
ডঃ পার্থ বন্দ্যোপাধ্যায়ের আমেরিকা-জীবন এবং স্বপ্ন-দুঃস্বপ্ন – পর্ব ৪৫
সিক্স ল্যাথাম ভিলেজ লেন
নাসীম আহমেদকে বিদায় জানিয়ে তিনজনে মিলে উঠলাম এক শীত শীত সকালে আমাদের মেরুন রঙের নিসান সেন্ট্রা গাড়িতে। গন্তব্য বহু দূরের নিউ ইয়র্ক রাজ্যের উত্তরে অনেক বেশি শীতের শহর অলব্যানি।
ছাত্রজীবন শেষ হলো। এবারে আমেরিকায় আর পাঁচজন চাকুরীজীবির মতো আমারও নতুন জায়গা, নতুন চাকরি। এক বছরের প্র্যাক্টিক্যাল ট্রেনিং পারমিটের কার্ড দিয়েছে সদাশয় মার্কিন ইমিগ্রেশন ডিপার্টমেন্ট। এস আই ইউ’এর ফরেন স্টুডেন্ট অ্যাডভাইজার দোর্দণ্ডপ্রতাপ কার্লা কপ্পি হাসিমুখে জানালেন, একটা বছর আমি এদেশে আরো থাকতে পারবো। চাকরি করে কিছু অভিজ্ঞতা সঞ্চয় করে তারপর মার্কিন সরকার চাইবে, আমি যেন দেশে ফিরে যাই।

উঁচু থেকে নিউ ইয়র্ক স্টেটের রাজধানী অলব্যানি’র রূপ
যাঁতাকলে পড়ে গিয়েছি তখনই। বুঝতে পারছিলাম, পালাবার পথ আর নাই। দেশে ফেরা আর হবে না সম্ভবতঃ। এই একটা বছরের মধ্যে দেখো এইচ ওয়ান-বি ভিসা করাতে পারো কিনা। তাহলে আরো ছ’বছর থাকতে পারবে, আর গ্রীন কার্ডের জন্যে অ্যাপ্লিকেশন করতে পারবে। জানতে পারলাম, এই হলো আমেরিকায় থাকার সাধারণ, আইনসম্মত পথ।
কার্লা বললো, “গুড লাক।” বলে হ্যান্ডশেক করলো পার্কিং লটের মাঝখানে দাঁড়ানো সেই দোতলা কাঠের বাড়ির বাইরের ঘরে। তখনকার দিনের সর্বশক্তিমান ফরেন স্টুডেন্ট অফিস। কার্লার এই অফিসেরই অন্য এক ডিপার্টমেন্টে নাসীম কাজ নিয়ে এসেছিলো পিটসবার্গ থেকে।
“মেক শিওর ইওর পার্মিট ডাজন্ট ল্যাপ্স। নট ইভেন ফর এ ডে।” কার্লা শেষবারের মতো মনে করিয়ে দিলো।
এক দিনের জন্যেও যেন তোমার পার্মিট ল্যাপ্স করে না যায়। ইমিগ্রেশন ডিপার্টমেন্ট যেন তোমার কাগজপত্রে কখনো কোনো গ্যাপ দেখতে না পায়। ভবিষ্যতে গ্রীন কার্ড যদি করাতে চাও, অথবা পরে যদি মার্কিন নাগরিকত্বের জন্যে আবেদন করতে চাও, সমস্ত কাগজপত্র যেন একেবারে নতুন বউয়ের মতো বিউটিফুল থাকে।
আমি জানতাম আগেই। উইলিয়াম হল আর সুসান হল ইত্যাদি জাঁদরেল ছাত্রনেতা ও নেত্রীর সঙ্গে ওঠাবসা করতে করতে, আর ল্যারি ম্যাটেনের স্নেহচ্ছায়ায় থেকে অনেক কিছু শিখে গিয়েছিলাম। জেনে গিয়েছিলাম, আমেরিকায় আর যাই করো, দুটো ভুল কখনো কোরো না। এক, ইমিগ্রেশন-সংক্রান্ত কাগজপত্র সবসময়ে যেন স্পট-ফ্রী থাকে। আর দুই, মেডিকেল ইন্স্যুরেন্স যেন এক দিনের জন্যেও ল্যাপ্স না হয়।
দুটোই হতে দেখেছি আমাদেরই পরিচিত সার্কেলে। এবং তার জন্যে নানা রকম বিপদের মধ্যে তাদের পড়তে দেখেছি। কারুর বিপদ ভয়ঙ্কর। কারুর বা ঈশ্বরের দয়ায় অল্পের ওপর দিয়ে গেছে। কিন্তু আমি জানতাম, সেই স্ট্রেসের মধ্যে কখনো আমি পড়তে চাই না।
চলে আসার কয়েক দিন আগে প্ল্যান্ট বায়োলজি ডিপার্টমেন্টের সেই একমেবাদ্বিতীয়ম কনফারেন্স কাম লাঞ্চ রুমে আমার কয়েকজন সতীর্থ দুপুরবেলায় একটা পিৎজা পার্টি দিলো। অনেকেই এসেছিলো সেখানে আমাদের দুজনকে বিদায় জানানোর জন্যে। ছাত্রী কাম কলীগ মার্টি ভয়ট, স্টিভ রজার্স, বেথ উইল্টশায়ার, আরো অনেকে। গ্র্যাজুয়েট এবং আন্ডারগ্র্যাজুয়েট স্টুডেন্ট। আর তার সঙ্গে সান্ডবার্গ, রে এবং বারবারা স্টটলার, এরা সব। ম্যাটেন কয়েক মিনিটের জন্যে উঁকি দিয়ে গেলেন কাজের ফাঁকে।

এস আই ইউ ছেড়ে চলে আসার সময়ে ডিপার্টমেন্টে পিৎজা পার্টি
সবাই খুশি সফলতার সঙ্গে পিএইচডি শেষ করে পোস্ট-ডক্টোরাল ফেলোশিপ নিয়ে আমরা নিউ ইয়র্ক চলে যাচ্ছি। সব ছাত্রছাত্রীই এমনটাই চায়। এর মধ্যেই পুরোনোদের মধ্যে টিম আর শ্যারন পেনসিলভ্যানিয়া চলে গেছে কলেজ শিক্ষকতার চাকরি নিয়ে। এলেন সাইফারও কোথায় যেন চলে গেছে পিএইচডি শেষ করে।
আমি সাড়ে চার বছরে ডক্টরেট করলাম। করা খুব সহজ নয়। আমাকে করতেই হয়েছিল, কারণ না করলে স্কলারশিপ থাকতো না। আর পাঁচটা আমেরিকান স্টুডেন্টের মতো অবস্থা আমার নয়। স্কলারশিপ না থাকলে ফ্যামিলি নিয়ে চলবে কী করে? মুক্তি যা রোজগার করে তখন, তাতে ফ্যামিলি নিয়ে থাকা যায় না। সে যতই ছোটো হোক না কেন আমার পরিবার। আর সংসার চালাবার খরচ বাইরে কোথাও কাজ করে মেটানো যাবে না কঠোর ইমিগ্রেশন আইনের জন্যে।
মার্টি আমাকে বললো, “তোমার জন্যে একটা ছোট্ট উপহার এনেছি।” বলে, ওয়াল্ট হুইটম্যানের বিখ্যাত কবিতার বই “লিভস অফ গ্রাস” আমাকে দিলো। ও জানতো সাহিত্যের প্রতি আমার দুর্বলতা। সে বই এখনো আমার কাছে রয়ে গেছে।
আর কোনো ফেয়ারওয়েল জাতীয় অনুষ্ঠান হয়নি। হওয়া সম্ভব ছিলো না, কারণ আমি মাত্র কয়েক দিনের ছুটি নিয়ে নিউ ইয়র্ক থেকে এসেছি। ওখানে এক মাস থেকে এক পরিচিত দাদার আর এক পরিচিত আত্মীয়র মাধ্যমে একটা অ্যাপার্টমেন্ট কমপ্লেক্সে থাকার ব্যবস্থাও করে ফেলেছি। সে কমপ্লেক্সের নাম ল্যাথাম ভিলেজ। দোতলা টানা বাড়ি। একটা কোণে একতলায় আমাদের দুই বেডরুম আর একটা লিভিং রুম, দেশে যাকে বলে ড্রয়িং রুম। ছশো ডলার মাসে ভাড়া। বিদ্যুৎ আর জল ভাড়ার মধ্যেই। হিসেব করে দেখলাম, যা পাচ্ছি জন হেন্সের কাছে কাজ করে, তাতে টায়ে টায়ে হয়তো চলে যাবে। কিন্তু একটা পয়সাও বাঁচানো যাবে না। এখনকার মতো তাই সই।

জন হেনসের বাড়ি ডিনারে। সঙ্গে তাঁর মেয়ে, এবং সামনে আমার শিশুকন্যা।
এবারে আর নরমাল-ব্লুমিংটন থেকে কার্বনডেল – মাত্র আড়াইশো মাইল ড্রাইভ নয়। এক হাজার মাইল। সঠিক হিসেবে এক হাজার ছেচল্লিশ মাইল। এই দূরত্ব পাড়ি দিতে হবে আমাদের এই পুরোনো নিসান সেন্ট্রা স্টেশন ওয়াগনে। পিছনে বাচ্চাদের কার সীটে আমার মেয়ে, তখন পাঁচ বছর তার বয়েস। আর কিছু জিনিসপত্র। তার পাশে বসে মুক্তি। খাওয়াতে হবে রাস্তায়। ঘুম পেলে ঘুম পাড়াতে হবে। সামনের অন্য সীটে আরো কিছু জিনিসপত্র, এবং এমার্জেন্সির জন্যে কম্বল, ওষুধ দু চারটে। একটা ফ্লাস্কে গরম চা। সঙ্গে একটা ট্রিপল-এ কোম্পানির ম্যাপ।
আগেই বলেছি, গুগল ইন্টারনেট ইত্যাদি তখনও ভবিষ্যতের গর্ভে।
নাসীমকে বিদায় জানিয়ে রওনা দিলাম অলব্যানির পথে। তখন বোধহয় সকাল আটটা। কার্বনডেল আস্তে আস্তে ঘুম থেকে উঠছে তখন।
মাঝখানে বোধহয় কোথাও একটা রাত কাটাতে হয়েছিল, কারণ বাচ্চা নিয়ে একটানা এক হাজার মাইল ড্রাইভ করা সম্ভব নয়। আমিই বেশির ভাগ রাস্তাটা ড্রাইভ করে এলাম। মুক্তি মাঝে মাঝে এক ঘণ্টা দু ঘণ্টার জন্যে হাল ধরেছে। সেসব রাস্তা তখনকার দিনে শুনশান, চুপচাপ। এমন রাস্তাতেই সেই ভয়ঙ্কর দুর্ঘটনা ঘটেছিলো। আজও এই এতো বছর পরেও সেসব রাস্তায় হঠাৎ কখনো গেলে মনে হয়, নিউ ইয়র্ক, লস অ্যাঞ্জেলেস, অ্যাটলান্টা এসব জায়গার সঙ্গে কী বিরাট তফাৎ!
পাঁচ ছ ঘণ্টা ড্রাইভ করে বোধহয় পৌঁছেছিলাম ওহায়ো রাজ্যের কলম্বাস বলে একটা শহরে। সেখানে তখন আমার এক দূর সম্পর্কের দিদি থাকতো তার ফ্যামিলি নিয়ে। সেখানেই বোধহয় একটা রাত ছিলাম। এই ছন্দা-দি’রা আগে থাকতো নর্থ ক্যারোলাইনার উইনস্টন-সালেম নামের একটা শহরে। সেখানেও একবার আমরা গিয়েছিলাম, তখন আমার মেয়ে আরো অনেক ছোটো। মনে আছে, ছন্দা-দি’র স্বামী আমাদের দেখাতে নিয়ে গিয়েছিলো সেখানকার বিখ্যাত সিগারেট কোম্পানির ফ্যাক্টরি, যেন কী একটা তাজমহল দেখাচ্ছে। লক্ষ কোটি সিগারেট তৈরি হচ্ছে, যার তামাক পাতা চাষ করতো আগে আমেরিকার কালো চামড়ার ক্রীতদাসরা, আর এখন করে গরিব ইমিগ্রেন্ট শ্রমিকরা। যেহেতু ধূমপান মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে প্রায় বন্ধ হয়েই গেছে, সুতরাং মুনাফা যাতে না কমে, উইনস্টন আর সালেম সিগারেট কোম্পানি ভারতে, বাংলাদেশে, আফ্রিকায়, ভিয়েতনামে, ফিলিপিন্সে, মেক্সিকোয় নতুন নতুন বাজার খুঁজে বের করেছে।
আমি জানতাম আগেই। উইলিয়াম হল আর সুসান হল ইত্যাদি জাঁদরেল ছাত্রনেতা ও নেত্রীর সঙ্গে ওঠাবসা করতে করতে, আর ল্যারি ম্যাটেনের স্নেহচ্ছায়ায় থেকে অনেক কিছু শিখে গিয়েছিলাম। জেনে গিয়েছিলাম, আমেরিকায় আর যাই করো, দুটো ভুল কখনো কোরো না। এক, ইমিগ্রেশন-সংক্রান্ত কাগজপত্র সবসময়ে যেন স্পট-ফ্রী থাকে। আর দুই, মেডিকেল ইন্স্যুরেন্স যেন এক দিনের জন্যেও ল্যাপ্স না হয়
পুঁজি তার শ্রমিক এবং বাজার যে কোনো প্রকারে খুঁজে বের করবেই।
যাই হোক। পরের দিন আবার সকালবেলা রওনা দিয়ে ক্লান্ত শরীরে সন্ধেবেলায় এসে হাজির হলাম অলব্যানি শহরের রাস্তার গোলকধাঁধা আর ট্র্যাফিক সার্কেলের জটিল সমাধান করে। তখন আমরা গেঁয়ো ভূত। কার্বনডেল কোথায়, আর কোথায় অলব্যানি। ভাগ্যিস আমি একটা মাস আগেই এখানে থেকে গিয়েছিলাম। না হলে আমাদের মতো গাঁইয়াদের পক্ষে সেই ট্র্যাফিক আর সিক্স-লেন হাইওয়ে ঠেঙিয়ে বাড়ি খুঁজে বের করা সম্ভব হতো না।
করে ফেললাম। ল্যাথাম ভিলেজ লেন অ্যাপার্টমেন্ট কমপ্লেক্স। সেই কমপ্লেক্সেই আমাদের একটা ফ্ল্যাট। আগে থেকেই বলে রেখেছিলাম, সেখানে অন্য একটা ফ্ল্যাটে থাকে আর এক বাঙালি পরিবার – অমিতাভ চক্রবর্তী, তার স্ত্রী বনানী, এবং তাদের একটি বড়ো মেয়ে ও এক কন্যাসন্তান। যে দাদার মাধ্যমে ফ্ল্যাট খুঁজে পেয়েছিলাম, তার নাম শীতাংশু ঘোষ। তাঁর স্ত্রী শুক্তি। ভবিষ্যতের সাত আট বছর এই বাঙালি পরিবারগুলোর সঙ্গে আমাদের সখ্য ঘনিষ্ঠ হয়েছে। নতুন এক বাঙালি সমাজ আমাদের সাদরে গ্রহণ করেছে। পঁচিশ তিরিশটি ফ্যামিলি। অলব্যানি, রেনসেলেয়ার, আর স্কেনেকটাডি – তিন ছোটো ছোটো শহর, আর পাশ দিয়ে বয়ে চলেছে নিউ ইয়র্কের হাডসন নদী। নদীর ওপাশে আর একটা ছোটো শহর, তার নাম ট্রয়। এই শহরগুলোতে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা বাঙালি ও ভারতীয় অনেকগুলো পরিবার। আর আছে বাংলাদেশি কিছু ফ্যামিলি।

সিক্স ল্যাথাম ভিলেজ লেন বাড়ির ভিতর আমার ছোট্ট মেয়ে
সে রাতে আমাদের ডিনারের ব্যবস্থা চক্রবর্তীদের বাড়িতেই হয়েছিল। এসে জুটেছিল আমাদের স্বাগত জানাতে আরো কয়েকটি বাঙালি পরিবার। একসঙ্গে এতগুলো বাঙালির মুখ আমরা অনেকদিন দেখিনি।
খাওয়া দাওয়া শেষ করে আমরা অতি ক্লান্ত আড়াইজন মানুষ চাবি খুলে ঢুকলাম আমাদের নতুন অ্যাপার্টমেন্টে।
সিক্স, ল্যাথাম ভিলেজ লেন। আগামী তিন বছর এই বাড়িটাই হবে আমাদের ঠিকানা।
শীত অনেক বেশি এখানে।
(চলবে)
*আমেরিকা-জীবনের দীর্ঘ অভিজ্ঞতা নিয়ে প্রখ্যাত মানবধিকার কর্মী ডঃ পার্থ বন্দ্যোপাধ্যায়ের কলামে চলছে ‘মেরিকামায়া সাতকাহন’।
ধারাবাহিকভাবে প্রতি শুক্রবার সন্ধে ৬টায় প্রকাশিত হচ্ছে শুধুমাত্র বঙ্গদর্শন-এ।
‘মেরিকামায়া সাতকাহন’-এর সমস্ত পর্ব পড়তে এখানে ক্লিক করুন।
