
আজও বাঙালিরা নেতাজিকে ছুঁয়ে আছে তাঁর লেখা চিঠিপত্রে
২৩ জানুয়ারির সকালটা এক অন্যরকম ব্যস্ততায় কাটে কুলটির বেলরুই গ্রামের রায় পরিবারের। এইদিন বাড়ির সকলে একজায়গায় জড়ো হন প্রতিবছর। গদি দেওয়া, তারের বুনটের কাঠের চেয়ার স্পর্শ করে নেতাজিকে উপলব্ধি করার চেষ্টা করেন এঁরা। কারণ ১৯৪০ সালে বেলরুই গ্রামের জমিদার পরিবারের সদস্য নকুলচন্দ্র রায়ের সঙ্গে দেখা করতে এসে এই চেয়ারেই বসেছিলেন সুভাষ বোস। সবশেষে তাদের বাড়িতে সযত্নে রক্ষিত নেতাজির সই করা চিঠি মাথায় ঠেকিয়ে প্রণাম করেন রায় বাড়ির বর্তমান সদস্যরা। ‘সোনার বাংলা কটন মিল লিমিটেড’-এ নকুল বাবুকে যোগ দেওয়ার অনুরোধ জানিয়ে কলকাতার এলগিন রোডের বাড়ির ঠিকানা ছাপানো নিজের লেটার প্যাডে সে চিঠি লিখেছিলেন সুভাষচন্দ্র। নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসু মানেই এমনই সব ঘরোয়া বাঙালির সৎ আবেগ, আমজনতার পক্ষ হতে ভারতীয় স্বাধীনতার ইতিহাসকে এমনভাবেই ছুঁয়ে থাকার প্রচেষ্টা। নেট দুনিয়ার এই ভয়ংকর গতিময় সময়ে আজও তাই বাঙালি, নেতাজিকে ছুঁয়ে আছে তাঁর লেখা চিঠিপত্রে। দেশভাবনার বিচিত্র গতি আজকাল চোখে পড়ে। তবু এখনও সত্যিকারের দেশ ও দেশের মানুষদের কথা ভাবেন যেসব পরিবার, তাদের কাছে এইসব চিঠি যেন আজও তাঁদের ঘরের ছেলের দেশনায়ক হয়ে ওঠার গল্প।
মানবিক না হলে দেশকে ভালোবাসা যায় না। জননায়ক সুভাষচন্দ্রের জীবনের শুরু থেকেই মানুষের প্রতি এই হৃদয়-প্রসারী ভালোবাসার সীমাহীন প্রকাশ। বাবা জানকীনাথ ও মা প্রভাবতী দেবীর সস্নেহ প্রশ্রয় সুভাষকে মানুষের পাশে দাঁড়ানোর শিক্ষা দিয়েছিল ছোটো থেকেই। পরিবারের প্রতিটি মানুষের প্রতি যেমন দায়-দায়িত্ব, ভালোবাসাময় কর্তব্য থাকে, তেমনি আমাদের দেশও এক বৃহৎ পরিবার, দেশের প্রতিটি মানুষের জন্য কিছু করার কথা ছোট্ট সুভাষ শিখেছিলেন তাঁর বাবার কাছেই। কাছের মানুষ, পরিজন আর দেশ ছেলেবেলা থেকেই তাই ‘এক’ ছিল বিবেকানন্দ পড়া সুভাষচন্দ্রের অনুভবে। আমাদের এই কেতাবী দেশপ্রেম সুভাষের সেই ভালোবাসার গভীরতার নাগাল পায় না। আমাদের দৈনন্দিন সুখযাপনে কেবল ক্ষণিক শিহরণ আনে সেই দেশপ্রেমের কাহিনি। কাহিনিই বটে, কারণ ব্যক্তি সুভাষচন্দ্র যখন বলেন পারিবারিক জীবনও তাঁর কাছে মূল্যহীন ঠেকবে যদি তা দেশকল্যাণের কাজে না লাগে, তখন অবাক বনে যাই আমরা। হয়তো কিছুটা ধারণা করা যায় কেন দেশের কাজে এগিয়ে আসা তাঁর মেজদা শরৎচন্দ্র ও তাঁর স্ত্রী বিভাবতীর দাম্পত্য এত প্রিয় ছিল নেতাজির। কিছুটা অনুমান করা যায় সব বিপদ উপেক্ষা করে নিজের সন্তানের মতো তরুণ বিপ্লবীদের দেখাশোনা ও আশ্রয় দেওয়া মাস্টারমশাই বেণীমাধব বাবুর স্ত্রী’কে কেন এত শ্রদ্ধা করতেন সুভাষ। কিছুটা বোধগম্য হয় দেশের কাজে জীবন উৎসর্গ করা নেতাজিকে বুঝে কী অপরিসীম আস্থায় বিদেশিনী এমিলি শেঙ্কেল ছেড়ে থেকেছিলেন তাঁর স্বামী সুভাষচন্দ্রকে।

১৯৩৪ থেকে ১৯৪২ পর্যন্ত এমিলিকে মোট ১৬২টি চিঠি লিখেছিলেন সুভাষ। কখনও জেলবন্দী অবস্থায়, কখনও বন্দিগৃহ থেকে, কখনও চূড়ান্ত রাজনৈতিক অস্থিরতার মধ্য থেকেই সেসব চিঠি লেখা। কিন্তু সবেতেই সুভাষের মানবিক মুখ। কঠিন সময়েও এক বৃহত্তর স্বার্থের কথা ভেবে নিজের সুখ স্বাচ্ছন্দ্যকে তুচ্ছ করা। ১৯৩৬ সালে মুর্শিদাবাদে পরিচিত জনৈক সুনীল ঘোষ মৌলিকের বিয়ে সংক্রান্ত এমনই এক ব্যক্তিগত চিঠির প্রত্যুত্তরে নবদম্পতিকে আশীর্বাদ করে নেতাজি লিখছেন, “দেশের ও দশের হিতার্থে তোমাদের জীবন ব্যয়িত হোক। তারমধ্যেই শ্রেষ্ঠ সুখ আনন্দের আস্বাদ নিশ্চই পাবে।” এমন মানুষই তো ভারতের স্বাধীনতার জন্য সাধারণ আমজনতার সমর্থন ভীষণভাবে দরকার তা উপলব্ধি করে, ১৯৪৪-এর ৪ জুলাই বার্মায় এক র্যা লিতে রক্তের বিনিময়ে স্বাধীনতা এনে দেওয়ার কথা বলতে পারেন। এমন মানুষের মুখেই মানায় সে কথা। ইতিহাসের সাদা-কালো রং পেরিয়ে, সময়ের সত্যের কাছে এমন দেশপ্রেমই তো চির ভাস্বর হয়ে থাকে।
অহিংস-সহিংস আন্দোলন, নরমপন্থী-চরমপন্থী বিভাজন, ক্ষমতার হাতের পুতুলে পরিণত হওয়া ঐতিহাসিক বিশ্বাসঘাতকতা, স্বপ্নভঙ্গ, আজাদ হিন্দ ফৌজের দৃপ্তকণ্ঠের জাগরণ এমনকি জীবন মৃত্যুর সংশয় ও হাজারো কমিশনের বিচিত্র রকম সুপারিশের দোলাচল পেরিয়ে দেশকে ভালোবাসা এই সুভাষ বোস আজও বেঁচে আছেন ভীষণভাবে। শুধুমাত্র দেশের কাজ করবেন বলেই সিভিল সার্ভিসের লোভনীয় চাকরি যেদিন প্রত্যাখান করেছিলেন সুভাষ, সেইদিন থেকেই ভারতবর্ষের মানুষ, এই সাধারণ ‘আমরা’ ঋণী হয়ে আছি তাঁর কাছে। শুধু প্রতিমুহূর্তে আজও যারা দেশকে নিজের প্রেমিকার মতো কিংবা মায়ের মতো করে ভালোবাসে, সে ভালোবাসার আগুনে দগ্ধ হয়ে যায়, তাদের প্রত্যেকের চরণচিহ্ন ধরে হেঁটে গেলে সেই ঋণের পবিত্র পথকে বোধহয় খানিক ছুঁতে পারা যায়। প্রতিটি ২৩ জানুয়ারির সকাল আসলে নিরাপদ দেশপ্রেমিকদের সেই পথ স্পর্শ করতে চাওয়ার কেবল অক্ষম চেষ্টা।
* ১৯৪০ সালে নকুলচন্দ্র রায়ের সঙ্গে দেখা করতে এসে এই চেয়ারেই বসেছিলেন সুভাষ বোস। ছবি- সংগৃহীত।
