পর্তুগিজদের বড়ো স্বর্গ আর ছোটো স্বর্গ এই বাংলাতেই

ইউরোপীয়দের মধ্যে প্রথম বাংলায় আসেন পর্তুগিজ বণিকরা

প্রাচীন কালে ভারতের সঙ্গে ইউরোপের খুব সমৃদ্ধ বাণিজ্যিক সম্পর্ক ছিল। একদিকে রোমান সাম্রাজ্যের পতন ঘটলে আর অন্যদিকে সিল্ক রুট বন্ধ হয়ে গেলে সেই বাণিজ্যও থেমে যায়। গোটা মধ্যযুগ ধরে ভারতীয় উপমহাদেশ ছিল বহির্বাণিজ্যে যথেষ্ট এগিয়ে, তবে সেই সময়ে ইউরোপীয়দের জায়গা দখল করে নিয়েছিলেন পশ্চিম দিকে আরব এবং পূর্ব দিকে চিনের বণিকরা। আবার ইউরোপে আধুনিক যুগ শুরু হলে সেখানে নতুন করে সমুদ্রপথে বাণিজ্যের তোড়জোড় শুরু হয়। তখনও ভারতে মুঘল শাসন শুরু হয়নি। ইউরোপ থেকে প্রথম ভাস্কো দা গামার নেতৃত্বে তিনটি পর্তুগিজ জাহাজ ১৪৯৮ সালে ভারতের কালিকট বন্দরে এসে পৌঁছল। এইভাবে ইউরোপীয় বণিকদের মধ্যে প্রথমে পর্তুগিজরাই ভারতে পা রাখলেন। বাংলাতেও প্রথম ইউরোপের যে বণিকরা এসে পৌঁছেছিলেন, তাঁরাও সেই পর্তুগিজ।

তখন বাংলার কাপড়, বিশেষ করে সুতি আর রেশমের কাজ ছিল ইউরোপে খুব জনপ্রিয়। মসলিন তো ছিল ইউরোপিয়ানদের কাছে খুবই লোভনীয়। আরব বণিকরা মূলত এখান থেকে কাপড় নিয়ে বিক্রি করতেন ইউরোপে। এছাড়া বাংলার চাল এবং তুলোরও খুব সুখ্যাতি ছিল পৃথিবীজোড়া। ভাস্কো দা গামা বাংলা আর গুজরাটের বিখ্যাত কাপড় সম্পর্কে জেনেছিলেন। তিনি দেশে ফিরে রাজাকে সে কথা জানিয়েওছিলেন। ভারতে আসা আরেকজন পর্তুগিজ বণিক আলবুকার্কও লিসবনে জানিয়েছিলেন বাংলায় ব্যবসা করার বিপুল সম্ভাবনার বিষয়ে। তবে পর্তুগালের শাসক তখন সেই বিষয়ে মাথা ঘামাননি। তিনি তখন এশিয়ায় নিরঙ্কুশ সমুদ্রবাণিজ্যের স্বপ্নে বিভোর। পরবর্তীকালে ১৫১৭ সালে পর্তুগিজরা বাংলায় প্রথম বাণিজ্যের জন্য উৎসাহী হয়। তবে সেই উদ্যোগ সফল হয়নি কয়েকটি কারণে। পরের বছর মালদ্বীপ থেকে জোয়াও দে সিলভিরাকে বাংলায় পাঠান পর্তুগিজ সরকার। যখন তিনি বাংলায় আসছেন, ঠিক তখনই দুটি জাহাজ পণ্য বোঝাই করে বাংলা থেকে গুজরাটে যাচ্ছিল। সিলভিরা জাহাজ দুটোকে আটক করে সেগুলোতে নিজের লোক বসিয়ে কালিকটে পাঠিয়ে দেন। আর ওই দুই জাহাজের চালকদের নিজের হেফাজতে রেখে তাদের নিয়ে পাড়ি দেন চট্টগ্রাম। এই দুই চালক চট্টগ্রামে পৌঁছতে সিলভিরাকে সাহায্য করে ঠিকই, অন্যদিকে আবার তারাই চট্টগ্রামের শাসককে গোপনে সব খবরই দিয়ে দেয়। আর চট্টগ্রাম সরকারও কামান দাগা শুরু করে পর্তুগিজ জাহাজের দিকে। কোনওভাবে পালিয়ে বাঁচেন জোয়াও দে সিলভিরা।

এর পরেও বেশ কয়েকবার পর্তুগিজরা বাংলায় ঢোকার চেষ্টা করেছিলেন, কিন্তু প্রত্যেকবারই কোনো না কোনো সমস্যায় পড়ে অভিযান আর সম্পূর্ণ হয় না। তবে উত্তর ভারতে মুঘল শাসন শুরু হওয়ার পর পরিস্থিতি পাল্টাতে থাকে। দিল্লির তখতে হুমায়ুন, আর বিহারের শের শাহ চাইছেন প্রথমে বাংলা জয় করে তারপর দিল্লির অধীশ্বর হতে। বাংলার সুলতান গিয়াসউদ্দিন মাহমুদ শাহ তখন শের শাহের ভয়ে গোয়ার পর্তুগিজ শাসকের কাছে দূত পাঠালেন। শর্ত হল, পর্তুগিজরা সুলতানকে সাহায্য করবেন শের শাহের আক্রমণ ঠেকাতে, বদলে চট্টগ্রাম আর সপ্তগ্রামে কুঠি বানাবেন পর্তুগিজরা। চট্টগ্রাম ছিল পর্তুগিজদের কাছে ‘পোর্ট-গ্রান্ডি’ বা বড়ো স্বর্গ, আর সপ্তগ্রাম ছিল ‘পোর্ট পিকানো’ বা ছোটো স্বর্গ। এরপর যদিও শের শাহ বাংলায় এসে সুলতানকে নাকাল করে তেরো লক্ষ স্বর্ণমুদ্রা আদায় করে ফিরে যান। পর্তুগিজদের সাহায্য খুব একটা কাজে না লাগলেও সুলতান তাঁর প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী তাঁদের অনুমতি দেন বাংলায় কুঠি বানাতে। এইভাবে ১৫৩৭ সালে বাংলায় পর্তুগিজরা একটু গুছিয়ে নিতে পারে। তারপর ১৫৮০ সালে মুঘল সম্রাট আকবর পর্তুগিজদের হুগলি নদীর তীরে কুঠি তৈরির সনদ দেন। যে জায়গায় পর্তুগিজরা নিজেদের বসতি তৈরি করে, তার নাম দেয় Porto Pequeno, এখন যে জায়গার নাম ব্যান্ডেল। 

Developed by DXDasia