রবীন্দ্রনাথের ‘দুই বিঘা জমি’র উপেনরা ভালো নেই, তাই কৃষকদের কথা ভেবেছেন বারবার

নোবেল পুরস্কার অর্থের অধিকাংশই শান্তিনিকেতন বিদ্যালয়ের নামে কৃষি ব্যাঙ্কে ডিপোজিট রেখেছিলেন কবি

রবীন্দ্রনাথ এখন একটি প্রতিষ্ঠান। ঠাকুরবাড়ি বাঙালি সংস্কৃতির কেন্দ্র। রবীন্দ্রচর্চা করতে বসে বিস্মিত হতেই হয়, অতল গহীন সরোবরের মতো সেই ভাবনার থই পাই না। অবাক হয়ে ভাবি, এই কবিমনটি কৃষাণের জীবনেরও শরিক। ২০২০ সালের প্রবল কৃষক আন্দোলনের প্রেক্ষাপটে যখন গ্রাম উজাড় করে একত্রিত হচ্ছেন সহস্রাধিক কৃষক, তখন রবিঠাকুরের সেই মনটিকে বড়ো মনে পড়ছে, যে মনের কণা দিয়ে লিখেছিলেন দুর্ভিক্ষ পীড়িত  মানুষদের জন্য গান— ‘বর্ষ যদি যায় সাথে লয়ে যাক বরষের শোকভার।’ নতুন বছরের সূচনালগ্নে এই প্রার্থনা সকলের। তার সঙ্গে আজকের কথকতার কেন্দ্রে থাকুক কৃষাণের জীবনের শরিক যে জন সেই কবির এক বিশেষ জীবনচর্যা।

কর্মভূমি হিসেবে রবীন্দ্রনাথ যখন বীরভূমের গ্রাম বেছে নিলেন, তখন দারিদ্র্য আরো নিকটে এসে দাঁড়ালো কবির মনের খুব কাছে। জমিদার বংশের সন্তান হওয়ার জন্য কৃষক প্রজাদের জীবন দেখেছিলেন সংবেদনশীল মন নিয়ে। হয়তো তাই , ‘দুই বিঘা জমি’ কবিতা রচনার সময় উপেনের বেদনা সোচ্চার হয়ে ধরা পড়েছিলো তাঁর কলমে। জমিদারের মন নিয়ে এই ভাবনার জাদু তৈরি হতে পারে না। নিজেই বলেছিলেন, জন্মগত পেশা জমিদারি হলেও স্বভাবগত পেশা ছিল আসমানদারী। নিজের ছেলে রথীন্দ্রনাথ, জামাই নগেন্দ্রনাথকেও বিলেত পাঠিয়েছিলেন কৃষিবিদ্যা ভালো করে আয়ত্ত করার জন্য। তাঁদের লিখেছিলেন, ‘তোমরা দুর্ভিক্ষপীড়িত প্রজার অন্নগ্রাসের অংশ নিয়ে বিদেশে কৃষি শিখতে গেছ—ফিরে এসে এই হতভাগ্যদের অন্নগ্রাস কিছু পরিমাণেও যদি বাড়িয়ে দিতে পার তাহলেই ক্ষতিপূরণ হলে মনে সান্ত্বনা পাবো। মনে রেখো জমিদারের টাকা চাষির টাকা এবং এই চাষিরাই তোমাদের শিক্ষার ব্যয়ভার নিজেরা আধপেটা খেয়ে এবং না খেয়ে বহন করছে। এদের এই ঋণ শোধ করবার দায় তোমাদের উপর রইল— নিজেদের সাংসারিক উন্নতির চেয়েও এইটেই তোমাদের প্রথম কর্তব্য হবে।’ রথীন্দ্রনাথ ফিরে এসে যুক্ত হন পতিসরে কৃষি সংস্কারের কাজে। শিলাইদহেের কুঠিবাড়ি এলাকাতে বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি ব্যবহার করে একটি আদর্শ কৃষিখামার তৈরি করিয়েছিলেন রথীন্দ্রনাথ। তখন বেশ একটা কর্মযজ্ঞ শুরু হয়েছিল। আমেরিকা থেকে চাষ আবাদের যন্ত্রপাতি, ভুট্টার বীজ আনানো হয়। যে চাষিরা ধান ছাড়া অন্য কোনো ফসলের চাষ করতে পারতেন না, তাদের আলু আর টমেটোর চাষ শেখানো হয়েছিলো। দো আঁশলা মাটিতে উদ্ভিদের প্রয়োজনীয় খাদ্যসামগ্রী আনানোর সঙ্গে সঙ্গে একটি ছোটো রাসায়নিক ল্যাবরেটরিও গড়ে তোলা হয়েছিল। উৎকৃষ্ট সারের সম্পর্কে এক মজাদার গল্প আছে। রথীন্দ্রনাথ জেলেদের কাছ থেকে নৌকা বোঝাই ইলিশমাছ কিনে, তাতে চুন মাখিয়ে মাটির নিচে পুঁতে রাখার ব্যবস্থা করেছিলেন। বছরখানেক পর সেই মাছ পরিণত হয়েছিলো উৎকৃষ্ট সারে। পতিসরের অনুর্বর কঠিন জমিতে আনারস, কলা, খেজুর প্রভৃতি ফলের গাছ লাগানোর জন্য প্রজাদের উৎসাহিত করার কথা বলেছিলেন রবীন্দ্রনাথ। অনুর্বর জমিতে খেসাড়ির চাষ করলে ভালো ফলন হয়, অস্ট্রেলিয়ার কোন এক গাছ নাকি গরুর খাদ্য— এইসব তথ্য সংগ্রহ করে রথীন্দ্রনাথকে দিতেন রবীন্দ্রনাথ।

হলকর্ষণ উৎসবে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর 

রবীন্দ্রনাথের কাছে কৃষির উন্নতি একটা নেশার মতো ছিল। রবীন্দ্রনাথ যখন প্রথম জমিদারি দেখাশোনার দায়িত্ব পেয়েছিলেন, তখন প্রবল উদ্যমে আলুচাষ শুরু করিয়েছিলেন। শিলাইদহ কুঠিবাড়ি সংলগ্ন এলাকার পঞ্চাশ বিঘা জমিতে শুরু হয়েছিলো আলুর চাষ। কৃষি বিশারদ কবি ও নাট্যকার দ্বিজেন্দ্রলাল রায় এই বিষয়ে রবীন্দ্রনাথকে পরামর্শ দিতেন। কুষ্ঠিয়া থেকে আলুর ক্ষেত পরিদর্শনে আসতেন দ্বিজেন্দ্রলাল রায়। কিন্তু এত উদ্যম সত্ত্বেও দেখা গেল ফলন ভালো হয়নি। অথচ রবীন্দ্রনাথের কাছ থেকে বীজ নিয়ে মাত্র পাঁচ কাঠা জমিতে আলুর চাষ করে অনেক ফলন করিয়েছিলো চামরু নামে এক রাজবংশী চাষি। প্রায় দ্বিগুণ! সে এক মজার কাণ্ড। তবে এই আলু চাষের ঘটনা সরকারি নথিতে জায়গা পায়। এই ব্যর্থতা রবীন্দ্রনাথের কৃষক সত্তাকে এতটুকুও দমাতে পারেয়নি। জগদীশচন্দ্র বসুকে একটি চিঠিতে রবীন্দ্রনাথ লিখেছিলেন, ‘আমার চাষবাসের কাজও মন্দ চলিতেছে না। আমেরিকান ভুট্টার বীজ আনাইয়াছিলাম— তাহার গাছগুলা দ্রুতবেগে বাড়িয়া উঠিতেছে। মান্দ্রাজী সরু ধান রোপণ করাইয়াছি, তাহাতেও কোনো অংশে নিরাশ হইবার কোনো কারণ দেখিতেছি না। দ্বিজেন্দ্রলালবাবু সোমবারে সস্ত্রীক আমার শস্যক্ষেত্র পর্যবেক্ষণে আসিবেন।’ অক্ষয়কুমার মৈত্রের উদ্যোগে রবীন্দ্রনাথ শুরু করেছিলেন রেশম চাষ। দ্বারকানাথ দেবেন্দ্রনাথের আমলে শিলাইদহের কাছে রেশমচাষ হতো, এই শুনে রীতিমতো খেপে উঠেছিলেন লরেন্স নামের এক সাহেব। তিনি ছিলেন রবীন্দ্রনাথের সন্তানদের গৃহশিক্ষক। রবীন্দ্রনাথ পরে সেই ঘটনার উল্লেখ করে বলেছিলেন, ‘লরেন্সের বিছানাপত্র, তার চৌকি, টেবিল, খাতা, বই, তার টুপি, পকেট, কোর্— সর্বত্রই হল গুটির জনতা। তার ঘর দুর্গম হয়ে উঠল দুর্গন্ধের ঘন আবেষ্টনে।’ কিন্তু উপযুক্ত মুনাফার অভাবে সে চাষ মাঝপথে বন্ধ হয়।

রবীন্দ্রনাথের কৃষিকাজে উৎসাহ শুধুই বড়লোকের খেয়াল ছিল না। ভুট্টা, কপি, পাটানাই মটর ইত্যাদি চাষে প্রজাদের উৎসাহ জুগিয়েছিলেন। চাষিদের আর্থিক দুর্গতির কথা ভেবে, তাদের মহাজনদের কাছ থেকে বাঁচাবার অভিপ্রায় থেকেই রবীন্দ্রনাথ পাতিসরে কৃষি ব্যাঙ্ক প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। কয়েকজন বন্ধু আর ধনী মহাজনদের কাছ থেকে কয়েক হাজার টাকা ধার নিয়ে গ্রামীন ব্যাঙ্ক খুলে বসেছিলেন। প্রজাদের স্বার্থের কথ ভেবে চলতেন রবীন্দ্রনাথ। তাই কৃষি ব্যাঙ্কের ভরাডুবি নিকটেই ছিল। সেই সময়ই রবীন্দ্রনাথ পেলেন নোবেল পুরস্কার। সেই পুরস্কারের অর্থের সিংহভাগই শান্তিনিকেতন বিদ্যালয়ের নামে কৃষি ব্যাঙ্কে ডিপোজিট রাখা হয়েছিলো। কৃষকরা এত উপকৃত হয়েছিলেন যে মহাজনরা ওই গ্রামের থেকে ব্যবসা গুটিয়ে নিতে বাধ্য হয়েছিলেন।

রবীন্দ্রনাথ লক্ষ্য করেছিলেন, চাষের কাজ হয়ে গেলে চাষিরা বেকার হয়ে পড়ে। এই জন্য চাষিদের কুটিরশিল্প শেখানোর উপর জোর দিয়েছিলেন রবীন্দ্রনাথ। ধানভানার কলের ব্যবহার, ট্র্যাক্টরের ব্যবহার ইত্যাদির প্রসঙ্গে গভীর ভাবে ভাবতেন। চাষিদের মনস্তত্ত্ব নিয়েও ভেবেছেন তিনি। কৃষির সঙ্গে সৌন্দর্যবোধকে মিলিয়ে দিয়েছিলেন তিনি। বনভোজন, বৃক্ষরোপণ, নবান্ন ইত্যাদি উৎসবের মতো পালন করা, চাষি গৃহস্থের মনে ফুলগাছের শখ জাগিয়ে তোলা ইত্যাদি মনস্তাত্ত্বিক বিষয়গুলি ছড়িয়ে দিতে চেয়েছিলেন। ‘আমরা চাষ করি আনন্দে’— এই বীজমন্ত্রে দীক্ষিত করতে চেয়েছিলেন বাংলার দরিদ্র চাষীদের। মৃত্যুর কয়েকমাস আগেও ভেবেছিলেন সেইসব দরিদ্র অভাগাদের কথা, যারা ফসল ফলায়, অথচ তাদের কথা কেউ ভাবে না। রবীন্দ্রনাথ তাঁর সংবেদনশীল মন নিয়ে ‘কৃষাণের জীবনের শরিক’ হতে চেয়েছিলেন। শুধু কথায় নয়, কাজেও।

তথ্যঋণঃ
রবীন্দ্রনাথ ও রবীন্দ্রনাথ, পূর্ণানন্দ চট্টোপাধ্যায়

Developed by DXDasia