একটি ‘মনোহর’ আখড়ার গপ্পো

আমাকে একদিন বললেন, ৮০টা ডনে কিস্যু হবে না, অন্তত ৮০০টা দিতে হবে

কোনো কোনো পাড়ার এক-একটা গৌরব থাকে না? ইতিহাস বা ভূগোলগত কোনো বিশেষত্বজনিত। আমাদের পাড়ার তেমন কিছুই ছিল না, শুধু ছিলেন মনোহর আইচ। আমাদের পাড়ায় এমন কোনও ছেলেও ছিল না, যে অন্তত একবার ঐ আখড়ায় যায়নি। আমি ছোট থেকে শুনি মনোহর আইচ একটা বিরাট ব্যাপার। বুকে হাতি চাপাতেন, মাসল ফোলালে কুঠারাঘাতও হার মানত, লোহার রড দাঁত দিয়ে বেঁকিয়ে দিতে পারেন অনায়াসে। আমি এতকিছু দেখিনি। দেখতাম একটা বারমুডা পরে দক্ষিণপাড়ায় বাজার করতে এসেছেন, মজা করে চোখ মারছেন। আমার যখন ক্লাস সেভেন, তখনই লম্বায় আমি ভদ্রলোককে টপকে গিয়েছি। ছোট্ট একটা হারকিউলিস এই মানুষটাই নাকি কিংবদন্তী বিশ্বশ্রী। ভাবাই যায় না। যাহোক, সবাই যখন বলে…

মাধ্যমিক দেবার পর ইচ্ছে হল আমিও ঘুরে আসি আখড়ায়। পিঠের দুপাশে অদৃশ্য দুটো ডানা গজিয়েছে। তাছাড়া, প্রেমেও পড়েছি প্রথমবার। সব মিলিয়ে শারীরিক ইচ্ছেটা বড় হয়ে উঠল। আমার প্রথম আখড়ায় যাবার দিন আর 'আমিও তোকে বেশ পছন্দ করি জানিস তো। না না, পছন্দ না, এটা ভালবাসাই। আমি সিওর' – এত্তগুলো অবিশ্বাস্য কথা একসঙ্গে শোনার দিন একই। ১৯ মার্চ। ফুরফুরে বসন্ত তখন। সৌরভের ক্যাপ্টেন্সিতে ভারতীয় ক্রিকেট দল পাকিস্তানে খেলতে গেছে। সেদিন খুব সম্ভবত থার্ড ওয়ান ডে। আখড়ায় যাবার পথে সদ্য হওয়া প্রেমিকার সঙ্গে ঘুরতে ঘুরতে দেরি করে ফেললাম অনেকটাই। তারপর আখড়ায় ঢুকতে না ঢুকতেই রং খসে গেল। সবার সামনে আমায় ঘাড় ধাক্কা দিয়ে বের করে দিলেন মনোহর স্যার। সাতটার পর আর কাউকে ঢুকতে দেওয়া হবে না। ভারী বিপদ। মাথাও গেল গরম হয়ে। যদিও, তারপর থেকে দেরি আর করিনি কখনও। মনোহর আইচের বয়স তখন ৯২। মাথা কাজ করে না ভাল। কয়েকবছর আগে বিজেপির হয়ে ভোটে দাঁড়িয়ে হেরেছেন। শুনেছি, প্রচারে বলেছিলেন – স্কুলের থেকেও ব্যায়ামাগার বেশি দরকার, উনি জিতলে সে ব্যবস্থাই হবে। লোকে এসব শুনে আর সাহস পায়নি।

বাবা বলেছিল, পাগল না হলে কেউ এসব বলে। আমারও মনে হত পাগল। নাহলে এই বয়সেও কেউ এক এক সেটে ১০০-১৫০টা বেঞ্চ প্রেস মারে অনায়াসে! একটানা ২০টা মারলেই আমার বুকের খাঁচা দপদপ করতে থাকে। মনোহর আইচ বসে থাকতেন আর আমরা সমানে ডন মেরে যেতাম। মাঝে বুড়ো যেতেন নিচে চা আনতে। হুকুম থাকত, যত সেট ডন, তত সেট বৈঠক। বৈঠক আর কে মারে! উনি উপরে এলে বলতাম বৈঠক শেষ। এভাবেই বেশ চলছিল। একদিন উনি চা নিয়েই একেবারে উঠলেন। আর নামলেন না। সামনে দাঁড়িয়ে প্রায় ৭০টা বৈঠক। তারপর দু দিন যন্ত্রণায় পা ভাঁজ করে বসে নিত্যকর্ম সারতে পারিনি। মনে মনে খুব গাল দিতাম। আমাকে একদিন বললেন, ৮০টা ডনে কিস্যু হবে না, অন্তত ৮০০টা দিতে হবে। শুনেই সেদিনের মতো ব্যায়াম করা মাথায় উঠল। বন্ধুরা ঝাঁ-চকচকে জিমে যেত, পেশি বানাবার ফুড সাপ্লিমেন্ট খেত। সঙ্গে থাকত কেতার ডায়েট চার্ট। এসব দেখে, শুনে কার না লোভ হয়? আমিও সোনামুখ করে ডায়েট চার্ট চাইতে গেলাম মনোহর স্যারের কাছে। উনি শুনেই তেলেবেগুনে জ্বলে উঠলেন। ফোকলা মুখের অর্ধেক কথা বোঝা যায় না। শেষে বললেন রোজ পান্তা খেতে। পান্তায় খুব শক্তি হয়। ওটাই ডায়েট। ইতিউতি গজিয়ে উঠতে থাকা হালের জিমখানার বনের ভিতরে বাঙালির আবহমান শরীরচর্চার দ্বীপ হিসেবে যেন টিকে ছিল এই আখড়া। আমি সাত-আট মাস আখড়ায় যেতাম নিয়ম করে। একদিনও ওঁকে অসুস্থ হতে দেখিনি। রোজ ব্যায়াম করতেন। কোনোদিন হাত, কোনোদিন বুক বা কাঁধ। সবটাই হত, শুধু মাথার ব্যায়ামটাই যা…

আমার বসন্তে শুরু হওয়া 'বাল্যপ্রেমে' অভিসম্পাত নামল শীতে। শরীর চর্চায় উৎসাহ হারিয়ে আমিও আখড়া ছাড়লুম। মনোহর আইচের বয়সও বাড়তে লাগল। ছেলেদের সঙ্গে ঝামেলা। ছেলেরা নাকি বাবাকে দেখে না। এই খবর কোনও এক বাংলা খবরের চ্যানেলে দেখানো হল। পাড়া জুড়ে গুজগুজ ফিসফিস। বড় ছেলে মুখ ভার করে ঘুরে বেড়াচ্ছেন। সুযোগ পেলেই অপপ্রচারের নিন্দে করছেন। মনোহর আইচের অবশ্য এসব নিয়ে খুব ক্ষোভ ছিল বলে মনে হয়না। উনি নিজের তালে থাকতেন। হাঁটতে বেরোতেন। আমার এক বন্ধু স্বপ্নেন্দু একদিন আমার বাড়ি এসে আবদার জুড়লো ওঁকে দেখতে যাবে। নিয়ে গেলাম। স্বপ্নেন্দু প্রণাম করতেই জিজ্ঞেস করলেন– "তোমার কত চলছে?" স্বপ্নেন্দু অবাক। খানিক পর বোঝা গেল বয়সের কথা বলছেন। স্বপ্নেন্দু মৃদুস্বরে বলল– ত্রিশ। মনোহর আইচ মুচকি হেসে বললেন – ''আমার নিরানব্বুই।" খুব চাইতেন একশো পূর্ণ হোক। হলও। পাড়ায় বিরাট মঞ্চে সংবর্ধনা। মঞ্চে উঠে দাঁতহীন মুখে বলতে লাগলেন যৌবনের স্বদেশি আন্দোলনে জড়িয়ে পড়া, জেল খাটা, বিষ্ণু বাবুর আখড়ায় ব্যায়াম করা, জেলে থাকতে থাকতে ব্যায়াম করে জেলের রড বাঁকিয়ে দেওয়া, বিদেশে গিয়ে বিশ্বশ্রী খেতাব জেতার কথা। নেহাত আত্মপ্রেমে পেশি ফোলানোর জিগিরের বাইরে ব্যায়াম-জাতীয়তাবাদ-আদর্শ একাকার করা এইসব কথা আমরা আগে ঢের শুনেছি। আরো একবার। সবশেষে ঝুলে পড়া চামড়া ঢাকা হাতের পেশি মুঠো করে দেখানো। অতীতের সমস্ত গৌরব তখনও শক্ত হয়ে জমাট সেখানে।

আজ থেকে দু'বছর আগে খবরটা যখন কানে এল, তখন সন্ধে। একটা সময় এই সন্ধেতেই নিয়মিত ঘাম মাখবার জন্য জুটতাম ওই আখড়ায়। বেঁটে শক্তিশালী মানুষটা বসে থাকতেন সামনে। এতদিনে সময় ফুরোল তাঁর। শুনেছিলাম, মৃত্যুর পরে হাতের, কাঁধের সেই শক্ত কাঠামোটা একইরকম ছিল। ডাক্তার বলছিলেন রাইগর মরটিস। পাড়ার অনেকেই মানতে চায়নি। আমৃত্যু শক্ত দেহটার কি রাইগর মরটিসের প্রয়োজন হয়? ''ডাক্তার জানেটা কী? এককালে ওই কাঁধেই হাতি চাপত যে। সাধে কী এত শক্ত।"

সেদিন থেকে আমার পাড়া গৌরবের স্মৃতিতে বাঁচছে।

Developed by DXDasia