এক গালা পেটানো রাত ও একা গ্রামের গল্প

পুরুলিয়া জেলার এক ক্ষুদ্র গ্রাম বলরামপুর

পুরুলিয়া জেলার এক ক্ষুদ্র গ্রাম বলরামপুর। স্টেশনের নাম বরাভূম হলেও পোস্টঅফিস ও গ্রামের নাম বলরামপুর হিসাবেই খ্যাত। অযোধ্যার বুকে শেষতম রেলস্টেশন ও ঘনবসতি এই গ্রামই। এখন অনেকখানি শহর হয়ে উঠেছে বলরামপুর। তবে খুব কমদিনের বসত নয় এই গ্রামের। এখানকার পুরোনো বাড়িগুলি দেখলে স্পষ্টতই বোঝা যায় তার গঠনে হাভেলির প্রভাব। প্রাকৃতিক সৌন্দর্য বজায় রেখেও শহরের অনেক সুবিধাই এখন দিতে সক্ষম এই গ্রাম। এই গ্রামেই প্রায় দেড়দশক আগে রাজস্থান থেকে এসে বসবাস শুরু করে ছ’সাতটি মুসলিম পরিবার। স্বভাবতই পাশাপাশি বাসা বাঁধে তারা। এরা গালার কাজে দক্ষ। এখনও সেই পেশাতেই রয়েছেন বেশ কিছু প্রজন্ম ধরে। খুব স্পষ্টভাবে বলতে পারেন না চলে আসার ইতিহাস। এখন এনাদের অনেকেরই পরিবার স্বচ্ছল, সপরিবার সামলাচ্ছেন গালার ব্যবসা। দু’তলা বাড়ি করেছেন, ঘরে আলো, পাখা নিয়ে সুখের সংসার। তা গোটা পশ্চিমবঙ্গ পড়ে থাকতে পুরুলিয়ার এক কোণে এসে থেকে যাওয়ার কিই বা কারণ হতে পারে তাঁদের? খুঁজতে গেলে দু’তিনটি জিনিস মাথায় আসে প্রথম। এঁরা রাজস্থানি ঘরানার গালার কাজে দক্ষ। রাজস্থানের রুক্ষ ও শুষ্ক আবহাওয়ায় বেড়ে ওঠা মানুষগুলি কোথাও গিয়ে নিজেদের আবহাওয়ার কিয়দাংশ মিল খুঁজে পান পুরুলিয়ার শুষ্ক গরমে। একটা ফাঁকা গ্রাম, মরুভূমি না হলেও জলের যথেষ্ট টান সেখানে। মূলত চাষ নির্ভর এই গ্রামে সবচেয়ে বেশি ফলন টম্যাটোর। এখনও রপ্তানি হয় বহু পরিমাণে।

বাজারের মাঝবরাবর পরপর বেশ কয়েকটি দোকান। দোকানে কোনও দরজা নেই। কোথাও বাবা-মা-ছেলে, কোথাও দাদা-বোন মিলে গরম করে পিটিয়ে, তাতে ধাতুর রিং ভরে তৈরি করে যাচ্ছেন গালার চুরি, কানের দুল… ট্যুরিস্টদের গাড়ি এসে থামছে। তাঁরা দেখছেন, কেউ কেউ ভিডিও করছেন, কেউ কেউ কিনেও নিচ্ছেন কাছের মানুষদের জন্য। আর সন্ধের বলরামপুরের অন্ধকারে হালকা ভেসে আসছে তাদের অবিরাম হাতুড়ি ঠোকার আওয়াজ। লাল, নীল, সবুজ, কালো নানা রঙের মিশেল দিয়ে তৈরি হচ্ছে নানা জিনিস।

খুব স্পষ্ট ধারণা না পাওয়া গেলেও ধরে নেওয়া যায় এখানে এসে সেটল করার পিছনে তাঁদের অন্যতম কারণ ছিল পুরুলিয়ায় গালার সহজলভ্যতা। পশ্চিমবঙ্গের সবচেয়ে বেশি শেল্যাক বা গালার সাপ্লাই পুরুলিয়াতেই।

আজ প্রায় পাঁচ-ছয় প্রজন্ম এঁরা একই মাটি আঁকড়ে পড়ে রয়েছেন এই গ্রামে। একই পেশা চালিয়ে পেট ভরাচ্ছেন পরিবারের। আমার দেশের বাড়ির গ্রামে দেশের পশ্চিম প্রান্ত থেকে এসে কীভাবে নিজের লোক হয়ে উঠেছে মানুষগুলি। সময়ের সঙ্গে মানুষের চাহিদা বদলেছে, চুরি বা দুলের সঙ্গে আস্তে ধীরে পেন বানানো শুরু করেছেন তাঁরা। তারপর চাবির রিং, ফুলদানি। এবার গিয়ে দেখতে পাই, থালা ও ট্রে-র সংযোজন। তবে আন্তরিকতা এতটুকু কমেনি তাঁদের। একটি টাকার জিনিস না কিনেও ঘণ্টার পর ঘণ্টা বসে দেখা যায় তাঁদের কাজ। ছবি তোলা যায়।

থালা দেখতে চাওয়ায় চাচি হাঁক পাড়লেন ঘরের দিকে। এক যুবতী চটজলদি ওর্ণা দিয়ে ঘোমটা টেনে কটা থালা নিয়ে হাজির হলো সামনে, পিছন পিছন বেরিয়ে এল তার পিসি। মেয়েটি লাজুক চোখে এক এক করে সমস্ত রকম জিনিস দেখালো। পিসি চিনতে পারলেন, মায়ের খোঁজ নিলেন, দিদিরও। ছবি তুলব কিনা জিজ্ঞাসা করায় খুশি হয়ে বললেন তাহলে কাজ করি, কাজের ছবি তোলো বেটা। কথা দিয়ে এসেছিলাম লিখব ওদের নিয়ে, নিজের শিকড় ছেড়ে, মাটি ছেড়ে এসে ছোট্ট এই টবে মানিয়ে নেওয়া গাছগুলো একগাল হেসেছিল। আমি তাদের টব হালকা চাগিয়ে দেখেছি, মাটির দিকে কিছু সাদা শিকড় বেরিয়ে এসেছে টবের বাইরেও।

Developed by DXDasia