
প্রিন্স দ্বারকানাথ ঠাকুরের ছোটোছেলে নগেন্দ্রনাথ ঠাকুর
ধরা যাক, বিদেশের পথ ধরে হেঁটে চলেছেন এক বৃদ্ধা। অশক্ত, ন্যুব্জ শরীর! অথচ খুব উজ্জ্বল দুটি চোখ! বৃদ্ধার মনে মনে একটি অন্য স্বর জেগে উঠছে— “যদিও স্ত্রী এবং মা হয়ে আমি সুখী হয়েছি এবং চুলে আমার পাক ধরেছে, আজও যখন সেই বিগত দিনের সহজ সরল অমলিন প্রেমের কথা স্মরণ করি আমার দু-চোখ জলে ভরে যায়। আমি শুনেছিলাম নগেন্দ্র আর ইহজগতে নেই, তা যদি না শুনতাম তাহলে আমি কখনও হয়তো বিবাহ করতাম না।” নগেন্দ্র বলতে প্রিন্স দ্বারকানাথ ঠাকুরের ছোটো ছেলে নগেন্দ্রনাথের কথা বলা হয়েছে এবং এই বৃদ্ধা ফ্যানি স্মিথ। নগেন্দ্রনাথের প্রেমিকা। তাঁদের সম্পর্ক পরিণতি পায়নি। অন্য মানুষের সঙ্গে দাম্পত্যজীবন কাটিয়েছেন তাঁরা। অথচ দুজনের মনেই স্থির হয়ে ছিল পরস্পরের সঙ্গে কাটানো কিছু মুহূর্ত। অল্পবয়সের তীব্র আবেগ আর মায়াজড়ানো সেই সম্পর্ক রূপকথার চেয়ে কোনো অংশে কম নয়। মেয়েটির নাম ফ্যানি স্মিথ। নগেন্দ্রনাথের বিলেতবাসের সময় ফ্যানির সঙ্গে বন্ধুত্ব হয় তাঁর।
নগেন্দ্রনাথ ছিলেন আশ্চর্য রূপবান। তিনি যখন স্নান করার জন্য পুকুরে নামতেন তখন মনে হত জলে পদ্মফুল ফুটেছে। তিনি ছিলেন দ্বারকানাথ ঠাকুরের ছোটোছেলে। ১৮২৯ সালে জন্মেছিলেন তিনি। এই রূপবান পুত্রটির উপর একটু বেশিই পক্ষপাত ছিল দ্বারকানাথের। নগেন্দ্রনাথ ছোটোবেলা থেকেই এক বিষাদ ও একাকিত্বের মধ্যে বড়ো হয়েছেন। তাঁর জন্মের পর থেকেই দিগম্বরী ও দ্বারকানাথের মতবিরোধ তৈরি হয়। দুজনেই নিজের নিজের জগতে ব্যস্ত হয়ে পড়লেন। দেবেন্দ্রনাথ যেভাবে বড়ো হয়েছেন, নগেন্দ্রনাথের বড়ো হওয়া ঠিক তেমনটা নয়। দশ বছর বয়সে কিছুদিনের ফারাকে প্রায় সমবয়সী এক দাদা এবং মাকে হারিয়ে হয়তো আরো অন্তর্মুখী হয়ে উঠেছিলেন নগেন্দ্রনাথ।
দেবেন্দ্রনাথ যেভাবে বড়ো হয়েছেন, নগেন্দ্রনাথের বড়ো হওয়া ঠিক তেমনটা নয়। দশ বছর বয়সে কিছুদিনের ফারাকে প্রায় সমবয়সী এক দাদা এবং মাকে হারিয়ে হয়তো আরো অন্তর্মুখী হয়ে উঠেছিলেন নগেন্দ্রনাথ।
ঠাকুরবাড়ির সেরা সন্তান তখন দেবেন্দ্রনাথ। নগেন্দ্রনাথ আলাদা করে কারো নজরে পড়েননি তখনও। তাঁর বাবা যখন দ্বিতীয়বার বিলেত যাচ্ছিলেন, তখন নগেন্দ্রনাথকে সঙ্গে করে নিয়ে গেলেন। মুখচোরা ছেলেটির লেখাপড়ার প্রতি আগ্রহ নজর করেছিলেন দ্বারকানাথ। নগেন্দ্রনাথকে নিয়ে সম্ভবত অনেক আশা ছিল দ্বারকানাথের। তাই উইল করার সময় দেবেন্দ্রনাথকে দিলেন আদিবাড়ি আর গিরীন্দ্রনাথকে বৈঠকখানা বাড়ি। নগেন্দ্রনাথের জন্য রেখেছিলেন কিছু জমি আর টাকা। হয়তো ভেবেছিলেন, বিলেতেই প্রতিষ্ঠিত হয়ে যাবে দ্বারকানাথ। বিলেতযাত্রার সময় নগেন্দ্রনাথের কিশোর বয়সের রূপ দেখে মুগ্ধ হয়েছিলেন অনেক বিদগ্ধজন। নগেন্দ্রনাথ ঘুরতে ভালোবাসতেন এবং নিজের ভ্রমণবৃত্তান্ত ডায়েরিতে লিখে রাখতেন। দ্বারকানাথ নগেন্দ্রনাথকে সম্ভ্রান্ত ইংরেজ সন্তানের মতো করে তৈরি করছিলেন। নগেন্দ্রনাথ ঘোড়ায় চড়ে হাইড পার্কে বেড়াতে যেতেন। ঠিক অভিজাত তরুণ ইংরেজদের মতো।
দিব্যি কাটছিল দিন। বিদেশে লেখাপড়া, থিয়েটার, উদার মানসিকতা — এই সবকিছু অন্তর্মুখী নগেন্দ্রনাথকে নতুন জীবন দিয়েছিল। কিন্তু হঠাৎ করেই দ্বারকানাথের অসুস্থতা সব এলোমেলো করে দিল। চিন্তিত নগেন্দ্রনাথ প্রবাসে আবার একলা হয়ে পড়েন। দ্বারকানাথের মৃত্যু হয় নির্জন প্রবাসে। তাঁর মৃত্যুশয্যায় এবং সমাধির সময় নিজের বলতে একমাত্র নগেন্দ্রনাথই ছিলেন। একাই দায়িত্ব নিয়ে দ্বারকানাথকে সমাধিস্থ করেন নগেন্দ্রনাথ। তাঁকে সমাধিস্থ করার সময় কোনো ধর্মসমাজের সাহায্য নেওয়া হয়নি।
এই সময় তাঁর সঙ্গে আলাপ হল ফ্যানির। নগেন্দ্রনাথ তখন প্রবল রূপবান। গায়ে বহুমূল্য জমকালো শাল আর জ্বলজ্বলে দুটি চোখ। ফ্যানির মুগ্ধতা প্রেমে রূপান্তরিত হল। নগেন্দ্রনাথের একটি ছবি এঁকেছিলেন ফ্যানি। দুজনে বাগানবাড়িতে বসে শেক্সপিয়র, বায়রন এবং আরো অনেক কবির কবিতা পড়তেন। ফ্যানি ছিলেন যথার্থই গুণবতী ও বিদূষী। দ্বারকানাথ বেঁচে থাকলে হয়তো তাঁদের প্রেম পরিণতি পেতে পারত, কিন্তু তা হল না। দ্বারকানাথের মৃত্যুর পর প্রবাসী নগেন্দ্রনাথকে ঘরে ফেরানোর তোড়জোড় শুরু হল। সহজে ফিরে যেতে চাননি তিনি। বন্ধুকে লিখেছিলেন, “তোমার নিকট মনের কথা খুলিয়া বলিতে কি, আমার এখন দেশে ফেরার ইচ্ছা নাই, কি কারণে ঠিক বলিতে পারি না। —ইংলন্ড ছাড়িয়া কলকাতায় যাইতে কোনমতেই আমার মন উঠিতেছে না।” কিন্তু ফিরতে হল।
বিদেশে লেখাপড়া, থিয়েটার, উদার মানসিকতা — এই সবকিছু অন্তর্মুখী নগেন্দ্রনাথকে নতুন জীবন দিয়েছিল। কিন্তু হঠাৎ করেই দ্বারকানাথের অসুস্থতা সব এলোমেলো করে দিল। চিন্তিত নগেন্দ্রনাথ প্রবাসে আবার একলা হয়ে পড়েন।
তখন কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার কথা হচ্ছিল। নগেন্দ্রনাথকে সেখানে পড়তে পাঠাবার প্রলোভন দেখিয়ে দেশে ফেরানো হয়েছিল। অথচ পরে তাঁকে সেখানে পড়তে পাঠানো হয়নি। ফ্যানি প্রস্তুত ছিলেন এই অবশ্যম্ভাবী বিচ্ছেদের জন্য। তাঁর চিঠিতে লিখেছিলেন, “জানতাম দুজনেই, এ প্রণয়ের পরিণতি ঘটবে বিচ্ছেদের দুঃখে। শেষ বিদায়ের দিন এল, নগেন্দ্রনাথ নানা উপহার এনেছিলেন আমার জন্য, তা থেকে আমি গ্রহণ করেছিলাম একটিমাত্র জিনিস— তাঁর পরিধেয় শাল। দুঃখের অশ্রুতে আমাদের প্রণয়ের পরিসমাপ্তি ঘটল।”
নগেন্দ্রনাথ যখন দেশে ফিরছেন, তখন সকলের খুব কৌতূহল! কেমন পোশাক পরে আসবেন তিনি? জাহাজঘাটে ভিড় জমে গেল। নগেন্দ্রনাথ এলেন ধুতি পাঞ্জাবি চাদর গায়ে, পায়ে জরির লপেটা। সকলে অবাক। সত্যেন্দ্রনাথ ঠাকুর তখন ছোটোদের দলে। বিলেতফেরত নগেন্দ্রনাথ তখন তাঁর কাছ বিস্ময়! নগেন্দ্রনাথ আবেগপ্রবণ ছিলেন। তাই ব্যবসার মারপ্যাঁচ অত বুঝতেন না। ঠাকুরবাড়ির কার কোম্পানির হাল খারাপ না বুঝে সেখানেই টাকা লগ্নি করেন এবং ব্যবসার লোকসান হওয়ায় ঋণগ্রস্ত হয়ে পড়েন। বিলাসী জীবনে অভ্যস্ত হয়ে পড়ায় নিজের জন্য এবং পরোপকারের নেশা থাকায় পরের জন্যও ঋণ করতেন। প্রথম প্রথম দেবেন্দ্রনাথ সামাল দিলেও পরে তিনিও নগেন্দ্রনাথকে এড়িয়ে চলতেন। অবশ্য বঞ্চিত করেননি কখনও। তাঁর প্রাপ্য সম্পত্তি থেকে অর্থ বিনিয়োগ করার ব্যবস্থা করে দিয়েছিলেন। এরপর দেবেন্দ্রনাথের পুজো বন্ধের সিদ্ধান্তকে কেন্দ্র করেও দুই ভাইয়ের মতবিরোধ হয়। কিন্তু ভালোবাসা অটুট ছিল। সিপাহী বিদ্রোহের সময় দেবেন্দ্রনাথকে প্রবাস থেকে বাড়ি ফিরিয়ে আনার জন্য একা বেরিয়ে পড়েছিলেন নগেন্দ্রনাথ। ভালোবাসার গভীরতা ছিল এতটাই।
ত্রিপুরাসুন্দরীর সঙ্গে নগেন্দ্রনাথের বিয়েটা নিয়মমাফিক হয়। সাত বছরের ত্রিপুরাসুন্দরীর সঙ্গে নগেন্দ্রনাথের বন্ধুত্ব তৈরি হয়েছিল কীনা জানা নেই। তবে ঋণগ্রস্ত নগেন্দ্রনাথের জীবন তখন অন্য খাতে বইতে শুরু করেছে। অথচ তিনি ভ্রমণপিয়াসী। অর্থাভাবে একাই বেরিয়ে পড়তেন। আবেগপ্রবণ মানুষটি পরিজনদের জন্য ভেবেছেন। অথচ অভিমানে জোড়াসাঁকোয় থাকেননি। রমানাথ ঠাকুরের বাড়িতেই থাকতেন। মাত্র উনত্রিশ বছর বয়সে তাঁর মৃত্যু হয়। তাঁর কোনো ছবি পাওয়া যায়নি। পরে অবনীন্দ্রনাথের সঙ্গে দেখা হয় বৃদ্ধা ফ্যানির। তিনি পার্শিয়ান একটি ছবির ফ্রেম পাঠান নগেন্দ্রনাথের ছবি রাখার জন্য। কৃষ্ণকৃপালনি খোঁজ নিয়ে দেখেছিলেন নগেন্দ্রনাথের একটি তৈলচিত্র বিক্রয় করা হয়েছিল মহারাজা প্রফুল্লনাথ ঠাকুরের কাছে। সেই ছবির ফ্রেম পাঠিয়েছিলেন সেই বৃদ্ধা, যিনি তরুণীবেলায় এক ভারতীয়কে ভালোবেসেছিলেন। কোনোদিন ভুলে যাননি।
______
সহায়ক গ্রন্থঃ
ঠাকুরবাড়ির বাহিরমহল, চিত্রা দেব
