
ডঃ পার্থ বন্দ্যোপাধ্যায়ের আমেরিকা-জীবন এবং স্বপ্ন-দুঃস্বপ্ন – পর্ব ৮
আমাদের মেয়ে হবার পর আমরা বাড়ির পিছনে দাঁড়িয়ে
সেল বায়োলজিতে প্রথম পরীক্ষায় একশোর মধ্যে পঁয়তাল্লিশ পেয়ে হতাশ হয়ে পড়েছিলাম। ওয়েবারকে পাঁউরুটিমুখো বলে রঞ্জন আর আমি গালাগালি দিয়েছিলাম – ঘরের মধ্যে দরজা বন্ধ করে বসে। রাগ হয়েছিল। শালা, পঁয়তাল্লিশ? আর ওই চীনে ব্যাটাকে পঁচানব্বই?
কিন্তু তা সাময়িক। হাল ছেড়ে দেওয়ার পাত্র আমি কখনোই ছিলাম না। এ বান্দাকে এতো সহজে তোমরা দাবায়ে রাখতে পারবা না।
যেটা অনেক পরে বুঝেছি, তা হলো, আমাদের দেশের শিক্ষাব্যবস্থায় আমরা বিশ্লেষণ – ক্রিটিকাল থিংকিং – করতে শিখিনি বলে হাজার বই ঘেঁটেও আমরা ওয়েবারের প্রশ্নের উত্তর ঠিকমতো দিতে পারিনি। কিন্তু চীনদেশ থেকে আসা মিস্টার ঝাও পেরেছিলো। এখানেই আসল তফাৎটা হয়ে যায় শিক্ষাব্যবস্থায়। ওরা ভেতরে ঢুকে শেখে। প্রশ্ন করে, চ্যালেঞ্জ করে। আমরা শুধু মুখস্থ করি। আর মাস্টার যা বলে, অক্ষরে অক্ষরে পালন করি। এ শিক্ষা কোনো শিক্ষাই নয়।
ইলিনয় স্টেট ইউনিভার্সিটি – আই এস ইউ – আমার ছাত্রজীবনের, শিক্ষাজীবনের একটা টার্নিং পয়েন্ট।
মুক্তি প্রথম আমেরিকায় এসে পৌঁছনোর পর আমাদের কার্ডিনাল কোর্টের বাড়িতে বন্ধুদের পার্টি। আবু হায়দার (দাঁড়িয়ে), ডানদিকে সুনীতা বসু ও রঞ্জন গুপ্ত
দেশের সেই ভীতিপ্রদ, শাস্তিমূলক শিক্ষাব্যবস্থার নির্মম কষাঘাতে জর্জরিত হয়ে, রক্তাক্ত হয়ে, মুমূর্ষু হয়ে পড়ার পর একটা আশ্বাসের বাণী দরকার ছিল। নিজেকে ফিরে পাওয়ার দরকার ছিল। ইংরিজিতে যাকে বলে রি-অ্যাশিওরেন্স, তা ফিরে পাওয়ার একটা মৃতসঞ্জীবনী দরকার ছিল। আমেরিকার মধ্যপ্রাচ্যের নাম না জানা ছোট্ট একটা বিশ্ববিদ্যালয় আর তার অধ্যাপক অধ্যাপিকারা, স্টুডেন্ট অ্যাডভাইসাররা আমাকে তাঁদের স্নেহ দিয়ে, উৎসাহ দিয়ে সে কনফিডেন্স ফিরে পেতে সাহায্য করেছিলেন। তাই, আই এস ইউ’তে সেরকম উজ্জ্বল কোনোকিছুর স্বাক্ষর রেখে না আসতে পারলেও ওই প্রথম অভিজ্ঞতার কথা ভুলতে পারি না।
এদিকে আমাদের থাকার জায়গার মালকিন সেই পঁচাশি বছরের মিসেস হ্যারিসন প্রতি শনিবার নিয়ম করে বিশাল আমেরিকান গাড়ি নিয়ে তিরিশ মাইল দূরে তার আশি বছরের বয়ফ্রেণ্ডের সঙ্গে দেখা করতে যাচ্ছে মুখে পাউডার, আর গলায় একটা মুক্তোর হার পরে। তখন তার হাসি দেখে কে! কোন ভানু ব্যানার্জী বলে “আশিতে আসিও না!”
আমেরিকায় এসে দেখে যা আশি মানেই এবারে তাহলে আসি নয়। পঁচাশিতেও প্রেম করা যায়।
আশির রঙ্গ দেখে আমরা গরিব ছাত্ররা হাসি। বয়ফ্রেন্ডের সঙ্গে দেখা করে ফিরে আসার পর বুড়ি হ্যারিসন তখন ছুঁড়ি। মন তখন তার উদার। ওপরে দোতলায় এসে আমাদের একটা কেক দিয়ে গেলো হয়তো। কিংবা আমাদের ট্র্যাশ ক্যান নিজেই পরিষ্কার করে দিয়ে গেলো। প্লাস্টিকের দুধের ক্যান শেষ হয়ে গেলে আমরা ফেলে দিতাম। হ্যারিসন দেখিয়ে দিলো, মুখের ছিপিটা খুলে নিয়ে পায়ের চাপ দিয়ে হাওয়াটা বের করে দিয়ে আবার ছিপিটা লাগিয়ে দিলে ক্যানটা ট্র্যাশ ব্যাগে অনেক কম জায়গা নেয়। এই রকম হাজার ছোটোখাটো জিনিস। আমরা তখন বেসমেন্ট ছেড়ে দোতলায় প্রমোশন পেয়ে উঠে এসেছি।
মিসেস হ্যারিসন ঠাট্টা করে বলে, “ইউ গাইজ আর মুভিন আপ ফ্যাস্ট, এ্যান্ট ইয়া?”
আমরাও দাঁত বের করে হাসতে হাসতে আমেরিকান ইংরিজি শিখে যাচ্ছি। মুভিং নয়, মুভিন। আর্ন্ট নয়, এ্যান্ট। হ্যারিসন একদিকে, আর হ্যারিস আর একদিকে। আমাকে তার গাড়িতে তুলে নিয়ে ড্রাইভিং শেখাচ্ছে যে কৃষ্ণাঙ্গী মেয়ে লিসা হ্যারিস – আমার বায়োলজি ক্লাসেরই সহপাঠিনি – সে শিখিয়ে দিচ্ছে আরো সব আমেরিকান শব্দভাণ্ডার।
আমরা একসঙ্গে পরেও ক্লাস নিয়েছি। ডঃ চুয়াং’এর স্ক্যানিং ইলেক্ট্রন মাইক্রোস্কোপি। চুয়াংয়ের অদ্ভুত ঝাঁকিয়ে ঝাঁকিয়ে বলা ইংরিজি শুনে আমরা হাসতাম। অর্গানাইজেশনকে বলে অর্গাজিনেশন। হাহা।
লিসা শিখিয়ে দিচ্ছে, ফুটপাথ নয়, সাইডওয়াক। ফুটপাথ এদেশে কেউ বোঝে না। ইউনিভার্সিটি কেউ তেমন বলে না। স্কুল। রাস্তার ডানদিক দিয়ে গাড়ি যায়। রাস্তা পার হওয়ার সময় তোমরা ইন্ডিয়ানরা একটু বেশি ওয়াচ আউট কোরো।
আমি পঞ্চাশ, ষাট মাইল স্পীডে গাড়ি চালাই হাইওয়েতে পড়ে। ভেটারান্স পার্কওয়ে। লিসা বলে, “আর ইউ শিওর ইউ নেভার ড্রোভ বিফোর? গশ ইউ লার্ন ফ্যাস্ট!”
Watterson Towers-এর অভ্যন্তরে
পেভমেন্ট মানে ফুটপাথ নয়। পেভমেন্ট মানে আসল রাস্তা। “নেভার ওয়াক অন দ্য পেভমেন্ট।” লিসা সাবধান করে দেয়। “নেভার এভার। ইউ গেট কিল্ড, ইফ ইউ ডু।” কেন যে লিসা আমার ওপর এতো সদয়, কে জানে। রোম্যান্টিক কিছু নয়। নিজের গাড়ির গ্যাস, মানে পেট্রোল, পুড়িয়ে অজ্ঞাতকুলশীল বিদেশি এক সহছাত্রকে দিনের পর দিন গাড়ি চালাতে পারদর্শী করে তোলার কোনো দরকার লিসার ছিলো না। কিন্তু ব্ল্যাকরা ঐরকমই। আমেরিকার জীবনে বার বার তার প্রমাণ পেয়েছি।
এসব দিক থেকে ব্ল্যাকদের সঙ্গে বাংলাদেশি বাঙালিদের খুব মিল আছে। ওরাও ঐরকম পরোপকারী, বন্ধুপ্রেমিক।
আই এস ইউ প্ল্যানেটোরিয়াম
ওয়েবার ক্লাসের অবস্থা দেখে কী একটা স্ট্যাটিসটিকাল গ্রাফ করে আমাদের পাশ করিয়ে দিলেন। ওই ঝাও ভদ্রলোকের পঁচানব্বইকে একশো ধরলেন, আর কী একটা জটিল স্ট্যাটিস্টিক্যাল ফর্মুলা কষে দেখালেন, আমরা পঁয়তাল্লিশের দল আসলে পঁয়তাল্লিশ নয়, পঁচাত্তর। আমরাও হাঁফ ছেড়ে বাঁচলাম। কারণ, এমনিতেই স্কুলের নিয়ম হলো, গ্র্যাজুয়েট স্টুডেন্টদের তাদের স্কলারশিপ ধরে রাখতে গেলে ধারাবাহিকভাবে সব ক্লাসে অ্যাভারেজ বি গ্রেড পেতেই হবে। অর্থাৎ, আশি থেকে নব্বইয়ের মধ্যে নম্বর রাখতেই হবে। আই এস ইউ’তে ঢোকার কয়েকদিনের মধ্যেই অ্যাডমিনিস্ট্রেটিভ বিল্ডিং জুলিয়েন হলে যে বিশাল ওরিয়েন্টেশন সেমিনার হয়েছিল কয়েকশো নতুন ছাত্রছাত্রীদের নিয়ে, সেখানে এসব নিয়মকানুন ভালো করে বুঝিয়ে দিয়েছিলেন গ্র্যাজুয়েট স্টুডেন্ট এডভাইজার বেটি প্লামার ও তাঁর সহযোগীরা। বেটি প্লামার মধ্যবয়েসী সদাহাস্যময়ী রমণী। বিশাল একটা মন্দগামী সাদা রেফ্রিজারেটর যেন। আর গাল দুটো লাল লাল আপেলের মতো।
একদিন আমি দেখা করতে গেছি তাঁর অফিসে কী একটা কাজে। তখন বিকেল তিনটে। মিসেস প্লামার দেখি সেজেগুজে কোথায় বেরোচ্ছেন। গাঢ় নীল রঙের ড্রেস, তার সঙ্গে সাদা রঙের মুক্তোর লম্বা নেকলেস। ওরেঃ তেরা!
আমাকে দেখে বললেন, “উপ্স, আই গুফড।” ওই তখন আর কী, সত্তর শতাংশ তিরিশ শতাংশ ফর্মুলা আবার। কিছুটা বুঝলাম, কিছুটা আন্দাজ করে নিলাম। গুফড মানে যে আসলে কী, পরে ডিকশনারিতে খুঁজে দেখেছি। অবশ্য তখন গুগলমাসি এরকম সর্বত্র হাসি ছড়াতো না। বই-ডিকশনারিতে গুফড কথার কোনো সত্যিকারের মানে খুঁজে পাইনি।
প্লামার বললেন, “ইউ নীড টু কাম ব্যাক টুমরো। কুড ইউ প্লিজ?” কারণ? “আই হ্যাভ এ ডিনার মিটিং নাও। অফুল সরি।”
ডিনার – এই বিকেল তিনটের সময়ে? আমাদের দেশে পাশের বাড়ির কার্তিকরা এখন লাঞ্চ খায়। যাক বাবা, এই শিক্ষেটাও হয়ে গেলো এই মার্কিন মুলুকে এসে। তিনটের সময়ে ডিনার!
আর এক লিসা – কিংবা তার নাম ছিল কি ট্রেসি? ঠিক মনে পড়ছে না আজ এই সাঁইত্রিশ বছর পর। সে আমাকে প্রথম কম্পিউটার ব্যবহার করতে শিখিয়েছিলো। ডঃ রজার অ্যান্ডারসনের ইকোলজি ক্লাসে প্রথম দু-তিন সপ্তাহের মধ্যেই সে সময়কার আদ্যিকালের ওয়ার্ড প্রসেসিং কম্পিউটার আর ডট ম্যাট্রিক্স প্রিন্টার শিখে নিতে হলো। টার্ম পেপার লিখতে হবে। সহপাঠিনী ট্রেসি আমার মুখের অবস্থা দেখে প্রথমে হাসলো, তারপর রাত দশটায় আসতে বললো আমাদের বায়োলজি ডিপার্টমেন্ট ফেল্মলী হলের কম্পিউটার রুমে। প্রত্যেক গ্র্যাজুয়েট স্টুডেন্টের কাছে আছে চাবি। সারারাত কাজ করতে পারো নিজের ইচ্ছেমতো। তারপর দরজাটা টেনে দিয়ে চলে যেও, ব্যস।
ডঃ রজার অ্যান্ডারসন
দশটা থেকে দুটো পর্যন্ত শিখলাম। তারপর ও শেখালো এসপিএসএসএক্স বলে আদ্যিকালের একটা স্ট্যাটিসটিকাল প্রোগ্রাম। সবকিছুই আমার কাছে ধোঁয়া ধোঁয়া – হিন্দী মিডিয়ামে হিব্রু শেখার মতো। শিখছি, আর মা কালীর নাম করে টুকে যাচ্ছি খাতায়। জীবনে কখনো কম্পিউটার চোখে দেখিনি। আর এখন… ভোর চারটেয় বাড়ি ফিরলাম নিশুত রাতে ঠাণ্ডা ঠাণ্ডা হাওয়া খেতে খেতে। জনমানবশূন্য কোয়াড। চেরি গাছের ফুলগুলো ঘুমিয়ে আছে। অনেক দূরে সেই আঠাশতলা উঁচু ওয়াটারসন্স টাওয়ারের মাথার ওপর লাল দুটো আলো চোখ মারছে।
পেটের মধ্যে গুরগুর শব্দ। যাকে অনেকে বলে প্রজাপতি।
অ্যান্ডারসনের সেই টার্ম পেপারে পনেরো কুড়ি জনের ক্লাসে আমরা পাঁচজন একশোর মধ্যে পঁচানব্বই পেয়েছিলাম। ট্রেসি পায়নি।
আমাদের সেই পাঁচজনকে নিয়ে অ্যান্ডারসন পেপার পাবলিশ করলেন ইকোলোজির এক জার্নালে।
আমেরিকায় আমার প্রথম পেপার।
(চলবে…)
*আমেরিকা-জীবনের দীর্ঘ অভিজ্ঞতা নিয়ে প্রখ্যাত মানবধিকার কর্মী ডঃ পার্থ বন্দ্যোপাধ্যায়ের কলামে চলছে ‘মেরিকামায়া সাতকাহন’।
ধারাবাহিকভাবে প্রতি শুক্রবার সন্ধে ৬টায় প্রকাশিত হচ্ছে শুধুমাত্র বঙ্গদর্শন-এ।
‘মেরিকামায়া সাতকাহন’-এর সমস্ত পর্ব পড়তে এখানে ক্লিক করুন।
