মেরিকামায়া সাতকাহন : ভূপেন হাজারিকার গান শুনতে সবাই মিলে ছুটলাম সেন্ট লুইস শহরে

ডঃ পার্থ বন্দ্যোপাধ্যায়ের আমেরিকা-জীবন এবং স্বপ্ন-দুঃস্বপ্ন – পর্ব ৩৩

সেন্ট লুইসে ভূপেন হাজারিকার গানের অনুষ্ঠানের শেষে আমরা

দ্বাত্রিংশ পর্বের পর

দুপুরবেলা পাইন বনে চারদিকে ম-ম করা রজনের গন্ধ। পায়ের নীচে স্তূপীকৃত হলুদ বাদামি পাইনের লক্ষ লক্ষ পাতা। আর তার মধ্যে ছড়িয়ে থাকা অজস্র কোন। পাইন কোন, অর্থাৎ শঙ্কু। যা গাছ থেকে ঝরে ঝরে পড়ে।

বুট পরা পা ডুবে যায় তার মধ্যে। আমি, আর ফরেস্ট্রি ডিপার্টমেন্টের কয়েকটা ছেলে। রে অলব্রাইটের পিএইচডি ডিসার্টেশনের কাজ চলছে। সে এখানে প্রধান ছাত্র। সঙ্গে তার রিসার্চ অ্যাডভাইজার প্রফেসর অবারটিন। আমার যেমন ওয়াল্ট সান্ডবার্গ। আর সঙ্গে আছি আমরা স্টুডেন্ট ওয়ার্কার হিসেবে। ওক গাছ, মেপল গাছ, অ্যাশ, চেরি, পপলার, বার্চ, সিকামোর, এলম। আমেরিকার রূপসী প্রকৃতির সঙ্গে পরিচয় হচ্ছে একটু একটু করে।

সেই কলকাতায় বিএসসি এমএসসি পড়ার সময়ে বন্ধুরা চার পাঁচজনের গ্রুপ করে বেরিয়ে পড়তাম শহরতলীর ট্রেনে করে। কোনোদিন আন্দুল মৌরিগ্রাম। গাছ চেনার নেশা হয়ে গিয়েছিলো। কোনোদিন হয়তো গড়িয়ার তখনকার জঙ্গলে যাওয়া হলো মাশরুম আর নানারকমের ছত্রাক সংগ্রহ করতে। কখনো সঙ্গে একজন অধ্যাপক। কখনো আমরা নিজেরাই।

আমেরিকায় এসে প্রথম দু বছর কি আড়াই বছর এসব করার কোনো সুযোগই হয়নি। প্রকৃতির সঙ্গে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে গিয়েছিলো দৈনন্দিন সমস্যা আর সংগ্রামের চাপে। এপ্রিল মাস থেকে অক্টোবর মাস পর্যন্ত প্রকৃতি নিপুণভাবে সাজতো। আই এস ইউ-র কোয়াডে চেরী গাছগুলোয় বেগুনি কিংবা গোলাপি ফুল ফুটতো অজস্র। ইলিনয় রাজ্যের শোকেস পাখি রেডবার্ড তার লম্বা লাল লেজ আর কালো ঠোঁট আর ঝুঁটি নিয়ে মাঝে মাঝে দেখা দিয়ে যেতো লুকোচুরি খেলার মতো।

এই পর্যন্ত। কিন্তু দারিদ্র্য, অসুখ আর সংসারযাত্রা নির্বাহ করার তীব্র পীড়নে মা-প্রকৃতিকে উপভোগ করতে পারিনি একেবারেই।

সাদার্ন ইলিনয় বিশ্ববিদ্যালয়ে চেরী গাছের বাহার

এই সাদার্ন ইলিনয় বিশ্ববিদ্যালয়ে এসে আমেরিকার বিশাল প্রকৃতিকে চিনলাম, জানলাম। কতরকমের গাছ, ফুল, ফল, পশু পাখি। চতুর্দিকে ছড়ানো রয়েছে কয়েক ডজন সংরক্ষিত অরণ্য – নেচার প্রিজার্ভ। জায়ান্ট সিটি স্টেট পার্ক, ফার্ন ক্লিফ, ডিক্সন স্প্রিং, ইলিনয় রাজ্যের একেবারে দক্ষিণ-পশ্চিম কোণে মিসৌরি রাজ্যের সংযোগস্থলে যেখানে মিসিসিপি নদী দুটো রাজ্যের সীমানা নির্দেশ করেছে, তার কাছাকাছি হর্সশু লেক।

সাদার্ন ইলিনয় বিশ্ববিদ্যালয় সংলগ্ন ‘নেচার প্রিজার্ভ’

ফরেস্ট্রী ডিপার্টমেন্টের কাজ করতে করতে নেচার চিনলাম। আর তারপর শুরু হলো আমার নিজের কাজ। সান্ডবার্গকে নিয়ে অনেক আলোচনার শেষে এক বিশেষ প্রজাতির মাশরুমের ট্যাক্সনমী অর্থাৎ শ্রেণীবিন্যাস করার রিসার্চ প্রজেক্ট দাঁড় করানোর সঙ্গে সঙ্গেই শুরু হলো এসব নানা জায়গায় গিয়ে হাজার ছত্রাক সংগ্রহ। আমার এলাকা শুধু সাদার্ন ইলিনয় নয়। আমি পিএইচডি স্টুডেন্ট। আমার পরিসর আরো বিস্তৃত। দক্ষিণ পশ্চিমে কেন্টাকি, মিসৌরি এবং টেনেসী রাজ্যতেও আমার ঘোরাঘুরি। সেসব ভৌগোলিক এলাকার বিচিত্র নামের বিচিত্র মাশরুম সংগ্রহ করে এনে তার জেনাস ও স্পিসিস আইডেন্টিফিকেশন আমার কাজের একটা অপরিহার্য্য অঙ্গ। বাড়িতে আমি প্রায় থাকি না বললেই চলে।

কত প্রজাতির ছত্রাক। সান্ডবার্গ ও আর এক সতীর্থ — হাতে এক বিশেষ প্রজাতির শ্যানটারেল

শিশুকন্যা নন্দিনী বড় হয়ে উঠছে একটু একটু করে। দিনের বেলা সে থাকে পাশের স্টুডেন্ট অ্যাপার্টমেন্টেই রেখা নামের এক ভারতীয় মহিলার কাছে। মুক্তি ওই ফরেস্ট্রী ডিপার্টমেন্টেই রিসার্চ অ্যাসিস্ট্যান্ট’এর কাজ পেয়েছে একটা। কিন্তু কাজ শুধুই অবৈতনিক রিসার্চ। স্টুডেন্ট যদিও বা ইউনিভার্সিটি ক্যাম্পাসের মধ্যে কাজ খুঁজে নিয়ে কিছু এক্সট্রা ডলার রোজগার করতে পারে, স্টুডেন্টের স্পাউস নৈব নৈব চ। ভিসার ওপর সবকিছু নির্ভর করছে। আমার ভিসা এফ ওয়ান। মুক্তির ভিসা এফ টু। এই ভিসাতে অর্থ রোজগার আইনবিরুদ্ধ। আগেও একথা বলেছি।

সুতরাং, কাজ শেখো যত খুশি। প্রফেসরকে ধরেকয়ে রিসার্চ করার কাজ তুমি শিখতেই পারো। কিন্তু টাকাপয়সা পাবে না।

এইভাবেই আমাদের চলছে।

আমি বাড়ি থাকি না। সারা সপ্তাহ কোথা দিয়ে কেটে যায়। সকালবেলা মুক্তি মেয়েকে তৈরি করে রেখার কাছে রেখে যায়। এক বছরের মেয়ে সারাদিন ওখানেই থাকে। অবশ্য রেখা খুবই মায়ের মতো দেখাশোনা করে। ওদের নিজেদের দুটো ছোটো ছোটো ছেলে। তাদের সঙ্গে খেলা করে মেয়ের কেটে যায়। আমি মুক্তিকে ফরেস্ট্রী ডিপার্টমেন্টে নামিয়ে দিয়ে আমাদের প্ল্যান্ট বায়োলজি ডিপার্টমেন্টে চলে যাই। বিকেলবেলা একবার বাড়ি ফিরে যাই একসঙ্গে। সেই সময়টাই একমাত্র ঘণ্টা দুয়েক হয়তো পারিবারিক সময় কাটানো। মেয়ের সঙ্গে একটু গল্প, খেলা। একসঙ্গে খাওয়া। তারপর আমি আবার চলে আসি ডিপার্টমেন্টে। ফিরি অনেক রাতে। তখন ওরা সবাই ঘুমিয়ে পড়ে। এইভাবে কেটে যাচ্ছে দিনের পর দিন, মাসের পর মাস।

সাদার্ন হিলসে রেখার কাছে আমাদের ছোট্ট মেয়ে, এবং রেখার ছোট ছেলে অনুজ

বাংলায় কথা বলার বন্ধু এস আই ইউ’তে বেশ কয়েকজন হয়েছে। জ্ঞানদার বাড়িতে মাঝে মাঝে আড্ডা হয় ব্যাকইয়ার্ডে বনফায়ার জ্বালিয়ে। খাওয়াদাওয়া হয়। গানটানও মাঝে মাঝে হয় – সেকথাও আগেই বলেছি। এরকম এক আড্ডায় একদিন আলাপ হয়ে গেলো রত্নার সঙ্গে। রত্না আমাদেরই বয়সী। ওর স্বামী কৌশিকদা বন্ধুবৎসল। ওদের দুটো ছেলেমেয়ে। এখন থেকে মাঝে মাঝে ওদের বাড়িতে গিয়েও আড্ডা হতে লাগলো। রত্নার মা বেড়াতে এসেছেন কলকাতা থেকে। সেখানেও একটা টান তৈরি হলো। নিজের আত্মীয় বলতে একেবারেই কেউ নেই এখানে। এরাই হয়ে উঠলো আত্মীয়ের মতো।

এস আই ইউ’তে আসার পরেই রবীন্দ্রজয়ন্তী করেছিলাম। মাঝখানে সীমা সরকার, তার একদিকে রত্না সিনহা, অন্যদিকে রবীন্দ্রনাথের ছবির সামনে বাংলাদেশের সুব্রত গোমেজ। তবলায় বাংলাদেশের একটি ছেলে – ফারুক না কী যেন নাম, আজ আর মনে নেই

জ্ঞানদার বাড়িতে আলাপ হলো বাংলাদেশের মেয়ে নাসীমের সঙ্গেও। রত্না ও নাসীম এই এতকাল পরেও বন্ধুই থেকে গেছে। আমার মেয়ের বিয়েতে নাসীম এসেছিলো। ও এখন রিটায়ার করার পরে থাকে ফ্লোরিডায়। সেখানে ওর মেয়ে নাইরীন থাকে, সে এখন ডাক্তার। ভাবলেই অবাক লাগে। তিন কি চার বছর বয়স থেকে ওকে দেখেছি।

নাইরীন আর আমার মেয়ে একেবারে আক্ষরিক অর্থে এক বয়সী – জানা গেলো ওদের দুজনের জন্মদিন এক। নাসীম পিটসবার্গে পড়াশোনা করে এস আই ইউ’তে ফরেন স্টুডেন্টস অফিসে চাকরি নিয়ে এসেছে। রত্না তখন কেবলই হোমমেকার। কিন্তু পরে পিএইচডি ডিগ্ৰী করে এস আই ইউ’র গ্র্যাজুয়েট স্কুলে, অর্থাৎ মাস্টার্স ও ডক্টরেট ছাত্রছাত্রীদের জন্যে যে আলাদা অ্যাডমিনিস্ট্রেটিভ ডিপার্টমেন্ট আছে, সেখানে রত্না ডীন হয়ে বহু বছর কাজ করেছে। এখন সেও রিটায়ার্ড।

আমার মেয়ে নন্দিনী ও নাসীমের মেয়ে নাইরীন। ওদের জন্মদিন একই দিনে, একই বছরে

জ্ঞানদার সৌজন্যে আরো আলাপ হলো কলকাতার বাঙালি দম্পতি বিকাশদা ও শিপ্রাদির সঙ্গে। দুজনেই বেশি বয়সে ছাত্র ও ছাত্রী হয়েছেন। আমাদের থেকে অন্ততঃ পাঁচ সাত বছরের সিনিয়ার। ওদের মেয়ে তখনই বোধহয় পনেরো ষোলো বছরের। আর ছেলে হয়তো দশ কি বারো। প্রবল সংগ্রাম করে যাচ্ছে পুরো ফ্যামিলিটা।

জ্ঞানদার বাড়িতে আরো আলাপ হলো বাংলাদেশ থেকে আসা বাবলুদার সঙ্গে। বাবলুদা অর্থাৎ আহরার আহমেদ। পলিটিকাল সায়েন্স পিএইচডি ছাত্র। নানা বিষয়ে সুপণ্ডিত। আমাদের একটা বিউটিফুল স্টুডেন্ট কমিউনিটি আস্তে আস্তে গড়ে উঠতে লাগলো। এছাড়া, ওদিকে টেনেসীতে মুনমুন-রবিদার ফ্যামিলি, আর বিভাস-শুক্লার কেন্টাকির ফ্যামিলি তো আছেই। একেবারে নতুন আসা ফ্যামিলি প্রদীপ ঘোষ আর তার বৌ সর্বানী ঘোষও আমাদের খুব বন্ধু হয়ে গেলো।

শিপ্রাদি ও বাবলুদা অর্থাৎ আহরার আহমেদ, আমাদের বাড়িতে

আমাদের নতুন পুরোনো গাড়ি নিসান সেন্ট্রায় চড়ে একবার আমরা রওনা দিলাম সেন্ট লুইস শহরে কোনো এক উইকেণ্ডে। সেখানে দুর্গাপুজো কমিটি পুজোর পরে আমেরিকায় ভ্রমণরত ভূপেন হাজারিকাকে নিয়ে এসেছে গান গাইবার জন্যে। সেই দেশ ছাড়বার পরে এই প্রথম দেশের কোনো শিল্পীর গান শোনা। নিজেরা গানবাজনা করতে ভালোবাসি। গানের অনুষ্ঠান হলেই আমরা আছি। রত্না, তেজেনের বউ সীমা, বাংলাদেশের সুব্রত গোমেজ এদের কয়েকজনকে নিয়ে রবীন্দ্রজয়ন্তীও আমরা করেছি।

কিন্তু ভূপেন হাজারিকা? খবর পেয়ে সবাই মিলে ছুটলাম। অর্থাৎ, একশো মাইল যাওয়া, একশো মাইল ফিরে আসা গান শুনে আর হাজারিকার সঙ্গে একটু আলাপ পরিচয় সেরে। রাত বারোটায় সবাই মিলে কার্বনডেলে ফিরে আসা হলো।

সেন্ট লুইসে ভূপেন হাজারিকা গান গাইছেন

সাদার্ন ইলিনয়তে পড়ার সময়ে পৃথিবীর হাজার দেশের দরজা খুলে গেলো চোখের সামনে। আমার ছোট্ট মেয়ে প্রথমে রেখার কাছে, তারপর নেপাল থেকে আসা পরিবারের কর্ত্রী রচনার কাছে থাকতে আরম্ভ করলো। তখনও ওকে আমরা আমাদের স্কুলেরই নিজস্ব ডে কেয়ারে পাঠাতে শুরু করিনি, কারণ সেখানে একটা নির্দিষ্ট বয়সের আগে পাঠানো যায় না। এক বছর বয়স থেকেই আমাদের মেয়ে বাড়ির বাইরে অন্য পরিবারের মায়েদের কাছে থেকেছে। বোধহয় দুই কি তিন বছর বয়স থেকে তাকে আমরা নিয়ে গেলাম এস এই ইউ’এর পরিচালনায় ছাত্রছাত্রীদের ছেলেমেয়েদের রাখার ক্রেশে।

আমরাও দুবছর সেই পুরোনো অ্যাপার্টমেন্ট কমপ্লেক্স সাদার্ন হিলস ছেড়ে দিয়ে নতুন গড়ে ওঠা ঝকঝকে কমপ্লেক্স এভারগ্রীন টেরেসে উঠে গেলাম। তখন বোধহয় ঊনিশশো নব্বই।

আমেরিকাতে পাঁচ বছর কেটে গেলো। দেশে এখনো যেতে পারিনি। মাসে মাসে পঞ্চাশ কি একশো ডলার পাঠাই বাবার ঠিকানায়।

ওরাও আমাদের বেহালার সেই বিরাট ফ্ল্যাট ছেড়ে দিয়ে পুরোনো পাড়ায় গোয়াবাগান মানিকতলার সেই দেড়তলার রাস্তাছোঁয়া ফ্ল্যাটে ফিরে গেছে।

অর্থাভাব ওখানেও।

(চলবে)

*আমেরিকা-জীবনের দীর্ঘ অভিজ্ঞতা নিয়ে প্রখ্যাত মানবধিকার কর্মী ডঃ পার্থ বন্দ্যোপাধ্যায়ের কলামে চলছে ‘মেরিকামায়া সাতকাহন’।

ধারাবাহিকভাবে প্রতি শুক্রবার সন্ধে ৬টায় প্রকাশিত হচ্ছে শুধুমাত্র বঙ্গদর্শন-এ।

‘মেরিকামায়া সাতকাহন’-এর সমস্ত পর্ব পড়তে এখানে ক্লিক করুন।

Developed by DXDasia