন্দ্রলালের রবীন্দ্র বিরোধিতা প্রসঙ্গে তাঁর পিতৃদেবের ‘ভুল’ স্বীকার করে নিয়েছেন পুত্র সংগীতগুরু দিলীপকুমার রায়। তিনি লিখছেন, ‘ যাঁকে তিনি এত শ্রদ্ধা করতেন সেই রবীন্দ্রনাথের বন্ধুত্ব তিনি হারালেন ঝোঁকের মাথায় তাঁকে অন্যায় আক্রমণ করে।’

আর দ্বিজেন্দ্রলাল? মৃত্যুর আগে তাঁরই জীবনীকারের কাছে তিনি ভুল স্বীকার করছেন। বলছেন, ‘সত্যিই আমার অত্যন্ত ভুল হয়ে গেছে, আমি আর এমন কাজ করব না।’

আর রবীন্দ্রনাথ পিতার আচরণে অনুতপ্ত দিলীপকুমারকে স্নেহপাশে জড়িয়েছেন, মায়ার বাঁধনে বেঁধেছেন, চিঠিতে লিখেছেন, ‘তোমার পিতাকে আমি শেষ পর্যন্ত শ্রদ্ধা করেছি’।

Developed by DXDasia