রাস্তার ভিড়ে ম্যাজিক দেখাচ্ছে মঁমার্তের তুলি-ক্যানভাস

প্রত্যেক শনিবার বিকেলে আকাদেমির সামনে জমে আড্ডা

প্রত্যেক শনিবার দুপুর থেকে একদল মানুষ এসে জড়ো হন আকাদেমি অফ ফাইন আর্টসের ঠিক সামনে। সন্ধের অন্ধকার নেমে এলেও বৈদ্যুতিক লন্ঠনে চলে আড্ডা। সঙ্গে ছবি আঁকা, গান, কবিতা, গল্পপাঠ, মূর্তি তৈরি – এক কথায় সৃজনের বহু প্রান্ত থেকে আসা নদী যেন মিশে যায় এখানে। খোলা রাস্তার পাশে রং-তুলি-ক্যানভাসে একের পর এক ম্যাজিকের জন্ম হতে থাকে। কেউ ইচ্ছে করলে অবিশ্বাস্য কম দামে সংগ্রহও করতে পারেন সেই সব ছবি। আড্ডা, ছবি আঁকা, গান-বাজনা মিলে সেটি আসলে একটি কর্মশালা। বলা যেতে পারে মুক্ত কর্মশালা। যে সব শিল্পীদের গ্যালারি ভাড়া করে প্রদর্শন চালানোর আর্থিক সংগতি নেই, তাঁরাও এখানে নিজেদের কাজ মেলে ধরতে পারেন রসজ্ঞ মানুষদের জন্য। আকাদেমি চত্বরে ওই সময়ে থাকে জমজমাট ভিড়। কেউ আসেন সিনেমা দেখতে, কেউ নাটক দেখতে, কেউ প্রদর্শনে – মোট কথা ওখানে সংস্কৃতিপ্রেমী মানুষের অভাব নেই। খোলা প্রদর্শন থেকে তাঁদেরই কেউ একজন কোনো ছবি কিংবা মূর্তি পছন্দ করে তখনই কিনে নিয়ে যেতে পারেন নিজের বাড়িতে।

এই যে প্রদর্শন আর কর্মশালার জমজমাট আসর – তার পোশাকি নাম ‘শনিবারের আড্ডা’। আয়োজনে কলকাতা মঁমার্ত। ফরাসি দেশের মঁমার্তকে বলা হয় শিল্পের পীঠস্থান। বিশ্ব সংস্কৃতির রাজধানী প্যারিসেরই একটি পাহাড়ি জেলা এটি – পিকাসো থেকে ভ্যান গঘ, অনেক মহান শিল্পীর পা এখানে পড়েছে। ১৯ শতকের শেষ এবং ২০ শতকের শুরুতে মঁমার্ত ছিল আঙুলের খেত আর হাওয়াকলে ঘেরা ছবির মতো সুন্দর একটা গ্রাম। মূল শহর থেকে একটু দূরের নিরিবিলি জায়গা, থাকা খাওয়াও বেশ সস্তা, তাই গরিব মেহনতি লোকেরা ফ্রান্সে শিল্পবিপ্লবের পর থেকে এখানে বাসা বানাতে থাকেন। বিপ্লবী রাজনীতির চর্চা আর উদার সংস্কৃতির জন্য মঁমার্তের নাম বাড়তে থাকায় জায়গাটা প্রিয় হয়ে উঠতে থাকে পড়ুয়া, লেখক, শিল্পীদের কাছেও। মেনস্ট্রিম প্যারিসের সংস্কৃতি থেকে আলাদা একটা পরিচিতি তৈরি করে ফেলে মঁমার্ত। হয়ে ওঠে সৃষ্টিশীল মানুষের স্বর্গরাজ্য। কলকাতার একদল শিল্পী একরাশ স্বপ্ন নিয়ে যখন ২০০৬ সালে নিজেদের সংগঠন তৈরি করলেন, ফ্রান্সের সেই সৃজন নগরীর অনুপ্রেরণায় তার নাম রেখেছিলেন মঁমার্ত।

১২ বছর আগে কলকাতা মঁমার্তের পথ চলা শুরু হয়েছিল। শুরুর অনুষ্ঠানে উদ্বোধন করেছিলেন বিখ্যাত ছবি আঁকিয়ে প্রকাশ কর্মকার। শুধুমাত্র সৃজনের চর্চা নয়, সেই নান্দনিকতার সঙ্গে সাধারণ মানুষের সংযোগ গড়ে তোলাই এই সংগঠনের উদ্দেশ্য। আমরা সাধারণত দেখি, যাঁরা শিল্প-সাহিত্যের চর্চা করেন, তাঁদের বেশিরভাগই সাধারণ জনসমাজের থেকে বিচ্ছিন্ন। গজদন্তমিনারে বাস করে তাঁরা কেবল নিজেদের বৃত্তের মানুষদের সঙ্গে মিশতেই স্বাচ্ছন্দ বোধ করেন। কলকাতা মঁমার্ত সেটাই ভাঙতে চেয়েছে। নান্দনিকতাকে তাঁরা নিয়ে এসেছেন জনসাধারণের মাঝখানে, উন্মুক্ত রাস্তায়। এই সমাজে এমন অনেক সম্ভাবনাময় শিল্পী রয়েছেন, যাঁরা কেবল সুযোগের অভাবে নিজেদের স্বপ্নকে সার্থক করতে পারছেন না। তাঁদের এই যন্ত্রণাকে অনুভব করতে পেরেছিলেন সংগঠনের সম্পাদক দেবাশীষ মল্লিক চৌধুরী। সেই তাড়না থেকেই কাজ করে চলেছে মমার্ত। সমাজের যে কোনো প্রেক্ষাপট থেকে মানুষ এসে যোগ দিতে পারেন মঁমার্তের কর্মশালায়, সৃজনের যে কোনো শাখায় নিজেদের প্রশিক্ষিত করতে। বিভিন্ন জেলায় জেলায় কর্মশালা আয়োজন করে থাকে এই সংগঠন। কলকাতা বইমেলাতেও এই সৃজনকর্মীরা মেতে থাকেন তাঁদের শিল্প ও শিক্ষার সম্ভার নিয়ে। একজন শিল্পীর যে সামাজিক দায়বদ্ধতা থাকে, তাকে নিজের প্রতিটি কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে বাস্তবায়ত করার চেষ্টা করেন মঁমার্তের সদস্যরা।

Post Tags
Developed by DXDasia