
সকল দেশে সকল সম্প্রদায়ের মধ্যে যদি অচলায়তন না থাকত, তাহলে এই বই রবীন্দ্রনাথ লিখতেন না
সে এক সময়ের কথা। সেদিন আকাশে ঘন মেঘের ঘটা, চারিদিকে ঘন সবুজ ক্ষেত, রবি ঠাকুরের তিনতলার ঘরের জানালা দরজা সমস্ত খোলা। কলম এগোতেই পারছে না। রাজকীয় আলস্যে ভরপুর রবীন্দ্রনাথ। রাইটার্স ব্লক হতে পারে। কিন্তু একটি নাটকের প্রথম অঙ্ক লেখা হল। সেদিন পয়লা আষাঢ়। চারুচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়কে লেখা পত্রে এমনই কিছু আবেগী শব্দের বেড়ায় ঘেরা আবহে ক্রমশ পল্লবিত হয়ে উঠছিল একটি নাটকের গড়ে ওঠার উপাখ্যান। নিভৃতে কলম হাঁকিয়ে লিখে চলেছেন রবীন্দ্রনাথ। তারপর একদিন লেখা শেষ হল— ‘নাটকটা শেষ করেছি। যদি ইচ্ছা কর শনিবার মধ্যাহ্ন বা অপরাহ্নে ওটা শোনাবার একটা ব্যবস্থা করা যেতে পারে।’ শনিবার হল না, সেদিনটা ছিল রবিবার। সীতাদেবীর লেখা স্মৃতিচারণ ‘পূণ্যস্মৃতি’ থেকে জানা যায়, সেই বিশেষ রবিবার বিকেল হতে না হতে কয়েকজন বারান্দায় দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করছিলেন কখন তিনি আসবেন। ঘণ্টাখানেক পর রবীন্দ্রনাথ এলেন। পাঠের সময় ক্রমাগত শ্রোতার সংখ্যা বাড়তে লাগল। রবীন্দ্রনাথ ক্লান্তিহীন কণ্ঠে গাইছেন, শব্দ সাজিয়ে বলে চলেছেন নাটকের অঙ্কগুলি। নাটক শেষে নাটকের নামটি কী রাখবেন এই নিয়ে ভাব বিনিময় শুরু হল। রবীন্দ্রনাথ নাম রাখতে চাইলেন ‘গুরু’। কিন্তু শ্রোতাদের মধ্যে গুঞ্জন উঠল— ‘অচলায়তন’। শেষ পর্যন্ত অচলায়তন নামটিই বহাল রইল। তবে অচলায়তন নাটকের একটি অভিনয়যোগ্য রূপ লেখা হয়েছিল। তার নাম দেওয়া হয়েছিল ‘গুরু’। পাঠের পর রবীন্দ্রনাথ নাটকটি পরিমার্জনা করেছিলেন। তাঁর নিজের লেখা চিঠির ভাষায়, ‘সমস্ত জিনিসটা আর একবার মেজে ঘসে বাড়িয়ে কমিয়ে এবারে বেশ আমার মনের মতো করে নিয়েছি।’ ‘অচলায়তন’ প্রথম প্রকাশিত হয়েছিল প্রবাসী পত্রিকায়।
একটি মস্ত বড়ো প্রতিষ্ঠান আর তার গারদের মতো লোহার দরজার আড়ালে বেশ কয়েকজন শিক্ষার্থী থাকত। তাদের পরিচালনার জন্য ছিলেন আচার্য, উপাচার্য, উপাধ্যায়, অধ্যাপক, মহাপঞ্চক এবং অসংখ্য আচার বিচার। ছাত্ররা নিয়ম মতো চলে। ঘাড় বাঁকায় না। দূরে তাকায় না। মেপে হাসে, মেপে কাঁদে। তাদের ঘিরে থাকে অগুনতি ভয়। উত্তর দিকে মূর্তিমতী ত্রাসের মতো রয়েছেন একজটা দেবী। অজানা কারণে উত্তর দিকের জানালা খোলা নিষিদ্ধ। অথচ সুভদ্র নামের এক বালক সেই জানালা খুলে ফেলেছে। অচলায়তনের নিস্তরঙ্গ জীবনে যেন ঢেউ এল। সকলেই ব্যস্তসমস্ত হয়ে উঠল। কেমন করে সুভদ্রকে কঠিনতম প্রায়শ্চিত্ত করানো যায়! সকলেই একমত। একজন ছাড়া। নাটক-এর ক্লাইম্যাক্স এল ওই দলছুট অবাধ্য ছাত্র পঞ্চকের মধ্য দিয়ে। প্রস্তুত হল নাটকীয় দ্বন্দ্বের জমি। পঞ্চকও প্রথমে একজটা দেবীকে মান্যতা দেওয়ার, তট তট তোটয় মন্ত্র পড়ার চেষ্টা করেছিল। কিন্তু এইসব অকারণে মেনে নিতে তার বুদ্ধি ও মেধা বাধা দিল। অগত্যা লড়াই শুরু হল প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে। পঞ্চকের মেধার জোর এতটাই বেশি ছিল যে তার তেজ অচলায়তনের সহ্য হল না। যেকোনো প্রতিষ্ঠানই সম্ভাব্য বিপ্লবের স্ফুলিঙ্গকে নির্বাসন দেয়। এক্ষেত্রেও অন্যথা হল না। নিজেদের উঁচু আসনে নিজেরাই প্রতিষ্ঠিত করেছিল যারা, তারাই পঞ্চককে নির্বাসন দিলেন। পঞ্চকের সঙ্গে প্রায় স্বেচ্ছা নির্বাসন নিলেন অচলায়নের আচার্য। কারণ তিনিও দীর্ঘদিন ধরে মনে মনে দ্বিধাদ্বন্দ্বে ক্ষতবিক্ষত হচ্ছিলেন। দুইজনে প্রতিষ্ঠানকে দূরে রেখে চলে গেলেন দর্ভক পল্লীতে। এইবার নাটকের আলো গিয়ে পড়বে দুইটি শ্রেণির উপর — দর্ভক ও শোনপ্রাংশু। অস্পৃশ্য ও অন্তজ— অচলায়তনের লোহার দরজার ওপারের মানুষজন তাদের মানুষ বলেই হয়তো ভাবেনি কখনও। কাজ পাগল মানুষগুলোর অবশ্য সেই নিয়ে কোনো মাথাব্যথা নেই। শোনপ্রাংশুদের প্রেরণা দাদা ঠাকুর আর দর্ভকদের প্রেরণা গোঁসাই। গল্পে গানে আদরে খেটে খাওয়া মানুষগুলো আর যেমনই থাক, অচলায়তনের শিক্ষার্থীদের মতো দুঃখী আর ত্রস্ত ছিল না। তারা সদাজাগ্রত প্রাণ। অচলায়তনে নিয়ম নিষেধ শিকড় ছড়িয়ে দিয়েছিল কঠিন ও কঠোরভাবে। এর মধ্যেই খবর রটেছিল গুরু আসছেন। এই গুরু নাটকে আগাগোড়া একটা সাসপেন্স হয়ে রয়ে গেলেন। শেষে যখন নাটকের শেষ অঙ্ক, তখন সকলে অবাক!
দাদাঠাকুর, গোঁসাই আর গুরু একজনই। সেক্ষেত্রে অচলায়তনের দীর্ঘ, অহঙ্কারী প্রাচীর যে ভাঙবেই, তা অমোঘ সত্য। অচলায়তনে আলো হাওয়ার মতো আনন্দের অনুপ্রবেশও অবশ্যম্ভাবী ছিল। মহাপঞ্চক তখন মানসিক জড়ত্বের প্রতিনিধি হয়ে লড়াই চলিয়েছে গুরুর প্রতিকূলে নিজেকে রেখে। তবে লড়াইয়ের ঘোর ভাঙে। যেমন করে ধুলোর মতো ভেঙে নুইয়ে পড়ে মিথ্যা আচার বিচার। পঞ্চক আর মহাপঞ্চকের উপর দায়িত্ব দিয়ে গুরু মিলিয়ে যান আবার। এইবার শুধু রেশটুকু রেখে যান মনে। পঞ্চক এই আনন্দ যজ্ঞের আচরণ নিজেই শুরু করেছিল। বজ্রবিদারণ, চক্রেশ, মরীচী, মহামরীচী, পর্ণশর্বরী, ধ্বজাগ্রকেয়ুরী মন্ত্র তাকে কোনো বন্ধনে জড়াতে পারেনি। এছাড়াও শৃঙ্গভেরী ব্রত, কাকচক্ষু পরীক্ষা, ছাগলোমশোধন, দ্বাবিংশপিশাচ ভয়ভঞ্জন পরীক্ষা তাকে মনে মনে দূরেই সরিয়ে নিচ্ছিল অচলায়তনের থেকে। পঞ্চকের মন দূরে কোথাও দূরে দূরে বেড়াত। প্রথমদিকে পঞ্চকের মনের যে দ্বন্দ্ব সেটাই নাটকের মজা। একদিকে সে শোনপ্রাংশুদের সঙ্গে অবলীলায় মিশছে।
অন্যদিকে অচলায়তনের কাঁসরের বাজনায় সে ত্রস্ত হয়। পঞ্চক আসলে গড়পরতা সামাজিক মানুষের দ্বিধাক্ষত মন। আচার বিচারের প্রাচীন সংস্কারের নির্মোক ছেড়ে বেরিয়ে আসা অত সহজ নয়। যখন তা সম্ভব হয়, তখনই নাটক শেষের বাজনা বাজে। অচলায়তনেও তাই-ই হয়েছিল। শোনপ্রাংশুদের সহজিয়া আনন্দ যখন পঞ্চককে ভর করে, পঞ্চক বলে ওঠে, ‘সর্বনাশ করলে রে— আমার সর্বনাশ করলে। আমার আর ভদ্রতা রাখলে না। এদের তালে তালে আমারো পা দুটো উঠছে।’ আবার দর্ভকদের দলে মিশে পঞ্চক আবারও টালমাটাল। বলে, ‘দে ভাই, আমার মন্ত্র তন্ত্র সব ভুলিয়ে দে, আমার বিদ্যাসাধ্যি সব কেড়ে নে, দে আমাকে তোদের ঐ গান শিখিয়ে দে।’ তারপর দাদাঠাকুর, গোঁসাইয়ের সঙ্গে এক হয়ে যান অচলায়তনের গুরু। বহুদিনের ভুল ভাঙার মতো প্রাচীর ভাঙে। সঙ্গে সঙ্গে পঞ্চকের মনের শিকল আলগা হয়। মহাপঞ্চকের অহং ভাঙে শেষ পর্যন্ত। বহুদিন পরে আসা বর্ষার মতো গুরু আসেন। — ‘মনে হচ্ছে যেন ভিজে মাটির গন্ধ পাচ্ছি, কোথায় যেন বর্ষা নেমেছে।’ গুরু যেন নতুন বর্ষার জলধারার মতো। মনের ঊষর মাটিকে সজীব করতে আসেন। অথবা গুরু সেই সোনার কাঠি যা অনেক বছরের ঘুম থেকে জাগিয়ে তোলে নিঝুম মনকে। মনে হয় গুরু একটি সদর্থক ভাবনা। একলা অথচ হাজার মানুষ এই গুরু। এক আশ্চর্য ভাবনা! যে ভাবনার স্পর্শে অচল আয়তনটি গতি পাবে। চরিত্র ও চরিত্রগুলির অন্তর্দ্বন্দ্ব সেই গতিশীলতা প্রাপ্তির উপলক্ষ্য মাত্র। নাটকের পঞ্চক ও মহাপঞ্চক চরিত্র দুটির ইঙ্গিত রবীন্দ্রনাথ পেয়েছিলেন রাজেন্দ্রলাল মিত্রের The Sanskrit Buddhist Literature of Nepal বইটি থেকে। এডওয়ার্ড টমসন অনুমান করেছিলেন অচলায়তনের সঙ্গে Castle of Indolence, Fairy queen এবং Princess এর সাদৃশ্যের কথা।
কিন্তু রবীন্দ্রনাথ এই অনুমানের সঙ্গে একমত হতে পারেননি। রামানন্দ চট্টোপাধ্যায়কে লেখা চিঠিতে লিখেছিলেন, ‘আমাদের নিজেদের দেশে মঠ মন্দিরের অভাব নেই—আকৃতি ও প্রকৃতিতে অচলায়তনের সঙ্গে তাদেরই মিল আছে।’ পত্রিকায় প্রকাশের পর অচলায়তন নাটকটিকে রক্ষণশীলরা অত্যন্ত সমালোচনা করেছিলেন। রবীন্দ্রনাথ তখন বলেছিলেন অচলায়তনকে শুধু হিন্দু সমাজের উপর আরোপ করা ঠিক নয়। সকল দেশে সকল সম্প্রদায়ের মধ্যে যদি অচলায়তন না থাকত, তাহলে এই বই তিনি কখনও লিখতেন না। ‘আর্যাবর্ত’ পত্রিকায় ললিতকুমার মুখোপাধ্যায় লিখেছিলেন, ‘ধর্মের দিক হইতে অচলায়তনের বিচার করা চলে। রাজনীতির দিক হইতেও ইহার বিচার করা চলে। অচলায়তন রাজনীতির Chinese wall, অর্থনীতির Closed door’। ললিতমোহন অচলায়তনকে রবিবাবুর ঘর বলেছিলেন। — ‘রূপকের অচলায়তন অবশ্য একটি সুবৃহৎ চত্বর, রবিবাবুর বাল্যজীবনের অচলায়তন একটি ঘর। সেই ঘরের ভিতরে একটি নির্দিষ্ট গণ্ডির মধ্যে তাঁর বিচরণস্থান। গুণের মধ্যে সেই ঘরের উত্তরদিকের জানালা খুলিলে প্রায়শ্চিত্তের বিধি ছিল না। সেই জানালাতে একাদিক্রমে ৬ ঘণ্টা ৮ ঘণ্টাকাল কেবল পাঁচজনে কে কেমন করিয়া গা ধুইতেছে, মাথা রগড়াইতেছে দেখা, ইহা পঞ্চকের তট তট তোটয় অপেক্ষা দশগুণ বেশি কষ্টকর, তাহা সকলেই স্বীকার করিবেন। রবিবাবু নিজেই ধরা দিয়াছেন— তিনি অচলায়তনকে ঘর বলিয়াছেন—
‘বেজে ওঠে পঞ্চমে স্বর ,
কেঁপে ওঠে বন্ধ এ ঘর
বাহির হতে দুয়ারে কর
কেউ ত হানে না।’
Readers' response বলে একটি কথা আছে। পাঠক ইচ্ছেমতো ভাবতেই পারেন রচনা সম্পর্কে। তবে রচনাকারের মতের গুরুত্ব সবচেয়ে বেশি। রবীন্দ্রনাথ অচলায়তন বিষয়ে নানা সময় নানা কথা বলেছেন। বারবারই বলতে চেয়েছেন ইতিহাসে যখনই কৃত্রিমতার জাল জটিল হয়েছে তখনই গুরু এসেছেন। দ্বার রুদ্ধ, পথ দুর্গম, বেড়া বিস্তর তবু তিনি এসেছেন। মনে হয় অচলায়তন নাটকে গুরু আসবেন— এটাই আসল। বাদবাকি যা নেতিবাচকতা সব গুরু আসার প্রস্তুতি। গুরু যেন রুদ্র। প্রাচীন জীর্ণ রীতিনীতি সব ভেঙে নতুন সময় তৈরি করেন। আলোচনার অন্তে এসে রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে একমত হয়ে যাই। নাটকটির নাম ‘অচলায়তন’ না হয়ে ‘গুরু’ হলেই যথার্থ হত। কারণ পঞ্চক, মহাপঞ্চক, আচার্য, উপাধ্যায়, সুভদ্র, দর্ভক — মনের মধ্যে সকলের উপস্থিতিকে ম্লান করে জেগে থাকেন গুরু, যিনি একলা অথচ হাজার মানুষ। যিনি মনে মনে আউল বাউল, ঘরছাড়া অথচ সকলকে শক্ত বাঁধনে বেঁধে যেন সকলের অন্তরে রয়ে যান অমোঘ আশ্বাস হয়ে।
সহায়ক গ্রন্থঃ
রবীন্দ্ররচনাবলী, পঞ্চম খণ্ড, পশ্চিমবঙ্গ সরকার
রবীন্দ্ররচনাবলী, ষোড়শ খণ্ড, পশ্চিমবঙ্গ সরকার
রবীন্দ্রনাট্য পরিক্রমা, উপেন্দ্রনাথ ভট্টাচার্য

