
কবিতা আর ছবি যখন এক হয়ে যায় তুষার চৌধুরীর আঙুলে
“বন্ধুরা বদলায় তারা অপূর্ণ আকাঙ্ক্ষা নিয়ে চলে যায় দূরে/ স্বপ্ন নেই সম্ভাবনা নেই/ অসীম ও অলীকের প্রতি কোনো টান নেই আর/ পাথরপ্রমাণ ক্লান্তি আজ চেপে ধরেছে আমাকে/ ঠেলে তুলবার কোনো ইচ্ছেও নেই আর/ মৃত্যু, মৃত্যু, কালো ডালিমের পেটে ঢুকে যাব আমি” (স্বপ্ন নেই)

কবি তুষার চৌধুরী লিখছেন। এ-কথা কখনওই নৈরাশ্যবাদের ভাষা নয় যতটা অচেতনের। এই অচেতনের শব্দ সারাজীবন বয়ে বেড়াতে হয়েছে তাঁকে। যেমন তাঁর লেখায়, তেমনই ছবিতে। তুষার চৌধুরীর কবিতায় ঘুরে ফিরে এসেছে রং-তুলি-ভাস্কর্যের অদ্ভুত সমাহার। তিনি কবিতা আঁকতেন এবং ছবি লিখতেন। পরিপূরক হয়ে উঠত একে অপরের হাত ধরে চলা। ‘দেবভাষা’র আয়োজনে চলছে ‘কবির ছবি’ এই শিরোনামে তুষার চৌধুরীর সারাজীবনের আঁকা ছবির প্রদর্শনী। সত্তর দশকের অন্যতম উল্লেখযোগ্য এই কবির অচেতনের ইঙ্গিত ও স্বপ্নঘোর ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে তাঁর আঁকা ছবিগুলির মধ্যে। কখনও তা প্যাস্টেলে আবার কখনও স্কেচ বা জলরং-এ।
দেবভাষার পক্ষে দেবজ্যোতি মুখোপাধ্যায় বলছেন “তুষার চৌধুরী চাইলেন না তাঁর ছবি নিয়ে বিশেষ কারোর মাথাব্যথা থাকুক। ১৯৭৯-তে বেরোচ্ছে তাঁর প্রথম কবিতার বই ‘অলীক কুকাব্য রঙ্গে’। সেই বইয়ের প্রথম সংস্করণের প্রচ্ছদ তিনি নিজেই করছেন। ওই একটিবার, তারপর কখনও তাঁর পেন্টিং প্রকাশ্যে আনতে চাইছেন না।” নয়ের দশকের শুরুতে প্রকাশিত হবে কবির অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি কাব্যগ্রন্থ ‘ডোমকাক ও বহ্নিশিখা’। তার কিছুবছর পরেই মারা যাচ্ছেন কবির সবচেয়ে ঘনিষ্ঠ বন্ধু অনন্য রায়। এই মৃত্যুর পর তাঁকে গ্রাস করে নিঃসঙ্গতা। কমে আসতে থাকে লেখাপত্র এবং ছবি আঁকা।
আরও পড়ুন
জয়নুল আবেদিন – এক বিস্ময়ের নাম

প্রদর্শনী ঘুরতে ঘুরতে নজরে আসবে বেশ কয়েকটি নগ্ন নারী-দেহের ছবি। কিন্তু সেই ছবিগুলির বেশ কয়েকটিতে কোনো নারীর মুখ নেই। গলা থেকে পা অবধি নগ্ন শরীর। কোনোটায় মুখের বদলে শুধু চোখ। প্রসঙ্গ ঘাঁটলে দেখা যাবে কবি বারবার বলছেন, “মেয়েদের মেধাকে আমি অবহেলা করি, তারা ঈর্ষাপরায়ণ, তারা গোলাপ দেখেনি”। তাই কি কবি খুব সচেতন ভাবে মেয়েদের মুখমণ্ডলকে বাদ দিতে চাইছেন? এই ছবিগুলির পাশাপাশি দেখা যাবে হলুদ দাগ টানা ডায়েরিতে প্যাস্টেল কালারে ছবি আঁকছেন। কখনও ঘোড়ার মুখাবয়ব, কখনও অ্যাবস্ট্রাক্ট ফিগার। দেবজ্যোতি মুখোপাধ্যায় বলছেন, “এখানে প্রদর্শিত ছবিগুলিই শেষ নয়, এরকম অজস্র ছবি তিনি এঁকেছেন। কাউকে না জানতে দিয়ে অন্তরালে তিনি ছবিগুলো এঁকে গেছেন। এই যে রীতিমতো রং কিনে, কাগজ কিনে প্রমাণ সাইজের ছবি করছি, সিরিয়াসলি না ভাবলে এই কর্মকাণ্ডে আসা যায় না। তাছাড়া শুধু ছবিই নয়, গান-সিনেমা সবকিছু নিয়ে তিনি আলোচনা করছেন, বন্ধুদের সাথে তর্ক করছেন। সে-সমস্ত ছাপ পড়েছে কবিতায়। তুষারের ছবি রিয়ালিস্টিক নয়। তীব্র অবচেতনের মধ্যে যেতে যেতে ওঁর ছবি বিভিন্ন স্তরের গল্প বলে। একটা সাধারণ বাক্যে বোঝানো যাবে না। ওঁর ছবি প্রচণ্ড সাংকেতিক আর সাজেস্টিক।

সারাজীবনই আমরা দেখি অনেক মানুষ আছেন যারা তাঁদের শিল্প মাধ্যমগুলিতে প্রতিষ্ঠা পেয়ে গিয়েছেন, কিন্তু দেখা গেল আশি বছর বয়সে তিনি গান করতে শুরু করলেন বা সিনেমা বানাতে শুরু করলেন। তুষার চৌধুরীর ক্ষেত্রে এমনটা যে ঘটেনি তা তাঁর সারাজীবনের পাণ্ডুলিপি পড়লেই বোঝা যাবে। এই প্রদর্শনী করতে গিয়েই দেবভাষা কর্তৃপক্ষের কথায় আক্ষেপের সুর বেরিয়ে আসছে। তাঁরা বলছেন সাম্প্রতিক তরুণ কবিদের তেমন উৎসাহ দেখা যাচ্ছে না। এই প্রদর্শনী যারা দেখতে আসছেন তাঁদের প্রত্যেকেই প্রায় চিত্রশিল্পী। আর এই আক্ষেপের মধ্যেই চিত্রশিল্পী তুষার চৌধুরী একা একটা ঘরের মধ্যে অবস্থান করছেন, দর্শকের ছুঁয়ে দেখার অপেক্ষায়।
