
মূলত রাধাকৃষ্ণের চিরায়ত লীলাবিষয়ক গানই ঝুমুরের বিষয়-আশয়
বোলান-আলকাপ-ভারবোল-হাপু-হাবু-জারি-সারি-ভাদু-টুসু-বাদনা-করম-পুশনা-ঝুমুর। এ সবই আমাদের মাটিগন্ধী লোকজ সংস্কৃতি। এর বাইরেও গ্রামবাংলায় অজস্র স্থানিক নিত্যাচারগত লোকোৎসব কত যে আছে তার ঠিক-ঠিকানা আজও অপরিজ্ঞাত। অনুসন্ধানী মন সে সব খুঁজে চলেছে অহরহ। সে কাজে ছাপ-কাগজ লাভের লোভ যেমন আছে, তেমনই আছে অদীনসত্ত্ব তাথ্যিক অনুসন্ধিৎসা। তাগিদ অমল সংরক্ষণের – কেননা এ সব হয়তো হারিয়ে যাবে অচিরেই। ঠিক খাগড়াই কাঁসা, ডোকরা শিল্প কিংবা পটচিত্রকলার মতো। নতুন প্রজন্মের আলোকিত মন এ হেন পরিশ্রমসাধ্য প্রাচীনতায় মন বসাতে আগ্রহী নয় আর। চটজলদি পাওয়ার যেখানে কিছু নেই, নেই অল্পায়াসের উৎপাদন, সেখানে কে আর ভূতের বেগার খাটতে চায়! তেমনই পরাক্রান্ত ভয় থেকেই আমার ছিল এলোমেলো পথচলা। সঙ্গী, এক সংস্কৃতিমনস্ক সংগঠন – অপচয়িত হীরকখণ্ড খুঁটে খুঁটে নেওয়া যার একান্ত নিদিধ্যাসন। এমন ভাবনা মাথায় নিয়েই ২০১৭ সালে পাড়ি দিয়েছিলাম পুরুলিয়ার বা পুরুল্যার টাঁড়পথে। দু’বার। প্রথমবার প্রখর তপনতাপ মাথায় নিয়ে, দাবদগ্ধ মুগ্ধতায়। দ্বিতীয়বার শীত – পলাশের চাদর গায়ে অলাতচক্রী মাদকতায়। উৎসুক মন জানতে চেয়েছিল ঝুমুরকে. বিশেষত দরবারি ঝুমুর আর তার সঙ্গে কর্ণের কবজ-কুণ্ডলের মতো জড়িত নাচনিদের। তবে সে পথচলার সামগ্রিক অভিজ্ঞতা নির্বেদ খিন্নতায় মোড়া। কেন, তা ক্রমশ প্রকাশ্য। প্রথমেই প্রয়োজনীয় গৌরচন্দ্রিকা। তার আগে বলি, পুরুলিয়ার ঝুমুর, দরবারি ঝুমুর বা তৎসংশ্লিষ্ট নাচনি বিষয়ে কোনও একঘ্নী প্রামাণিক তথ্য আছে বলে আমাদের মনে হয়নি। ঐতিহাসিক পরম্পরাগত তথ্য সংরক্ষণের তেমন কোনও সুসংবদ্ধ উদ্যোগ পূর্বে তো নেওয়া হয়ইনি, পরবর্তীতেও বিশ্বসনীয় ঢঙে তা যে হয়েছে, সে কথা অপ্রতর্ক্যভাবে বলা যাবে না। সুতরাং যা কিছু দেখেছি, শুনেছি তার অধিকাংশই অনুমাননির্ভর বা কোনও কোনও ক্ষেত্রে মানুফ্যাকচার্ড বলে মনে হয়েছে। যে কারণে একই বিষয়ে একাধিক মতামতের অবস্থান বিদ্যমান। তাই ‘হয়তো’, ‘বোধ হয়’ – এমত শব্দবন্ধ মাথায় রেখেই এই নিবন্ধে ঢুকতে হবে।
বাদক সরস্বতী সিং পাতর
এই সূত্রানুসারে যেটা পাই তা হল ১৭৯৩ সালে লর্ড কর্নওয়ালিসের চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত লাগু হলে যারা জমিদারিস্বত্ব স্থায়ীভাবে লাভ করেছিল তাদের মধ্যে বাঘমুন্ডির জায়গিরদার অযোধ্যাপ্রসাদ সিংহও ছিলেন। আর বেশিরভাগ ক্ষেত্রে যেমনটি হয় তেমনই তিনিও ছিলেন নৃত্যগীতের সমঝদার তথা পৃষ্ঠপোষক। তিনি গান লিখে পারদর্শীজনেদের দিয়ে গাওয়াতেন। গানের সঙ্গে নাচের প্রয়োজনে নিকট বা দূর থেকে মেয়েদের আনতেন এবং অবশ্যম্ভাবী ঢঙেই তারা হত নিম্নবর্গীয়, অবহেলিত, প্রান্তিক ‘মেয়েছেলে’।এই গান ছিল ঝুমুর আর নাচিয়ে মেয়েরা হয়ে গেল নাচনি। সেই থেকেই নাকি সূত্রপাত। আর রাজদরবারে বা জমিদারবাড়িতে যে ঝুমুর গাওয়া হত, সম্ভবত সেটাই দরবারি ঝুমুর যা কিনা গাম্ভীর্যে মাঠেঘাটে গাওয়া ঝুমুরের থেকে খানিক উচ্চমার্গীয়। মূলত রাধাকৃষ্ণের চিরায়ত লীলাবিষয়ক গানই ঝুমুরের বিষয়-আশয়। আবার ভিন্নমতে পুরুলিয়ার কাশীপুর রাজবাড়িতে দরবারি ঝুমুর অনিঃশেষ পৃষ্ঠপোষকতা লাভ করেই বিস্তৃতি পায়।
আমার এখনকার আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু যেহেতু নাচনি বিশেষত আমার দেখাশোনা জনাচারেক নাচনির সংক্ষিপ্ত পরিসরেই তা সীমায়িত এবং যেহেতু ঝুমুর আর নাচনি সম্পৃক্ত বিষয়, সেই হেতু এই প্রতিবেদনের স্বার্থে যেটুকু বলার তার বাইরে যাব না আর অবশ্যই সেখানে না – দেখা কল্পনাবিলাস কিছু থাকবে না।
নৃত্যরত সরস্বতী সিং পাতর
পুরুলিয়া অর্থাৎ পূর্বের মানভূম যা কিনা খণ্ডিত তার সৃজনের ইতিহাসটি উল্লেখযোগ্য। পূর্বতন বিহারের অধীনে থাকাকালীন এই মানভূম বাংলা ভাষা আন্দোলনের সূত্রে ১৯৫৬ সালে পশ্চিমবঙ্গের সঙ্গে যুক্ত হয় এবং পুরুলিয়া হয় জেলাসদর। মানভূম যে শুধু খনিজ সম্পদে সমৃদ্ধ ছিল তাই নয়, এর লোকসাংস্কৃতিক সম্পদও উল্লেখযোগ্য। আজ বিশ্বব্যাপী ছৌ নাচ কারও অবিদিত নয়। এ ছাড়া ভাদু, টুসু, বাঁদনা, করম তো আগেই উল্লেখ করেছি। এ সবেরই সূতিকাগার হল ঝুমুর। আর এই ঝুমুরের সনিষ্ঠ প্রতিপালক হচ্ছে নাচনি সম্প্রদায়। এদের মাধ্যমেই হাটে-মাঠে-ঘাটে ছড়িয়ে গেছে ঝুমুরের মাদকতাপূর্ণ সুর, লাস্য ভঙ্গিমায় – ঠিক যেন মহুয়ার ঘোর লাগা আবেশে। অথচ এই নাচনিরাই চিরকাল থেকেছে অবহেলিত, অনাহারক্লিষ্ট, অপাঙক্তেয় তথা সামগ্রিক কু-দৃষ্টির সহজ শিকার। আজ এদের কিছুটা পরিচিত জুটলেও খিন্ন ছবিটার খুব একটা বদল ঘটেছে বলে মনে হয়নি। যদিও এদের কেউ কেউ সরকারি লালন পুরস্কার পেয়েছেন। আবার ‘নান্দীকর’-এর মতো নাট্যসংস্থা ২০১৩ সালে নাচনিদের জীবন নিয়ে নাটকও মঞ্চস্থ করেছিল; তবু্ও তা ছিল তিমিরবিলাস মাত্র। তাতে করে তাদের তিমিরবিনাশ হয়নি। এ বিষয়ে বাকি কথায় পরে আসছি।
সরস্বতী সিং পাতর ও হারমোনিয়ামে হৃষীকেশ মুখার্জি
এখন বলি, প্রাথমিক পর্যায়ে ঝুমুর গানের পরিশীলিত বোধ ছিল না। নাচনি নাচকে ঘিরে তার বিকাশ ঘটে। ঝুমুরের কিংবদন্তি পুরুষ ভবপ্রীতানন্দ ওঝা কাশীপুর রাজদরবারের সভাকবি ছিলেন। তিনি ঝুমুর গানে নাচনিদের অবদান একবাক্যে স্বীকার করে গেছেন। পরবর্তী কবিরা ঝুমুরে ভণিতার প্রয়োগ করলেন। প্রথম যুগের ভণিতাহীন ঝুমুরের সুরে রাগ-রাগিণীর সংমিশ্রণ ঘটিয়ে দরবারি ঝুমুরের সৃষ্টি হয়েছিল।
সংস্কৃত ‘নৃত্য’ থেকে প্রাকৃত ‘নচ্চ’ হয়ে ‘নাচ’ শব্দের ব্যুৎপত্তিগত উদ্ভব। অঙ্গসঞ্চালনই নাচের আজন্ম সঙ্গী। ‘নাচনি’ শব্দটি যে ‘নাচ’- জাত তা বুঝতে কারও অসুবিধা নেই। তবে পুরুলিয়ায় মূলত বাই-নাচকেই নাচনি-নাচ বোঝানো হয়। তবে নাচ তথা নৃত্যের ইতিহাস বা পুরাণকথা সম্পর্কে আমরা যথেষ্ট অবগত। দেবরাজ ইন্দ্রের রাজসভার সুন্দরী নর্তকী থেকে শুরু করে বেহুলার নৃত্যকথা কে না জানে? প্রাচীনকালে তথা মধ্যযুগেও নর্তকীদের যথেষ্ট সমাদর বা সসম্মান কদর ছিল। নর্তকীদের অবনমন তথা অবমূল্যায়নের জন্য প্রাচীন দেবদাসী প্রথা (যা এখনও কোথাও কোথাও বহাল তবিয়তেই আছে) বহুলাংশে দায়ী, এ কথা অনস্বীকার্য। যদিও দেবদাসীদের সঙ্গে নাচনিদের প্রথাগত পার্থক্য আছে তবু্ও মন্দিরের নৃত্য-সেবিকাদের মতো জমিদারানুগ্রহ বা রাজানুগ্রহে পুষ্ট নাচনিদেরও আশ্রয়দাতার মনোরঞ্জনের সঙ্গে সঙ্গে দেহ-রঞ্জনের অকাম্য কাজটিও করতে হত। এ প্রসঙ্গে আমরা শূদ্রক রচিত ‘মৃচ্ছকটিক’-এর বসন্তসেনা কিংবা আমাদের পরিচিত নটী বিনোদিনীর কষ্টকর জীবনের কথাও স্মরণ করতে পারি। দুর্মুখ রায়েরা আগেও ছিল, নাচনি জীবনে এখনও আছে। মাত্রাভেদ হয়েছে মাত্র। দরবারি বাই নাচ যখন থেকে তার রূপ-রং-রস বিসর্জন দিয়ে শুধুই মনোরঞ্জনের হাতিয়ার হয়ে উঠল তখন থেকেই শুরু হল এই লোকশিল্পের সর্বনাশা দিন। অবশ্য নারীকে পণ্য হিসাবে বিজ্ঞাপিত করার যে নাগরিক উৎকট প্রয়াস – তাও নাচনির অবমূল্যায়নে কম দায়ী নয়।
আরও পড়ুন: ইতিহাসের ধুলোয় ঢাকা চিৎপুরের কাঠখোদাই শিল্প
বর্তমানের নাচনিদের বুঝতে হলে এই নাচের সেকাল-একাল বিভাজনটি মাথায় রাখতে হবে। পুরুলিয়ার ঝুমুর গবেষক জলধর কর্মকারের বয়ানে পাই, সে কালে নাচনিরা যে নাচ নাচতেন তা মূলত জমিদারি, বৈঠকি ও ধুমড়ি পর্যায়ের। এগুলো আদিরসাত্মক। এই নাচে নাচনির রসিকেরা (এঁদের বিষয়ে পরে আসব) মাথায় পাগড়ি বাঁধতেন আর নাচনিরা পরতেন ঘাংরি (ঘাগরা)। কোমরে কোমর-বন্ধনী। নাগড়া, ঢোল, সানাই, বাঁশি, মাদল প্রভৃতি বাদ্যযন্ত্র এই নাচে ব্যবহৃত হত। বিশেষ বিশেষ পূজানুষ্ঠানে জমিদারি নাচ বেশি হত। বৈঠকি নাচ যে কোনও উপলক্ষেই ঘরোয়া পরিবেশে হত। আর নানান পার্বণ-মেলায় ধুমড়ি নাচ যা সানাই ধামসা বাদ দিয়ে হত না। সম্ভবত ধামসা বা ধুমসা থেকেই ধুমড়ির উৎপত্তি। যাই হোক, এই নাচের সঙ্গে পৌরাণিক ঝুমুর – বিশেষত রাধা-কৃষ্ণের প্রেম বিরহের লীলাসঙ্গীত ও দেহতত্ত্বের গানই গাওয়া হত যা দরবারি অঙ্গের প্রতিরূপ বলেই মনে হয়।
বিমলা দেবীকে দেওয়া স্মারক সম্মান
একালের নাচনিরা আর ঘাগরা পরেন না। পরেন শাড়ি। এদের সজ্জায় আধুনিকতার ছোঁয়া। চুলে বাস-তেল, রঙিন ফিতে-বাঁধনের খোঁপা আর সেখানে গোঁজা রূপোর ঝুমকো কাঁটা; চোখে প্রসারিত কাজলরেখা, কানে কানপাশা, কপালে কাচপোকার টিপ, বাহুতে বাজু, হাতে চুড়ি, চওড়া কোমরবন্ধ, গলায় হার, পরনে পলাশরং শাড়ি, চকমকে ব্লাউজ – যেন স্বর্গীয় অপ্সরাদের ভূষণে ভূষিত হতে চায় এরা। যদিও এদের পান খাওয়া রক্তিম ঠোঁটের উল্লেখ পাই, আমি তা দেখিনি ; শুনেছি সিন্ধুবালা দেবীর মুখে পান লেগেই থাকত গীত-স্বর্ণযুগের প্রতিমা, ধনঞ্জয়ের মতো। কথায় আছে, ‘মুখে পান হাতে চুন / তবে জানবি মানভূম’। সেই অর্থে সিন্ধুবালাকে খাঁটি মানভুঁঞা বলা হত। যাই হোক, এহেন পোশাকি বাহার যতটা না নাচের প্রয়োজনে ততোধিক পুরুষ শ্রোতৃমণ্ডলীর মনোরঞ্জনের তাগিদে বলেই মনে হয়। তবে আমার দেখা সরস্বতী সিং পাতরকেই যা সাজতে দেখেছি, অন্য দু’জনকে তেমনভাবে নয়। অবশ্য আমরা হঠাৎ হাজির হয়ে ঘরোয়া পরিবেশে নাচ দেখেছি বলেই হয়তো সে সুযোগ তারা পাননি।
ছোঁকছোঁক করা নানাবিধ সুযোগসন্ধানী শহুরে উৎসুকজনের ব্যক্তিক কাজের স্বার্থে তথা সূত্রে যতই নাচনি পরিচিত আপাতঢঙে বিস্তৃতি পাক না কেন, তাদের অন্দর কথা জানলে এটা পরিষ্কার হয় যে সমাজার্থিক স্তরে তারা যে তিমিরে ছিল এখনও সেখানেই আছে। নৃত্যকলাকে পুরাকালে যেমন স্বচ্ছ দৃষ্টিতে দেখা হত না, ঠিক নার্সিং-ক্ষেত্রে চাকরির মতো, তেমনই সমাজের প্রান্তিক অবস্থান থেকে আসা এই নাচনি সম্প্রদায়কে মানুষ উপভোগ করলেও কখনওই অনুভবী দৃষ্টিতে দেখেনি। প্রাপ্ত অপাঙ্গ দৃকপাতই ছিল তাদের অদৃষ্ট লিখন। এ কারণেই হয়তো সরস্বতীর তিন কন্যার একজনও এ পথে নামেনি। যাই হোক, সমাজের নিম্নবর্গীয় সম্প্রদায় অর্থাৎ কামার, কুমোর, হাড়ি, তাঁতি, বাগদি, ভূমিজ, সর্দার, কুর্মি, মাহাত, সাঁওতাল প্রভৃতির মাঝ থেকেই নাচনিরা উঠে এসেছে। হিন্দু উচ্চবর্ণ বা উচ্চবিত্ত, মুসলমান বা খ্রিস্টিয় সম্প্রদায়ের মধ্য থেকে উঠে আসা নাচনি বিরলদৃষ্ট। সুতরাং বোঝা যাচ্ছে এভাবে নাচনি হওয়ার পেছনে দারিদ্র্য তথা প্রথাগত শিক্ষার সুযোগহীনতা এক গুরুত্বপূর্ণ কারণ। অবশ্য এই পেটের দায়ের বাইরেও যে গুরুতর ইতিবাচক কারণ তা হল নাচ ও গানের প্রতি তাদের স্বতঃস্ফূর্ত আকর্ষণ। বিমলা দেবী বা সরস্বতী সিংকে দেখে আমার সেটাই মনে হয়েছে।
এবার এই নাচনিদের সঙ্গে ওতপ্রোত জড়িত রসিকদের সম্পর্কে দু কথা বলতেই হয়। দীর্ঘদিন আগে কথাকার সুব্রত মুখোপাধ্যায়ের ‘রসিক’ উপন্যাসটি ধারাবাহিক পড়েছিলাম। সেখানে সম্ভবত জমিদার শ্রেণির রসিকদের কীর্তিকলাপের আকর্ষক কাহিনিই বর্ণিত হয়েছিল। পরবর্তীতে জমিদারি বিলুপ্ত হলে রসিকরাও উঠে আসে নাচনিদের মতোই নিম্নবর্গীয় অবস্থান থেকে। একমাত্র একটি নামই পেয়েছি রসিক হিসাবে যিনি উচ্চবর্ণজাত। তিনি সরস্বতী সিং পাতরের রসিক হৃষীকেশ মুখার্জি। এই স্বল্পভাষী সুভদ্র মানুষটির সান্নিধ্যলাভ করে তার গানও শুনেছি। এর বাইরে কোনও উচ্চবর্ণীয় রসিকের সন্ধান কেউ দিলে উপকৃত হই। যাই হোক, কানু বিনে যেমন গীত নেই, রসিক বিনেও নাচনি পরিচয় পূর্ণতা পায় না। নাচনিদের ভালোমন্দ, সুখ – দুঃখ, বিষণ্ণতা, নিরাপত্তা সবই আবর্তিত হয় স্ব স্ব রসিককে ঘিরে। অতীতের মধুলোভী রসিকদের কথা মাথায় রেখেও বলতে হয় এখনকার রসিকেরা দায়িত্ববান সংসারী তথা বিনম্র শিল্পী, যাঁরা না থাকলে নাচনি শিল্পকলাটিই হয়তো অবলুপ্ত হয়ে যেত। নিমাই ভট্টাচার্যের ‘নাচনি’ উপন্যাসেও নাচনিদের হেলাফেলাপূর্ণ অসহায়তার পরিচয় পাওয়া যায়। তবে তথ্য বলছে, বেশির ভাগ নৃত্যাকাঙ্ক্ষী মেয়েরাই নাচনি হয়েছে রসিকের আকর্ষণে। সেই রসিকের হয়তো বিবাহিত বউ আছে, আছে সন্তানসন্ততি। তেমন পরিবারের মূল সদস্য হিসাবে নাচনির স্থান নেই। আলাদাভাবে প্রায় অচ্ছুৎ হিসাবে তাকে থাকতে হয়েছে।
এ হল অতীত যুগের কথা, যখন নাকি নাচনিদেরও নানাবিধ গ্রামীণ মেলার মাঠে ‘ওড়ানো’ হত। যে প্রথম তাকে বাগে পেত তার ভোগেই লাগত সে। আবার এমন তথ্যও পাওয়া যায়, কোনও নাচনির মৃত্যু হলে তার পায়ে রশি বেঁধে তাকে শেয়াল শকুনের খাদ্য হিসাবে দূরস্থানে ফেলে আসা হত। মনে পড়ে যায় প্রেমচাঁদের উপন্যাস তথা সত্যজিৎ রায়ের নির্মিত চলচ্চিত্র ‘সদগতি’-র সেই গা রি রি করা দৃশ্য। এখন অবশ্য নাচনিরা এ হেন ভয়ংকর অবস্থানে নেই। সামাজিকভাবে বিবাহ তথা সৎকারের স্বীকৃতি তারা লাভ করেছে। যাই হোক, নাচনির কাছে তার রসিক হচ্ছে নোঙরের মতো। তাঁকে আশ্রয় করেই তার শিল্পযাত্রা। তার বেঁচে থাকা। তাই তাদের বলতে শোনা যায়, ‘রসিক বিনা দুনিয়া আন্ধার হেঁ’।
এবারে যে চারজন নাচনির কথা বলে এই নিবন্ধে ইতি টানব তারা হলেন সিন্ধুবালা দেবী, বিমলা দেবী, সরস্বতী সিং পাতর ও জ্যোৎস্নাবালা। আসলে এঁদের নামের সঙ্গে ‘দেবী’ যুক্ত হয় তখনই যখন তারা তাদের শিল্পীসত্তার পূর্ণ বিকাশ ঘটিয়ে নাচনি হিসাবে সসম্মানে গুণীমহলে নৃত্য প্রদর্শনের আমন্ত্রণ পান। যাহোক, প্রথমজন ব্যতিরেকে বাকি তিনজনের সঙ্গে আমার সাক্ষাৎ পরিচয় ঘটেছে আর তাদের গ্রামীণ বাসস্থানেও আমরা সশরীরে হাজির হয়েছি। একমাত্র সরস্বতী সিং পাতরই বর্তমানে পুরুলিয়া শহরের ধোবাঘাটা এলাকায় থাকেন যে অঞ্চল খুব একটা স্বাস্থ্যকর মনে হয়নি।
রঘুনন্দন কুমারের আবক্ষ মূর্তি
সিন্ধুবালা দেবীকে স্বচক্ষে দেখিনি। কেননা তিনি প্রয়াত হয়েছেন ২০০৪ সালে আর আমরা এই বিশেষ উদ্দেশ্যে পুরুলিয়া যাই ২০১৭তে। তবে পুরুলিয়ার কেন্দা থানার কেঁদরি গ্রামে তাঁর বাড়ি যাওয়া প্রধানত দুটি কারণে। প্রথমত, নাচনি বিষয়ে সুবেদী ঔৎসুক্য নিয়ে পুরুলিয়া গিয়ে নাচনি নাচের অবিসংবাদী ধারয়িত্রী সিন্ধুবালার বাড়ি যাওয়া হবে না তা ছিল আমাদের অনভিপ্রেত। দ্বিতীয়ত, জ্যোৎস্নাবালা সিন্ধুবালার সঙ্গে আত্মীয়তায় গ্রথিত। সে সূত্রও জোরাল। নাচনি জগতে দীর্ঘ অভিজ্ঞতাপুষ্ট সিন্ধুবালা যে শুধু সুকণ্ঠী কিংবা যথার্থ নৃত্যকলার অধিকারিণী ছিলেন তাই নয়, তিনি ছিলেন বিপজ্জনকভাবে সুন্দরী। তাঁকে তর্কাতীত ঢঙে ‘ছোটোনাগপুরের বুলবুল’ অভিধায় আখ্যাত করা হত। গবেষক জলধর কর্মকার প্রদত্ত তথ্যানুসারে সিন্ধুবালা জন্মেছিলেন স্বাধীনতা সংগ্রামের অগ্নিপাট সময়ে ১৯১২ সালে, বান্দোয়ানের মাখলা গ্রামের এক দরিদ্র কৃষক পরিবারে। সেই হিসাবে তিনি নবতি-অতিক্রান্ত এক বিদূষী নাচনি ছিলেন। বালিকাবেলায় মা-বাবাকে হারিয়ে বান্দোয়ানে মামাবাড়ির আশ্রয়ে চলে যান। ছোটো থেকেই নাচগানের প্রতি তাঁর অমোঘ আকর্ষণ। কিন্তু নড়বড়ে আশ্রয়ে থাকা কাল-সৌন্দর্য তাঁকে বিপদগ্রস্ত করল। লছিমপুরের জমিদার শশী সিং সর্দার তাঁকে তুলে নিয়ে গেল। সেখান থেকে পালিয়ে মাসকয়েক থাকতে হল কালি সর্দারের হেফাজতে। এমন সময় কেঁদরি গ্রামের সু-রসিক মহেশ্বর বা স্থানিক নাম-ডাকে চেপু মাহাত তাঁকে উদ্ধার করে নিয়ে আসেন এবং স্ত্রী-রূপ মর্যাদায় রক্ষণাবেক্ষণ করেন জীবনভর। সিন্ধুবালা তখন বয়ঃসন্ধির পরিসীমায়। এই মহেশ্বরের কাছেই সিন্ধুবালার ঝুমুর নাচের প্রথম পাঠ। এরপর থেকেই ‘চেপুর নাচনি’ হিসাবে তাঁর নামডাক ছড়িয়ে পড়তে থাকে দিগ্বিদিক। সিন্ধুবালা অবশ্য নিজেকে ‘নাচনি’ বলতে পছন্দ করতেন না। ঝুমুর-শিল্পী হিসাবেই স্ব-পরিচয়ে গর্ববোধ করতেন। মূলত তিনিই দরবারি তথা বাই-নাচের অগ্রণী রূপে চিহ্নিত হয়ে থাকেন। এ হেন সিন্ধুবালাকে কাশীপুর রাজসভায় একাধিকবার নিয়ে যাওয়া হয়েছিল। পঞ্চকোটরাজ তাঁর সুললিত নাচ গানে মুগ্ধতাস্বরূপ পুরস্কৃতও করেছিলেন যথেষ্ট। তিনি নানাবিধ পুরস্কারে ভূষিত। ১৯৮৯ সালে রবীন্দ্রভারতী বিশ্ববিদ্যালয় তাঁকে সম্মান প্রদর্শন করে। এরপর ১৯৯৪ সালে পশ্চিমবঙ্গ সরকার প্রদত্ত লালন পুরস্কার তাঁকে বিশাল প্রেক্ষাপটে স্থাপন করে যদিও ‘নাচনি’ সম্প্রদায়ের কাউকে এই পুরস্কার দেওয়া নিয়ে বিতর্কের শেষ ছিল না। তবুও শেষ পর্যন্ত তিনি তার অধিকারিণী হয়েছিলেন স্ব-যোগ্যতাবলে। এখানে উল্লেখ্য, দীর্ঘদিন পর আর এক জনপ্রিয় নাচনি পোস্তুবালা দেবী ২০১৮তে লোকসংস্কৃতি জগতের এই বিরল সম্মান লাভ করেন। তাকে নিয়েও নাগরিক অবমাননাকর ঝঞ্ঝাট কম হয়নি। যাই হোক, সিন্ধুবালাকে যখন এই পুরস্কার দেওয়া হয়েছিল তখন তার অর্থমূল্য ছিল পঁচিশ হাজার টাকা। এখন তা বেড়ে এক লক্ষ টাকা হয়েছে। যদিও অর্থমূল্যে এই সম্মান তথা কোনও সম্মানই বিচার্য নয়, তবুও এর মূল্য অনস্বীকার্য। কেননা সিন্ধুবালার বাড়ি গিয়ে যেটুকু বুঝেছি তাঁর উত্তরসূরিদের অবস্থা মোটেও অনটনক্লিষ্ট নয়। জোতজমিও কিছু আছে, বাড়িঘর মন্দ নয়। প্রবেশদ্বারে সিন্ধুবালার নামাঙ্কিত লৌহতোরণ তাঁর সুকৃতিরই প্রতিফলন হিসাবে প্রতিফলিত।
বিমলা দেবী ও পুত্র অমিত কুমার
এবারে আসি বিমলাদেবীর কথায়। যাকে দেখে বারংবার মনে হয়েছে দারিদ্র, উপেক্ষা তাঁর অমলিন শিল্পীসত্তাকে এতটুকু কাহিল করতে পারেনি। ভণিতাহীন অকপট এই মানবী তাঁর উচক্কা নৃত্যগীতের সরল সাবলীল পশরা সাজিয়ে আমাদের ভরিয়ে দিয়েছিলেন প্রাতিস্বিক মুগ্ধতায়। ঝুমুর তথা নাচনি নাচকে কেন্দ্র করে তাঁর একাগ্র ধ্যান আমাদের শুধু বিহ্বলই করেনি, অবাকও করেছিল অপরিসীম। তাঁর গানেই তাঁর কষ্টের পরিচয় নিহিত। যেমন তিনি গেয়ে ওঠেন : ‘কত আসে কত যায় / কত দিন কত মাস / কত ভাবি কত কাঁদি /…তবু সাড়া পাই না তোমার / বলি ও হরি বড়োই দুর্ভাগ্য আমার / আমার না হইল আশার সুংসার…’। এমনই দুর্ভাগ্য, দুঃস্থতাকে সম্বল করে মুখভরা হাসির আড়ালে আমাদের আপ্যায়ন করেছিলেন বিমলাদেবী ও তাঁর পরিবারের সদস্যগণ, পুরুলিয়ার আড়শা থানার সটরা গ্রামের একচিলতে গুমটি ঘরে। সেই গ্রামেরই কুমার সম্প্রদায়ের মাথা গৌরচন্দ্র কুমার ছিলেন বিমলাদেবীর রসিক তথা ওস্তাদ। আর ওই গ্রামেরই রঘুনন্দন কুমার তাঁর নৃত্যগুরু। এই রঘুনন্দনের একটি ভগ্নপ্রায় আবক্ষ মূর্তি আছে বিমলাদির বাড়িসংলগ্ন স্থানে যে মূর্তিকে তিনি প্রত্যহ পুজো করেন। একটি তথ্য বলছে বিমলাদেবীর সন্তান অমিত কুমার এই রঘুনন্দনেরই ঔরসজাত। দীর্ঘকাল নাচের জগতে থেকেও তেমন কোনও সচ্ছলতা তাঁর জুটেছে বলে মনে হয়নি। শুধু এক-দুটি পুরস্কারপ্রাপ্তি ছাড়া; যেমন ২০১২ সালে ‘মানভূম লোকসংস্কৃতি উৎসব’ সংস্থার দেওয়া সম্মান বা ২০১৭তে জি বাংলার দিদি নং -১ স্মারক। কিন্তু এতে তো আর সংবৎসরের অন্নসংস্থান হয় না। তাই নাচের ডাক না থাকলে তাঁকে মাঠঘাটের কাজও করতে হয়েছে। একদা সিন্ধুবালা দেবীর এই ছাত্রীর শারীরিক বয়সে এখন ভাটার টান। টানটান অভাবের জোয়াল তাঁকে চেপে মারতে পারেনি, অন্তত তাঁর সদাহাস্যময় চেহারায় তা ধরা পড়েনি। খরশান আত্মনিবেদন তাঁর পথচলার পাথেয়। তাঁর বাস্তবতাময় হাস্যরস দেখে মনে হয় যেন পাহাড়ের উচ্চতা থেকে পাষাণহৃদয়ে আছড়ে পড়ছে ঝর্নার বিমল ধারা আর তা যেন কঠিন জীবনেরই পথে ছড়িয়ে পড়ছে অপার নেতিকে উপেক্ষা করে। এমনই মনে হয় যখন তিনি অবলীলায় বলে ওঠেন, ‘সঞ্চয় তঞ্চয় হামাদের বাবু কিছু নাঞ। খালি পেটে খাছি। আনন্দ ফুর্তি যখন করি তখন খাই। যখন নাই, তখন নাই। ভবিষ্যতের কথা ভাইবে হবেক কী? আসর কইরবার সুমায়ে হয়তো যা দিল – তা সেটায় খানা আছে, দানা আছে, গাঁজা আছে, মদ-মুরগা আছে, ইসোব কমালে তো দলে আর কাউকে পাওয়া যাবেক নাঞ’। জীবনে কষ্টের অবসান হল না অথচ এ পথে কেন এলেন? – এ প্রশ্নের সটান উত্তর তাঁর – ‘সুর যখন ভেদে তখন বাবা মার কথা কে শুনে? সুর গেলে, ভাব কাটাইলে পরে বুইঝতে পারি। তখন আর করহার কিছুই নাই। ভাইবেই হবেক কী?’ বিমলাদেবীর আখ্যান শেষ করি তাঁর প্রতি শশধর মাহাতর শ্রদ্ধাঞ্জলি দিয়ে। নাচনি বিমলার প্রতি অপার মুগ্ধতায় তিনি লিখেছিলেন :
‘অতি সুমধুর সুরসুধা অকুণ্ঠ করেছ দান।
তৃপ্ত ব্যাকুল শ্রোতাকুল আকণ্ঠ করেছে পান।।
সুরেলা বিমলা অচঞ্চলা নৃত্যশিল্পে শ্রেষ্ঠা।
সুমিষ্ট কণ্ঠে মুগ্ধ সুজন হাজার কেষ্টা-বিষ্টা।।
বিমলা, তোমার নৃত্যকলা জেলায় বিকল্পহীন।
নৃত্যমহিমা সুরের গরিমা থাক চির অমলিন।।
ওগো বিমলা, হায় বিমলা! গাও বিলাপের সুরে।
অর্বাচীন কঠিনপ্রাণ সিক্ত হোক লহরে লহরে।।
কর্ম তোমার বর্ম স্বরূপ অমরতা দিক ঢালি।
ভক্তিসহ মুগ্ধচিত্তে মোদের আনত শ্রদ্ধাঞ্জলি”।।
হয়তো এ লেখায় পটুত্ব কম, কাব্যিক ত্রুটিতে ভরা; তবু্ও সশ্রদ্ধ আবেগের ঘাটতি নেই কোথাও। এভাবে আমরাও আনত হই নাচনি জগতের এই আশ্চর্যময়ীর প্রতি।
মহেশ্বর মাহাত ও সিন্ধুবালা দেবী
সরস্বতী সিং পাতর অর্থাৎ আমাদের সরস্বতীদিকেই প্রথম দেখি নাচনির সন্ধানে গিয়ে। প্রখর গ্রৈষ্মিক দিনে সেজেগুজে দীর্ঘক্ষণ অপেক্ষারত ছিলেন তিনি নৃত্যানুষ্ঠান শুরুর আগে। অপেক্ষা, বাজনদারের। অপেক্ষা, মাটি কাঁপিয়ে জ্বলে ওঠার। জবরজং পোশাকে মুখমণ্ডলে প্রয়োজনীয় রংচং মেখে এই কষ্টকর অপেক্ষার মধ্যেই ফুটে উঠছিল তাঁর শৈল্পিক দাপট যা জীবনভর প্রতিকূলতাকে হেলায় পদানত করতে শেখায়, শিখিয়েছে নাচনি সরস্বতী দেবীকে যিনি সদর্পে বলেন যে তাঁর বোঝাপড়ার শর্ত তিনি নিজেই ঠিক করেছেন। তাইতো সাত বছর বয়সে ঘর ছেড়ে বাই নাচে মন দেন চাণ্ডিলের রঘু সিং সর্দারের এই বেপরোয়া কন্যা। গ্রামীণ যাত্রা দেখে ঝুমুরের প্রতি আকৃষ্ট হন তিনি। প্রাথমিক পর্যায়ে থেপু সিং-এর কাছে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত সরস্বতী যাত্রায় অভিনয়কালে পরিচিত হন হৃষীকেশ মুখার্জীর সঙ্গে যা পরবর্তীতে পরিণয়ে রূপ পায়। একসঙ্গে দীর্ঘকাল বসবাসকারী এই হৃষীকেশই সরস্বতীর রসিক তথা শিক্ষাগুরু। অবশ্য হৃষীকেশের আলাদা সংসারও আছে বলে শোনা যায়। রসিকদের ক্ষেত্রে এই দ্বিবিধ সম্পর্ক নতুন কিছু নয়। যাই হোক, সরস্বতীর তিন কন্যা। সবাই বিবাহিত। একজন প্রয়াতও বটে। মেয়েরা কিন্তু এ পথে আসেনি। অভিজ্ঞ মা -ই হয়তো আসতে দেয়নি। পূর্বতন বাঘমুণ্ডির জঠাডি (বধাডি?) গ্রামের বাস ছেড়ে এখন তিনি পুরুলিয়া শহরের ধোবাঘাটায় থাকেন যার কথা আগেই বলেছি। এই মধ্যবয়স্কা নাচনিকে আমরা গৃহছাদের নিচে যেমন নাচতে দেখেছি, তেমনই বিকেলের মরা আলোয় প্রকৃতির আঙিনাতেও তিনি গীতবাদ্য সহযোগে নৃত্য প্রদর্শন করেছেন ; আবার এক সময় হঠাৎ করে তবলাতেও তাঁর দক্ষতা দেখিয়ে দিয়ে যেন ইঙ্গিত করেছেন, দেখো, আমরা নাচনিরা সবই পারি। তবে দুঃখ তথা লজ্জার বিষয়, এমন দুর্দশাপীড়িত নাচনিকেও তাঁর প্রাপ্য অর্থ-সাম্মানিক থেকে বঞ্চিত হতে হয়েছিল শিক্ষার আলোকপ্রাপ্ত জনৈক মাহাতোর খপ্পরে পড়ে। আসলে শোষিতও কখনও কখনও তো শোষকের গিরগিটিরূপ ধারণ করে! এ তারই বিষময় ফল। তবু্ও সরস্বতীরা তাঁদের সাধনার সঙ্গে সহবাস করেন। বিচ্ছেদ তাঁদের ধর্ম নয়।
সিন্ধুবালা দেবীর বাড়ির প্রবেশদ্বারের তাঁর নামাঙ্কিত লৌহতোরণ
আলোচনার শেষ পর্যায়ে যাকে নিয়ে বলব তিনি জ্যোৎস্নাবালা বা জ্যোৎস্নাদেবী। এই সর্বকনিষ্ঠ জ্যোৎস্নাই সিন্ধুবালার নাতনি বা নাতবউ ( আমরা ঠিক নিশ্চিত হতে পারিনি)। যাই হোক, জ্যোৎস্নাবালার রসিক তথা বর্তমান স্বামী বিকাশ মাহাত যদি সিন্ধুবালার নাতি হয় তবে অবশ্যই জ্যোৎস্না সিন্ধুবালার নাতবউ হবেন। শোনা যায়, একবার বান্দোয়ানের গ্রামের বাড়িতে বিকাশ ও তার দলবল গানবাজনা করতে গিয়ে যুবতি জ্যোৎস্নাকে একরকম তুলেই নিয়ে আসে। পরে সিন্ধুবালা তাকে আশ্রয় ও নাচগানে তালিম দেন। বর্তমানে জ্যোৎস্না স্বামী, পুত্র সংসার নিয়ে সিন্ধুবালার কেঁদরির বাড়িতেই থাকেন যার প্রসঙ্গে আগেই উল্লেখ করেছি। এখানে থেকেই তার চর্চা আর নানান জায়গায় অনুষ্ঠান করতে যাওয়া। তবে জ্যোৎস্নাবালার নাচগানে খানিক চটুলতা লক্ষ করেছি যা দরবারি গাম্ভীর্যের সঙ্গে ঠিক খাপ খায় না বলেই আমার বিশ্বাস। এমনকি আমি জ্যোৎস্নাকে ‘সাধের লাউ’ জাতীয় গানও গাইতে শুনেছি। সঙ্গে খ্যামটা ঢঙে নাচ। হয়তো সময়ের দাবি মেটাতেই তিনি এমনটা করে থাকেন। কিন্তু তাতে ঐতিহ্যের গায়ে যে দাগ লাগে তার তো মোচন হবার নয়। তবে অন্যান্যদের চাইতে জ্যোৎস্নাবালা অনেকটাই সচ্ছল অবস্থায় আছেন বলেই মনে হল ; যদিও ফিরে আসার সময় তার চোখমুখে অদ্ভুত কিছু প্রশ্নের ছাপ দেখেছিলাম। অনুচ্চারিত সেই প্রকাশে কোনও গোপন কষ্টের ইশারা ছিল কি?! হয়তো বা।
ইদানীং একটা বিষয় লক্ষণীয়। টি ভি’র নানাবিধ বিনোদনমূলক রিয়েলিটি শো তথা পাড়ার অনুষ্ঠানমঞ্চে বাঁকুড়া, পুরুলিয়ার নানা জাতের লোকগান তাদের ভাষায় গেয়ে-নেচে পরিবেশনের একটা হিড়িক পড়ে গেছে এবং চটুল পাবলিক তা ‘খাচ্ছেও’ খুব। আমরা এভাবেই নকলনবিশি পথে একজাতীয় সাংস্কৃতিক মেলবন্ধন ঘটানোর জোরাল তথা হাস্যকর প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি। এতে করে নাগরিক গান সেলেবরা কামাইও মন্দ করছেন না। কিন্তু মূলত যাদের রক্তে মিশে আছে এই গান, তাদের বিন্দুমাত্র উন্নতি ঘটছে না। হচ্ছে না তাদের তিমিরবিনাশ। আমরা চতুর মধ্যবিত্ত বুদ্ধিজীবী। আমাদের আছে মেট্রোপলিটন মন। খুব চেনা অথচ অচেনা এক ফল্গুস্রোতের ঢঙে আমরা ভাঙিয়ে খাই ওদের ভূমিজ সংস্কৃতিকে। তাই হঠাৎ করেই বিখ্যাত হয়ে ওঠে ‘লালপাহাড়ির দ্যাশে যা’ জাতীয় গান। অথচ ওদের গান ওদের সামনে গাইলে ওরা অকপট শুনিয়ে দেয়, ‘উটো মুদের গান লয়গো বট্যে’। সরাসরি আঘাত হেনে বুঝিয়ে দেয় মাটির গান বুঝতে হলে আগে টাঁড় মাটিটাকে ভালো করে বুঝতে হয় – আর এই অমল প্রচেষ্টাই চালিয়ে যাচ্ছে কর্তুকাম কিছু হাতে গোনা সংস্থা। শেষত বলি, জানি না, আর কতদিন টিকে থাকবে এই নাচনি ঐতিহ্য; আদৌ থাকবে কি না, সে সংশয়ও কম নয়। তবে পুরুলিয়ার বুকে বসে এই লোক-সংস্কৃতিকে বাঁচিয়ে রাখতে বিশিষ্ট সাহিত্যিক তথা গবেষক সৈকত রক্ষিত তাঁদের বাৎসরিক ‘সৃজন উৎসব’-এর মাধ্যমে যে আয়োজন করে থাকেন তা একবাক্যে প্রশংসার্হ। শুধু একটি বিনীত অনুরোধ, চটুলতার বিষম দাবির কাছে মাথা না নুইয়ে চেষ্টা করুন শুধু লোকজ সঙ্গীত-সংস্কৃতিতেই সীমাবদ্ধ রাখতে এই বহু প্রশংসিত উৎসবটিকে। নইলে নবনীদাস বাউলের সেই সাঁওতালি ঝুমুর গানটির মতোই দশা হবে নাচনিদের যেখানে বলা হচ্ছে: কাঁচা হাঁড়িতে লো হাঁড়িতে, রাখিতে নারিলি প্রেমজল। ‘উপযুক্ত আধার বিনা সবই যে আঁধার হবে একদিন!’
ছবি – লেখক
তথ্যঋণ: জলধর কর্মকার ও শশধর মাহাত, পুরুলিয়া।
পার্থ দে (আমরা মনভাসি), কলকাতা।
