![]()
শিবপ্রিয়র কলাম : পর্ব ২
“গানই সর্বশ্রেষ্ঠ সাধনা, লাগে না ফুল-চন্দন, মন্ত্র-তন্ত্র লাগে না” – সাধক কবি ভবা পাগলার এই গান, বিশ্ব সংগীত জগতে সংগীতকে মুক্তির দিশারী হিসাবে প্রতিষ্ঠা করার একটি উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত বলা যেতে পারে। এর ছত্রেছত্রে মুক্তির উদ্ভাস প্রকট।
গান- সংকট থেকে মুক্তির অন্যতম উপায় হিসাবে কাজ করতে পারে, তা অস্বীকার করার উপায় নেই। গান মানুষের আত্মার ভাষাকে প্রকাশ করতে পারে। দেশ-বিদেশের সংগীত স্রষ্টাদের অসংখ্য গান এই প্রসঙ্গে আলোচনায় আসতে পারে। রবীন্দ্রনাথ, নজরুল, রজনীকান্ত সেন, অতুলপ্রসাদ সেন, মোহিনী চৌধুরী, কমল দাশগুপ্ত, পরবর্তী সময়ে সলিল চৌধুরী, হেমাঙ্গ বিশ্বাস। সমসাময়িক ও পরবর্তীকালে গুলজার, শচিনদেব বর্মন, রাহুলদেব বর্মন, বাংলার অখিলবন্ধু ঘোষ, জটিলেশ্বর মুখোপাধ্যায়ের মতো সংগীত স্রষ্টাদের নাম প্রাতঃস্মরণীয়। এই প্রসঙ্গে বাখ, মোৎজার্ট, বেঠোফেন, পণ্ডিত রবিশঙ্কর, আলি আকবর, আমজাদ আলি, হরিপ্রসাদ চৌরাসিয়া, রাকেশ চৌরাসিয়া, শিবকুমার শর্মার নাম অবশ্যই উল্লেখযোগ্য। পৃথিবী জুড়ে এঁদের সৃষ্টি মুক্তির দিশারী হয়েছে, হয়ে আসছে, হতে থাকবে।
ইতিহাস বলছে যে, সংগীত অনেক সামাজিক ও রাজনৈতিক আন্দোলনের অনুপ্রেরণা হয়ে উঠেছে। দাসপ্রথার বিরুদ্ধে ব্লুজ, যুদ্ধবিরোধী আন্দোলনে রক, পপ মিউজিক, স্বাধীনতা সংগ্রামে দেশাত্মবোধক গান—এসবই সংগীতের শক্তি, ব্যক্তি ও সমাজের মুক্তির প্রমাণ।
যুগে যুগে সংগীত শুধু বিনোদনের মাধ্যমই নয়, বরং মানুষের স্বাধীন চেতনার, আত্মার গভীর অনুভূতি, বিরহ, প্রেম এমনকি সমাজ পরিবর্তনের প্রতীক হয়ে উঠেছে। সংগীতের শক্তি এমনই। নজরুলের “কারার ওই লৌহ কপাট”, রবীন্দ্রনাথের ‘যদি তোর ডাক শুনে কেউ না আসে’, ‘কে বসিলে আজি, হৃদয়াসনে’, সলিল চৌধুরীর ‘ও আলোর পথযাত্রী’ গানগুলো স্মরণীয়।
বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে, গান শুনলে মস্তিষ্কে ডোপামিনের নিঃসরণ বেড়ে যায়, যা মনকে শান্ত করে। শাস্ত্রীয় সংগীতের রাগ, সুফি সংগীতের দার্শনিক ভাবনা বা লোকসংগীতের সহজ সরল সুর—সবকিছুই মানুষের আত্মার মুক্তির দরজা খুলে দেয়। এখানে মিউজিক থেরাপি প্রসঙ্গে আলোচনা প্রয়োজন। পৃথিবীর বিভিন্ন সংস্কৃতিতেই সুর ও সংগীত আমাদের জীবনের সঙ্গে ওতপ্রোত ভাবে জড়িয়ে রয়েছে, সেই প্রাচীন কাল থেকেই এই ধারা চলে আসছে। শিশুর জন্মগ্রহণ থেকে শুরু করে বিবাহ অনুষ্ঠানে বা যেকোনও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানেই মানুষ গান বাজনার আয়োজন করে থাকে বহু প্রাচীনকাল থেকে। সুস্থতা ও স্বাস্থ্য রক্ষার ক্ষেত্রেও সংগীত রোগীর শুশ্রূষা করার অন্যতম মাধ্যম হিসাবে কার্যকর ভূমিকা পালন করে আসছে বহুদিন থেকেই।
আরও পড়ুন: সংগীতের উৎপত্তি ধ্রুপদ না শ্রম থেকে?
সংগীত চিকিৎসা বা মিউজিক থেরাপির মাধ্যমে মানুষের মানসিক চাহিদা পূরণ করা যায়, সেটা প্রমাণিত। একজন সংগীত চিকিৎসক রোগীর মনস্তাত্ত্বিক এবং সামাজিক চাহিদা ও অবস্থান অনুযায়ী সংগীতের মাধ্যমে তাঁর চিকিৎসা করে থাকেন। এই জন্য রোগীর সামনে গান গাওয়া, বাদ্যযন্ত্র বাজানো, তাঁকে গান শোনানো বা গান লেখা ইত্যাদি অবলম্বন করা যেতে পারে। মিউজিক থেরাপি একজন রোগীর মোটর স্কিল উন্নত করে। বিশেষ করে শিশুদের ক্ষেত্রে এই বিষয়টি বেশি মাত্রায় কার্যকর। শিশু-সহ বিভিন্ন বয়সের রোগীদের ক্ষেত্রে তাঁদের যোগাযোগ ব্যবস্থার একটি নতুন পথ দেখানো সম্ভব হয় – বিশেষ করে তাঁদের ক্ষেত্রে, যাঁরা নিজেদের অনুভূতি প্রকাশ করতে বা ব্যক্ত করতে পারেন না। গান শোনা বা তৈরি করার ফলে, মস্তিষ্কে একটি প্রভাব পড়ে যা আমাদের জ্ঞান, অনুভূতি বা শারীরিক কর্মক্ষমতা বাড়াতে সাহায্য করে। কাজেই সংগীত চিকিৎসা বা মিউজিক থেরাপি মনের মুক্তির সহায়ক হয়, হতে পারে।
ইতিহাস বলছে যে, সংগীত অনেক সামাজিক ও রাজনৈতিক আন্দোলনের অনুপ্রেরণা হয়ে উঠেছে। দাসপ্রথার বিরুদ্ধে ব্লুজ, যুদ্ধবিরোধী আন্দোলনে রক, পপ মিউজিক, স্বাধীনতা সংগ্রামে দেশাত্মবোধক গান—এসবই সংগীতের শক্তি, ব্যক্তি ও সমাজের মুক্তির প্রমাণ। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের সময় ‘আমার সোনার বাংলা আমি তোমায় ভালোবাসি’ গানটি মুক্তিযোদ্ধাদের অনুপ্রেরণা জুগিয়েছে, তেমনি গণসংগীত সমাজ পরিবর্তনের বার্তা বহন করেছে। হেমাঙ্গ বিশ্বাসের ‘শঙ্খচিলের গান’ মানুষের যুদ্ধ বিরোধী চেতনার উন্মেষ ঘটায়। সলিল চৌধুরীর ‘ঢেউ উঠছে, কারা টুটছে, আলো ফুটছে, প্রাণ জাগছে’ গানটি মানুষের মধ্যে বৈপ্লবিক চেতনা জাগ্রত করে। মোহিনী চৌধুরীর ‘মুক্তির মন্দির সোপান তলে, কত প্রাণ হল বলিদান’ গানগুলো আজও স্মরণীয়, প্রাসঙ্গিক।
বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে, গান শুনলে মস্তিষ্কে ডোপামিনের নিঃসরণ বেড়ে যায়, যা মনকে শান্ত করে। শাস্ত্রীয় সংগীতের রাগ, সুফি সংগীতের দার্শনিক ভাবনা বা লোকসংগীতের সহজ সরল সুর—সবকিছুই মানুষের আত্মার মুক্তির দরজা খুলে দেয়।
সংগীত কেবল সামাজিক বা রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটেই আটকে থাকে না, ব্যক্তিগত চিন্তা-চেতনায় মুক্তির রসদ হয়ে ওঠে। ব্যক্তিগত জীবনেও মুক্তির এক গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হিসাবে কাজ করে সংগীত। সংগীতচর্চা বা শোনা এক ধরনের ধ্যান হিসাবে কাজ করে, যা মানুষের দুশ্চিন্তা, অবসাদ ও একাকিত্ব দূর করতে সহায়তা করে। রবীন্দ্রনাথের ‘যদি প্রেম দিলে না প্রাণে’, ‘মহারাজ এ কি সাজে এলে হৃদয়পুর মাঝে’-সহ অসংখ্য গান উদাহরণ হিসাবে উল্লেখ করা যেতে পারে, যা মানুষের অবসাদ মুক্তিতে সহায়ক। কাজী নজরুল ইসলামের ‘কারার ঐ লৌহকপাট’ মানুষকে দেশাত্মবোধে উদ্বুদ্ধ করে, আবার তাঁরই ‘বধূ তোমার আমার এই যে বিরহ’ গানটি বিরহ ক্লিষ্ট মনে শান্তির বার্তা এনে দেয়। তাই এগুলো নিছক গান নয়, বরং মানুষের মুক্তির আকাঙ্ক্ষা পরিতৃপ্তির হাতিয়ার বলা যেতে পারে। ধ্রুপদী যন্ত্র সরদ, সেতার, এস্রাজ, বাঁশির মতো বাদ্যযন্ত্রে ইমন, বেহাগ, বসন্ত, মালকোষ, টোরি, দুর্গা, সোহিনী-সহ অসংখ্য রাগ মানবমনে তৃপ্তি ও মুক্তির সহায়ক হতে পারে।
তাই বলা যায়, সংগীত শুধু বিনোদনের মাধ্যমই নয়, বরং মানুষের ব্যক্তিগত আবেগ প্রকাশের, চেতনা-বোধ জাগ্রত করার, বিষাদ কাটিয়ে ওঠার একটি শক্তিশালী মাধ্যম বা উপায়। সংগীত আত্মার মুক্তি, সমাজ পরিবর্তনের অনুপ্রেরণা এবং সংগ্রামের মশাল। তাই সংগীতের শক্তিকে কেবল শিল্পের মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে, এটিকে এক বৃহত্তর মুক্তির মাধ্যম হিসেবে দেখাই শ্রেয়।
বঙ্গদর্শন.কম-এ শুরু হয়েছে সাংবাদিক শিবপ্রিয় দাশগুপ্তের কলাম। প্রকাশিত হচ্ছে প্রতি বুধবার।