
ডঃ পার্থ বন্দ্যোপাধ্যায়ের আমেরিকা-জীবন এবং স্বপ্ন-দুঃস্বপ্ন – পর্ব ১৬
গুড সামারিটান – হ্যাঁ, এমন দৃশ্য মার্কিন মুলুকের হাইওয়েতে দেখা যায় বইকি
আমার আদ্যিকালের প্লীমুথ ভ্যালিয়েন্ট নামে যতই ভ্যালিয়েন্ট হোক না কেন, সেই যে কয়েকবার হেঁচকি তুলে জনশূন্য ইন্টারস্টেট ফিফটি-ফাইভ হাইওয়ের মাঝখানে দাঁড়িয়ে পড়লেন, তারপর আর নট নড়ন চড়ন, নট কিচ্ছু। তখন সবেমাত্র গাড়ি কিনেছি, জীবনে কখনো গাড়ি চালাইনি দেশে। গাড়ির কলকব্জা নিয়ে, যন্ত্রপাতি নিয়ে কোনো ধারণাই নেই। আমি একেবারেই গণ্ডমূর্খ এসব ব্যাপারে।
এখন কী করি? পাশ দিয়ে মাঝে মাঝে হুসহুস করে অন্য লোকের গাড়ি বেরিয়ে যাচ্ছে। আমি দাঁড়িয়ে আছি রাস্তার ধারে। একবার এদিকে যাচ্ছি, একবার ওদিকে। দু’একবার আবার স্টার্ট দেওয়ার চেষ্টা করলাম। ক্যাঁ ক্যাঁ করে শব্দ হলো। হাতঘড়ি দেখছি মাঝে মাঝে। গর্ডনের বিয়েতে যাওয়া হলো না। ছি ছি, কী ভাববে ওরা? ভাববে, ইন্ডিয়ার লোকেরা সব এইরকম। নিমন্ত্রণ রক্ষা করতেও জানে না।
মনে মনে সেই বৃদ্ধ দম্পতিকে ঝাল ঝাড়ছি। ঝাল ঝাড়ছি কারণ, আমাদের যাদের কোনোকিছু সম্পর্কে কোনো জ্ঞান নেই, আমরা সবাই অন্য কারুকে ঝাল ঝেড়ে আনন্দ পাই। নিজের অজ্ঞতাকে লুকোতে গেলে অন্যকে শত্রু চিহ্নিত করতেই হবে। এটাই আমাদের বৈশিষ্ট্য।
আই-৫৫ চলে গেছে সেই শিকাগো পর্যন্ত বিশ্বদার বাড়ি ছাড়িয়ে। সে হলো উত্তরে। আর এদিকে এ হাইওয়ে চলে গেছে সুদূর দক্ষিণে, ইলিনয় রাজ্যের বুক চিরে। আমি এসেছি আধঘণ্টা দূরে লিঙ্কন নামের একটা ক্ষুদ্র শহরের পথে পনেরো মিনিট হয়তো। ফিরে যাওয়ারও কোনো উপায় নেই। আজ রবিবার, এমনিতেই রাস্তায় বেশি গাড়ি চলাচল নেই। মিডওয়েস্ট আমেরিকার এসব রাস্তা মানে হলো “ধূ ধূ করে যেদিক পানে চাই, কোনোখানে জনমানব নাই।” একেবারে ফ্ল্যাট রাস্তা মাইলের পর মাইল, গাছপালা পর্যন্ত দেখা যায় না। মাঝে মাঝে হয়তো কর্ন ফিল্ড – ভুট্টার ক্ষেত। ইলিনয়, ইন্ডিয়ানা, আইওয়া – পাশাপাশি তিনটে রাজ্যের চেহারাই মোটামুটি এক। রাস্তায় মানুষজন একেবারেই দেখতে পাওয়া যায় না।
আমেরিকার হাইওয়ে সিস্টেম এমনভাবে তৈরি করে ফেলেছে এরা যে মানুষের সঙ্গে যোগাযোগ আর একেবারেই নেই। তোমার গাড়িই তোমার বাড়ি। এখানে কথায় কথায় বলে, “ইউ আর অন ইওর ওন।” নিজের দেখভাল নিজেই করো। বিপদে পড়লে পয়সা ফেল, আমরা বিপদভঞ্জন মধুসূদন পাঠিয়ে দেবো আর একটা গাড়ি করে। তখনকার দিনে কোনো সেল ফোন ছিলো না, আর ইন্টারনেট তো কালের গর্ভে। কারুর সঙ্গে যোগাযোগ করার বিন্দুমাত্র উপায় নেই।
গর্ডন আমাদের ডিপার্টমেন্টের আর একজন গ্র্যাড স্টুডেন্ট। আমাদেরই বয়েস, কিংবা হয়তো একটু বেশি হবে। উষ্ণ শ্বেতাঙ্গ মার্কিন যুবক। চোখদুটো হাসে। আমার সঙ্গে খুব দোস্তি হয়ে গেছে। আমরা ইকোলজি ক্লাসের ছেলেমেয়েরা একসঙ্গে ফিল্ড ট্রিপ করতে গেছি এ্যান্ডারসনের সঙ্গে ইউনিভার্সিটির ভ্যানে করে। কী যেন একটা স্টেট পার্কে নিয়ে গিয়েছিলো – ছোটো ছোটো ঝর্ণা আর জলপ্রপাতের মাঝামাঝি, আমরা যখন গিয়েছিলাম, তখন প্রায় শুকনো। সেই ছোটবেলায় রাঁচির কাছে হুডরু দেখতে যাওয়ার কথা মনে পড়ে। অনেকটা সেই রকম। পাথরের ওপর দিয়ে ওঠানামা করা যায়। অনেক নিচে পর্যন্ত নেমে যাওয়া যায়। ইকোলজি ক্লাসের সবাই মিলে যাওয়া। আমার সেই প্রথম আমেরিকার অতি সুবিশাল এবং আশ্চর্য সুন্দর প্রকৃতি দেখার সুযোগ।
ইলিনয়ের স্টার্ভড রক স্টেট পার্ক – বহু প্রাকৃতিক সম্পদের মধ্যে একটি
গাড়িতে কয়েক ঘণ্টার পথ ভাঙা ভাঙা ইংরিজিতে কথাবার্তা বলতে বলতে কেটে গেলো। গর্ডনের নানা হাসির গল্প, যার কিছুটা বুঝলাম, বাকিটা ওই ৭০-৩০। আমি শুনিয়েছিলাম আমার সেই স্কটিশ ইস্কুলে পড়া “বেটি বটার বট সাম বাটার, বাট শি সেড দ্য বাটার’জ বিটার” – সেই টাং টুইস্টার। এ্যান্ডারসন শুনে খুব খুশি। অন্য আমেরিকান ছাত্রছাত্রীরা কিছুটা বুঝলো, কিছুটা বুঝলো না। এমনিতেই তখন আমার ইংরিজি উচ্চারণ জড়ানো জড়ানো দেশি স্টাইল। আহা, যদি সেই সময়কার সেই ইংরিজি বলাটা একটু রেকর্ড করে রাখা যেতো!
সত্যি, এই স্মৃতিকথা লিখতে লিখতে মাঝে মাঝেই মনে হয়, এই লেখা তো সঠিক বর্ণনা হতেই পারে না, সে আমার স্মৃতিশক্তি যতই তীক্ষ্ণ থাকুক না কেন। সেই সময়কার সেই যে বুদ্ধি – বা বলা যেতে পারে বুদ্ধির অভাব, বিশ্লেষণের অভাব, এবং নাইভিটি অর্থাৎ মূর্খতা, তা তো আমার আজকের এই বর্ণনায় প্রতিফলিত হবে না। সেদিক থেকে দেখতে গেলে সে দিনগুলোর যে ছবি আঁকছি এখন, তা মোটেই বাস্তব নয়। তা আজকের নতুন, কৃত্রিম রঙে রাঙানো।
বহুকালের পুরোনো কিছু কিছু ডায়েরির পাতা আছে। কিন্তু তাতে কয়েকটা দিনের সংক্ষিপ্ত বর্ণনা আছে হয়তো। স্মৃতিকথা বলতে যা বোঝায়, সেরকম ডায়েরি আমি কখনোই তেমন করে রাখিনি। রাখলে আজ এই মেরিকামায়াতে কাজে লাগানো যেতো।
থাক সেসব কথা পরে হবে। এখন এই বিরাট সমস্যা। হতাশায়, রাগে, দুঃখে কান লাল হয়ে যাচ্ছে। ভয় হচ্ছে, এখন কী হবে? কীভাবে এই বিপদ থেকে বাঁচবো?
গাড়ি করে সত্যিই মধুসূদন এসে হাজির হলেন। কয়েক ডজন গাড়ি পাশ দিয়ে বেরিয়ে যাওয়ার পর একটা গাড়ি আস্তে আস্তে আমার গাড়ির পিছনে এসে থামলো। না, পুলিশের সাইরেন দেওয়া গাড়ি নয়। সে অভিজ্ঞতাও পরে হয়েছে বেশ কয়েকবার। সেদিন এসে দাঁড়িয়েছিলেন যে মধুসূদন, তিনি শ্বেতাঙ্গ মাঝবয়েসী এক ভদ্রলোক। কাচ নামিয়ে জিজ্ঞেস করলেন, “ইউ নীড হেল্প?”
এখানে কেউ নিজে থেকে হেল্প করে না, যদি না কেউ হেল্প চায়। তার নানা বিপত্তি আছে। এদেশে ব্যক্তিকেন্দ্রিকতা এতোই প্রবল যে সমাজের যে ব্যাপারগুলো আমরা অতি স্বাভাবিক বলে মনে করি, সেগুলো এখানে প্রায় অদৃশ্য হয়ে গেছে। একজন আর একজনের বিপদে এগিয়ে আসার ব্যাপারটা তার মধ্যে অন্যতম। তুমি বিপদে পড়েছো, তুমি চাও আমি এগিয়ে এসে তোমাকে সাহায্য করি? আচ্ছা, তুমি বলছো তাই আমি এলাম। নইলে, রাস্তায় একটা গাড়ি দাঁড়িয়ে কেন পড়েছে, তা নিয়ে আমি ভাবতে যাবো কেন?
আজ থেকে পঁয়ত্রিশ বছর আগেও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে হয়তো কিছুটা সমাজ ছিল। কিছুটা মানবিকতা অবশিষ্ট ছিল হয়তো তখনও। আজ সামান্য কিছু জায়গা ছাড়া তা আরো বেশি অবলুপ্ত হয়ে গেছে। আজ আমাদের নিউ ইয়র্কের পাশের বাড়িতে একজন দিনের পর দিন না খেতে পেয়ে মরে পড়ে থাকলেও প্রতিবেশী জানতে পারবে না। যদি কোনোভাবে জানতেও পারে, এগিয়ে এসে তাকে খাওয়াবে, বা ডাক্তার দেখানোর ব্যবস্থা করবে, সে সম্ভাবনা কম।
আমাদের দেশেও এখন এই সামাজিক ধ্বংস দ্রুত ঘটে চলেছে আমাদের চোখের সামনেই। (এই রে, আবার প্রবন্ধ হয়ে যাচ্ছে, এখানেই থামি।)
মধুসূদনবাবু সামনের হুড খুলে মাথা গলিয়ে গাড়ি পরীক্ষা করলেন মিনিট দুয়েক। দু’একবার নিজে স্টার্ট দেওয়ার চেষ্টা করলেন। তারপর বললেন, “…” – অর্থাৎ, কী যে বললেন, আমার কাছে তা তামিল বা গ্রীক ভাষায় বাইবেল পাঠ। সম্পূর্ণ দুর্বোধ্য। তবে বুঝলাম, সাংঘাতিক জটিল কোনো সমস্যা নয়, এবং বৃদ্ধ দম্পতি আমাকে কোনোভাবেই ঠকাননি। তাঁদের ওপরে ঝাল ঝাড়বার কোনো কারণই নেই আমার।
তারপরে যে ঠিক কী হয়েছিল, আজকে আর মনে পড়ছে না। তবে মনে হয়, মধুসূদনবাবু আমার গাড়ি তাঁর গাড়ির সঙ্গে হুক দিয়ে বেঁধে নিয়ে দশ মিনিট দূরের কোনো এক দোকানে নিয়ে গিয়ে কী একটা জিনিস কিনে লাগিয়ে দিয়েছিলেন, যার দাম মাত্র পনেরো টাকা। সেই হোমিওপ্যাথি ওষুধেই ভ্যালিয়েন্ট আবার বীরবিক্রমে রাস্তায় পড়লো, এবং আমি মধুবাবুকে অজস্র ধন্যবাদ দিয়ে আবার পথে নামলাম।
গর্ডন আর তার নববধূর বাড়ি গিয়ে পৌঁছলাম বিয়েটিয়ে চুকে যাবার একঘণ্টা না দেড়ঘণ্টা পরে। দাঁত বের করে দুঃখ প্রকাশ করা, এবং কোনোরকমে আমার এই নতুন মেস বুঝিয়ে বলার চেষ্টা ছাড়া আর কিছু করার ছিলো না।
গরিব ইন্ডিয়ান ছাত্র হলেও একেবারে সে অকৃতজ্ঞ নয়, এবং নেমন্তন্ন করলে সে ভুলে যায় না, সেটা বোঝাতে পারাই যথেষ্ট ছিল। অবশ্য, এই বিয়েতে লুচি মাংস প্লাস্টিকের চাটনি দই আর লেডিকেনি ছিলো না। ছিল অবশিষ্ট দু চারটে হ্যাম আর চীজ স্যান্ডউইচ, শসার স্যালাড, ক্র্যাব আপেলের চাটনি, আর প্রচুর ওয়াইন। যা আমি খাইনি। চেনা চেনা মনে হলো অরেঞ্জ জুস। তাই খেয়ে, আর একবার ভুল ইংরিজিতে ক্ষমা প্রার্থনা করে, রাত নটায় কার্ডিনাল কোর্টের বাড়ির সামনে পার্কিং।
নিজের গাড়ি হবার আগে অন্যের গাড়িতে একবার বেড়াতে গিয়েছিলাম পাশের রাজ্য আইওয়া। সকালে গিয়ে সন্ধ্যেবেলায় ফিরে আসা।
আমার হোস্ট ফ্যামিলি ডাক্তার রবি কট্টুর আলাপ করিয়ে দিলেন তাঁর এক বন্ধু মিস্টার সিংয়ের সাথে। রবি বললো, সিংয়ের ভাইপো কে যেন পড়ে ইউনিভার্সিটি অফ আইওয়াতে। ও যাবে তার সঙ্গে দেখা করতে পরের উইকএন্ডে। আমরা যদি যেতে চাই … আমরা মানে তখনও মুক্তি আসেনি। আমি আর সৌমিত্র। আমরা তো হিন্দি ইংরিজি মিশিয়ে প্রচুর হাসলাম।
ডাক্তার রবি কাটুর ও পরিবার
মানে, “নিশ্চয়ই নিশ্চয়ই অফ কোর্স জরুর।” মানে, “ইফ ইউ টেক আস হোয়াই উই শ্যাল নট গো,” ইত্যাদি।
গেলাম। ঘণ্টা তিনেকের ড্রাইভ মিস্টার সিংয়ের বিরাট ভ্যানে চেপে। ওই আর একটা আই এস ইউ’এর মতোই ক্যাম্পাস। সেই চেনা ছক। চারদিকে নানা ডিপার্টমেন্ট, মাঝখানে ঘাসের লন বা কোয়াড। সামারে প্রায় ফাঁকা।
সিং দেখা করতে গেলেন তাঁর ভাইপোর সঙ্গে তার ডর্মে। আমরা বসে আছি একটা ঘরে। হঠাৎ আমি পাশের দু চারটে ঘরের ওদিকে একটা ঘর থেকে একটা গান শুনলাম। সৌমিত্রকে নিয়ে সোজা সে ঘরে গিয়ে দরজায় টোকা দিলাম। কারণ, দেওয়া যায়।
দরজা খুললো। ভেতরে দু’তিনজন বঙ্গসন্তান। শনিবার না রবিবারের দুপুরবেলা।
ভেতরে স্টিরিওতে গান হচ্ছে, “শুধু তোমার বাণী নয় গো হে বন্ধু হে প্রিয়। মাঝে মাঝে প্রাণে তোমার পরশখানি দিও।”

হেমন্ত মুখোপাধ্যায়।
(চলবে)
*আমেরিকা-জীবনের দীর্ঘ অভিজ্ঞতা নিয়ে প্রখ্যাত মানবধিকার কর্মী ডঃ পার্থ বন্দ্যোপাধ্যায়ের কলামে চলছে ‘মেরিকামায়া সাতকাহন’।
ধারাবাহিকভাবে প্রতি শুক্রবার সন্ধে ৬টায় প্রকাশিত হচ্ছে শুধুমাত্র বঙ্গদর্শন-এ।
‘মেরিকামায়া সাতকাহন’-এর সমস্ত পর্ব পড়তে এখানে ক্লিক করুন।
