
ডঃ পার্থ বন্দ্যোপাধ্যায়ের আমেরিকা-জীবন এবং স্বপ্ন-দুঃস্বপ্ন – পর্ব ২
শ্রম শিক্ষা বিষয়ে বক্তব্য রাখছেন ডঃ পার্থ বন্দ্যোপাধ্যায়
পঁচাশিতে আমি এসেছি আমেরিকার মিডওয়েস্ট অঞ্চলের ইলিনয় স্টেট ইউনিভার্সিটিতে। এক বছর একা থাকার পর মুক্তি এসেছে ছিয়াশির আগস্ট মাসে অনেক কাঠখড় পুড়িয়ে, অনেক পারমিশন জোগাড় করে, অনেক কাগজে সই করে। আমি আর একা থাকতে পারছিলাম না। শিকাগোর বিশ্বদা, রেবেকা বৌদি, আর ওদের দুটো ছোটো ছোটো মেয়ের সঙ্গে মাঝে মাঝে দেখা হয়ে তাও একটু ভালো লাগতে আরম্ভ করেছিল।
মা তখন নেই। উনিশশো আটাত্তরে ক্যানসারে মাত্র কয়েকমাস ভুগেই চলে গেছে। থাকলে কী হতো জানি না। হয়তো বাধা দিত না। আমার একরোখা স্বভাব মা খুব ভালো করেই জানতো। আমার উচ্চাকাঙ্ক্ষার কথা মা জানতো। জেদ জানতো। কিছু একটা করতে শুরু করলে আমি যে শেষ দেখে ছাড়বো, তা জানতে মার বাকি ছিল না।
কিন্তু সেকথা পরীক্ষা করার জন্যে মা ততদিন আর থাকেনি। বাবা ছিল। বাবা খুব খুশি হয়েছিল যখন ইলিনয় স্টেট ইউনিভার্সিটি থেকে আমার সেই বহুমূল্য আই-টোয়েন্টি নামক ইমিগ্রেশনের কাগজপত্র এসে পৌঁছল। এই কাগজ দেখালে কলকাতার মার্কিন কনস্যুলেট আমাকে বিদেশি ছাত্রদের যে এফ-ওয়ান ভিসা দেয়, তা দিয়ে দেবে। বিশেষ করে ওদের যদি দেখানো যায় আমি একটা কলেজে পড়াই, আর কলেজ থেকে আমাকে কেবলমাত্র দু বছরের ছুটি দিয়েছে আপাতত একটা মাস্টার্স ডিগ্রী করার জন্যে, এবং আমি আমার স্ত্রীকে ফেলে ওদেশে যাচ্ছি, তখন ওরা নিশ্চিত হবে যে আমি পাকাপাকি ভাবে আমেরিকায় থেকে যাবার বাসনা নিয়ে যাচ্ছি না। সুতরাং, ভিসা না দেওয়ার কোনো কারণই থাকতে পারে না। ভিসা পেতে কোনো সমস্যাই হয়নি। দশ দিন না কি দু’সপ্তাহের মধ্যে সমস্ত গোছগাছ করে ভারত ছেড়ে, বাংলা ছেড়ে আমেরিকায় চলে এলাম। পিছনে তাকিয়ে দেখার, ভাবনাচিন্তা করার, কারুর সঙ্গে পরামর্শ করার সময় পাইনি। আমেরিকায় যাচ্ছি স্কলারশিপ নিয়ে পড়তে, সেই আনন্দ, গর্ব আর উত্তেজনায় আর কিছু তলিয়ে দেখার কথা মনে হয়নি।
যেটা আমি বুঝিনি সেটা হলো, আমার মত একটা ছেলেকে মার্কিন শিক্ষাব্যবস্থা — যা বিদেশী ছাত্রদের ওপর বিরাটভাবে নির্ভরশীল — কম পয়সায় খাটিয়ে নিতে পারবে।
আপত্তি একটু এসেছিলো আমার শ্বশুরবাড়ি থেকে। ওঁদের মধ্যে বাস্তববুদ্ধি অনেক বেশি ছিল। তাছাড়া ওঁরা সবাই বামপন্থী মনোভাবের, আর আমেরিকা-বিরোধী। কিন্তু আমার বিদেশে পড়তে যাবার সফলতা অর্জনের পথে ওঁরাও বাধা সৃষ্টি করেননি। মুক্তির মা অনেক চোখের জল ফেলেছিলেন। একমাত্র সন্তান। দেশভাগ, দাঙ্গা, সর্বস্ব খুইয়ে ঢাকা থেকে কলকাতায় চলে আসা। নতুন করে আবার জীবন শুরু করা। নিঃসীম দারিদ্র্যের সঙ্গে লড়াই করে দাঁড়িয়ে ওঠা। তারপর স্বামী, আর এই মেয়ে। এদের নিয়ে আবার এক নতুন জীবন গড়ে তুলেছিলেন নতুন আশায়। আবার সেই মেয়েকে পৃথিবীর উল্টোদিকে চলে যেতে হবে? সেকথা ভেবেই তাঁর দিশেহারা লাগছিলো। বাবা সংযত, গম্ভীর। মেনে নিয়েছিলেন। স্বার্থত্যাগ করেছিলেন, মেয়ে-জামাইয়ের আশা আকাঙ্ক্ষার পথে অন্তরায় হতে চাননি।
যেটা আমি বুঝিনি সেটা হলো, আমার মত একটা ছেলেকে মার্কিন শিক্ষাব্যবস্থা — যা বিদেশী ছাত্রদের ওপর বিরাটভাবে নির্ভরশীল — কম পয়সায় খাটিয়ে নিতে পারবে। আমাকে শুরুতে মাসে তিনশো আশি ডলার অ্যাসিসেন্টশিপ দেওয়া হবে। পড়ার খরচ ফ্রী। আণ্ডারগ্র্যাজুয়েট ছাত্রছাত্রীদের প্রাকটিক্যাল ক্লাস নিতে হবে। সেই দায়িত্বপালনের জন্যে প্রতি সপ্তাহে কুড়ি ঘণ্টা কাজ করতে হবে। অর্থাৎ, মাসে আশি ঘণ্টা। তিনশো আশি ডলারকে আশি দিয়ে ভাগ করলে কত হয়? ভাবাই যায়না! একটা সিনিয়র স্টুডেন্টকে উচ্চশিক্ষাতে কাজ করার জন্যে ঘণ্টায় পাঁচ ডলারও দিচ্ছে না। যেখানে বাড়িতে একটা ঘাস কাটার লোক লাগালে সেও ঘণ্টায় দশ ডলারের কমে কাজ করতে রাজি হবে না। কিন্তু আমরা বিদেশী ছাত্র। আমাদের ঠকানো এতো সহজ। আমরা কিছুই বুঝি না। এদেশে অর্থনীতি সম্পর্কে কোনো ধারণাই নেই।
তার ওপরে ছিলাম অধ্যাপক। সম্মান, শ্রদ্ধা, ছাত্রছাত্রী। আবার হয়ে গেলাম পরিচয়হীন বিদেশী ছাত্র।
আমরা যারা একেবারে আনকোরা নতুন, তাদের ঠকানো তো আরো সহজ। আমেরিকায় পড়তে যেতে দিচ্ছে, তাতেই আমরা আহ্লাদে আটখানা। যেন, লটারির প্রাইজ জিতেছি। অহংকারের আর শেষ নেই।
তিনশো আশি ডলারে মাস চলে নাকি আমেরিকায়? সে যতই পড়ার খরচ দিক না কেন। বাড়িভাড়া, বই খাতা কেনার খরচ, খাওয়ার খরচ— সবকিছু তিনশো আশি ডলারে কেমন করে হয়? ডিপার্টমেন্ট বা ইউনিভার্সিটির বাইরে কোনো কাজও নিতে পারবে না। নিলে তা আইনবিরুদ্ধ হবে। কিন্তু, আমরা জানিই না ওদেশের মূলস্রোত আমেরিকানদের ওরা কত দেয়, আর আমাদের মত বিদেশী ছাত্রদের কত দিচ্ছে। আমরা যারা একেবারে আনকোরা নতুন, তাদের ঠকানো তো আরো সহজ। আমেরিকায় পড়তে যেতে দিচ্ছে, তাতেই আমরা আহ্লাদে আটখানা। যেন, লটারির প্রাইজ জিতেছি। অহংকারের আর শেষ নেই।
ইলিনয় স্টেট ইউনিভার্সিটি
ইলিনয় স্টেট ইউনিভার্সিটি, নরমাল টাউন। বিশ্ববিখ্যাত শিকাগো শহর থেকে একশো মাইল দক্ষিণে মধ্য ইলিনয়। সেন্ট্রাল ইলিনয়। সেই রবীন্দ্রনাথের বীরপুরুষ কবিতার লাইনের মতো, “ধূ ধূ করে যেদিকপানে চাই, কোনোখানে জনমানব নাই।” অন্ততঃ, বাঙালি একেবারেই নাই। মিডওয়েস্ট আমেরিকার ব্রেড বাস্কেট কর্নফিল্ড। যোজনব্যাপী ভুট্টার ক্ষেতের মধ্যে দিয়ে রাস্তা চলে গেছে, তার মাঝে মাঝে দু’একটা ছোটোছোটো শহর। নরমাল-ব্লুমিংটন, পিওরিয়া, আর্বানা-শ্যাম্পেন, আরো একটু ভেতরের দিকে আব্রাহাম লিঙ্কনের স্মৃতিবিজড়িত স্প্রিংফিল্ড — ইলিনয় রাজ্যের রাজধানী। কিন্তু ছোট্ট শহর।
আরো অনেক দক্ষিণে, প্রায় তিনশো মাইল দক্ষিণে সাদার্ন ইলিনয় ইউনিভার্সিটি টাউন কার্বনডেল। ইলিনয় স্টেট ইউনিভার্সিটি বা আই এস ইউ থেকে সাদার্ন ইলিনয় ইউনিভার্সিটি বা এস আই ইউ চলে গিয়েছিলাম এখান থেকে মাস্টার্স ডিগ্রি করার পর পিএইচডি করার জন্যে। সে গল্প পরে বলা যাবে।
কী ভয়ঙ্কর শীত এই সেন্ট্রাল ইলিনয়তে! চারদিকে বরফ জমে আছে। শিকাগোর দক্ষিণে সাবার্ব টাউন লাইল। একদিকে লাইল, আর একদিকে ভারতীয় অধ্যুষিত মাঝারি মাপের শহর নেপারভিল। গুজরাটি ইন্ডিয়ানদের বসতি আমেরিকানদের মাঝে। লাইল ক্ষুদ্র জনপদ। সেখানে নির্জন, নিরিবিলি রাস্তা নর্থ ক্লোভার ড্রাইভে বিশ্বদার — বিশ্বপ্রসাদ নাথের বা স্থানীয় ইন্ডিয়ানদের মধ্যে যার নিকনেম বব আঙ্কেল — তার একতলা বাড়ি। যখন যাই, দু একদিন থেকে আসি। পিওরিয়া চার্টার বলে একটা বাস ছাড়ে আমাদের স্কুলের লাইব্রেরীর সামনে থেকে, সেই বাসে চড়ে দশ ডলার ভাড়া দিয়ে চলে যাই। দুঘণ্টার রাস্তা। বাস স্টপ থেকে বিশ্বদা ওদের নীলরংয়ের বিউইক গাড়িতে করে নিয়ে যায়।
কেমন যেন একটা মমতা মাখানো ওদের ছোট্ট বাড়িটা। বাড়ির পিছনে একটু খোলা জায়গা, সেখানে একটা বিরাট মেপল গাছ ব্যাকইয়ার্ডের ঠিক মাঝখানে। যেন বাড়ির প্রহরী। চারদিকে বরফের মোটা চাদর বিছানো। বাড়ির ভেতরে গুমগুম করে হিটার চলার শব্দ। শীতকালে সমস্ত দরজা জানালা বন্ধ। ভীষণ শীত। বাথরুমের মেঝেটায় কার্পেট নেই। বাঙালিদের বাথরুমে কার্পেট থাকে না। আমরা জল ফেলি। মুছি। সেই একটুখানি কার্পেট-ছাড়া হালকা নীল রংকরা মোজেইক জায়গাটায় পা পড়লেই মনে হয় বরফের একটা চাঁইয়ের ওপরে যেন পা পড়লো। আর, চারদিক সব বন্ধ থাকার কারণে কেমন যেন একটা গন্ধ। এ গন্ধটা আমাদের দেশে নেই। কলকাতায় নেই। নরম্যাল শহরে প্রথম পা দিয়েই এ গন্ধটা পেয়েছি আমাদের স্টুডেন্ট অ্যাপার্টমেন্টের ঘরগুলোতে। বিশেষ করে বেসমেন্টে — মাটির নিচের তলায়। সেখানে সূর্যের আলো একেবারেই আসে না। কার্পেট আর ওয়াল পেপার থেকে কেমন যেন একটা ভ্যাপসা গুমোট গন্ধ বেরোয়। তার সঙ্গে কার্পেট ক্লিনারের তীব্র কেমিক্যাল গন্ধ। দম বন্ধ হয়ে আসে। আমরা বাংলা দেশের খোলা হাওয়ায় মানুষ। এই দমবন্ধ পরিবেশ যেন কয়েদখানার মতো।
চলবে…
*আমেরিকা-জীবনের দীর্ঘ অভিজ্ঞতা নিয়ে প্রখ্যাত মানবধিকার কর্মী ডঃ পার্থ বন্দ্যোপাধ্যায়ের কলামে শুরু হয়েছে ‘মেরিকামায়া সাতকাহন’।
ধারাবাহিকভাবে প্রতি শুক্রবার সন্ধে ৬টায় প্রকাশিত হবে বঙ্গদর্শনে।
