
ডঃ পার্থ বন্দ্যোপাধ্যায়ের আমেরিকা-জীবন এবং স্বপ্ন-দুঃস্বপ্ন – পর্ব ৩১
এ স্মৃতিকথার বাইশ নম্বর পর্বে আমি লিখেছিলাম, “আমাদের ছমাসের মেয়ে বলতে গেলে এর আগে কখনো কোনো বাঙালিকে দেখেনি। বলতে গেলে, আমরাও দেখিনি। একটা ব্যতিক্রম ছাড়া। তাদের কথা না বললে এ গল্প অসম্পূর্ণ থেকে যাবে।”
সে ছিল সেই অতি ক্ষুদ্র নর্ম্যাল শহরে আর তার ইলিনয় স্টেট ইউনিভার্সিটির গল্প। সেখানে বাঙালি বলতে ছিল আমার সঙ্গে একই প্লেনে কলকাতা থেকে আসা সুনীতা বসু, আর বাংলাদেশ থেকে আসা উচ্চিংড়ে আণ্ডারগ্র্যাজুয়েট ছাত্র আবু হায়দার। দুজনেই বিত্তবান পরিবার থেকে আসা। আমার মতো হতদরিদ্র ঘর থেকে উঠে আসা তারা নয়।
সুনীতার বাবা ছিলেন ঊষা সেলাইকল কারখানায় বড়ো অফিসার, আর আমার বাবা সেখানেই কাজ করতেন সামান্য বেতনে। তাঁর সাহায্য ছাড়া বলতে গেলে আমি আমেরিকায় আসার প্লেনের টিকিটই কাটতে পারতাম না, কারণ কোনো ধারণাই আমার ছিলো না। পাসপোর্ট করাতে গিয়েই কলকাতার পুলিশ আমাদের বেহালার বাড়িতে এসে আমার কাছে ঘুষ চেয়েছিলো, এখনো মনে আছে। আমি উঠে এসেছিলাম একেবারেই রাস্তার ধুলো থেকে।
সেদিক থেকে সুনীতা আর আবু অতি স্বচ্ছল পরিবারের সন্তান। যেমন অধিকাংশ ছেলেমেয়ে আমেরিকায় আসে স্বচ্ছল পরিবার থেকে। যখন শিকে ছিঁড়লো আমেরিকায় পড়তে আসার, তখন কলকাতার ইউ এস এডুকেশনাল ফাউন্ডেশনের অফিসে একটা ওয়েলকাম টু আমেরিকা জমায়েত হলো। সেখানে গিয়ে দেখি, যারা যারা এবারে যাচ্ছে আমার মতো, সুনীতার মতো, তাদের নব্বই শতাংশই ধনী ঘরের ছেলেমেয়ে, এবং দেখে মনে হলো, আমেরিকায় যাওয়ার জন্যে এরা তৈরি হয়েছে বহুকাল থেকে। তাদের কথাবার্তা, চালচলন, পোশাক, হাসি সবকিছুর কায়দাই আলাদা।
আমার মতো গোরাচাঁদ বসু রোড আর পেয়ারাবাগানের মদের গলির দেড়তলা মেজেনাইন ফ্ল্যাট থেকে কেউ উঠে আসেনি। কারুর মা প্রায় বিনা চিকিৎসায় বেয়াল্লিশ বছর বয়সে ক্যানসারে মরে যায়নি।
আবু হায়দার শুধু যে ফ্যামিলির খরচে আইএসইউ’তে পড়তে এসেছিলো তাই নয়, ওই সেই চার বছরের বিশাল খরচ দেওয়ার পরেও দেখলাম, ওর বাবা, মা এবং বোন চট্টগ্রাম থেকে এসে ওর কাছে কিছুদিন কাটিয়ে গেলো। তাঁরা থাকতেন কোনো এক বাসা ভাড়া করে, কারণ স্টুডেন্ট অ্যাপার্টমেন্টে অভিভাবকদের থাকার অনুমতি থাকে না। এমনিতে খুবই উষ্ণ, আন্তরিক পরিবার। মনে আছে, একদিন তাঁদের বাসায় আমাদের কয়েকজনকে ডেকে আবুর মা রান্না করে খাওয়ালেন। সেই ভীষণ নিঃসঙ্গতায় তাঁদের আমন্ত্রণ ঊষর মরুভূমিতে অতি সংক্ষিপ্ত একপশলা বৃষ্টির মতোই মনে হয়েছিল।

এরাই ছিল আমাদের পরিবারের মতো। কোনো এক শীতের দিনে আমার শিশুকন্যার সাথে শিপ্রাদি
তখনও আমি একাই থাকি। তারপর একদিন কীভাবে যেন হঠাৎ আলাপ হয়ে গেলো আর একটা বাঙালি পরিবারের সঙ্গে। বোধহয় যখন আমরা প্রথমবার আমেরিকায় দুর্গাপুজো দেখতে যাই রত্না ও তার পরিবারের সৌজন্যে – সে বোধহয় ঊনিশশো সাতাশি সালের অক্টোবর মাস – তখন সেই সেন্ট লুইস শহরে গিয়ে পরিচয় হয়েছিল একঝাঁক কলকাতার বাঙালির সঙ্গে। পরিচয় এমনই ঘনিষ্ঠ হয়ে গেলো যে সে দুর্গাপুজোর সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে নর্ম্যাল থেকে বেড়াতে যাওয়া আমি, সৌমিত্র ঘোষরায় আর রঞ্জন গুপ্ত, আর ওদিকে ওদের সেই যৌথ পরিবারের কয়েকজন মিলে আমরা হৈহৈ করে গান গেয়ে এলাম সবার সামনে। চুরাশির অক্টোবরে কলকাতায় শেষবারের মতো দুর্গাপুজো দেখেছি। সেই স্মৃতিমেদুরতা বয়ে বয়ে বেড়িয়েছি তিনটে বছর ধরে।

সেন্ট লুইসে দুর্গাপুজো ১৯৮৮ কিংবা ১৯৮৯। মাঝখানে রত্না সিনহা
আজ সাতাশিতে আবার বাঙালিত্ব, তার দুর্গাপুজো, ধর্মকে সঙ্গে রেখে কিন্তু মনকে ধর্মাক্রান্ত করতে না দিয়ে রবীন্দ্রনাথ, নজরুল আর সলিল চৌধুরীর গান। সঙ্গে আমার ছোট্ট পরিবার। আমি গান গাইছি দলের সঙ্গে, আর আমার বউ কাছেই বসে গান শুনছে। সঙ্গে আপাদমস্তক গরম চাদরে ঢাকা দেওয়া আমাদের কয়েক মাসের শিশুকন্যা।

সেন্ট লুইস দুর্গাপুজো ১৯৮৭। গ্রুপে গান। মাঝখানে কাজল, তার পাশে রঞ্জন
সেই শিশুকন্যা আজ কলাম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সংগীতে পিএইচডি ডিগ্ৰী লাভ করলো। হয়তো গানের সুর সেই সুপ্ত শৈশব থেকেই তার মনে প্রবেশ করেছিল। ভাষা আর চেতনা কোন বয়স থেকে শিশুর মনে গেঁথে যায়? এ বিষয়ে আমার গুরু ভাষাতাত্ত্বিক নোম চমস্কি বলতে পারবেন।
আলাপ করে জানলাম, বুলুদি, আর ওদের সেই তিন বোন ও তাঁদের পরিবারের সবাই নর্ম্যালের আশেপাশেই থাকেন। একটা পরিবার থাকে পিওরিয়া বলে একটা জায়গায়। সেখানে আমেরিকার বিখ্যাত কর্পোরেশন ক্যাটারপিলারের অফিস ও কারখানা। সেখানে ক্রেন তৈরি হয়। অনেক ভারতীয় ও বাঙালি সেখানে কাজ করেন। আর দুই বোন অঞ্জু ও বুলু তাঁদের পরিবার নিয়ে থাকেন আরো কাছে শেনোয়া বলে এক প্রায়-অদৃশ্য গ্রামে। সেখানে অঞ্জুর স্বামীর নিজস্ব ফ্যাক্টরি।
তখন আমার মাস্টার্স ডিগ্ৰী শেষ করার সময়। নিঃশ্বাস ফেলার অবকাশ নেই। তার ওপর দুশ্চিন্তা, এখানে তো শেষ হতে চললো, কিন্তু এর পর কী হবে? তখনও কার্বনডেলে আসার কিছুই ঠিক হয়নি। চিঠিপত্র দিয়ে যাচ্ছি — ফোন করে লং ডিস্টেন্স কথাবার্তা বলার মতো পয়সাও নেই, কায়দাকানুনও কিছু জানা নেই। আমাদের ইন্ডিয়ান স্টুডেন্ট এ্যাসোশিয়েশনের পাণ্ডা সেই সেকেণ্ড-হ্যাণ্ড মার্সিডিজ গাড়ি চালানো নরেন্দ্র গাওঁকারের কথা শুনে এসআইইউ’তে যোগাযোগ করতে শুরু করেছিলাম। জানতামনা জীবন কোন রাস্তায় আমাকে নিয়ে যাচ্ছে।

সেন্ট লুইসে দুর্গাপুজো ১৯৮৭। তবলায় আমি, গানে ভাস্কর মুখার্জী। হারমোনিয়ামে সৌমিত্র
তাও এক সন্ধ্যেতে সময় বের করে অঞ্জু বুলু ওদের বাড়ি চলে গেলাম সবাই মিলে। সবাই মানে আমাদের সেই থ্রী মাস্কেটিয়ার্স আমি ও আমার ফ্যামিলি, সৌমিত্র ও দেশ থেকে সদ্য আসা ওর বউ কাজল, আর সুনীতা। যথারীতি ভাত মাছ মিষ্টি, ও শেষে রবীন্দ্রনাথের গান।

সেন্ট লুইসে ভূপেন হাজারিকার গানের অনুষ্ঠানের শেষে আমরা
অনেকদিন পর্যন্ত এই পরিবারের সঙ্গে আমাদের যোগাযোগ ছিল। এ গল্পের বাকিটা পরে আবার বলা যাবে এখন।
এখন ফিরে আসি কার্বনডেল অধ্যায়ে।
ভোরবেলা যখন মুক্তি আর আমাদের মেয়ে নন্দিনী ঘুমিয়ে থাকে, তখন আমি ধড়াচূড়ো পরে বেরিয়ে পড়ি। ভারী জুতো একজোড়া কেনা হয়েছে কে-মার্ট বলে একটা সুপারমার্কেট থেকে। সস্তার তিন অবস্থা। জুতো সস্তা, কিন্তু এমন ভারী যে হাঁটাচলাই করা যায় না প্রায়। তার সঙ্গে মোটা জ্যাকেট শীতের হাত থেকে বাঁচার জন্যে। মাথায় উলের টুপি, হাতে মোটা দস্তানা।

নোম চমস্কির সঙ্গে
সূর্য তখনও ওঠেনি। আমি বীরবিক্রম ভ্যালিয়েন্টকে স্টার্ট দেওয়ার চেষ্টা করি। যদি কপাল ভালো থাকে, সে স্টার্ট নেয়। আমি গিয়ে পৌঁছোই বায়োলজি ডিপার্টমেন্টের পার্কিং লটে। সেখান থেকে একটু হাঁটলেই ফরেষ্ট্রী ডিপার্টমেন্টের বাড়ি। ওরা সব অপেক্ষা করে থাকে বাড়ির সামনে। এসআইইউ’এর লম্বামতো মেরুন রঙের ভ্যান। আমরা আট দশজন সে ভ্যানে চেপে চলে যাই ওদের রিসার্চ করার জায়গা একটা জঙ্গলে। সেখানে বিশাল বিশাল গাছ আছে আকাশপানে তুলে মাথা। আর আছে চারদিকে অসংখ্য পাইন গাছ।
পাইন বলতে নারায়ণ গঙ্গোপাধ্যায়ের সেই বিখ্যাত ছড়াটা উদ্ধৃত করার লোভ সংবরণ করতে পারলাম না।
“ওগো পাইন
ঝলমল করছে জ্যোৎস্না,
দেখাচ্ছে কী ফাইন!”
সে সময়ে অবশ্য এসব কৌতুক করার অবস্থা ছিলো না। বাঁচার সংগ্রাম চলেছে প্রতিনিয়ত। তাও মনে পড়ে, চারদিকে পাইন গাছের সমারোহ, আর কেমন একটা মিষ্টি মিষ্টি গন্ধ। চিরহরিৎ বৃক্ষের গা দিয়ে যে রজন ঝরে ঝরে পড়ে, তার সুবাসে চারদিক মাতোয়ারা। মাটিতে পড়ে আছে ঝরে পড়া বাদামি পাতার স্তূপ, আর অসংখ্য পাইন কোন। প্রতিদিনই আমি বেছে বেছে দু একটা কোন নিয়ে আসতাম আমার মেয়ের জন্যে।

সাদার্ন হিলসে আমাদের বাড়ির সামনে মেয়েকে ফুটবলের প্রথম পাঠ
চিনলাম নানারকমের ওক গাছ। কোনোটার নাম হোয়াইট ওক, কোনোটার নাম রেড ওক, কোনটার নাম পিন ওক, বার ওক। রজার অ্যান্ডারসন আগেই কিছুটা চিনিয়ে দিয়েছিলেন। এখন অবারটিন আর তাঁর পিএইচডি ছাত্র রে অলব্রাইটের কল্যাণে আরো চিনলাম। রে হলো এই প্রজেক্টের প্রধান ব্যক্তি – তার গবেষণার কাজে সাহায্য করার জন্যেই আমাদের কয়েকজনকে স্টুডেন্ট ওয়ার্কার হিসেবে কাজ দেওয়া হয়েছে। আমাদের গ্রুপে আছে শক্ত সমর্থ ছেলে হোসে। সে হণ্ডুরাস থেকে এসেছে।
ওক গাছগুলোর উপরের দিকে একটা যন্ত্র লাগানো আছে, আর মাটির কাছাকাছি আছে একটা ড্রামের মতো জিনিস। বৃষ্টির পরিমাপ করা হবে, এবং তার সঙ্গে সঙ্গে গাছের পাতার পরিমাপ ও ওজন।
এসব কাজের বিশদ ব্যাখ্যা আমি চাইনি কখনো, কারণ সে সময় আমার ছিলো না। অর্থ রোজগারের তাগিদে এ কাজ আমি নিয়েছি, এবং ফল সিমেস্টারে যখন আমার হাফ স্কলারশিপ ফুল স্কলারশিপ হয়ে যাবে, আমি সঙ্গে সঙ্গে এ কাজ ছেড়ে দেবো।
ভীষণ পরিশ্রমের কাজ। তার ওপরে আবার আছে ল্যাবরেটরিতে ফিরে গিয়ে রে অলব্রাইটকে তার গবেষণায় একটু একটু সাহায্য করা, এবং প্রধানতঃ বাসন মাজা। অর্থাৎ তার ফ্লাস্ক, বীকার সাবান দিয়ে ধুয়ে দেওয়া। আমেরিকা নামক দেশে এক ছাত্র আর এক ছাত্রের ল্যাব অ্যাসিস্ট্যান্ট হিসেবে কাজ করছে, এ কোনো নতুন কথা নয়। কিন্তু ভারতীয় ছাত্র তার মূল্য দিতে পারে না। আত্মসম্মানে লাগে। আমাদের শেখানো হয়েছে, তুমি উচ্চ, আর ওই যারা গরিব লোক তোমার ল্যাবরেটরিতে কাপ ডিশ ফ্লাস্ক ধুয়ে দিচ্ছে তারা নীচ।
রে ছিল বন্ধুর মতো। কিন্তু সে তখন পিএইচডি প্রায় শেষ করে এনেছে, আর আমি সবে ঢুকেছি। একটা দূরত্ব থেকেই গিয়েছিলো।
স্প্রিং টার্মের শেষে অবারটিন বললেন, “আমার মনে হয় সামারেও আমি তোমাকে কিছু স্টাইপেন্ড দিতে পারবো।”
যাক, আরো তিনমাসের জন্যে নিশ্চিন্ত। তবে, এই তিন মাসের জন্যে থাকলো শুধুমাত্র এই আড়াইশো টাকা। প্লান্ট বায়োলজি ডিপার্টমেন্ট দেবে শুধুই শুভেচ্ছা আর ভালোবাসা।
(চলবে)
*আমেরিকা-জীবনের দীর্ঘ অভিজ্ঞতা নিয়ে প্রখ্যাত মানবধিকার কর্মী ডঃ পার্থ বন্দ্যোপাধ্যায়ের কলামে চলছে ‘মেরিকামায়া সাতকাহন’।
ধারাবাহিকভাবে প্রতি শুক্রবার সন্ধে ৬টায় প্রকাশিত হচ্ছে শুধুমাত্র বঙ্গদর্শন-এ।
‘মেরিকামায়া সাতকাহন’-এর সমস্ত পর্ব পড়তে এখানে ক্লিক করুন।
