দেবেন্দ্রনাথের অজান্তে, ঠাকুরবাড়িতে সযত্নে আরাধনা করা হত বৈদিক পৌরাণিক দেবদেবীদের!

ঠাকুরবাড়ির অন্দরমহলে পুতুলপুজো— এক নীরব প্রতিবাদ

এই মুহূর্তে দেশ, কাল, সময়, সমস্যা সব ভুলে যান। মনে মনে পিছিয়ে চলুন উনিশ শতকে। একটি বনেদি বাড়ির অন্দরমহল পার হয়ে চলেছেন রমানাথ ঠাকুরের বাড়ির পুরোহিত কেনারাম শিরোমণি। বাড়ির গিন্নিমা তার হাত দিয়ে কালীঘাটে এবং তারকেশ্বরে পুজো পাঠাবেন যে! পুরো কাজটাই গোপনে করে ফেলতে হবে। আপনারা ভাবছেন, গোপনে কেন?তাহলে ঘটনার শিকড়ে পৌঁছতে হবে। জানতে হবে ওই বনেদিবাড়ির পরিচয়। ঘটনার আড়ালে গোপনীয়তার কারণ।

শুনলে হয়তো অবাক হবেন, বাড়িটি জোড়াসাঁকোর ঠাকুরবাড়ি এবং যিনি গোপনে পুজো পাঠাচ্ছিলেন, তিনি রবীন্দ্রনাথের মা সারদাসুন্দরী দেবী। ঠাকুরবাড়ির দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুরের চুয়াল্লিশ এবং তাঁর স্ত্রী সারদাসুন্দরীর পঁয়ত্রিশ বছর বয়সে রবীন্দ্রনাথের জন্ম হয়। এই সেই সময়, যখন দেবেন্দ্রনাথ বহু বছরের পৌত্তলিক ধর্মাচরণ থেকে মুক্ত হয়ে ব্রহ্ম উপাসনার চেষ্টা শুরু করেছিলেন। এই ভাবনার অভিঘাত বড়ো সজোরে এসে পড়েছিল ঠাকুরবাড়ির অন্দরমহলে। হঠাৎ করেই গৃহদেবতার পুজো বন্ধ হয়ে যায়, চণ্ডীমণ্ডপে প্রতিমার পীঠস্থানে তৈরি হয় উপাসনার বেদি আর শ্বেতপাথরের ভিতের উপর প্রোথিত  হয়েছিল ব্রাহ্মধর্মের বীজমন্ত্র। কিন্তু যে মেয়েদের একলা অবসরের অবলম্বন ছিলেন গৃহদেবতা, যাদের চিকের আড়ালের নিস্তরঙ্গ জীবনের একটু বিনোদন ছিল পুজোর আনন্দ— তাদের মন কীভাবে গ্রহণ করেছিল মহর্ষির এই ব্যক্তিগত সিদ্ধান্ত? আজ আমাদের আলোচনার বিষয় ঠাকুরবাড়ির অন্দরমহলে এই সিদ্ধান্তের অভিঘাত। 

রবীন্দ্রনাথের জন্মের আগেই তাঁর পরিবার সমাজের নোঙর তুলে বাঁধা ঘাটের বাইরে এসে ভিড়েছিল। দেবেন্দ্রনাথ নিজের ধর্মমতকে প্রতিষ্ঠা দেওয়ার জন্য শালগ্রাম শিলা বাদ দিয়ে দ্বিতীয়া কন্যা সুকুমারীর বিয়ে দিয়েছিলেন। ব্রাহ্মমতে পিতৃশ্রাদ্ধ করেছিলেন। তখন জ্ঞাতি কুটুম্বরা তো বটেই, পাথুরিয়াঘাটার ঠাকুরবাড়িও তাঁর পরিবারকে সামাজিকভাবে বর্জন করেন। দেবেন্দ্রনাথ যখন গৃহদেবতার পুজো বন্ধ করতে উদ্যোগ নিয়েছিলেন, তখন প্রথম প্রতিরোধ আসে অন্দরমহল থেকেই। গিরীন্দ্রনাথ ঠাকুরের বিধবা পত্নী লক্ষ্মী জনার্দনের দায়িত্ব গ্রহণ করলেন এবং সপরিবারে বৈঠকখানার বাড়িতে বসবাস শুরু করলেন। এই ছিল  তাঁর সরাসরি প্রতিবাদ। কিন্তু দেবেন্দ্রনাথের নিজের পরিবারের মেয়েরা? তাঁরা কি স্বতঃস্ফূর্তভাবে বন্ধ করে দিয়েছিলেন পুতুলপুজো? শুধু দেবেন্দ্রনাথ বলেছিলেন বলেই? একেবারেই না! দেবেন্দ্রনাথের নেতৃত্বে ঠাকুরবাড়ির পুরুষ সদস্যদের মনে ব্রাহ্মধর্ম যতই শিকড় মেলে দিক, অন্দরমহলে নীরবে, গোপনে প্রবাহিত হয়ে চলেছিল চিরাচরিত হিন্দু পৌত্তলিক ধর্মের স্রোত।

ঠাকুরবাড়ির মেয়েরা

দেবেন্দ্রনাথের পিতামহী অলকাসুন্দরী দেবী যখন ঠাকুরপরিবারের গৃহবধূ হয়ে এসেছিলেন, তখন ঠাকুরবাড়ি চিহ্ণিত ছিল ‘মেছুয়া বাজারের গোঁড়া’ হিসাবে। পুজো পার্বণে, গৃহদেবতার সেবায় অন্দরমহলে পৌত্তলিক আবহাওয়া বেশ বজায় রেখেছিলেন তিনি। প্রতিদিন গঙ্গাস্নান, তীর্থ ভ্রমণ, হরিবাসর, কীর্তন— কিছুই বাদ ছিল না। পিতামহীকে তখন রীতিমতো সঙ্গ দিতেন দেবেন্দ্রনাথ। অলকাসুন্দরীর মৃত্যুই আধ্যাত্মিক বদল ঘটায় দেবেন্দ্রনাথের মনে, একথা অনেকেরই জানা। দ্বারকানাথের নিজের দিদি রাসবিলাসীর স্বামী ভোলানাথ চট্টোপাধ্যায় সন্ন্যাস নিয়েছিলেন। পরে, তাঁরই নির্দেশে রাসবিলাসীর নিজের বাড়ি তৈরি হয় এবং নিজের বাড়িতে প্রতিমা এনে পুজো করিয়েছিলেন রাসবিলাসী। দ্বারকানাথের স্ত্রী দিগম্বরী দেবী স্বভাবত ধার্মিক ছিলেন, তার উপর দ্বারকানাথের তথাকথিত অধার্মিক আচরণ তাঁকে আরও ধর্মপথগামী করে তোলে। লক্ষ হরিনামের মালা জপ, স্বপাক আহার, স্বামীর ছোঁয়া লাগলে স্নান করে শুদ্ধ হওয়া এবং ‘লক্ষ্মীর অবতার’ হিসেবে পরিচিত দিগম্বরীর ধর্মনিষ্ঠাকে এক লহমায় নস্যাৎ করা দেবেন্দ্রনাথেরও অসাধ্য ছিল। হয়তো তাই পিতৃশ্রাদ্ধের পূর্বরাত্রে স্বপ্নে মা দিগম্বরীর কাছে অপৌত্তলিক পদ্ধতিতে শ্রাদ্ধানুষ্ঠান করার অনুমতি প্রার্থনা করেছিলেন দেবেন্দ্রনাথ। রবীন্দ্রনাথের মা, সারদাসুন্দরীর ধর্মসঙ্কট বড়ো বেদনাদায়ক। একটি মানুষ জীবনের প্রথম পঁয়ত্রিশ বছর যে বিশ্বাস আঁকড়ে ছিলেন, তাকে একেবারে মুছে ফেলা যায় কি? শুধু স্বামীর অনুসরণ করার জন্যই ভক্তিলালিত পুতুলপুজো ত্যাগ করে স্বামীর ধর্মব্যাখ্যা শুনতেন— একথা জোরের সঙ্গেই বলছি। ধর্মবেদীতে বসে সারদাদেবী কিন্তু নিজের ইষ্টমন্ত্রই জপ করতেন। পুজোপার্বণে দেবেন্দ্রনাথ তো বাইরে থাকতেন। তখন সারদাদেবী ব্যক্তিগত সংস্কার ও স্বামীর ধর্মীয় মতাদর্শে ক্ষতবিক্ষত। সৌদামিনী দেবী ও জ্ঞানদানন্দিনী দেবীর স্মৃতিকথা থেকে জানা যায়, গ্রহাচার্যরা প্রলোভন দেখিয়ে সারদাদেবীর কাছ থেকে অর্থ নিয়ে যেত। 

দেবেন্দ্রনাথের কঠিন  নির্দেশ সত্ত্বেও ঠাকুরবাড়ির মেয়েরা পুতুলপুজো করেছেন। কখনও গোপনে আবার কখনও প্রকাশ্যেও। বিবাহসূত্রে দূরে গিয়ে ঠাকুরবাড়ির অনেক মেয়ে নত হয়েছেন হিন্দু পৌত্তলিক ধর্মের কাছে। সারদাদেবীর মৃত্যুর পর সংসারের অধিকাংশ দায়িত্ব সামলাতেন সৌদামিনী দেবী। দেবেন্দ্রনাথের নির্দেশ জারির পর তিনি গোপনে কৃষ্ণের ছবিতে জল, ফুল দিয়ে পুজো করতেন। বলেন্দ্রনাথের মা প্রফুল্লময়ী জীবনের অনেক ঘাত-প্রতিঘাতের পর আশ্রয় নিয়েছিলেন পৌত্তলিক ধর্মের কাছে। পরমহংস শিবনারায়ণ স্বামীর দীক্ষা গ্রহণ করেছিলেন তিনি। পরে জ্ঞানদানন্দিনীর পুত্রবধূ সংজ্ঞা, শরৎকুমারী দেবীর কন্যা সুপ্রভা, সৌদামিনী দেবীর মেয়ে ইরাবতী— কেউ হিন্দু গুরুর কাছে দীক্ষা নিয়েছিলেন, কেউ বা পুতুলপুজো করেছেন পরম ভক্তিতে। জ্ঞানদানন্দিনীর শৈশবের স্মৃতিচারণা থেকে জানা যায়, তাঁর দেবভক্তির কথা! শিলাইদহে পুত্র সুরেন্দ্রনাথের অভিষেক সম্পন্ন হয়েছিল হিন্দু পৌত্তলিক পদ্ধতিতে। ইন্দিরা দেবীও ‘স্মৃতিসম্পূট’ গ্রন্থে স্বীকার করেছিলেন নিজের  অনুষ্ঠানপ্রিয় স্বভাবের কথা। বীরেশ্বরর মন্দিরের আরতি দেখে ভক্তিতরঙ্গে তাঁরও চিত্ত পুলকিত হয়েছিল। তিনিও নত হয়েছিলেন বীরেশ্বরের চরণে।  স্বর্ণকুমারী দেবীর বিদূষী কন্যা সরলাদেবী বরাবর পৌত্তলিকতাকে প্রশ্রয় দিয়েছিলেন। স্বামী বিবেকানন্দের ব্যক্তিত্বে মুগ্ধ ছিলেন তিনি। তাঁর অন্তরের আধ্যাত্মিক পিপাসার কথা তিনি মুক্ত কন্ঠে স্বীকার করেছিলেন। এই পিপাসা অবশ্যই ছিল মৃণালিনী দেবী ও কাদম্বরী দেবীর মধ্যেও। কাদম্বরীর বাবা শ্যামলাল গাঙ্গুলির নিয়মিত কাশী যাওয়ার কথা জানা যায় ইন্দিরাদেবীর স্মৃতিচারণা থেকে। পূর্বজীবনের দেবসংস্কার কাদম্বরীর মনে প্রভাব ফেলে থাকবে, এটাই স্বাভাবিক। মৃণালিনীদেবীর প্রকৃত নাম ভবতারিণীর আড়ালে শাক্ত প্রভাব স্পষ্ট। জোড়াসাঁকো আর শিলাইদহে বিভক্ত হয়েছিল মৃণালিনীর সংসার। শিলাইদহে রবীন্দ্রনাথের বাড়িতে থাকাকালীন নন্দলাল বসু লক্ষ করেছিলেন জলখাবারে গোপীনাথের মন্দির থেকে শীতলী প্রসাদ আসছে। অবনীন্দ্রনাথ নাকি ক্ষীরের পুতুলের গল্প শুনেছিলেন মৃণালিনী দেবীর কাছ থেকেই। ষষ্ঠী ঠাকুরুণের গপ্পো কথা সন্তানের মায়েদের ঠোঁটস্থ থাকত, ব্রতের কাহিনি হিসেবে। মনে প্রশ্ন জাগতেই পারে, ঠাকুরবাড়ির গৃহবধূ কি তাহলে ব্রত রাখতেন? রবীন্দ্রনাথের পুত্রবধূ বড়ো হয়েছেন লক্ষ্মী জনার্দনের নিত্য সেবা করে। তাঁর মন অবশ্যই পৌত্তলিক ছিল। ঠাকুরবাড়ির মেয়েরা, যেমন নিপময়ী, সুনয়নীরা সৃষ্টিকাজে সাবজেক্ট হিসেবে বেছে নিয়েছিলেন ঠাকুরদেবতার ছবি! শুধুই শিল্প হিসেবে? নাকি এর অন্তরালে ছিল নারীমনের সহজাত ভক্তি?

অন্দরমহলের ইতিহাস সবসময়ই গোপন, অদৃশ্য প্রাচীরের আড়ালে থাকে। তবু কিছু স্মৃতিকথা থেকেই উঠে আসে ঠাকুরবাড়ির মেয়েদের পুতুলপুজোর ইতিবৃত্ত। দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর অপৌত্তলিক ধর্মসাধনার এক বিশেষ পদ্ধতির প্রচলন করতে চাইলেও তাঁর সমকালে অনেকেই সেই আরোপিত ধর্মসংস্কারকে মন থেকে গ্রহণ করতে পারেননি। বিশেষ করে ঠাকুরবাড়ির অন্দরমহল। নিস্তরঙ্গ জীবনের যে দেববিশ্বাস এবং দেববিগ্রহকে আঁকড়ে মেয়েগুলির জীবন কাটত, সেই বিশ্বাসের শিকড় তাঁদের অন্তরের গভীরে প্রবেশ করেছিল। সেই কারণেই দেবেন্দ্রনাথের অজান্তে, অন্তঃপুরের আনাচে কানাচে সযত্নে আরাধনা করা হত, বৈদিক পৌরাণিক দেবদেবীদের। হয়তো দেবেন্দ্রনাথের আরোপিত মতাদর্শের বিরুদ্ধে এই ছিল ঠাকুরবাড়ির অন্দরমহলের নীরব প্রতিবাদ। 

সহায়ক গ্রন্থঃ

মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথের আত্মজীবনী, দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর
স্মৃতিকথা, সৌদামিনী দেবী
রবীন্দ্রনাথের আত্মীয়স্বজন, সমীর সেনগুপ্ত
জীবনের ঝরাপাতা, সরলা দেবী
দেবতা অনুরাগী রবীন্দ্রনাথ, প্রণবেশ চক্রবর্তী
ঠাকুরবাড়ির অন্দরমহল, চিত্রা দেব

Developed by DXDasia