
মুসলিম হওয়ার ‘অপরাধে’ সংস্কৃতে এমএ করতে দেওয়া হয়নি তাঁকে
সিটি কলেজ থেকে সংস্কৃত নিয়ে সদ্য স্নাতক হয়েছেন তিনি। ইচ্ছা, আরো পড়ার। মূলভাষায় বেদ অধ্যয়নের স্বপ্ন নিয়ে কলিকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের এমএ কোর্সে ভর্তি হয়েছেন তরুণ। কিন্তু, প্রথমেই বাদ সেধেছেন বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক, পণ্ডিত সত্যব্রত সামধ্যায়ী। সাফ জানিয়ে দিয়েছেন, তিনি এই ছাত্রকে পড়াবেন না। কারণ, ছাত্রের নাম মুহম্মদ শহীদুল্লাহ। একজন ‘মুসলমান’ পড়বে বেদ? এত বড়ো কথা! পন্ডিত সামধ্যায়ী হয়তো খেয়াল ছিল না, শহীদুল্লাহ সেই ছেলেবেলা থেকেই সংস্কৃত ভাষাটা আয়ত্ত করছেন। মৌলবী সাহেবের কাছে মার খাওয়ার ভয়ে ফার্সি ক্লাসে না বসে, গিয়ে বসতেন সংস্কৃত ক্লাসে। এমনকি সংস্কৃততে রীতিমতো কবিতাও লিখেছেন কিশোর বয়সে। কিন্তু কে শোনে কার কথা!
তবে হাল ছাড়লেন না শহীদুল্লাহ। ধরে বসলেন বিশ্ববিদ্যালয়ের তৎকালীন উপাচার্য আশুতোষ মুখোপাধ্যায়কে। আশুতোষ জানতেন, ‘ছোকরা’ সহজে দমার পাত্র না। তিনি তৎক্ষণাৎ অনুরোধ করলেন পণ্ডিত সত্যব্রতকে। গোঁড়া ব্রাহ্মণ পাল্টা হুমকি দিলেন, যদি মুসলমানকে বেদ পড়ানো হয়, তিনি কলেজ ছাড়বেন। এ নিয়ে শিক্ষিত আধুনিক সমাজে ঢি ঢি পড়ে গেল। সুরেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায় সম্পাদিত ‘দি বেঙ্গলি’ পত্রিকায় অধ্যাপককে ঘিরে কঠোর সমালোচনা বেরোলো। উল্টোদিকে নরম সুর ধরলেন শহীদুল্লাহর প্রাক্তন শিক্ষক, ভাষাবিদ হরিনাথ দে। তাঁর মতে, প্রতিহিংসাপরায়ণ শিক্ষকদের হাত থেকে বাঁচতে তাঁর সংস্কৃত না পড়াই ভালো। এতকিছুর পরেও অধ্যাপক সত্যব্রত তাঁর বিশ্বাসে অটল রইলেন। সুতরাং স্যার আশুতোষেরই হস্তক্ষেপে, প্রথম ছাত্র হিসেবে নতুন ‘তুলনামূলক ভাষাতত্ত্ব’ বিভাগে ভর্তি হলেন শহীদুল্লাহ।
ধর্মের গোঁড়ামির বিরুদ্ধে লড়তে হয়েছে প্রতিপদে। তাঁর বিরুদ্ধে কলম ধরেছেন দু’পক্ষের মৌলবাদীরাই। কারো মতে মুসলমানের বেশে হিন্দু তিনি, আর বাকিরা তাঁর ‘আপন আচরি’ বাদ দিয়ে পরধর্মের প্রতি আগ্রহ দেখে যারপরনাই খাপ্পা। আর হবে নাই বা কেন? চেনা ছকের বাইরেই তো বরাবর বিচরণ করছেন মানুষটি। শহীদুল্লাহ’র গবেষণা ‘কাহ্নপা ও সরহের মরমী গীত’ নিয়ে। ‘মদন-ভস্মে’র উপর ‘ভারতী’ পত্রিকায় প্রবন্ধ লিখছেন। আবার ১৯১৮ সালে ‘বঙ্গীয় মুসলমান সাহিত্য সমিতির’ অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা তো তিনিই। শোনা যায়, করাচিতে চাকরি খুইয়ে কাজী নজরুল ইসলাম এসে উঠেছিলেন এই সমিতির অফিসেই !
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে, হরপ্রসাদ শাস্ত্রীর আহ্বানে লেকচারার পদে যোগ দিয়েছিলেন ১৯২১ সালে। সেখানেই শহীদুল্লাহ কাটিয়েছেন জীবনের বহুলাংশ। জীবদ্দশায় প্রায় আঠেরোটা ভাষা শিখেছিলেন, জার্মান পণ্ডিতদের ধরে দিতেন ব্যাকরণ… সবই এখন কিংবদন্তি।
৪৭ সালে ভাগ হয়ে যায় ভারত। উর্দুকে অবিভক্ত পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা করার চেষ্টা অনেকদিন ধরেই চলছিল। দেশভাগের আগেই আলিগড় মুসলিম বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য ডক্টর জিয়াউদ্দিন আহমেদ, উর্দুর পক্ষে জোরালো সওয়াল করেন। এই মতের বিরুদ্ধে প্রথম স্বর শহীদুল্লাহর। তিনি লিখেছেন, “দেশে একটি মাত্র রাষ্ট্রভাষা হলে সে সম্মান বাংলার। দুটি রাষ্ট্রভাষা হলে বাংলার সঙ্গে উর্দুর কথা বিবেচনা করা যেতে পারে।” তৎকালীন পাকিস্তান সরকার রোমান আর আরবি হরফ চাপাতে চেয়েছিল বাংলা ভাষার উপর। শহীদুল্লাহ থেমে থাকেননি। ১৯৪৮ সালে পূর্ব পাকিস্তানে সাহিত্য সম্মেলনে তিনি বলেন, “আমরা হিন্দু বা মুসলমান একথা যেমন সত্য তার চেয়ে বেশি সত্য এই যে আমরা বাঙালি।”
মৌলবাদীদের রোষানলে পড়েও ভাষার প্রতি ভালোবাসা ছাড়তে পারেননি তিনি। একজন প্রকৃত গবেষকের তো আর জাত-ধর্ম হয় না।
তথ্যঋণ : আচার্য শহীদুল্লাহ এবং ধর্মনিরপেক্ষতার বিবেক: গৌতম রায়

