
পর্তুগিজদের সাহায্যে চট্টগ্রাম জয় করেছিলেন শায়েস্তা খাঁ
মুঘল সম্রাট আকবর পর্তুগিজদের বসতি তৈরি করতে দিয়েছিলেন হুগলি নদীর তীরে। তখন ১৫৮০ সাল। পরে জায়গাটার নাম হয় ব্যান্ডেল। বাংলায় ওটাই ছিল তখন পর্তুগিজদের প্রধান বাণিজ্যকেন্দ্র। বর্ষাকালে তারা বাংলায় ব্যবসা করে বর্ষার পর চলে যেতেন গোয়াতে। তখন গোয়াই ছিল ভারতীয় উপমহাদেশে পর্তুগিজদের মূল ঘাঁটি। তারা যেহেতু চাইতেন একচেটিয়া বাণিজ্য করতে, তাই বিপক্ষের জাহাজ দেখলেই তারা লুঠ করতেন। বিশেষ করে চট্টগ্রাম আর সপ্তগ্রামে এত জাহাজ তারা লুঠ করেছিলেন যে পর্তুগিজ জলদস্যু বা হার্মাদদের মানুষ তখন সমুদ্রের ত্রাস হিসেবে দেখা শুরু করে। ‘হার্মাদ’ শব্দটা এসেছে স্প্যানিশ শব্দ ‘আর্মাডা’ থেকে, যার অর্থ ‘নৌবহর’। পর্তুগিজ জলদস্যুরা তাদের লুটেরা বাহিনী তৈরি করতেন ‘বুলখক খানা’ থেকে। ওই সময়ে যারা মুঘল শাসকদের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করতেন, তাদের একটা অংশ পালিয়ে গিয়ে জমা হতেন সপ্তগ্রামে। সম্রাট আকবর তাই সপ্তগ্রামকে বলতেন ‘বুলখক খানা’ বা বিদ্রোহীদের ঘাঁটি। চট্টগ্রামের আরাকান আর মগ জলদস্যুরাও পর্তুগিজদের সঙ্গে মিলে যৌথভাবে লুঠপাট চালাতেন।
আকবরের মৃত্যু হলে মুঘল তখতে বসলেন জাহাঙ্গির। সেনাপতি মানসিংহকে পাঠালেন বাংলার বারো ভুঁইয়াকে দমন করতে। তখন পর্তুগিজরা লড়াই করলেন মুঘল সেনার বিরুদ্ধে। মানসিংহ যখন দ্বিতীয়বার বাংলায় আসেন, তখন তাঁর বিরুদ্ধে রাজা মানসিংহের নৌবাহিনীতে থেকে যুদ্ধ করেছিলেন রডা গঞ্জালেস, ফ্রান্সিস কার্ভালোর মতো পর্তুগিজ সেনাপতিরা। আকবরের সঙ্গে কখনও পর্তুগিজদের সরাসরি কোনো সংঘাত লাগেনি। কিন্তু জাহাঙ্গিরের সময় প্রত্যক্ষভাবে মুঘল সম্রাটের বিরুদ্ধে পর্তুগিজদের যুদ্ধ শুরু হয়। তার একটা মূল কারণ ছিল, পর্তুগিজদের লুঠপাটে বাংলার মানুষ অতিষ্ট হয়ে গিয়েছিলেন। মুঘলদের চোখে ফাঁকি দিয়ে বাখরগঞ্জ, যশোর, ঢাকা, নোয়াখালি, কাতরাবোতে নিজেদের ঘাঁটি তৈরি করেছিলেন পর্তুগিজরা।
জাহাঙ্গিরের ছেলে শাহজাদা খুররম এক সময়ে বিদ্রোহ করে বাংলায় আশ্রয় নিয়েছিলেন। তাঁর স্ত্রী মুমতাজ বেগমের এক দাসীকে মগ দস্যুরা অপহরণ করেছিলেন তখন। তাই শাহজাহার একটা রাগ ছিল বাংলার জলদস্যুদের ওপর। এরপর খুররম যখন শাহজাহান উপাধি নিয়ে মুঘল সম্রাটের দায়িত্ব নেন, পর্তুগিজদের সঙ্গে তখন সংঘাত চরমে ওঠে। এক মুঘল সেনাপতির স্ত্রীকে পর্তুগিজরা অপহরণ করলে শাহজাহান বাংলার সুবাহদার কাশিম খাঁকে নির্দেশ দেন পর্তুগিজকে বাংলা থেকে উৎখাত করতে। তারপর মুঘলদের সঙ্গে পর্তুগিজদের যুদ্ধ চলে তিন মাস। ১৬৩২ সালে কাশিম খাঁ পর্তুগিজদের হারিয়ে হুগলি শহর দখল করে নেন। ব্যান্ডেলে কাটা হয় একটা বিরাট সুড়ঙ্গ। তাতে বারুদ ভরে পর্তুগিজদের দুর্গ উড়িয়ে দেয় মুঘল সেনারা। তারপর শায়েস্তা খাঁ যখন সুবাহদার ছিলেন, তাঁর উদ্যোগে বাংলায় তৈরি হয় বিশাল নৌবাহিনী। তিনি কূটনীতি প্রয়োগ করে পুরস্কার আর বেশি মাইনের লোভ দেখিয়ে পর্তুগিজদের সরিয়ে এনেছিলেন আরাকান দস্যুদের পক্ষ থেকে। মুঘলদের কাছে প্রায় অচেনা, সমুদ্র-পাহাড়ে ঘেরা চট্টগ্রাম বিজয়ের ক্ষেত্রে পর্তুগিজরা শায়েস্তা খাঁর সেনাবাহিনীকে সাহায্য করেছিলেন নানাভাবে।
তথ্যসূত্র – ইতিবৃত্ত ডট কম, সামহোয়্যারইন ব্লগ
