কারাগারে খুন – সত্তর বছর আগের সেই দিন

দিনটা ছিল ১৯৫০ সালের ২৪ এপ্রিল

দিনটা ছিল ১৯৫০ সালের ২৪ এপ্রিল। মাত্র তিনবছর আগে আমরা এক হাতে স্বাধীনতা পেয়েছি এবং অন্য হাতে খণ্ডিত বাংলা। ওপার বাংলার নতুন নাম হয়ে গেল, পূর্ব পাকিস্তান। সেই পূর্ববঙ্গের রাজশাহী জেলের খাপড়া ওয়ার্ডে ঠান্ডা মাথায় এক হত্যাকাণ্ডের আয়োজন করে মুসলিম লিগ সরকার। সেইদিন ওই ওয়ার্ডে সমস্ত দরজা বন্ধ করে জানলা দিয়ে গুলি চালিয়ে খুন করা হয় কমিউনিস্ট বন্দিদের। স্বাধীনতার পরে ভারতীয় উপমহাদেশে জেল হত্যার ঘটনা রাজশাহীতে এই প্রথম। সেই সময়েই জেনানা (মহিলা) ফাটকে নির্যাতিতা হচ্ছেন কমিউনিস্ট নেত্রী ইলা মিত্র।

গুলি যখন চলে তখন খাপড়া ওয়ার্ডে ৩৯ জন রাজবন্দি ছিলেন। তার মধ্যে সাতজন ঘটনাস্থলেই মারা যান। গুরুতর আহত ১৮ জন। বাকিরাও কম-বেশি জখম হন। যে সাতজন মারা যান তাঁরা হলেন, কম্পরাম সিং, হানিফ শেখ, আনোয়ার হোসেন, সুধীন ধর, দিলুয়ার হোসেন, সুখেন্দু ভট্টাচার্য এবং বিজন সেন। এঁদের মধ্যে বিজন সেন ছিলেন আন্দামান ফেরত স্বাধীনতা সংগ্রামী।

দেশ স্বাধীন হওয়ার একবছর পার না হতেই ভারত এবং পাকিস্তানে কমিউনিস্ট পার্টি বেআইনি ঘোষিত হয়। আসলে স্বাধীনতা আন্দোলনের শেষ পর্বে, প্রধানত দুই বাংলায় কৃষকদের তেভাগা আন্দোলন যথেষ্ট জোরদার হয়ে ওঠে। তার প্রভাব সবচেয়ে বেশি পড়েছিল উত্তরবঙ্গে। সেইকারণে স্বাধীনতার আগে থেকেই দুই বাংলার বিভিন্ন কারাগারে কমিউনিস্ট নেতা-কর্মীদের ভিড় উপচে পড়ে। অনেকেই স্বাধীনতার সূর্যোদয় দেখেছেন কারাগারে বসে। সেই আন্দোলনের প্রাণকেন্দ্র হয়ে ওঠে দিনাজপুর, ময়মনসিং, সিলেট, রাজশাহী ইত্যাদি জেলা। দেশভাগের ফলে দিনাজপুর দ্বিখণ্ডিত হয়। কিন্তু তার বড়ো অংশটাই চলে যায় পূর্ব পাকিস্তানে।

খাপড়া ওয়ার্ডে যাঁরা শহিদ হলেন, সেই সাতজনের দেহ আর খুঁজে পাওয়া যায়নি। তাদের সৎকার কেমন করে হল তাও জানতে পারেননি আত্মীয়-পরিজনেরা। সরকারি প্রেসনোট-এ বলা হয়, কমিউনিস্ট বন্দিরা পুলিশের রাইফেল ছিন্তাই করতে চেয়েছিল বলেই এ হত্যাকাণ্ড ঘটে। সরকারি তরফে ঘটনা নিয়ে কোনো নিরপেক্ষ তদন্তের নির্দেশ দেওয়া হয়নি। ১৯৫৪ সালের নির্বাচনে পূর্ববঙ্গের যুক্তফ্রন্ট সরকার গঠিত হওয়ার পরে তদন্ত শুরু হয়। কিন্তু কিছুদিনের মধ্যেই সামরিক কর্তৃপক্ষ সেই সরকার বাতিল করে দেয়।

সেই সময়ের পরিস্থিতির চাপে দুই বাংলার কমিউনিস্ট পার্টিও খাপড়া ওয়ার্ড হত্যাকাণ্ড নিয়ে প্রচারের বিশেষ সুযোগ পায়নি। ১৯৫১ সালে এই রাজ্যে ‘পাকিস্তান শহিদ স্মৃতি কমিটি’ গড়ে ওঠে অগ্নিযুগের বিপ্লবী সতীশ পাকড়াশির নেতৃত্বে। আসলে, পূর্ববাংলায় খাপড়া হত্যাকাণ্ড প্রচার পেতে শুরু করে ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনের পরে। বাংলাদেশ স্বাধীন হলে ১৯৭৩ সালের ২৪ এপ্রিল, অর্থাৎ ঘটনার ২৩ বছর পরে, রাজশাহী জেলে খাপড়া ওয়ার্ডের সামনে শহিদবেদি স্থাপিত হয়। তবে, ঘটনার কয়েকদিনের মধ্যেই কলকাতার ‘দ্য স্টেটসম্যান’ পত্রিকায় সংবাদটি প্রকাশিত হয়। রাজশাহী জেলায় কর্মরত রয়টার্সের প্রতিনিধি আইনজীবী ধীরেন মৈত্র সেই সংবাদ পাঠিয়েছিলেন। তার ফলে তাঁকে পুলিশি হেনস্থার শিকার হতে হয়েছিল।

গুরুতর আহত হয়ে যাঁরা বেঁচে ছিলেন তাঁদের মধ্যে সিলেটের অনন্ত দেব সারাজীবনের জন্য পঙ্গু হয়ে যান। নুরুন্নবীর বাঁ পা কেটে ফেলতে হয়। আহতদের মধ্যে ছিলেন প্রথম বামফ্রন্টের আমলে বিধানসভার অধ্যক্ষ সৈয়দ মনসুর হবিবুল্লা। তাঁকে সারাজীবন শরীরে দশটি ছররা গুলি নিয়ে বেঁচে থাকতে হয়েছে।

পৃথিবীর ইতিহাস আয়তনে বাড়ছে। সেইসঙ্গে বাড়ছে সংগ্রামী শহিদদের তালিকাও। নির্যাতন অত্যাচারের এই ঘটনা প্রবাহ একদিন বিস্মৃতির সমুদ্রে হারিয়ে যায়। তবুও কোনো বিশেষ দিনে মনে করার সামান্য দায় আমরা কি উপেক্ষা করতে পারি? 

কৃতজ্ঞতা স্বীকারঃ

খাপড়া ওয়ার্ড হত্যাকাণ্ড ১৯৫০: মতিউর রহমান: প্রথমা প্রকাশন: ঢাকা।

Developed by DXDasia