
রঙে রঙে বসন্তের চিঠি দেবভাষা’য়
চিঠি তোমায় হঠাৎ আঁকতে হল এই বসন্তে। কার কার বাড়ি এল সেই চিঠি? পুরোনো ক্ষয়, পুরোনো বন্ধুত্ব দেখো কী রঙিন! কী অপরূপ সেই বার্তা। কিছুক্ষণ পরেই তোমার বাড়ির কলিংবেল বেজে উঠবে। ডাকপিওন এসে ডাক দেবে হঠাৎ। কার চিঠি এল তবে? বসন্তের?

“তোমার চিঠি কালকে পেয়েছি/ ক’হাজার মাইল পেরিয়ে এসেছে তোমার কথার ছন্দ/ একা একা রাত কাটানো কবরে /কুয়াশা ছড়ানো ভোরের খবরে/ পাওয়া না পাওয়ার দ্বন্দ্ব”- এমনই কিছু উত্তাপ ধারণ করেছিলাম নব্বই-এর দশক পর্যন্ত। তারপর একটু একটু করে বদলে গেছে সময়। টেলিভিশন, মোবাইল, ইন্টারনেট, এমনকি হাল আমলের বিমুদ্রাকরণ- চিন্তাচেতনাকে একমুহূর্তে পাল্টে দিয়েছে। বদলেছে বসন্তের রং, প্রেমের সংজ্ঞা। সময়টা খুবই কম, মনে হবে হঠাৎ করেই যেন সবটা বদলে গেল। রোজনামচার জাঁতাকলে আটকে থাকাই আমাদের নিয়ম। আমরা তাসের দেশ পড়ি, কিন্তু গ্রহণে ব্যর্থ হই। আমরা সিস্টেমের বিরুদ্ধে কথা বলে রাজপথে সামিল হই, কিন্তু বাড়ি ফেরার পথে সেই সিস্টেম আমার পিছন ছাড়ে কি? ঠিক এমনভাবেই একটু একটু করে শেষ হয়ে গেল পোস্টকার্ড। আমাদের যাপন থেকে ক্রমশ হারাতে থাকলাম ঘিয়েটে স্বভাব। এমনই এক বসন্তে হঠাৎ বঙ্গদর্শনের দপ্তরে বসন্তের চিঠি এল। চিঠির উপরে বড়ো বড়ো করে লেখা “রঙে রঙে বসন্তের চিঠি। আপনিও স্বাগত।” চিঠি হাতে ধরিয়ে এক বৃদ্ধ চিরবসন্তের হাসি হেসে বললেন, “আসবেন কিন্তু!”

আসলে এই কথোপকথনের স্পেসটা নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। গ্যাপ পড়ছে দুই প্রজন্মের। ঠিক এমন সময় দেবভাষা’র দুই কর্ণধার সৌরভ দে এবং দেবজ্যোতি মুখোপাধ্যায় ঠিক করলেন শিল্পীদের দিয়ে পোস্টকার্ডে ছবি আঁকাবেন। সেই ছবি সজ্জিত হবে তাঁদের গ্যালারিতে। পরিকল্পনা অনুযায়ী প্রায় ২০০টি পোস্টকার্ড কেনার জন্য পৌঁছালেন দক্ষিণ কলকাতার একটি পোস্ট অফিস। কিন্তু পোস্ট অফিস কর্তৃপক্ষ হতবাক। এত পোস্টকার্ড একসঙ্গে কেউ কখনও নিয়েছেন নাকি! নিয়েই বা কী করবেন! অনেক ঝামেলার পর অবশেষে পাওয়া গেল পোস্টকার্ড। হইহই করে সেই কার্ড পাঠানো হল চিত্রশিল্পীদের বাড়ি বাড়ি। যে যার মতো বার্তা পাঠালেন সেই চিঠির মাধ্যমে। কোনো লেখা দিয়ে নয়, ছবি দিয়ে, রং-তুলি দিয়ে। আর এটিই দেবভাষা’র বসন্তের বার্তা।

গ্যালারিতে সুসজ্জিত শিল্পীদের চিঠি দেখাতে দেখাতে এই প্রদর্শনী তৈরির শুরুর গল্প শোনাচ্ছিলেন দেবজ্যোতি মুখোপাধ্যায়। তিনি বলছিলেন, পোস্টকার্ডে ছবি আঁকার ইতিহাস আজকের নয়। শিল্পী নন্দলাল বসু শান্তিনিকেতন থেকে তাঁর বন্ধু বা আত্মীয়স্বজনদের যে চিঠি পাঠাতেন, সেখানে মূল লেখাটির সঙ্গে একটি ছবিও এঁকে দিতেন। তাই পোস্টকার্ডে ছবি আঁকার ইতিহাসকে দেবভাষা নতুন চোখে আবিষ্কার করল। এবং তাঁদের প্রয়াসকে স্বাগত জানালেন প্রায় চব্বিশজন চিত্রশিল্পী। তাঁদের মধ্যে আছেন- রামানন্দ বন্দ্যোপাধ্যায়, গণেশ হালুই, বুদ্ধদেব গুহ, শুভাপ্রসন্ন, সমীর আইচ, অতীন বসাক, যোগেন চৌধুরী, কৃষ্ণেন্দু চাকী, সুশোভন অধিকারী প্রমুখ। পোস্টকার্ডে কবিতা লিখলেন প্রদর্শনীর আহ্বায়ক সৌরভ দে এবং দেবজ্যোতি মুখোপাধ্যায়। গত ১১ মার্চ প্রদর্শনীর উদ্বোধন করলেন বুদ্ধদেব গুহ। ২৪ মার্চ শেষ হল।

পূর্ণেন্দু পত্রী তাঁর কথোপকথন সিরিজে একসময় লিখেছিলেন, “তোমার চিঠি আজ বিকেলের চারটে নাগাদ পেলাম/ দেরী হলেও জবাব দিলে সপ্তকোটি সেলাম।/ আমার জন্যে কান্নাকাটি? মনকে পাথর বানাও।/ চারুলতা আসছে আবার। দেখবে কিনা জানাও।/ কখন কোথায় দেখা হচ্ছে লেখোনি এক ফোঁটাও।/ পিঠে পরীর ডানা দিলে এবার হাওয়ায় ছোটাও।/ আসবে কি সেই রেস্টুরেন্টে সিতাংসু যার মালিক?/ রুপোলী ধান খুঁটবে বলে ছটফটাচ্ছে শালিক।”

চিঠি আসুক এভাবে। চিঠিরা শব্দে বাঁচুক, বাঁচুক বর্ণেও। কিছু জিনিসের ইতিহাস মুছে যায় না। আজকের ইমেল আর সোশ্যাল মিডিয়ার যুগে চিঠিদের আরও রঙিন করে তোলবার দায়িত্ব কিন্তু আমাদেরই। এমন অনন্য প্রয়াসকে এত দীর্ঘ আকারে তুলে আনবার জন্য দেবভাষাকে সেলাম। যাঁরা অংশগ্রহণ করলেন, সেলাম তাঁদেরও।

