
ডঃ পার্থ বন্দ্যোপাধ্যায়ের আমেরিকা-জীবন এবং স্বপ্ন-দুঃস্বপ্ন – পর্ব ১২
কাজ, কাজ আর কাজ
দেশে থাকতে কাজ করিনি তেমন কখনো।
ওই শেষের চারটে বছর – একাশি থেকে পঁচাশি – সুন্দরবন হাজি দেশারত কলেজে অধ্যাপনার কাজ করা শুধু। সেখানে যাওয়া আসার ভীষণ সমস্যা ছিল ঠিকই, আর তখনকার দিনে না ছিল সেল ফোন, আর না ছিল বাড়িতে খবর দেওয়ার কোনো উপায়। সেই যে মঙ্গলবার কাকভোরে পুরোনো এ্যালাৰ্ম ক্লকের ঘ্যাটো ঘ্যাটো আওয়াজে ঘুম ভেঙে রেডি টেডি হয়ে কাঁধে ঝোলানো ব্যাগ নিয়ে বেরিয়ে পড়লাম, আবার সেই শুক্রবার রাত আটটা থেকে এগারোটা যে কোনো একটা সময়ে বাড়ি ফিরে আসা পর্যন্ত মুক্তি বা আমার বাড়ির আর কেউ জানতেই পারতো না আমি কোথায় আছি।
কিন্তু কলেজে একবার পৌঁছে গেলে থাকতাম প্রায় রাজার হালে। দাসদাসী, ড্রাইভার, বাবুর্চি… মানে ওই আর কী… দাসদাসী আর বাবুর্চি দুটোই হলো আমাদের গ্রামের সন্ধ্যার মা, যে সপ্তাহে সাতদিন দুবেলা কাজ করতো আমাদের অধ্যাপকদের মেসে মাসিক পনেরো টাকা মাইনে নিয়ে, আর আমরা যখন একবার প্রস্তাব করেছিলাম ওকে মাসে পাঁচ টাকা বাড়িয়ে দেওয়া হোক আর বেশির ভাগ অধ্যাপক সে প্রস্তাবে সম্মত হলেন না বলে ও সেই পনেরোতেই থেকে গেলো। আর ড্রাইভার হলো ক্যানিংয়ের লঞ্চঘাট থেকে কোনো এক সারেং যে আমাদের তিনঘন্টা ড্রাইভ মানে ইয়ে কানফাটানো আওয়াজের আর পোড়া ডিজেলের বিউটিফুল গন্ধমাখা লঞ্চ চালিয়ে পাঠানখালি কলেজঘাটে পৌঁছে দিতো।
কিন্তু তাও রাজার হাল। প্রচুর সম্মান, ডিপার্টমেন্টে আমি তখন একমেবাদ্বিতীয়ম প্রফেচার পিবি চার। আমার তৈরী করা ডিপার্টমেন্টে একজন সর্বসময়ের ল্যাব অ্যাসিস্ট্যান্ট, একজন সর্বসময়ের ফাইফরমাশ খাটা স্টাফ, আরো একজন সাহায্যকারী লিয়াকত আলী মোল্লা — যার কাজ বোটানি জুলজি দুটো ডিপার্টমেন্টেই স্পেসিমেন সরবরাহ করা। খুব খাতির ছাত্রছাত্রী ও স্টাফদের কাছে। তারপর ইউনিভার্সিটির প্র্যাকটিক্যাল পরীক্ষার সময়ে চেনাশোনা একজনকে এক্সটার্নাল এগজামিনার করে ধরে বেঁধে উপরোধে নিয়ে আসা — তখন তাঁর সৌজন্যে পরীক্ষার কয়েকদিন পড়ে পাওয়া চৌদ্দ আনা মুরগির ঝোল আর ভাত।
সেই এক্সটার্নাল হতেন যিনি আমার কথা ফেলতে না পেরে, আমাদের বালিগঞ্জ সায়েন্স কলেজের সেই দাদা অনিল মান্না কোভিডে চলে গেলেন।
যাই হোক। জীবন যখন ছিল ফুলের মতো। পাপড়ি তাহার ছিল শত শত।
আমেরিকায় শুনেছিলাম স্বর্গরাজ্য। এখানে নাকি কাজটাজ কেউ করে না, রান্না থেকে ঘর পরিষ্কার এবং জুতো সেলাই থেকে চণ্ডিপাঠ – অবশ্য আমেরিকায় চণ্ডিপাঠ অথবা শাঁখের আওয়াজ অনেকটা মঙ্গলগ্রহে মানুষ খুঁজে পাওয়ার মতো – সবকিছুই নাকি মেশিনে হয়ে যায়। এখন অবশ্য এই বিতর্ক-উত্তর যুগে পুষ্পাঞ্জলিও অনলাইনে দেওয়া হচ্ছে, আর সঙ্গে শাঁখ আর ঘণ্টার আওয়াজ – কিন্তু আমি বলছি গত শতকের শেষের দিকের কথা।
ছোটোবেলায় লাইফ ম্যাগাজিনে রঙিন ছবি দেখতাম পার্কিং করা আছে শত শত গাড়ি। ওই সেই চোখ ছানাবড়া হওয়ার বয়েসে চোখ রাজভোগ কিংবা মিহিদানা হয়ে যেত সেসব ছবি দেখে। কেউ কখনো বলে দেয়নি যে আমেরিকায় গাড়ি থাকতেই হবে সে তোমার পক্ষে গাড়ি কেনা, তেল কেনা, মেন্টেন করা এবং ইন্স্যুরেন্স দেওয়ার টাকা জোগাড় করা সম্ভব না অসম্ভব কেউ দেখবে না, গাড়ি তোমাকে রাখতেই হবে কারণ পঁচানব্বই শতাংশ জায়গায় কোনো বাস ট্রাম সরকারি বা বেসরকারি পরিবহন কিচ্ছু নেই – এবং তাই এতো গাড়ি, এবং এতো গাড়ি চালানোর তেল আমেরিকা জোর করে আনছে মধ্যপ্রাচ্য থেকে এবং তাই এতো যুদ্ধ সেই অঞ্চলে ইত্যাদি ইত্যাদি। এসব কোনো ধারণাই ছিলো না, যেমন আমাদের দেশের অধিকাংশ মানুষের এখনো নেই। আমেরিকা মানে এখনো বেশির ভাগ মানুষের কাছেই ওই সেই আগেরই মতোই — স্বর্গরাজ্য।
এবং কাজের ওপরেই তোমার জীবন। কাজ যদি করতে না পারো, শারীরিক পরিশ্রম এবং মানসিক শক্তি যদি তোমার না থাকে, আমেরিকায় তুমি ফিনিশ হয়ে যাবে। বাঁচতেই পারবে না এদেশে। তোমাকে কাজ করে যেতে হবে সর্বক্ষণ, এবং তোমাকে তার জন্যে যে পারিশ্রমিক দেওয়া হবে, তা তোমার গায়ের চামড়ার রং দেখে, তুমি পুরুষ না নারী তা দেখে, তোমার ইমিগ্রেশন স্ট্যাটাস দেখে, তোমার ধর্ম ও নাম দেখে, এবং তোমাকে কতটা ঠকিয়ে নেওয়া যায়, তা দেখে। যারা বলে আমেরিকায় প্রেজুডিস নেই, এখানে বর্ণবৈষম্য অতীত ইতিহাসের বিষয়, এবং এদেশে প্রচুর টাকা দেওয়া হয় কাজ করার জন্যে — তারা আসল আমেরিকাকে জানেই না।
আমেরিকায় এই দুহাজার বাইশ সালেও প্রতি ছজন শিশুর মধ্যে একজন দারিদ্র্যসীমার নীচে থাকে। খেতে পায় না ভালো করে, বাসস্থান নেই, স্বাস্থ্য ভেঙে পড়া, অবসাদে আক্রান্ত অথবা হাঁপানি হেপাটাইটিস বা অন্য কোনো ভীষণ রোগে। সিঙ্গল পেরেন্ট। দু বছরের কোভিড অতিমারীর প্রকোপে পৃথিবীর মধ্যে সবচেয়ে বেশিসংখ্যক – আজকের হিসেবে দশ লক্ষ ছেষট্টি হাজার মানুষ – এই তথাকথিত শ্রেষ্ঠ দেশ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে হেভেনের টিকিট কেটেছে। খোঁজ নিয়ে দেখুন।
আমি কাজ করেছি ক্যাফেটেরিয়ায় ন্যূনতম মজুরিতে। কাপ ডিশ ধোয়া, চা কফি কোক পেপসি জল সার্ভ করা। ভোরবেলায় উঠেই ওয়াকার হলের ডর্ম। মাথায় জালের নেট, পরনে কাপড়ের হালকা উর্দি। নিজের ছাত্রছাত্রীদেরই অনেকে সেই ডর্মে থাকে, এবং আসছে ব্রেকফাস্ট খেতে। দেখছে তার ল্যাব অ্যাসিস্ট্যান্ট অর্থাৎ টিচার খাবার সার্ভ করছে। খুব একটা গৌরবজনক বিষয় নয়। তারপর ফেলে দেওয়া খাবার। শকিং মনে হতো দেখে, কারণ এসেছি গরিব ভারতবর্ষ থেকে। এখানে মধ্যপ্রতীচ্যের ধনী অঞ্চলগুলো থেকে আসা সুসজ্জিত স্বাস্থ্য-প্রাচুর্য ছাত্রছাত্রীরা ট্রে ভর্তি করে খাবার নেয় — সেল্ফ সার্ভ – আমরাই সসেজ, ডিম, টোস্ট, প্যানকেক, মাফিন, ওয়াফল আরও হাজার খাবার তৈরি করে দিচ্ছি আমাদের কিচেনে। অঢেল খাবার নিচ্ছে, তার সঙ্গে ফল, অরেঞ্জ বা অ্যাপল জুস, আরো কত কী।
ইলিনয় স্টেট ইউনিভার্সিটি ক্যাফেটেরিয়া (১)
জানে খেতে পারবে না এতো। তাও নিচ্ছে, আর অর্ধেক খেয়ে অর্ধেক ফেলে দিচ্ছে। কারণ, টাকা আগেই দেওয়া আছে সিমেস্টার শুরুর সময়ে। ফলে, হু কেয়ার্স? ট্রে ভর্তি ভর্তি না খাওয়া খাবার কনভেয়ার বেল্ট দিয়ে চলে যাচ্ছে গার্বেজ বিনে।
ইলিনয় স্টেট ইউনিভার্সিটি ক্যাফেটেরিয়া (২)
তিন ঘণ্টা কাজ করতাম সেখানে প্রতিদিন। তিন ঘণ্টায় রোজগার দশ ডলারের মতো সেই সময়ে। সপ্তাহে দুদিন কাজ। মাসে সব মিলিয়ে একশো ডলার এক্সট্রা রোজগার। ভেবেছিলাম সেই টাকা জমিয়ে দেশে ফিরে যাবো। হায় রে মূর্খ! মহামূর্খ!
মুক্তি কাজ করতে পারতো না। করলে বেআইনি হবে কারণ সে এসেছে আমার স্পাউস হিসেবে মার্কিন সরকারের বদান্যতায়। খোলাখুলি কাজ করতে পারে না। ডিপোর্টেশন হয়ে যাবে। মেয়ে যখন কয়েক মাসের, তখন খরচ এতোই বেড়ে গেলো যে আমিও সেই বোন স্টুডেন্ট সেন্টারে একটা রেস্টুরেন্টে কাজ নিয়েছি আগের অভিজ্ঞতার জোরে, আর মুক্তি বাড়িতে বসেই বেবিসিটিংয়ের কাজ করছে। ওই যা হয় কিছু উপার্জন, আইন বাঁচিয়ে। কেউ তেমন দেখতো না বলে চলে যেত। কার্ডিনাল কোর্টের কমিউনিটি হলে কাগজে লিখে বিজ্ঞাপন আর ফোন নম্বর দেওয়ালে সাঁটিয়ে দেওয়া ছিল আমাদের।
সুন্দরবন হাজি দেশারত কলেজের ক্যান্টিন
একবার এক শ্বেতাঙ্গ মার্কিন দম্পতি সন্ধ্যে ছটা নাগাদ তিন ছেলেমেয়েকে আমাদের কাছে রেখে গেলো। বললো রাতে এসে নিয়ে যাবে। আমরা হলাম গিয়ে বাঙালি, বাচ্চাগুলো কী খাবে? বাবা মা কোনো ব্যবস্থাই করে যায়নি। মুক্তি আবার রান্না করে তাদের খাওয়ালো। বড়োটা মেয়ে, বোধহয় সাত আট বছর। পরে একটা ছেলে, পাঁচ, আর একটা খুব বাচ্চা – বোধহয় দুই কি তিন।
রাত এগারোটা বাজলো, বারোটা বাজলো। তারা ফিরে আসে না আর। চিন্তায় আমাদের ঘুম নেই। বাচ্চাগুলো চেঁচাচ্ছে। আবদার করছে, বায়না করছে, ঘুমোচ্ছে না। আমাদেরও নিজেদের একটা বাচ্চা মেয়ে। মুক্তি একবার ওকে দেখে আসছে শোবার ঘরে, আবার বসার ঘরে এদের দেখে যাচ্ছে। আমাকে এর মধ্যে আবার একবার ল্যাবে যেতেই হলো কয়েক ঘণ্টার জন্যে।
সে এক বিশাল বিপদ। আমরা এখন কী করি?
সারা রাত ধরে অপেক্ষা করার পরেও তারা এলো না। ফিরে এলো পরের দিন সন্ধ্যেবেলা। এর মধ্যে আমরা তাদের বাড়ি গিয়েও দেখে এসেছি। চাবি বন্ধ। আশেপাশে জিজ্ঞেস করলাম। কেউ জানে না তারা কোথায়।
আমরা অসহ্য উৎকণ্ঠায় কাটালাম।
শ্বেতাঙ্গ মার্কিন বাবা ও মা ফিরে এলেন। আমাকে বললেন, “সরি ম্যান, উই গট হেল্ড আপ।”
হেল্ড আপ? ব্যস? ইয়ার্কি পায়া হ্যায়? আমার মুখের চেহারা তখন খুব একটা প্রসন্ন নিশ্চয়ই দেখায়নি, এ কথা আমি হলফ করে বলতে পারি।
মা’টি বললেন তাঁর বড়ো মেয়ের দিকে তাকিয়ে, “ডিড ইউ গাইজ ইট সামথন?”
না, ভাগ্যিস বললেন। আমরা তো না খাইয়েই চব্বিশ ঘণ্টা রেখে দিয়েছিলাম।
মুক্তি অত্যন্ত বিরক্ত। আমি বললাম, “ইউ নো হোয়াট?” মোটামুটি বুঝিয়ে দিলাম খুব বেশি অভদ্রতা না করে, এখানে তোমাদের বাচ্চাদের আর এনো না ভবিষ্যতে।
সেখানেও একটু হিসেব করে বলতে হবে কথা। যদি রিপোর্ট করে দেয়!
রিপোর্ট করলে ডিপোর্ট।
(চলবে)
*আমেরিকা-জীবনের দীর্ঘ অভিজ্ঞতা নিয়ে প্রখ্যাত মানবধিকার কর্মী ডঃ পার্থ বন্দ্যোপাধ্যায়ের কলামে চলছে ‘মেরিকামায়া সাতকাহন’।
ধারাবাহিকভাবে প্রতি শুক্রবার সন্ধে ৬টায় প্রকাশিত হচ্ছে শুধুমাত্র বঙ্গদর্শন-এ।
‘মেরিকামায়া সাতকাহন’-এর সমস্ত পর্ব পড়তে এখানে ক্লিক করুন।
