
ডঃ পার্থ বন্দ্যোপাধ্যায়ের আমেরিকা-জীবন এবং স্বপ্ন-দুঃস্বপ্ন – পর্ব ১০
লেক মিশিগানের ধারে আমি বসে আছি মন খারাপ করে
মুক্তি আমেরিকায় এসে পৌঁছনোর আগেই আমার আমেরিকার জীবনে কতগুলো ঘটনা ঘটে গিয়েছিলো। জীবনস্মৃতিতে সেগুলোর কথা না বললে নিজের কাছে অপরাধী থেকে যাবো।
ওকে চিঠি লিখে সেসব কথা জানিয়েছিলাম। আজ, এই স্মৃতিকথার মাধ্যমে বাকি পৃথিবীকে জানাচ্ছি।
কেন জানাচ্ছি? না জানালেও পারতাম। আমি না লিখলে কেউ তো জানতেই পারতো না। কিন্তু জানাতেই হলো। কারণ, (এক) আমার এই স্মৃতিকথা লেখার উদ্দেশ্য আমেরিকার জীবনটা আসলে কেমন, তা আমাদের দেশের মানুষকে জানানো। যেসব বিষয় নিয়ে আমাদের দেশে, আমাদের সমাজে কখনো কোনো সিরিয়াস আলোচনা হয়না – যেমন সেক্স – এবং না হওয়ার কারণে একটা ছেলে বা মেয়ে জীবন সম্পর্কে ধোঁয়াশা নিয়ে বড়ো হয়, এবং তার ফলে হাজার রকমের ভুল ধারণা, ভয়, অসুখ অথবা বিকৃতি তাদের গ্রাস করে, সেসব বিষয়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মতো একটা দেশ কেমনভাবে তার ইয়ং জেনারেশনকে সম্পূর্ণ স্বাধীনতা দিয়েছে – তা মানুষকে জানানো, বোঝানো। এই হলো একটা কারণ। আর (দুই) আমরা যারা সেই রক্তচক্ষু প্রাগৈতিহাসিক শিক্ষার – বা প্রকৃতপক্ষে অশিক্ষার বা অসম্পূর্ণ শিক্ষার – বলি হয়েছি, আমাদের মনে হঠাৎ সেই স্বাধীনতার হাওয়া কীভাবে প্রবল ঝড়ের আঘাত করতে পারে এবং প্রস্তুতিহীন জীবনে তার কী মারাত্মক শক লাগতে পারে, তাও নিজের জীবন দিয়ে সবাইকে বোঝানো। কোনো শিক্ষাই প্রস্তুতিহীনভাবে দেওয়া যায় না, পাওয়া যায় না। তার ফল হয় সুদূরপ্রসারী। সারাটা জীবন তছনছ হয়ে যেতে পারে সেই শকের প্রভাবে।
আজকের হঠাৎ আধুনিক হয়ে যাওয়া, বা হতে চাওয়া ভারতবর্ষে, বাংলা দেশে প্রস্তুতিহীন মনের ওপর এই ঝোড়ো হাওয়ার স্বাধীনতা যে কী ভয়াবহ প্রভাব বিস্তার করেছে, আমেরিকায় আমার সেই প্রথম দিনগুলোর অভিজ্ঞতার কথা বললে তার বিশ্লেষণ করতে অনেকের খুব সুবিধে হবে। আমেরিকার জীবন নিয়ে খোলাখুলি লিখতে গেলে আমেরিকায় চুম্বন, নগ্নতা এবং সেক্স নিয়ে খোলাখুলি লিখতেই হবে।
চুম্বন তো যেখানে সেখানেই ছিল। রাস্তায়, যেখানে দুটো পয়সার জন্যে কাপ ডিশ ধুতাম, খাবার সার্ভ করতাম, সেই ক্যাফেটেরিয়ায়, ক্লাসরুমে ঢোকার আগে হলওয়েতে বয়ফ্রেন্ড গার্লফ্রেণ্ডের একটা শেষ চুমু, আগস্টের দুপুরে ডর্মের সামনের সবুজ ঘাসের গালিচায় সান ট্যান করতে করতে মাঝে মাঝে এক আধটা চুমু, আধো অন্ধকারে শনিবার মাঝরাতের পার্টিতে কানফাটা রক মিউজিকের সঙ্গে নাচতে নাচতে জড়িয়ে ধরে চুমু। লেসবিয়ান বান্ধবীদের মধ্যে একটু আড়ালে চুমু। ঠোঁটের চুমু এক রকম, আমার কয়েকজন প্রিয় ছাত্রী আমার কাছ থেকে পড়া বুঝে নিয়ে চলে যাবার আগে গালে একটা আলতো চুমু – অনেকটা থ্যাংক ইউ হ্যান্ডশেকের মতোই। তারপর খুব কাছে আসতে চাওয়া স্যারা ক্যাথারিন, ফেলিশা এরকম আরো কয়েকজন হয়ে ওঠা বান্ধবীর আরো একটু গভীরভাবে চুমু। যার উত্তর দিতে আমি জানতাম না। শিখিনি কখনো।
কনফিউজড লাগতো।
সবকিছুই ঘটে যাচ্ছিলো আমার সেই এক বছর আমেরিকায় একা থাকার জীবনে।
দুটো মারাত্মক ঝড় পরপর আমাকে হালভাঙা নৌকোর যাত্রীর মতো পেড়ে ফেললো। ইলিনয় স্টেট ইউনিভার্সিটির স্টুডেন্ট রিক্রিয়েশন ক্লাব তাদের বোন স্টুডেন্ট সেন্টারে দুটো সিনেমা দেখানোর ব্যবস্থা করলো। আইডি কার্ড দেখালেই ফ্রী। সে সময়ে আমার কয়েকজন ভারতীয়, শ্রীলঙ্কান, ক্যারিবিয়ান এবং আমেরিকান বন্ধু ও বান্ধবী হয়েছে। বলা বাহুল্য, প্রায় সবাই ব্যাচেলর, আর আমি হংসমধ্যে বকো যথা। ধরেবেঁধে নিয়ে গেলো ওই মোহন, ভরত, এডগার আর কারা যেন এক শনিবারে রগরগে কামোত্তেজক “ইম্যানুয়েল” ছবি দেখতে। সফ্ট পর্ন। ফরাসী ছবি – থাইল্যাণ্ডে শুটিং। সিলভিয়া ক্রিস্টেল নামক অতি সুন্দরী, লাস্যময়ী চিত্রতারকার নাম তার আগে কখনো শুনিনি। নগ্নতা ও ফ্রী সেক্স তথাকথিত উদারপন্থী পুঁজির বাজারে কোথায় এগিয়ে গেছে, সে সম্পর্কে কোনো ধারণাই আমার ছিলো না।
বিলাসবহুল বোন স্টুডেন্ট সেন্টারের ভেতরে ব্র্যাডেন অডিটোরিয়াম
যৌনতা নিয়ে ধোঁয়াশা আমাদের মতো ঔপনিবেশিক শিক্ষার ভিক্টিম উত্তর কলকাতার ছেলেদের বরাবরই ছিল — এই নিয়ে ঘটিকাহিনিতে আমি বিস্তারিত আলোচনা করেছি। যা পড়ে সিনেমা পরিচালক বুদ্ধদেব দাশগুপ্ত আমাকে জিজ্ঞেস করেছিলেন, “পার্থ ভাই, তোমার বইতে তুমি যা লিখেছো, সে সব সত্যি?” সব সত্যি, বুদ্ধদা। আরো অনেক কিছু লিখতেই পারিনি সঙ্কোচ কাটিয়ে। কিন্তু লিখলে ভালো হতো। অসম্পূর্ণ থেকে গেলো অনেক কথাই।
মোহময়ী ডাচ অভিনেত্রী সিলভিয়া ক্রিস্টেল
সেই ভীষণ জটিলতার, কনফিউশনের বয়ঃসন্ধি কাটিয়েই উঠতে পারিনি তখনও। পৃথিবীর উল্টোদিকের এক দেশে ইউনিভার্সিটি ক্যাম্পাসের একটা অতি সাধারণ ব্যাপার — একটা শনিবার সন্ধের সিনেমা দেখতে গিয়ে মনের ভেতরে একটা অবিশ্বাস্য ঝাঁকুনি খেলাম। এ ঝাঁকুনি অদৃশ্য, এবং স্পর্শহীন যেন। আধুনিক পৃথিবী তার আধুনিকতার মোড়কে সমাজের মূল্যবোধ সম্পূর্ণ উল্টেপাল্টে দিয়েছে। আমরা বুঝতে পারিনি। যৌনতা নিয়ে এতো স্বাধীনতা – ভালো অথবা খারাপ – অনুভব করতেই পারছিলাম না ঠিকমতো।
শুধু একটা জিনিস বুঝতে পারছিলাম।
আমাদের ৩০২ কিংসলির বাড়ি। মিসেস হ্যারিসনের বাড়ি। রবিবার সকালে পাঁউরুটি টোস্ট, স্ট্রবেরি জেলি আর ডিমসেদ্ধ ব্রেকফাস্ট খেতে খেতে এডগার তার সেই ট্রেডমার্ক মুচকি হেসে আমাকে জিজ্ঞেস করলো, “কী পার্থ, কেমন লাগলো কালকের মুভি?”
আমি বললাম, “লক্ষ্য করেছো সেই সবার সামনে সিলভিয়া ক্রিস্টেলের জীনসের প্যান্ট উরুর কাছ থেকে কেটে ফেলা? এবং উন্মুক্ত উর্ধাঙ্গ সেই নীল নদীর ধারে? যেখানে ওপাশ দিয়ে একদল বৌদ্ধ সন্ন্যাসী হেঁটে যাচ্ছে? মেয়েদের শরীরকে কেবলমাত্র পণ্য হিসেবে ব্যবহার নয়?”
এডগার – “রিয়েলি? ইউ থিঙ্ক সো?”
ততদিনে ছ’মাস কেটে গেছে আমেরিকায়। আমেরিকান কায়দার ইংরিজি দ্রুত শিখে ফেলছি। আমার নিজের ব্রেকফাস্ট রুটি, ডাল আর ডিমের ডালনা বসিয়ে এডগারের দিকে তাকিয়ে আমি বললাম, “আই নো সো।”
আবার এডগারের সেই ট্রেডমার্ক মুচকি হাসি। ওদের কাছে এসব ব্যাপার ওই আমেরিকার নতুন প্রজন্মের মতোই জলভাত। আমার কাছে নয়।
এখানেই শেষ নয়। আরো মাসখানেক পরে আরো শকিং “রিক্রিয়েশন” হয়ে গেলো সেই বিলাসবহুল স্টুডেন্ট সেন্টারে। আমাদের লাইবারটার ল্যাবের সহকর্মিনী চল্লিশোর্ধ ক্যারল আর তার বয়ফ্রেন্ড ডিপার্টমেন্টের বাগানের মালী ডন আমাকে জানালো, হার্ডকোর পর্ন “ডেবি ডাজ ডালাস” দেখানো হবে। টিকিট দুষ্প্রাপ্য।
মিসেস হ্যারিসনের বাড়িতে আমেরিকান ও ভারতীয় বন্ধুদের সঙ্গে। ইথিওপিয়ার আবাবাও রয়েছে
এক্সএক্সএক্স বা ট্রিপল এক্স কথাটা তার আগে দেশে থাকতে বন্ধুদের মুখে শুনেছিলাম সেই স্কটিশ চার্চ ইস্কুলে পড়ার সময়ে এঁচোড়ে-পাকা বয়েসে। সেই সাদাকালো ছবি দেওয়া নিষিদ্ধ মার্কিন “সাহিত্য”। এখন একেবারে ভীষণ বাস্তবের মুখোমুখি। ফিল্ম। না দেখার মতো মনের জোর তখন ছিলো না। তার ওপর, আমি তখন থাকি একা। ভারতের সেক্স এডুকেশন-হীন একটা নিম্ন-মধ্যবিত্ত ছেলে।
তীব্র একাকীত্ব। যৌনজীবনের বিশাল ভ্যাকুয়াম।
ভাবতে পারিনি হার্ডকোর পর্ন কাকে বলে। সিনেমা দেখে এসে সারা গা কাঁপতে লাগলো। যেন একটা ভীষণ অপরাধ করে ফেলেছি।
মুক্তিকে চিঠি লিখে জানালাম। দশ পনেরো দিন পরে আমার চিঠি পেয়েই ও ফোন করলো আমাকে। রাগ করেনি। শিক্ষিত ফ্যামিলির শিক্ষিত মেয়ে। শুধু বললো, “এসব দেখো না। জীবনের ফোকাস নষ্ট হয়ে যাবে।”
আমিও জানতাম, এসব জিনিস আমার জন্যে নয়। আমি এক্সপ্লিসিট সেক্স উপভোগ করি না। নারীশরীরকে সর্বসমক্ষে বাজারি পণ্য হিসেবে ভাবতে আমার মন কখনো সায় দেয় না। কোনোদিন দেয়নি। উত্তর কলকাতার এঁদো গলিতে বড়ো হয়েছি। যৌনতার শিক্ষা পাইনি কখনো। সেক্স এডুকেশন ছিলো না আমাদের দেশে। এদেশে আছে। কিন্তু তাও …একটা দেওয়াল আছেই মনের মধ্যে। ওরা যা খুশি করুক। ওই এডগার, ভরত, মোহন, নরেন্দ্রর মতো বিশাল বড়োলোকের ছেলেরা করুক। আমি এই সঙ্গ উপভোগ করি না।
আমাদের ৩০২, কিংসলির বাড়িতে কিন্তু মাঝে মাঝেই অনেক রাত্তিরে নরক গুলজার হয়। ভরতের গার্লফ্রেন্ডরা তো আসেই। এছাড়া, ওরা চার পাঁচজন দলবেঁধে ব্লু ফিল্মের ভিডিও ক্যাসেট রেন্ট করে নিয়ে আসে।
আমি আর সৌমিত্র – মিসেস হ্যারিসনকে বলে দরজায় তালা লাগাবার ব্যবস্থা করে নিয়েছি ততদিনে।
আমি জানি, এই বিনোদন ভয়ঙ্কর এক ড্রাগের মতো। এই ড্রাগের শিকার হলে আর রক্ষে নেই।
(চলবে)
*আমেরিকা-জীবনের দীর্ঘ অভিজ্ঞতা নিয়ে প্রখ্যাত মানবধিকার কর্মী ডঃ পার্থ বন্দ্যোপাধ্যায়ের কলামে চলছে ‘মেরিকামায়া সাতকাহন’।
ধারাবাহিকভাবে প্রতি শুক্রবার সন্ধে ৬টায় প্রকাশিত হচ্ছে শুধুমাত্র বঙ্গদর্শন-এ।
‘মেরিকামায়া সাতকাহন’-এর সমস্ত পর্ব পড়তে এখানে ক্লিক করুন।
