
ডঃ পার্থ বন্দ্যোপাধ্যায়ের আমেরিকা-জীবন এবং স্বপ্ন-দুঃস্বপ্ন – পর্ব ৩২
পড়াশোনা আর পলিটিক্সের বাইরেও একটা জীবন থাকে। আমারও ছিল।
সেই যে ঘটিকাহিনির একেবারে শুরুতে বলেছিলাম, “ডুব ডুব ডুব রূপসাগরে আমার মন, তলাতল পাতাল খুঁজলে পাবি রে সে রত্নধন।”
এই খোঁজা চলেছে আমেরিকার এই প্রায় চার দশকের জীবন ধরে।
গান আমার জীবনে একটা বিরাট স্থান অধিকার করে থেকেছে চিরকাল। গান, সিনেমা, সাহিত্য। দেশ থেকে দশ দিনের নোটিশে সবকিছু ছেড়ে, পিছনে ফেলে চলে আসবার সময়ে সঙ্গে ছিল কয়েকটা মাত্র ক্যাসেট, একটা পুরোনো আদ্যিকালের প্যানাসোনিক টেপ রেকর্ডার কাম ক্যাসেট প্লেয়ার – যা অনেকটা আড়াইশো পাতার একটা বইয়ের সাইজের, আনন্দ পাবলিশার্সের সেই লাল মলাটের সবুজ চোখ টেপা বেড়ালের ছবি দেওয়া সুকুমার সাহিত্যসমগ্র, আর আমার সেই বহু পুরোনো মলাটের কোণ ছেঁড়া দু খণ্ডের গীতবিতান।
গান আমার সঙ্গে ছিল সেই প্রথম দিন থেকেই। রামকুমার চট্টোপাধ্যায় আর হেমন্ত মুখোপাধ্যায়ের গানের কথা আগেই বলেছি। আর কী কী ছিল, ঠিক মনে পড়ে না আর এতকাল পরে। তবে, একটা ক্যাসেটে মুক্তির গাওয়া একটা রবীন্দ্রসঙ্গীত, আমার আমার বাবার রেকর্ড করে দেওয়া পাড়ার ফেরিওয়ালাদের ডাক সঙ্গে করে নিয়ে এসেছিলাম। মন খুব খারাপ হলে বাজিয়ে বাজিয়ে শুনতাম সেই মিসেস হ্যারিসনের ভাড়াবাড়িতে দোতলার তালা দেওয়া যায় না যে ঘরে, তার বিছানায় শুয়ে শুয়ে।
আর ছিল মন খারাপ হলে চোখ বন্ধ করে গান। রবীন্দ্রনাথের গান তো ছিলোই। সৌমিত্র জুটে যাবার পর দুজনে মিলে মিল খুঁজে খুঁজে গান গাওয়ার কথাও আগেই লিখেছি। ওই যে পরে যার নামকরণ হয়েছে অন্ত্যাকশারি। আমাদের বড়ো হওয়ার সময়ে আমরা বাংলাতেই গানের লড়াই বলতাম তাকে। আজকের মতো বাঙালির দিবারাত্র হিন্দি বলার ফ্যাশন তখনও শুরু হয়নি।
তার সঙ্গে ছিলেন নজরুল ইসলাম, অতুলপ্রসাদ সেন, রজনীকান্ত, দ্বিজেন্দ্রলাল। ছিলেন সলিল চৌধুরী। এঁদের গান আমাকে সেই দুর্বিসহ নিঃসঙ্গতায় বেঁচে থাকতে সাহায্য করেছে এই প্রবাসজীবনে। বহুকাল, বহুকাল পর অনুজপ্রতিম বন্ধু প্রতীক ঘোষের অডিও পোর্টাল জাস্টোরি ডট কমে আমি তৈরি করে দিয়েছিলাম বাংলা গানের লম্বা একটা সিরিজ। রবিঠাকুর আর এই পাঁচ প্রবাদপ্রতিম বঙ্গসন্তানের গান নিয়ে এপিসোড তৈরি করে দিয়েছিলাম প্রতীককে।
কিছু কিছু বিশেষ গান কেমন করে যেন সারাজীবন সঙ্গে আলাদাভাবে লেগে থেকেছে। যখন বিদেশে বন্ধু আর সমাজ, সোসাইটি জুটিয়ে গান গাইবার ফুরসৎ হলো, তখন সেই গানগুলো বারবার করে ফিরে ফিরে এসেছে। যখন তারও অনেকদিন পরে কলকাতায় ফিরে গিয়ে গানের সিডি করার অবকাশ হলো, তখনও সেই গানগুলো বিশেষভাবেই প্রথম তালিকায় স্থান পেয়েছে।
কেন এমন হয়, জানি না।
সেই যে আইওয়া ইউনিভার্সিটির স্টুডেন্ট অ্যাপার্টমেন্টে গিয়ে কয়েকজন বঙের ঘরে সন্ত হেমন্তের “শুধু তোমার বাণী নয় গো হে বন্ধু হে প্রিয়” শুনেছিলাম, সেই গানটা কোথায় যেন এক সুপ্ত অবচেতনে ডুবে ছিল বহুকাল। কোভিড অতিমারী শুরু হওয়ার ঠিক আগে কলকাতার সেই সময়কার জনপ্রিয় টিভি অনুষ্ঠান “ভালো আছি ভালো থেকো”তে ঊর্মিমালা বসু আমাকে নিয়ে এক সাক্ষাৎকার করলেন। মেরিকামায়ার গোড়াপত্তন হয়তো সেখানেই হয়েছিল। আমেরিকায় কেমন করে আমাদের জীবন কেটেছে, কাটছে, তাই নিয়ে এক ঘণ্টার আড্ডা।
আড্ডা শেষ হওয়ার মুখে ঊর্মিদি যখন বললেন, “পার্থ, একটু গান শোনাবে না আমাদের শ্রোতাদের?” তখন আর মাত্র তিরিশ সেকেণ্ড বাকি। কিছু না ভেবেই গেয়ে দিলাম “শুধু তোমার বাণী নয় গো হে বন্ধু হে প্রিয়।”

টিভিতে আমার ইন্টারভিউ সঙ্গে উর্মিমালা বসু
কেমন করে যেন ডুবে থাকা সেই অতলের রত্ন ভেসে উঠলো মনের ওপরের স্তরে। নিশ্চয়ই এভাবেই বহু বহু পুরোনো স্মৃতি অবচেতনে ডুবে থাকে আমাদের। আর স্নেহের পরশ পেলেই মাঝে মাঝে প্রাণে পরশখানি দিয়ে যায় কোন এক অদৃশ্য দেবতা।
এছাড়া কোনো ব্যাখ্যা আর আমি খুঁজে পাই না এ রহস্যের।
অন্তর্মুখিতা থাকে। বাংলার খোলা হাওয়ায় বড় হওয়া একটা ছেলের থাকে কবিতা আর কবিত্ব। থাকে যেমন রবীন্দ্রনাথ, বিভূতিভূষণ, মানিক, প্রভাতকুমার আর শরৎচন্দ্রের মানবিকতা, আর পরশুরাম, মুজতবা আলী আর লীলা মজুমদারের হাস্যরস, তেমনই সঙ্গে থাকেন জীবনানন্দ, সুনীল-শক্তি, নীরেন্দ্রনাথ, বুদ্ধদেব বসু, প্রেমেন্দ্র মিত্র আর শঙ্খ ঘোষ।
থাকেন আমাদেরই মতো নিঃসঙ্গতায় দীর্ঘকাল আমেরিকায় কাটানো অমিয় চক্রবর্তী।
আর সঙ্গে থাকেন দেবব্রত বিশ্বাস, হেমন্ত মুখোপাধ্যায়, সুচিত্রা মিত্র, শান্তিদেব ঘোষ। মানবেন্দ্র মুখোপাধ্যায় স্বপ্নে আসেন তাঁর নজরুলগীতি নিয়ে, বাগিচায় বুলবুলি উড়িয়ে দেন তিনি। কৃষ্ণা চট্টোপাধ্যায় আসেন তাঁর অতুলপ্রসাদ রজনীকান্তের দ্বিজেন্দ্রলালের গান নিয়ে।
এম এস শুভলক্ষ্মী স্বপ্নেই গেয়ে যান পতিতোদ্ধারিনি গঙ্গে। সেই কবে সদ্যপ্রয়াত বন্ধু সুবীর গাঙ্গুলির সঙ্গে রাতজাগা আসরে শোনা সুনন্দা পট্টনায়কের জগন্নাথস্বামী নয়নপথগামী ভবতু মে। ওই যেন আরেক স্বপ্নে শোনা যাচ্ছে গুরুর গুরু কেরামাতুল্লাহ সাহেবের তবলা, আর সঙ্গে বাজছে সামনে বসে শোনা ঋষি রবিশঙ্কর আর আলী আকবর।
সেই একেবারে বাল্যকালে হঠাৎ কেমন করে যেন বর্ধমানের মহারাণীর কলকাতার প্রাসাদের একতলার ঘরে শ্যামল মিত্র গান গেয়ে যাচ্ছেন একটানা। কে সি দাসের এসপ্ল্যানেডের দোকানের সামনে ফুটপাথে চেয়ারে বসে গাওয়া চিন্ময় চট্টোপাধ্যায়ের গান। রবীন্দ্রসদন প্রাঙ্গণে পঁচিশে বৈশাখ ফ্রী অনুষ্ঠানে কাজী সব্যসাচী আবৃত্তি করছেন, “দাও সূর্য দাও আলো দাও অমৃত মৃতজনে দাও ভীতচিতজনে শক্তি অপরিমাণ হে সর্বশক্তিমান।”
গোয়াবাগান পার্কের সেই খোলা জায়গাটায় হেমন্ত মুখোপাধ্যায় গাইছেন সেই অশ্রুবারির প্রথম গান “মনে রবে কিনা রবে আমারে।”
আমাকে কি কারুর মনে রবে? আমার ভারতবর্ষের শৈশব, বাল্য, কৈশোর, প্রথম যৌবন কি ব্যর্থ হবে?
আমি চলে এসেছি দেশ ছেড়ে, সমাজ সংসার মিছে সব মিছে কলরবের সেই প্রথম কুড়ি পঁচিশটা রঙিন বছর আর বন্ধু ছেড়ে। কীসের সন্ধানে এসেছি, আমি জানি না। ঈশ্বর, নিয়তি, পূর্বজন্ম পরজন্ম কিছুই আমার মনে তেমন দাগ কাটে না। আমি এসেছি দূর প্রবাসে – নতুন পথের সন্ধানে। আমি হৃদয়েতে পথ কেটেছি। আমি জেনেছি পথের ঠিকানা পাওয়া যাবে নতুন পথে চলার দাগে। মনোরথে ঠিকানা খুঁজে পাওয়া যাবে একদিন, এই আশায়।
রবার্ট ফ্রস্টের সেই কবিতা যেন আমার জীবনে শেষ সত্য।
Two roads diverged in a wood, and I —
I took the one less traveled by,
And that has made all the difference.
আমি আছি আমার মনে। আপনারই সন্ধানে।
আমার মনের মাঝে যে গান বাজে, শুনতে কি পাও গো?
আমার মনের মাঝে যে গান বাজে শুনতে কি পাও গো
আমার চোখের পরে আভাস দিয়ে যখনি যাও গো।
রবির কিরণ নেয় যে টানি ফুলের বুকের শিশিরখানি,
আমার প্রাণের সে গান তুমি তেমনি কি নাও গো?
প্রাণের গান প্রাণের বীণায় বেজে চলেছে সারাটা জীবন। সে গান শোনার ইচ্ছে কারুর তেমন হয়নি। আমিও গান গাইনি তাদের সভায়।
যারা মন দিয়ে শোনার, জানার চেষ্টা করেছে, তাদের জন্যে আমি গান গেয়েছি।
তাদের জন্যেই আমি এ গান গেয়ে যাবো সারা জীবন ধরে।
পশ্চিম কেন্টাকির পাডুকা নামক ছোট্ট শহরে থাকতো বিভাস ঘোষ আর তার স্ত্রী শুক্লা। আর তাদের দুটো ছোটো ছোটো ছেলে বিতান আর সায়ন। কেমন করে যেন তাদের সঙ্গে আলাপ হয়ে গেলো। এবং সেই শুরু হলো তাদের বাড়িতে আসা যাওয়া। আর গান গাওয়া।
শুক্লা গানের ভক্ত। নিজেও অতুলপ্রসাদ রজনীকান্তের গান গায় চমৎকার, কৃষ্ণা চট্টোপাধ্যায়ের ঢঙে। “জাগাও পথিকে ও সে ঘুমে অচেতন।” “একা মোর গানের তরী ভাসিয়েছিলেম নয়নজলে।" "তোমারি দেওয়া প্রাণে তোমারি দেওয়া দুখ, তোমারি দেওয়া বুকে তোমারি অনুভব।”
আমরা আমাদের শিশুকন্যাকে নিয়ে প্রথমে চলে যেতাম ওদের বাড়ি দেড় ঘণ্টা ড্রাইভ করে। সেখানে একরাত থেকে উইকএন্ডের পরের দিন আরো একঘণ্টার পথ অতিক্রম করে চলে যেতাম পশ্চিম টেনেসীর জ্যাকসনে মুনমুনদের বাড়ি।
টেনেসীর জ্যাকসনে মেয়ে আর একটু বড় হবার পর। মুনমুন-রবিদার ছেলে ও মেয়ের সঙ্গে
শুক্লাদের বাড়ি একটা হারমোনিয়াম ছিল। রাত দুটো তিনটে পর্যন্ত গান গাইতাম আমরা।
চোখ বন্ধ করে গান গাইতাম বলে আমার নাম হয়ে গেলো অন্ধ গায়ক।
ও হ্যাঁ, বলতে ভুলে গেছি, আমাদের তখন নতুন একটা পুরোনো গাড়ি হয়েছে। মেরুন রঙের নিসান সেন্ট্রা আমাদের পক্ষীরাজ। এবারে আর ঊনিশশো সত্তর নয়। একেবারে ঊনিশশো আশি মডেল। এক ইরানিয়ান ছাত্র বিক্রি করে দিলো আমাদের। আড়াই হাজার ডলার। রীতিমতো বড়োলোক তখন আমরা। সব মিলিয়ে আটশো ডলার রোজগার মাসে মাসে।
আমাদের নতুন নিসান সেন্ট্রা গাড়ি
দুশো পঁচাত্তর ডলার দিয়ে কেনা সেই বীরবিক্রম ভ্যালিয়েন্ট পথে বসে যাওয়ার পরেও একজন মার্কিন ভদ্রলোক এসে তিনশো পঞ্চাশ ডলার দিয়ে সে গাড়ি কিনে নিয়ে গেলেন একদিন। বললেন, তিনি নাকি ইঞ্জিনটা খুলে নিয়ে অন্য কোন কাজে লাগাবেন।
পলিটিক্স আর পড়াশোনা তো ছিলই। এবারে পেলাম পুঁজিবাদের প্রথম পাঠ।
(চলবে)
ধারাবাহিকভাবে প্রতি শুক্রবার সন্ধে ৬টায় প্রকাশিত হচ্ছে শুধুমাত্র বঙ্গদর্শন-এ।
‘মেরিকামায়া সাতকাহন’-এর সমস্ত পর্ব পড়তে এখানে ক্লিক করুন।


