মেরিকামায়া সাতকাহন : দেশ ছেড়ে আমরা যারা চলে আসি, অনেকের কাছেই তারা ‘দেশদ্রোহী’

ডঃ পার্থ বন্দ্যোপাধ্যায়ের আমেরিকা-জীবন এবং স্বপ্ন-দুঃস্বপ্ন – পর্ব ২৯

অষ্টবিংশ পর্বের পর

সেই পাকিস্তানী ছেলেটাকে হারিয়ে যেতে দেখেছি। দুঃখ দুঃখ মুখ করে থাকতো, লড়াইটা ঠিকমতো করতে পারছিলো না। তার চোখে বিষাদ লেগে থাকতো সর্বক্ষণ। বিষাদ ছিল, আর ভয়ও ছিল।

আমরা যারা ভারত থেকে সে সময়ে এসেছিলাম, আমাদের আর কিছু না থাকুক, একটা দেশ ছিল। একটা রাষ্ট্র ছিল। হ্যাঁ, আমি ভবিষ্যতের কোনো রাস্তা খুঁজে পাচ্ছিলাম না বলে দেশ ছেড়ে চলে এসেছিলাম। ওই সিপিএম, ওই কংগ্রেস, ওই নকশাল, ওই গুণ্ডাবাজি, ভোট রিগিং, আর সবচেয়ে বড়ো কথা, অসম্মানের সমাজ। যেখানে প্রতিভার কোনো দাম নেই, ইন্টেলেকচুয়াল মোটিভেশনের কোনো দাম নেই। যেখানে গতানুগতিকতা মানুষকে পচা ডোবায় ডুবিয়ে মারে।

সবই ঠিক। কিন্তু তাও একটা দেশ ছিল আমাদের। ভারতবর্ষ নামে একটা গৃহ ছিল। “পতিতোদ্ধারিণী গঙ্গে” ছিল।

ইন্দিরা গান্ধীর হত্যাকাণ্ডের পরে দেশের তখন টালমাটাল অবস্থা। আমেরিকা আর সিআইএর মদতে দক্ষিণপন্থীরা ক্ষমতা দখল করার দিকে একটু একটু করে অগ্রসর হচ্ছে। কিন্তু তাও ভারতবর্ষ তখনও আছে। সার্বিক ইমপ্লোশন যাকে বলে, অর্থাৎ ভেতর থেকে ভেঙে টুকরো টুকরো হয়ে যাওয়া, তা তখনও শুরু হয়নি।

কিন্তু পাকিস্তানে সে অবস্থা নেই। সামরিক শাসন। মানুষের জীবনের মূল্য কানাকড়িও নয়। যেসব পাকিস্তানী ছাত্রছাত্রীরা দেশ চলে গেছে, তারা কেবলমাত্র আমার মতো ইন্টেলেকচুয়াল তাড়নায় যায়নি। একেবারে জীবন বাঁচানোর জন্যে গেছে। দেশে ফিরে গেলে তাদের বাঁচার সম্ভাবনা থাকবে কিনা, বলা যায়না। বিশেষ করে যারা কোনোভাবে রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত।

মোস্তাফিজ নামের ছেলেটাও হয়তো সেরকম। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বিশ্ববিদ্যালয়ে টিঁকে থাকতে না পারলে এদেশে বসবাস করা তার পক্ষে সম্ভব নয়, কারণ ভিসা থাকবেনা। হ্যাঁ, একা থাকলে তাও পরিচয়হীন, ডকুমেন্টহীন অবস্থায় হয়তো লুকিয়ে বেঁচে থাকতে পারবে — যেমন মেক্সিকো, হণ্ডুরাস, গুয়াতেমালা বা বাংলাদেশ থেকে কয়েক লক্ষ মানুষ বেঁচে আছে সুড়ঙ্গের মধ্যে লুকিয়ে থাকা কুকুর বেড়ালের মতো। ধরা পড়লেই নির্যাতন এবং বিতাড়ন। কিন্তু স্ত্রী পুত্রকন্যা নিয়ে সেভাবে বেঁচে থাকা একটা পাকিস্তানী ত্রিশোর্ধ্ব ছেলের পক্ষে প্রায় অসম্ভব।

স্বপ্ন যাদের সফল হয়নি, তারা হারিয়ে গেছে, ফুরিয়ে গেছে। কোনো ইতিহাসের পাতাতেই তাদের কোনো কথা কখনো লেখা হয়নি।

মঞ্জুলা বলে আর একটা ছাত্রী ছিল আমাদের বায়োলজি বিল্ডিংয়েই, সে বোধহয় নিচের তলায় ফিজিওলজি ডিপার্টমেন্টে এসেছিলো পিএইচডি করবে বলে। পাঞ্জাবের মেয়ে। সে কিন্তু ছিল হাসিখুশি, উষ্ণ বন্ধুতার হাত বাড়িয়ে দিয়েছিলো আমাদের দিকে। আমাদের ছোট্ট সংসারের বসার ঘরে প্রায়শই ডেকে আনা স্টুডেন্ট বন্ধুদের ডিনারে মঞ্জুলাও এসেছে। দেশের গল্প করেছে, বাবামায়ের দুঃখ, একাকীত্বের কথা বলেছে। ঠিক যেন আমাদেরই গল্প। আমাদের আর এক বন্ধু দম্পতি প্রদীপ আর সর্বানীর যখন ছেলে হলো, তখন আমাদের সঙ্গে গিয়ে হাসপাতালে বাচ্চাকে দেখে এসেছে বেলুন নিয়ে গিয়ে।

কোনো এক বন্ধুর নবজাতককে দেখতে হাসপাতালে। সামনে দীর্ঘাঙ্গী মঞ্জুলা

একদিন মঞ্জুলা আমার অফিসে এসে কাঁদতে লাগলো। পিএইচডি থিসিস লেখার যোগ্যতা অর্জন করার জন্যে যে কম্প্রিহেন্সিভ পরীক্ষা দিতে হয় আমেরিকার স্কুলে, যার কথা আমি পরে বিশদভাবে বলবো, সে পরীক্ষায় মঞ্জুলা উত্তীর্ণ হতে পারেনি। ওকে আর কোনো দ্বিতীয় সুযোগ দেওয়া হবে না। ওকে চলে যেতে হবে। এসআইইউ ছেড়ে। এবং সম্ভবতঃ দেশ ছেড়ে। ওর স্টুডেন্ট ভিসা আর থাকবে না।

মঞ্জুলার পিএইচডি হওয়ার স্বপ্ন শেষ হয়ে গেলো। আর সঙ্গে সঙ্গে শেষ হয়ে গেলো আমেরিকায় থাকার স্বপ্ন। এবং তার তীব্র হতাশা ও দুঃখ তো আছেই। সঙ্গে সঙ্গে আতঙ্ক এসে গ্রাস করেছে ওকে, কারণ দেশে ফিরে যেতে বাধ্য হবে সে, এবং সেখানে ফিরে যাওয়া মানে পরিবার পরিজন সমাজ বন্ধুদের কাছে প্রকাশ্য এবং গুপ্ত লাঞ্ছনা গঞ্জনা সহ্য করতে হবে এখন। আমাদের সমাজে ব্যর্থ হয়ে ফিরে আসার পর বিন্দুমাত্র সহানুভূতি নেই। বিশেষ করে দেশে ছেড়ে আমরা যারা চলে আসি, অনেকের কাছেই আমরা তখন দাগী আসামি – দেশদ্রোহী। আমরা “স্বার্থপরের মতো দেশের কথা, পরিবারের কথা, বাবামায়ের কথা, ভাইবোনদের কথা না ভেবে” বিদেশে চলে গিয়েছিলাম। এখন আবার ব্যর্থ হয়ে দেশে ফিরে এসেছি? ওহ, সমাজের লাঞ্ছনার হাড়িকাঠে বলি দেওয়ার এমন সুযোগ কি আর ছাড়ে কেউ?

রাষ্ট্র হয়তো আছে মঞ্জুলার মতো মেয়েকে আশ্রয় দেওয়ার জন্যে। মোস্তাফিজের পাকিস্তানের মতো বিস্ফোরক অবস্থা হয়তো নয়। কিন্তু ভারতীয় সমাজ ও তার ভেতরকার প্রতিদিনের ঈর্ষা, আক্রোশ, প্রতিশোধস্পৃহা? সেগুলো তো রয়েই গেছে। সেই গিলোটিনে ব্যর্থ হয়ে ফিরে আসা মঞ্জুলাদের জবাই করা হবেই হবে।

হয়তো সে মেয়েটা অন্য কোথাও গিয়ে পড়াশোনা করে, কাজকর্ম করে সফল হয়েছে। আমি তার খবর রাখিনা। কিন্তু সেই কান্নায় ভেঙে পড়া ওর মুখটা আমার এখনো মনে আছে। কয়েকদিনের মধ্যেই একটা জীবন অন্ধকারে তলিয়ে গেলো চোখের সামনে। 

এরকম আরো দেখেছি। আমাদের বিদ্যাসাগর কলেজের বোটানির বিভাগীয় প্রধান ডঃ দীপক গুপ্ত অর্থাৎ ডিকেজি স্যারের কোচিং ক্লাসের এমন সুনাম ছিল যে শুধু আমাদের কলেজের নয়, অন্য কলেজের ছেলেমেয়েরাও তাঁর কাছে সেই পাইকপাড়ার একতলার বাড়িতে আমাদের মতোই প্রাইভেট ক্লাসে পড়তে আসতো। স্কটিশ কলেজের ছাত্র তিলক আর ছাত্রী সুস্মিতা ছিল আমাদের থেকে দু তিন বছরের জুনিয়র। তারাও পড়তো। ঠিক যেমন পড়তো প্রেসিডেন্সি কলেজের স্টার ছাত্রী তপতী দত্ত। ডিকেজি যেতেন তপতীর সুকিয়া স্ট্রিটের বাড়িতে ওকে পড়াতে। এমএসসি পড়ার সময়ে আমিও তপতীর বাড়ি গিয়ে অনেক পড়াশোনা করেছি। তারপর… যাক সেসব কথা। ইচ্ছে হলে আমার দেশের স্মৃতিকথা ঘটিকাহিনি পড়ে নেবেন।

সেই তিলক আমি আমেরিকায় আসার দু এক বছর আগেই ফিলাডেলফিয়ার কাছে একটা ইউনিভার্সিটিতে আমার মতোই এমএস করতে এসেছিলো। তারপর, সুখী ও স্বচ্ছল পরিবারের ছেলেটা এদেশের নিষ্করুণ সমাজ ও একাকীত্বের যন্ত্রণা সহ্য করতে না পেরে দেশে ফিরে গেলো। এবং ফিরে গিয়ে ওখানে যে মানসিক যন্ত্রণার মধ্যে পড়লো, তার কথা আমি অন্যের মুখে শুনেছি।

তিলক আবার ফিরে এলো কয়েক বছর পরে আমেরিকায়। আমার সঙ্গে দু একবার ফোনে কথাও হয়েছে। ওর কষ্টের কথা আমাকে আভাসে ইঙ্গিতে জানিয়েছে। আরো অনেক কথা বলেছে এবং বলেনি। গোপনীয়তার খাতিরে ব্যক্তিগত কথা আমি এখানে লিখতে পারিনা। কিন্তু তিলক আজ এতো বছর পরে কীভাবে লড়াইটা করলো, এবং কীভাবে আবার এদেশে ফিরে এসে বেঁচে থাকলো, সে গল্পটা আমার জানতে ইচ্ছে করে।

তিলক ছিল আর্টিস্ট। আমি যেমন সেই ক্যাথি গাইস্টের কাছে ফিল্ম নিয়ে পড়াশোনার সুযোগ পেতে পারতাম, কিন্তু বুদ্ধি ও পরামর্শদাতার অভাবে করতে পারিনি, এবং বিজ্ঞান ছেড়ে অনেক বেশি প্যাশনের রাস্তায় পাকাপাকিভাবে চলে যাবার জন্যে বহু বছর অপেক্ষা করতে হয়েছিল, তিলক কিন্তু শুনেছি সে ভুল করেনি। শুনেছি ও নাকি দ্বিতীয়বার আমেরিকায় ফিরে আসার পরে আর্টিস্ট হিসেবেই জীবন শুরু করেছিল। যদিও শিল্পীদের জীবন, বিশেষ করে নামগোত্রহীন বিদেশী ইমিগ্রেন্ট একটা ছেলের আর্টিস্ট হিসেবে আমেরিকায় জীবন কাটানো মারাত্মক ঝুঁকির।

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র সহায়সম্বলহীন বিদেশীদের জন্যে কোনো মায়াদয়া দেখায় না। বিশেষ করে তৃতীয় বিশ্বের দেশ থেকে আসা অখৃস্টান অশ্বেতাঙ্গ “অদ্ভুত” নামের মানুষদের। পায়ের তলায় যাদের মাটি নেই, তাদেরও দেখায়না। আর আমাদের মতো প্রায় চল্লিশ বছর আমেরিকায় সাফল্যের সঙ্গে কাজ করা মানুষদেরও নয়।

মঞ্জুলাকে, মুস্তাফিজকেও দেখায়নি।

মার্কিন মিডিয়ার কল্যাণে এদেশের মানুষ আমাদের সম্পর্কে, আমাদের সভ্যতা, সংস্কৃতি, দেশ, ভাষা, ধর্ম সম্পর্কে প্রায় কিছুই জানে না।

আমাদের অবস্থাও মঞ্জুলা মুস্তাফিজদের মতোই হতে পারতো, যদি না সেই প্রথম স্কুল আইএসইউ’এর আড়াই বছর কামারের হাপরের আগুনে অবয়বহীন লোহা পুড়িয়ে পিটিয়ে মজবুত কাস্তে হাতুড়ি কুড়ুল কোদালে পরিণত না হতো।

তারপর সেই আগুন-গনগনে অবয়বে আশীর্বাদবারি সিঞ্চন করলেন কয়েকজন মানুষ। কয়েকজন শিক্ষক শিক্ষিকা, কয়েকজন সহকর্মী ছাত্রছাত্রী, আর বিদেশে পড়ে পাওয়া চোদ্দ আনা কয়েকটা বন্ধু পরিবার। যে বন্ধু পরিবারগুলো এই প্রবাসে দৈবের বশে জীবতারাকে খসে পড়তে দেয়নি। বাঁচিয়ে রেখেছে।

এদের কথা একটু একটু করে বলতেই হবে। এই বিদেশ বিভুঁইয়ের নিঃসংঙ্গতায় তারাই হয়ে উঠেছে আমাদের পরম আত্মীয়।

শিকাগোর বিশ্বদা, রেবেকা বৌদির কথা আগেই বলেছি। বলেছি টেনেসীর মুনমুন আর রবিদার কথা। এবারে বলবো এই কার্বনডেলের নতুন পাওয়া বন্ধু রত্না, নাসীম, আর বাংলাদেশ, ভারত, নেপাল থেকে আসা কয়েকজন বিশেষ বন্ধু আর বান্ধবীর কথা। আর তাদের পরিবারের কথা।

টেনেসীর জ্যাকসনে মেয়ে আর একটু বড় হবার পর। মুনমুন-রবিদার ছেলে ও মেয়ের সঙ্গে।

আমার মেয়ে নন্দিনী ও নাসীমের মেয়ে নাইরীন। ওদের জন্মদিন একই দিনে, একই বছরে

আর বলবো টেনেসী যাবার পথে পশ্চিম কেন্টাকিতে পাডুকা নামের আর একটা ঘুমন্ত ছোট্ট শহরে হঠাৎ পাওয়া বাঙালি বন্ধু বিভাস আর শুক্লার কথা।

আর তাদের বাড়ি গিয়ে রাতের পর রাত জেগে রবীন্দ্রসঙ্গীত গাওয়ার কথা।

(চলবে)

*আমেরিকা-জীবনের দীর্ঘ অভিজ্ঞতা নিয়ে প্রখ্যাত মানবধিকার কর্মী ডঃ পার্থ বন্দ্যোপাধ্যায়ের কলামে চলছে ‘মেরিকামায়া সাতকাহন’।

ধারাবাহিকভাবে প্রতি শুক্রবার সন্ধে ৬টায় প্রকাশিত হচ্ছে শুধুমাত্র বঙ্গদর্শন-এ।

‘মেরিকামায়া সাতকাহন’-এর সমস্ত পর্ব পড়তে এখানে ক্লিক করুন।

Developed by DXDasia