জহর দাশগুপ্তের ছবি: নারীত্বে প্রকৃতির গতি

নারীর সাথে প্রকৃতির সমন্বয় জহর দাশগুপ্তের ছবিতে বারবার উঠে এসেছে

পালটে পালটে যাচ্ছে এই বিশ্ব ব্রহ্মাণ্ডের সবকিছু। আমরা কিছু বদলকে দেখতে পাচ্ছি, খানিকটা বুঝতে পারছি, বেশির ভাগটাই পারছি না। আমাদের শরীর পাল্টাচ্ছে, শিরা-ধমনী-স্নায়ু-পেশি সবকিছু বদলে বদলে যাচ্ছে প্রত্যেক মুহূর্তে। কত পুরোনো কোষ মরছে প্রতিদিন, আবার নতুন কোষ জন্মে তার জায়গা নিচ্ছে। বদলেরই একটা দিক হচ্ছে গতি। কিংবা অন্যভাবে বলা যায়, গতিরই একটা দিক হল বদল। পৃথিবীর আহ্নিক গতি আর বার্ষিক গতি আনছে দিনের বদল আর বছরের বদল।  বদলের গতি যখন ক্যানভাসে উঠে আসছে, তখন সেখানে ফুটে উঠছে একই সাথে দার্শনিকের প্রজ্ঞা আর বৈজ্ঞানিকের বিশ্লেষণ। দার্শনিক বার্গসঁর ভাবনা জহর দাশুগুপ্তের তুলিতে দেশীয় সংস্কৃতির সাথে একাত্ম হয়ে যাচ্ছে আরেকবার। এর আগে রবীন্দ্রনাথের ‘বলাকা’তে বার্গসঁ ছিলেন অন্যভাবে, উপনিষদের আলোকে। আর শিল্পী জহর দাশগুপ্ত উপনিষদ কিংবা মার্কস কোথাও স্থির আশ্রয় খুঁজে পাচ্ছেন না। মনের সেই দ্বন্দ্বে ক্ষতবিক্ষত হয়ে উঠছে তুলির প্রত্যেকটা আঁচড়। তাই হয়তো বার্গসঁর দর্শন এখানে রাবীন্দ্রিক অতীন্দ্রিয়তার বদলে এনেছে নির্মোহ জৈবনিক প্রবাহমানতা। 

যেমন ধরা যাক যিশু খ্রিস্টের ছবিটি। এখানে যিশু মহামানব, তাই দেহবিভঙ্গেও তিনি বিশাল। যারা তাঁকে ক্রুশ কাঠে তুলে দিচ্ছেন, এক হাত বাড়িয়ে তিনি ক্ষমা করে দিচ্ছেন সেই অবোধদের। প্রচণ্ড যন্ত্রণাতেও তাঁর মুখমণ্ডল যোগীর মতো নির্লিপ্ত, অথচ যিশু এখানে ভীষণভাবে শরীরী। দেহের বিভিন্ন অঙ্গপ্রত্যঙ্গের ভেতরে যে পরিবর্তন ঘটে চলেছে তাতে যিশু এবং তাঁর ঘাতকদের মধ্যে কোনো পার্থক্য নেই। তিনি ঈশ্বর হন বা না হন, কালের গতিতে তিনিও পাল্টাচ্ছেন, ঈশ্বরের মতো চিরন্তন নন তিনি। ঠিক যেমন কৃষ্ণপ্রেমে রাধার ট্র্যাজিক ছবিটাতেও বদলের গ্রাফ ধরা পড়ছে নারীদেহের কোমলতায়। এখানে নারীসত্ত্বা প্রকৃতির সাথে মিশে গেছে। আদিম কালে কৃষিক্ষেত্রের উর্বরতার সঙ্গে মিলিয়ে দেখা হত নারীর সন্তানধারণের ক্ষমতাকে। মানুষের সংস্কৃতিতে ধীরে ধীরে এইভাবে প্রকৃতি হয়ে উঠেছে মাতৃরূপিনী আর নারী হয়ে উঠেছে প্রকৃতিরূপিনী। নারীশক্তিকে পুজো করাও শুরু হয়েছে প্রকৃতিরই রূপক হিসেবে। সিন্ধু সভ্যতায় আমরা তার প্রমাণ পাই। আমাদের দুর্গাও আদিকালে পূজিতা হতেন শস্যের দেবী অন্নপূর্ণা রূপে। পঞ্চশস্য এবং পঞ্চপল্লব এখনও দুর্গা আরাধনায় ব্যবহৃত হয়, যেগুলো ওই শস্যদেবীর আদিরূপটির সাক্ষ্য দিয়ে থাকে।

 

নারীর সাথে প্রকৃতির সমন্বয় জহর দাশগুপ্তের ছবিতে বারবার উঠে এসেছে। উদাহরণ হিসেবে তাঁর জেব্রা সিরিজের একটি ছবির কথা বলা যেতে পারে। জেব্রা বাস করে গহন অরণ্যে, ফলে সাদাকালো দাগওয়ালা সেই জন্তুটি বন্য প্রকৃতির রূপক হয়ে উঠেছে ছবি আঁকিয়ের হাতে। উপরন্তু সাদা আর কালোর সহাবস্থানে জঙ্গলের মধ্যে যেন সব উলটো বৈশিষ্ট্যের মিলন ঘটিয়ে ফেলেছে। তারই পাশে সবুজ ঘাসের সাথে একাত্ম হয়ে আছে সবুজ নারী। যেন সবুজ বনভূমিই নারীর মধ্যে ছবিতে মূর্ত হয়ে উঠেছে। লক্ষ করার বিষয়, মেয়েটির হাতে একঝাঁক পদ্মফুল। ভারতীয় নারীত্বের প্রতীক সে। আর জেব্রা তো আফ্রিকাবাসী। সব মিলিয়ে ছবিটি এক বিশ্বপ্রেমের বার্তাও তুলে ধরেছে। ভূতাত্ত্বিকরা বলেন, ভারতীয় ভূখণ্ড একসময়ে আফ্রিকা মহাদ্বীপের অংশ ছিল। হয়তো শিল্পীর তুলিতে তারও ইঙ্গিত আছে। কিংবা ঐক্যবদ্ধ তৃতীয় বিশ্বের রাজনৈতিক প্রয়োজনীয়তাও ফুটিয়ে তুলেছেন শিল্পী। ছবি আঁকিয়ে জহর দাশগুপ্ত একজন যথেষ্ট রাজনীতি সচেতন মানুষ। একসময় বামপন্থী দর্শনের মধ্যে তিনি জনগণের আশ্রয় খুঁজে পেয়েছেন। সেই আশ্রয় লাল ছাতার রূপকল্পে তাঁর ছবিতে জায়গা করে নিয়েছিল। শুধুই বা মানুষ কেন, অন্যান্য জীবও সেই ছাতার নিচে আশ্রয় পেতে পারে, তার আশ্রয়ে মানুষ আনন্দে বিভোর হয়ে গান বাজনা শিল্প সাহিত্যে মেতে থাকবে, এরকমই তাঁর মনে হয়েছিল। আবার পরবর্তী সময়ে বামপন্থী শাসকের অপরিণামদর্শিতার সমালোচনাও তিনি করেছেন অকুণ্ঠ স্বরে।

 

দু’টো আলাদা ক্যানভাসে আঁকা ‘মাধবী’ ছবিটির কথা এখানে বিশেষ করে বলা দরকার। এই ছবিটি শিল্পী জহর দাশগুপ্তের আরেকটা দিক তুলে ধরে। নান্দীকারের প্রযোজনা ‘মাধবী’ নাটক দেখে শিল্পী এই ছবির ইন্ধন পেয়েছিলেন। মহাভারতে আছে রাজা যযাতির মেয়ে মাধবীর গল্প। বিশ্বামিত্রের শিষ্য গালব সেই রাজকন্যাকে ব্যবহার করেছিলেন গুরুকে দেবার দক্ষিণা সংগ্রহ করতে, চারজন রাজা সেই মেয়েকে ভোগের বিনিময়ে নির্দিষ্ট ধরনের ছ’শো ঘোড়া গালবের হাতে তুলে দেন। এদিকে বিশ্বামিত্র চেয়ে বসে আছেন আটশো ঘোড়া, বাকি দু’শো কোথায় পাওয়া যাচ্ছে না। গুরুকে খুশি করতে গালব শেষমেশ মাধবীকেই নিতান্ত ভোগ্যপণ্যের মতো তুলে দিচ্ছেন বিশ্বামিত্রের হাতে। ছবিতে গোরুর মাথাওয়ালা বিশ্বমিত্রের পাশব লালসার পাশাপাশি গালবের ধান্ধাবাজ হাসি আর রাজকন্যাকে বন্দি করে রাখা বিশাল দুই হাতের মধ্যে মাধবীর বুকে ফুটে থাকা ফুল জানান দেয় যে সে গালবকে ভালোবেসেছিল, এর পরেও তার দৃঢ় চাহনি গোটা পুরুষতন্ত্রকে যেন চাবুক মেরে যায়।

শিল্পী জহর দাশগুপ্ত আকাদেমি অফ ফাইন আর্টসের সহ-সভাপতি এবং পরবর্তীকালে সভাপতি হিসেবে বহুদিন দায়িত্ব সামলেছেন। প্রাতিষ্ঠানিক স্বীকৃতি থাকা সত্ত্বেও দেশের ছবিপ্রেমীদের মধ্যে তাঁর স্বকীয়তা এখনও খুব বেশি পরিচিতি পায়নি। তাই আরেকবার তাঁর ছবিগুলির নতুন করে মূল্যায়নের দায়িত্ব বাংলাবাসীর থেকেই যায়। কারণ, গেঁয়ো যোগীকে ভিখ না দিলেও চলে, কিন্তু ঘরের শিল্পীকে মর্যাদা না দিলে সেটা ঘরের পক্ষেই লজ্জাজনক হয়ে দাঁড়ায়। শিল্পীকে তাঁর প্রাপ্যটুকু দিলে তো আমরাই ধন্য হব, দেশই সমৃদ্ধ হবে, আঁকিয়ে তো ছবি এঁকেই তৃপ্তি পান, তাঁর প্রত্যাশা তো প্রচারে নয়, প্রকাশেই তাঁর সিদ্ধিলাভ।

Developed by DXDasia