
ভারতেও যে এই ধরনের প্রাণীর অস্তিত্ব ছিল, তা প্রকাশ্যে এল এই প্রথম
আট বছর আগে, ২০১৩ সালে ভারতের পশ্চিম উপকূলের ক্যাম্বে খাঁড়িতে সন্ধান পাওয়া গিয়েছিল একটি বিশেষ প্রজাতির জীবাশ্ম। তবে জীবাশ্মটি ঠিক কোন প্রজাতির, সে-ব্যাপারে তখনও নিশ্চিত ছিলেন না গবেষকরা। সম্প্রতি সেই রহস্য উদঘাটন করেছেন দুই বাঙালি গবেষক; প্রেসিডেন্সি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক কল্যাণ হালদার এবং অনিকেত মিত্র। শুধু তাই নয়, চিহ্নিতকরণের সঙ্গে সঙ্গে অয়েস্টার গোত্রের (এক ধরনের ঝিনুক) এই প্রাণীটির জীবনচক্রেরও হদিশ দিয়েছেন তাঁরা। এবং যে কথাটি বিশেষ উল্লেখযোগ্য, তা হল অবলুপ্ত প্রজাতিটির নামকরণ করা হয়েছে কবি জীবনানন্দ দাশের নামে—‘অস্ট্রিয়া জীবনানন্দাই’।
এর আগেও আর্জেন্টিনায় একাধিক প্রজাতির একগামী ঝিনুকের সন্ধান পেয়েছিলেন গবেষকরা। তাঁদের জীবনচক্র মিলে যায় অস্ট্রিয়া জীবনানন্দাই-এর সঙ্গে। অনুমানিক সাড়ে ৫ কোটি বছর আগে ভারতের সমুদ্র উপকূলবর্তী ম্যানগ্রোভ অঞ্চলে বসবাস ছিল বিস্ময়কর এই ঝিনু্ক প্রজাতির। তবে ভারতেও যে এই ধরনের প্রাণীর অস্তিত্ব ছিল, তা প্রকাশ্যে এল এই প্রথম। সম্প্রতি ‘অ্যাকটা প্যালিয়েন্টোলজিকা পোলোনিকা’ পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছে দুই বাঙালি গবেষকের এই গবেষণাপত্রটি।
আরও পড়ুন: চালু হল রাজ্যের সবচেয়ে বড়ো অক্সিজেন প্লান্ট
গবেষণায় উঠে আসছে, আজ থেকে প্রায় সাড়ে ৫ কোটি বছর আগে এই বিশেষ ঝিনুক প্রজাতির মহিলা অয়েস্টার নিজের শরীরের মধ্যে আশ্রয় দিত তার প্রাপ্তবয়স্ক পুরুষ সঙ্গীকে। প্রাপ্তবয়স্ক পুরুষেরা আকারে কয়েক গুণ ছোটো হত মহিলাদের তুলনায়। ফলে সহজেই মহিলা সঙ্গীদের খোলসের তলায় আশ্রয় নিতে পারত তারা। জীবনধারণের এই অভিনব পদ্ধতি তারা রপ্ত করেছিল বিবর্তনের হাত ধরেই। আর সেই বিবর্তনের কারণ ছিল জলবায়ু পরিবর্তন।
সাধারণত, বাহ্যিক প্রজনন প্রক্রিয়ার মাধ্যমেই বংশবিস্তার করে ঝিনুক। বদলাতে থাকা জলবায়ুর সঙ্গে মানিয়ে নিতে, ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করতেই এমন শারীরিক বন্দোবস্ত করেছিল এই প্রাগৈতিহাসিক অয়েস্টার। পুরুষের দেহ থেকে নির্গত শুক্রাণু জলবাহিত হয়ে পৌঁছায় স্ত্রী-র দেহে। কিন্তু সেইসময় ক্রমাগত পৃথিবীর উষ্ণতা বৃদ্ধি বাধা হয়ে দাঁড়ায় এই প্রক্রিয়ার। ফলত, একপ্রকার বাধ্য হয়েই অভিযোজনের এই পথে হেঁটেছিল এই ঝিনুক প্রজাতি। শুক্রাণুর সঙ্গে ডিম্বাণুর মিলন নিশ্চিত করতে মহিলাদের শরীরেই স্থায়ীভাবে জায়গা করে নিত প্রাপ্তবয়স্ক পুরুষ অয়েস্টার। বলাই বাহুল্য, নারীর দেহে পুরুষসঙ্গী চিরস্থায়ী হওয়ায় একগামিতার ধারাতেই অভ্যস্ত ছিল এই বিশেষ অয়েস্টার প্রজাতি।
কিন্তু একটি ঝিনুকের প্রজাতির সঙ্গে ‘বনলতা সেন’-এর কবির কী সম্পর্ক? কেনই বা এমন নামকরণ? একটি সংবাদমাধ্যমেরর সাক্ষাৎকারে গবেষকদের একজন জানিয়েছেন, সাধারণত, নতুন কোনও প্রজাতির খোঁজ মিললে বিশিষ্ট ব্যাক্তির নামে তার নামকরণ হয়। তাই অনেক ভেবেচিন্তেই এই নাম রাখা। রবীন্দ্রনাথের সময়ের সবচেয়ে ‘প্রমিন্যান্ট’ কবি বোধহয় জীবনানন্দই। কবির প্রতি ব্যক্তিগত ভালোলাগাই এই নামকরণের প্রাথমিক কারণ।
সত্যিই তো, ইতিহাস-প্রকৃতিকে জীবনানন্দ ছাড়া আর কে সেভাবে কবিতায় ধরে রাখতে পেরেছে! “হাজার বছর শুধু খেলা করে অন্ধকারে জোনাকির মতো;/ চারিদিকে পিরামিড— কাফনের ঘ্রাণ;/ বালির উপরে জ্যোৎস্না— খেজুর-ছায়ারা ইতস্তত/ বিচূর্ণ থামের মতো: এশিরিয়— দাঁড়ায়ে রয়েছে মৃত, ম্লান।” এ তো ‘অস্ট্রিয়া জীবনানন্দাই’-এর এক মনোলগই।
