প্রেম দোদোমা

প্রেম দিবসে বঙ্গদর্শনের বিশেষ লেখা ৫ : ভাস্কর লেট

“প্রেম আসলে দোদোমা। দু’বার ফাটে। একবার মাটিতে, একবার শূন্যে। বাতাসে ছড়িয়ে পড়ে মৃত বারুদের গন্ধ। ফাটাফুটো খোল ছড়িয়ে থাকে ইতিউতি। এখানেই নটেগাছটির ইতি। এরপর নতুন প্রেমের সমীকরণ কি শুরু হয় আবার?”

নরওয়ের ক্যাপ্টেন আলাতোস পার্লো যখন ঠিক করলেন সমুদ্রে-সমুদ্রে আর লগি ঠেলে ঘুরে বেড়াবেন না, তখন তাঁর মনে পড়ল, ঘন বাদামি চামড়ায় বাঁধানো ডায়েরিসমূহের কথা। ‘ইউএসএস বারি’ ছিল তাঁর জাহাজের নাম। তা-ই নিয়ে উত্তর মহাসাগর ও বাল্টিক সাগর চষে ফিরেছেন এক সময়। 

তাঁর পূর্বসুরি নরওয়েজিয়ান ক্যাপ্টেন ড্যানিয়েল ড্যানিয়েলশন ট্রোসনারের ডায়েরি পড়ে উদ্বুদ্ধ হয়ে ক্যাপ্টেন আলাতোস পার্লো এন্ট্রি নিতে শুরু করেছিলেন ১৯০১ সাল নাগাদ। ‘নোট’ নিয়েছেন একটানা ১৫ বছর। ৩৬-৪০টি ডায়েরি থাকার কথা সেই মতো। ৪৭ বছর বয়সে, সমুদ্রের নোনা গন্ধ শরীর থেকে মুছে ফেলার জন্য যখন তিনি ডাঙার জীবনে থিতু হতে চাইলেন মরিয়া হয়ে– দরকার পড়ল পুরনো ডায়েরিদের। বইটই বের করতে হবে, বা নাতিপুতিদের জন্য গল্প শোনার রসদ জুগিয়ে যেতে হবে– এ ধরনের বাধ্যবাধকতা তাঁর ছিল না। এ অনেকটা পুরনো আয়নায় অনেক দিন পরে নিজেরই পুরনো মুখটিকে ফিরে পাওয়ার তাড়না।

শরীর না-জাগলে প্রেম কোথায়? এমনটা মনে হয় প্রতিবার। শরীরকে দেখা যায়। শরীরের জাগৃতি বোঝা যায়। প্রেম, সে তো কুয়োর জলে পড়ে থাকা চাঁদের আলো। তুলব কী করে, তার আগেই জলের মধ্যেই ভেঙে যায় খান-খান হয়ে। প্রেমের উদ্ভাস বোঝা যায় না।

কিন্তু দেখা গেল, বেশ কিছু ডায়েরির খোঁজ নেই। বাতাসে উবে গিয়েছে যেন। বিস্তর সন্ধান করে হাতে এল খান চোদ্দোমতো। তেমন যত্ন কখনওই করেননি ডায়েরিগুলিকে। লেখার কালি তাই ফিকেতর হয়েছে। এত বিবর্ণ যে পড়া যায় না কোথাও কোথাও। পাতাগুলো পলকা হতে হতে এত জরাজীর্ণ– উল্টে দেখতে ইচ্ছে করছে– কিন্তু ক্যাপ্টেন আলাতোস পার্লো ভয় পাচ্ছেন– যদি নাড়াচাড়ার ফলে ছিঁড়ে যায়!

সন্ধে হতেই বসে পড়েন ডিনার টেবিলের পাশের সোফাটায়। পানীয় সহযোগে। এক-একটি ‘এন্ট্রি’ উদ্ধার করতে পারলে, স্মৃতির গভীরে অনেকখানি অক্সিজেন বগবগ করে ওঠে। কবে, কেন, কী প্রয়োজনে লিখেছিলাম– তা মনে করতে চেষ্টা করেন। তা সত্যিই কিছু কিছু মনে পড়ে। আবার ছিন্নসূত্রের কতক-কতক মনেই পড়ে না কখনও। এর কারণ হতে পারে ক্যাপ্টেন আলাতোস পার্লো-র দুর্বল মেমরি। বা, হতে পারে তাঁর ক্ষীণ লেখনীশক্তির ফঁাপা বিবরণ– দায়ী এর জন্য। পাতার পর পাতা লিখে গেলেই তো হয় না, সে তো জায়গা ভরাট করা হল, শেষাবধি তো লিখে প্রকাশ করতে হবে অনুভূতির তলদেশে আসলে কী রয়েছে– সেইটে। যখন পারেন না তা উদ্ধার করতে, দোষ অবধারিতভাবে গিয়ে পড়ে লেখার ’পর। এ কেমন শব্দবাণ ছুড়েছেন, যা প্রাচীন ক্ষত আর চেনাতে পারছে না? এ কেমন অক্ষরবৃত্ত রচেছেন, যা আনন্দের উৎস খুলে দিয়ে তুলে আনতে পারছে না রুদ্ধ ফোয়ারার ফুর্তিকে? এ কেমন কল্পনাশক্তি, যা শব্দের পায়ে পায়ে হাঁটতে হাঁটতে চলে যেতে পারছে না অতীতে ভঙ্গুরতায়? ভেবে কিনারা করতে পারেন না আলাতোস পার্লো। বিষণ্ণ হয়ে বসে থাকেন। 

কিন্তু এদিন তা হল না। 

“প্রেম আসলে দোদোমা। দু’বার ফাটে।…” প্রথমবার পড়েই স্নায়ুরা উত্তেজিত হয়ে উঠল তাঁর। চোখ বুজে পানীয়তে চুমুক দিতেই ঘুরতে শুরু করল স্মৃতির লাটাই। 

১৯১০। পর্তুগিজের উত্তর প্রান্তের এক ছোট্ট বন্দরে সেবার গিয়ে হাজির হয়েছেন। এ-পথে সচরাচর আসেন না। কিন্তু স্পেনের একটা অর্ডার এসে গেল মোটা টাকায়। গুস্তাভ গিলি– অর্ডার পাইয়ে দিলে– ১০ পারসেন্ট কমিশন নেয়। কিন্তু ক্যাপ্টেন আলাতোস পার্লো হিসেব কষে দেখলেন, গুস্তাভকে ১০ পারসেন্ট দিয়েও ডলারের অঙ্কে যে-টাকা হাতে থাকছে, তা জব্বর। পর্তুগিজ থেকে মাল লোড করে পৌঁছে দিতে হবে পশ্চিম আফ্রিকার একটি দেশে। 

রাজি হয়ে গেলেন ক্যাপ্টেন।

দিন আটেক সময় লেগে গেল মাল লোড হতে। জাহাজের কলকবজা দেখভাল করা, আবহাওয়ার খবর নেওয়া এবং প্রকৃত রুট-সহ বিকল্প রুটগুলির আগাপাস্তলা বুঝে নেওয়া ছাড়া তখন আর তেমন কাজ নেই ক্যাপ্টেনের হাতে।

তাই তৃতীয় দিন সন্ধে নামতেই ঢুঁ মারলেন বন্দর লাগোয়া জনপদের মেয়ে-মহল্লায়। ক্যাপ্টেন আলাতোস পার্লোর বয়স সেই সময় তিরিশের কোঠায়। হাতে টাকা। কোমরে বন্দুক। উদ্ধত মেজাজের সামনে নানা বয়সের পুরুষেরা নত। এই তো জীবন, কালীদা। পানসি চালানোর। 

মেয়ে-মহল্লায় আকণ্ঠ মদ খেতে খেতে প্রথম দু’-ঘণ্টার মধ্যেই ক্যাপ্টেন আলাতোস পার্লো রটিয়ে দিলেন নিজের বায়োডাটা। ‘আই হ্যাড বিন আ প্যামপার্ড চাইল্ড।’ মা অল্প বয়সে চলে যান। বাবা বিয়ে করেন। আরও দুটো। সৎমাদের আরও বাচ্চাকাচ্চা হয়। পরিবারে টাকার অভাব ছিল না। তবে দেখভাল ও শাসনের ঘাটতি ছিল। সেই অবকাশে যতখানি বকাটে হওয়া সম্ভব, তিনি হয়েছেন। ১২ বছরের মধ্যেই মদ এবং শুকনো নেশায় হাতেখড়ি। ১৪ বছর বয়সে প্রথম নারীসঙ্গ– ভদ্রমহিলা ছিলেন মাঝবয়সিনি– টাকার বিনিময়ে। 

ক্যাপ্টেনের সরল স্বীকারোক্তি– যাদের সঙ্গে বিছানায় গিয়েছি প্রত্যেককে টাকা দিয়েছি। সবের একটা ‘মূল্য’ আছে। মূল্যের মর্যাদা রাখতে হয়। আর, এই ভাবনায় শেষ পর্যন্ত তিনি এতখানি সম্পৃক্ত হয়ে পড়েন যে, রাখঢাক না করে বলতে থাকেন– “আই হ্যাভ নেভার গন টু বেড উইথ আ ওম্যান আই ডিডন’ট পে, অ্যান্ড আ ফিউ হু ওয়্যার নট ইন দ্য প্রফেশন আই পারসুয়েডেড, বাই আর্গুমেন্ট অর বাই ফোর্স, টু টেক মানি ইভন দে থ্রিউ ইট ইন দ্য ট্র্যাশ।’ যারা টাকা নেয়, তাদের টাকা গছিয়েছি বটে। তবে যারা এই পেশার নয়, তাদেরকেও কাজটাজ হয়ে যাওয়ার পরে টাকা দিয়েছি– এটা জেনে যে– সেই টাকা তারা হয়তো আস্তাকুঁড়েয় ফেলে দেবে। পুরো মেয়ে-মহল্লা অচিরে জেনে যায়– ক্যাপ্টেন আলাতোস পার্লো নাকি বাইশ বছর বয়স থেকেই নোট রাখতে শুরু করেছেন– শয্যাসঙ্গীদের নামধাম, বয়স, কোন জায়গার, কী পরিস্থিতিতে আলাপ, এমনকী ‘স্টাইল অফ লাভমেকিং’।

এইভাবে চলছিল ক’-দিন চমৎকার।

অচেনা বঁড়শিটি গলায় বিঁধল– চলে আসার আগের দিন। দিনটি ছিল বুধবার। সকাল থেকে সেদিন মেঘের আস্তরণে ঢাকা পড়েছিল চারিপাশ। দুপুর থেকে বৃষ্টি নামে। রাত আটটার সময়, ঝিরঝিরে বৃষ্টির মধ্যে, তৃতীয়বারে জন্য যখন তাঁবু বদলালেন আলাতোস পার্লো, অর্থাৎ তিন নম্বর মেয়েটির কাছে উপস্থিত হলেন, পায়ে পা রাখা দায় হয়ে উঠেছে। টলমল করছে শরীর। নেশার ঘোরে পুব-পশ্চিম জ্ঞান নেই। মাঝি-মাল্লারা চেয়েছিল ক্যাপ্টেন আজ ক্ষান্ত দিন– এবার চলুন জাহাজে– আগামী কাল থেকে যেতে হবে অনেকটা পথ– কিন্তু এগুলো মুখের উপর বলবে কে? পদমর্যাদা এসে জিভ চেপে ধরছে যে।

‘প্রেম’ কী তিনি ঠিক বোঝেন না। কিন্তু রসময় আনচান অনুভব করেছেন। কেন আরও একটু থাকতে হত, কেন আরও একবার দেখা করতে ভাল হত ওই মেয়েটির সঙ্গে? যতবার ভেবেছেন, হিসেব মেলাতে পারেননি। সে হিসেব কি মিলবে কখনও?

তৃতীয় তাঁবুতে ছিল বছর ষোলোর মেয়েটি। অতটাও কালো নয়, অতটাও ফরসা নয়। দেহে পূর্ণযৌবনা হরিণের চাঞ্চল্য। টানা চোখের কাজল পেরিয়ে সে দেখছিল– ফ্যাটফেটে ফরসা চেহারার জোয়ান লোকটি কী সব হাবিজাবি বকে যাচ্ছে। কথার মধ্যে সংগতি নেই। শরীরের সঙ্গে মনের তালমিল নেই। এর পক্ষে যে কিছু করা সম্ভব নয়, বুঝতে বাকি থাকে না মেয়েটির।  

কিন্তু টাকা পুরো নিয়েছে সে। এদিকে রাতও সবে পুরুষ্টু হতে শুরু করেছে। কাজেই মেয়েটি অপেক্ষা করতে থাকে। 

এরপরের বিবরণ পড়ে নেওয়া যেতে পারে ক্যাপ্টেন আলাতোস পার্লো-র লেখা থেকে– 

‘রাত তিনটে নাগাদ ঘুম ভাঙল আমার। কোথায় আছি, কী করে এখানে এলাম, সেসব মনে পড়তে কয়েক মিনিট গেল। তারপর আস্তে আস্তে মনে পড়ল, আগের রাতে বেহেড মাতাল হয়ে ঘুমিয়ে পড়ার কথা। অন্ধকার ঘর। চোখ সইয়ে বুঝতে পারলাম, বিছানায় একা শুয়ে আছি। পায়ে জুতো নেই। মানে, কেউ খুলে রেখেছে। জামাটাও খুলে দেওয়া হয়েছে। হাতড়ে হাতড়ে পেয়ে গেলাম পাশেই। কিন্তু সেই মাজা রঙ, ভরা নদীর মেয়েটি কোথায়?

উঠতে যাচ্ছিলাম। পরক্ষণে ভাবলাম, উঠে কোথায় বা যাব? বরং শুয়েই থাকি। কিশোর বয়স থেকে মেয়ে-মহল্লায় আসা-যাওয়া শুরু হয়ে গিয়েছিল আমার। এমন পরিবেশ নতুন তো নয়। মেয়েটি নিশ্চয় আশেপাশে কোথাও আছে। ঘুমন্ত খদ্দেরের জন্য কে আর বিনিদ্র রজনী কাটায়! 

সবাই বলে, প্রেম নাকি ভোরের আলোর মতো। নরম রোদের তাপ মুগ্ধ করে দেয়। সেখানে শরীরের জায়গা নেই। আমি এসব তত্ত্ব বুঝতে পারি না। শরীর না-জাগলে প্রেম কোথায়? এমনটা মনে হয় প্রতিবার। শরীরকে দেখা যায়। শরীরের জাগৃতি বোঝা যায়। প্রেম, সে তো কুয়োর জলে পড়ে থাকা চাঁদের আলো। তুলব কী করে, তার আগেই জলের মধ্যেই ভেঙে যায় খান-খান হয়ে। প্রেমের উদ্ভাস বোঝা যায় না। কিছু অপার্থিব ব্যাপারস্যাপার ঘটতে থাকলে– লোকে বলে প্রেমে পড়েছে। আসলে, সবই কিন্তু শরীরের কারসাজি। হরমোন মজায় মন। 

এই মাঝতিরিশে পৌঁছতে পৌঁছতে কত তো নারীসঙ্গ করলাম! শরীরের বেশি কিছু কি পাইনি? পেয়েছি তো। লোকে বলে, নাবিকের বন্দরে বন্দরে সংসার। ভুল বলে না। সমুদ্র যখন ফুঁসে ওঠে, ঝড় এসে দোলাতে থাকে জাহাজের কাঠামোকে, তখন প্রাণে বাঁচার কথা ছাড়া কিছু মনে থাকে না। তারপর ঝড় যখন থেমে যায়, সমুদ্র হয়ে যায় শান্ত ও শিষ্ট, তখন আস্তে আস্তে সমুদ্রের তলা ফুঁড়ে উঠে আসে সেই অক্টোপাস– কামনা। দুপুরের সূর্যে, গভীর জ্যোৎস্নায়, বিকেলের মায়াবিছানো আকাশ দেখে দপদপ করে শরীরের গ্রন্থিগুলি। ডাঙায় এসে, কোনও মেয়ে-মহল্লায় ঢুকেই, আমি উন্মুক্ত করে দিই অক্টোপাসের সেই খিদেকে। কিন্তু এমন নারীও তো পেয়েছি, কাজের কাজ মিটে যাওয়ার পরে যারা গল্প করেছে। বাড়ির কথা বলেছে। কী করে মেয়ে-মহল্লায় ঢুকে পড়েছিল একদিন, সে-কথা যেমন বলেছে তেমনই বলেছে আশঙ্কার কথা– যদি কোনও দিন এখান থেকে মুক্তিও পায়– তাহলে বাইরের পৃথিবীর জীবনকে কি আলিঙ্গন করতে পারবে? অনেকটা জেলের কয়েদিদের মতো। বছরের পর বছর ধরে থাকতে থাকতে জেলের কয়েদিরা এক সময় আর মুক্তি পেতে চায় না। কারণ, জেলের বাইরের জীবনের ছবিটা তখন অচেনা হয়ে যায়। মেয়ে-মহল্লার অনেক মেয়ের কাছেও ব্যাপারটা একই ধরনের। 

সাতপাঁচ ভাবতে-ভাবতে ঘুমিয়ে গিয়েছিলাম। আবার যখন ঘুম ভাঙল, চারপাশে কাঁচা রোদ। মেয়ে-মহল্লাটি নিস্তব্ধ। সারা রাতের হল্লা পোহানোর পর ঘুমচ্ছে। বাঁদিকে তাকিয়ে দেখলাম, সেই মেয়েটি। ফিরে এসেছে। তার সব রূপটান ঘেঁটে গিয়েছে। শরীর আলুথালু। বিস্রস্ত। অন্য কোথাও ছিল, বুঝতেই পারলাম। কিন্তু তাকে ওই অবস্থায় দেখেও আমার ভেতরে থেকে ঢেউ উঠছিল। রাতে যা ছিল অধরা, এখন কি হতে পারে না পূর্ণ? বিছানাতেই পাশ কাটলাম। দু’বার গড়িয়ে চলে এলাম কাছে। এবার– কয়েক ইঞ্চির দূরত্বে– সেই রম্য নারীশরীর। হাতের তালুর উল্টোদিকটা দিয়ে স্পর্শ করলাম তার গলা, গাল, কপাল। আমার দেহে উষ্ণতা ছিল। ভিতরের থরথরে জন্তুটার গোঙানি শুনতে পাচ্ছিলাম। কিন্তু মেয়েটির কপালে তো অন্য উষ্ণতা, জ্বরের। গা পুড়ে যাওয়া জ্বর।’ 

ক্যাপ্টেন আলাতোস পার্লো বারকয়েক দেখলেন মেয়েটিকে। নাবিক-বৃত্তি তাঁর ইন্দ্রিয়বোধকে প্রখর করেছে। এ জ্বর ভোগাবে, তাঁর মন বলতে থাকল। ঘুমন্ত, প্রায় হুঁশহীন মেয়েটিকে ফেলে রেখে, সেদিন ওই বিছানা থেকে চুপচাপ চলে আসেন ক্যাপ্টেন আলাতোস পার্লো। 
পাখা মুড়ে শুয়ে থাকা পাখির মতো– মেয়েটিকে দেখে মনে হয়েছিল তাঁর। আরও একটা দিন থাকতে পারলে, মেয়েটির কাছে আর-একবার আসা যেত। তার পাখায় ও পালকে বুলিয়ে দেওয়া যেত মরমি পরশ। যৌন উত্তেজনা বোধ করছেন, অথচ যৌনতায় প্রবৃত্ত হতে মন চাইছে না– এমন দ্বন্দ্বে এর আগে কখনও পড়েননি ক্যাপ্টেন আলাতোস পার্লো। স্কুলের কিছুটা উপরের দিকে শেক্সপিয়ারের কবিতা পড়তে হয়েছিল। মানে ভাল বুঝতে পারেননি। রোমান্টিক তিনি কোনও দিন ছিলেন না। কিন্তু কেন কে জানে, সেদিন ভোরের সূর্যকে সাক্ষী রেখে, নীরবে মেয়ে-মহল্লা ছেড়ে আসার সময় তাঁর মনে হচ্ছিল– এখানেই বোধহয় কবিতাটবিতার দরকার হয়, দরকার হয় এমন কিছুর– যা অব্যক্তকে ভাষায় আনতে পারবে, জাহির করতে পারবে! 

তাঁর জাহাজ আফ্রিকার উদ্দেশে ভোঁ দেয় দুপুরে। মেঘে মেঘে ছিন্ন আকাশ। বাতাসে বাতাসে ভেজা বিষাদ। সমুদ্রের ঢেউয়ে ঢেউয়ে ছিল কেমন যেন একটা বাড়তি উচ্ছ্বাস ও ফুঁসে ওঠা। সন্ধের দিকে সেকেন্ড কম্যান্ড-ইন-চার্জকে দায়িত্ব বুঝিয়ে দিয়ে নিজের কেবিনে চলে আসেন ক্যাপ্টেন আলাতোস পার্লো। ডায়েরিতে লেখেন, নাম না জানা এই মেয়েটির প্রসঙ্গে কয়েক ছত্র– “প্রেম আসলে দোদোমা। দু’বার ফাটে। একবার মাটিতে, একবার শূন্যে। বাতাসে ছড়িয়ে পড়ে মৃত বারুদের গন্ধ। ফাটাফুটো খোল ছড়িয়ে থাকে ইতিউতি। এখানেই নটেগাছটির ইতি। এরপর নতুন প্রেমের সমীকরণ কি শুরু হয় আবার?”

ক্যাপ্টেন আলাতোস পার্লোর প্রেম-দোদোমাটি আসলে মাটিতে ফাটার আগেই শূন্যে ফেটেছিল। ‘প্রেম’ কী তিনি ঠিক বোঝেন না। কিন্তু রসময় আনচান অনুভব করেছেন। কেন আরও একটু থাকতে হত, কেন আরও একবার দেখা করতে ভাল হত ওই মেয়েটির সঙ্গে? যতবার ভেবেছেন, হিসেব মেলাতে পারেননি। সে হিসেব কি মিলবে কখনও? 

রাত দুটোয় জাহাজের ডেকে এসে দাঁড়ান ক্যাপ্টেন। 

অই ধ্রুবতারা দেখা যাচ্ছে। সেদিকে তাকিয়ে এক সময় হেসে ফেললেন ক্যাপ্টেন আলাতোস পার্লো। কেন যে তারায় তারায় তিনি খুঁজছেন, যাকে কোনও দিন পাবেনই না!
_____ 
প্রেম দিবসে বঙ্গদর্শনের বিশেষ লেখা | ভাস্কর লেট | Valentine's Day | ভ্যালেন্টাইন্স ডে

 

Developed by DXDasia