
কোনো এক সময়ে পালিত হওয়া রবীন্দ্র জয়ন্তী কিংবা পাড়ার মঞ্চের শ্যামা-চিত্রাঙ্গদার মহড়া
জীবনের খাতায় সময় ফুরায়, সেই(সে-ই / সেটাই) স্বাভাবিক নিয়ম। সময় আসলে ফুরায় না। সময় শুধু বয়ে চলে, ফুরোয় মানুষ, ফুরোয় মানুষের প্রত্যাশা। যেখানে মানুষের সাধারণ ধর্মই নিজের পরবর্তী প্রজন্মের ভিতর নিজের চিহ্নটুকু রেখে যাওয়া, সেখানে একজন শিল্পী নিজের নিশান রেখে যান তাঁর সৃষ্টিতে; তাঁর পদচিহ্নটুকু রয়ে যায় গল্পে, গানে, কবিতায়, ছবিতে।
আমরা যারা নব্বইয়ের মাঝামাঝি জন্মেছি, তারা এই এখনকার মতো পাড়ার মোড়ে মোড়ে হনুমান জয়ন্তীর বাড়বাড়ন্ত অথবা রামনবমীর ডিজে-র প্রবল নাচ না দেখলেও বরীন্দ্র জয়ন্তীর রমরমা দেখেছি বটে।
এ বছর রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ১৬৫তম জন্মদিন। তিনি এই পৃথিবী ছেড়েছেন ১৯৪১ সালে। তবু আজ এতগুলো বছর তিনি রয়ে গেছেন বাঙালির মননে। অবশ্য তিনি যে থেকে যাবেন কোনও না কোনওভাবে, সেই আভাস মৃত্যুর আগেই পেয়েছিলেন কবি। 'আজি হতে শতবর্ষ পরে' কেউ না কেউ যে তাঁর কবিতাখানি পড়বেন, সেই কথা তিনি জানতেন নিশ্চিত। বাঙালি মননে রবীন্দ্রনাথ এক অবিচ্ছেদ্য অঙ্গই বটে। আমরা যারা নব্বইয়ের মাঝামাঝি জন্মেছি, তারা এই এখনকার মতো পাড়ার মোড়ে মোড়ে হনুমান জয়ন্তীর বাড়বাড়ন্ত অথবা রামনবমীর ডিজে-র প্রবল নাচ না দেখলেও রবীন্দ্র জয়ন্তীর রমরমা দেখেছি বটে।
প্রতি পাড়ায় বাঁশের মঞ্চ বেঁধে পালিত হত রবীন্দ্র জয়ন্তী। একটা বয়সের পর এই ধরনের অনুষ্ঠানগুলিতে অংশগ্রহণ করার প্রবণতা কমেছে অবশ্যই। যত বয়স বেড়েছে তত পাড়ার মাইকে বাজা রবীন্দ্রসংগীতের চেয়ে মধ্যরাতের ব্যক্তিগত দেবব্রত কিংবা কণিকায় দূরে কোথাও হারিয়ে গেছে মন। একটা বয়সের পর কবি রবীন্দ্রনাথের চেয়ে প্রিয় হয়ে উঠছেন প্রাবন্ধিক রবীন্দ্রনাথ, তাঁর দর্শন, কৃষিভাবনা। যখন সত্যিই বুঝেছি রবীন্দ্রনাথের ন্যাশনালিজম, তত দিনে আমাদের চারপাশে এক অন্য জাতীয়তাবাদের জাল তৈরি হয়ে গিয়েছে। সেই জালে আটকেই আরও বেড়েছে পাড়ার মোড়ের ডিজে-র আওয়াজ। তবে এই সর্বব্যাপী রবীন্দ্র চেতনার বীজটি কিন্তু ওই পাড়ার মঞ্চের ‘ফুলে ফুলে ঢলে ঢলে’-র ভিতরই নিহিত ছিল।
যে সকল পরিবারে গীতবিতান কিংবা সঞ্চয়িতার জায়গা হয়ে ওঠেনি কখনওই, সেই পরিবারের শিশুরা কিন্তু রবীন্দ্রনাথকে চিনতে পেরেছে পাড়ার ওই বাঁশের মঞ্চ থেকেই, পাড়াতুতো কাকা-পিসি-মামা-মাসি বা মাস্টারমশাই-দিদিমণিদের হাত ধরে।
যে সকল পরিবারে গীতবিতান কিংবা সঞ্চয়িতার জায়গা হয়ে ওঠেনি কখনওই, সেই পরিবারের শিশুরা কিন্তু রবীন্দ্রনাথকে চিনতে পেরেছে পাড়ার ওই বাঁশের মঞ্চ থেকেই, পাড়াতুতো কাকা-পিসি-মামা-মাসি বা মাস্টারমশাই-দিদিমণিদের হাত ধরে। তারপর তাঁকে যে যার মতো ধারণ করেছে। আজ যখন পাড়ায় পাড়ায় বাসন্তী কিংবা শীতলা পুজোর বহর দেখি তখন বুঝতে পারি কবিপক্ষ জুড়ে বিপুল আর্থিক বদান্যতায় পালিত হওয়া যথাযথ শৈল্পিক অনুষ্ঠানগুলির চেয়ে বাঁশের মঞ্চের নান্দনিকভাবে দুর্বল অথচ আন্তরিকতার প্রাচুর্যে উজ্জ্বল ওই অনুষ্ঠানগুলির প্রয়োজনীয়তা কেন বেশি! আসলে নরম মাটির শিশু মন, যেখানে তখনও নান্দনিকতার শক্ত আদল তৈরি হয়নি, সেখানেই একটা অচেনা শব্দ, একটি সম্পূর্ণ নূতন ও বৈপ্লবিক ভাবের প্রকাশ সবচেয়ে সহজে ও গভীরে আঁচড় কেটে যেতে পারে। আমাদের সময়ে পালিত হওয়া রবীন্দ্র জয়ন্তী কিংবা রবীন্দ্র-নজরুল সন্ধ্যা, অথবা বিজয়া সম্মিলনী, পাড়ার মঞ্চের শ্যামা-চিত্রাঙ্গদা নৃত্যনাট্যের মহড়া থেকে তার অপটু অনুষ্ঠান – সমস্তটাই এক যৌথতার আদলের ছোঁয়া দিয়ে যেত। কাঁচা হৃদয়ে ওইটুকু রসদই ভবিষ্যতের আশ্বাস ভরিয়ে দিত কল্পনায়। শত বছর আগে লেখা সাহিত্য হৃদয়ের দ্বারখানি খুলে দিত শতবর্ষ পরেও।
