
কথাগুলো কিন্তু ৯৩ বছর পুরোনো
ভাষার মধ্যে একটা প্রাণধর্ম আছে। ভাষার সেই ধর্মকে রক্ষা করে তবেই লেখকরা তাকে নতুন নতুন পথের হদিশ দেয়। যেমন করে হোক জোড়াতালি দিয়ে তার অঙ্গপ্রত্যঙ্গ বদল করা যায় না। মনে করা যাক, দেশটা মগের মুল্লুক এবং মগ রাজারা বাঙালি হিন্দু-মুসলমানের নাক-চোখের চেহারা কোনোমতে সহ্য করতে পারছে না, মনে করছে ওটাতে তাদের অমর্যাদা। তা হলে, তাদের বাদশাহী বুদ্ধির কাছে একটিমাত্র অপেক্ষাকৃত সম্ভবপর পন্থা থাকতে পারে, তা হচ্ছে মগ ছাড়া আর-সব জাতকে একেবারে লোপ করে দেওয়া।
এই উদাহরণ সমসাময়িক মনে হলেও, আদতে পুরোনো। রাজনৈতিক স্বার্থ চরিতার্থে ভাষাকে অপব্যবহার যুগ যুগ ধরে চলে আসছে। রবীন্দ্রনাথের বাংলা শব্দতত্ত্ব-র বেশ কিছু প্রবন্ধ পড়লে এ বিষয়ে একটা স্বচ্ছ ধারণা পাওয়া সম্ভব।
তখন খর বৈশাখ। ১৩৩৯ (১৯৩২) সাল। প্রবাসী-র বৈশাখী সংখ্যায় প্রকাশিত হয়েছিল ‘মক্তব-মাদ্রাসার বাংলা ভাষা’ বিষয়ক একটি প্রবন্ধ। প্রবন্ধটি পড়ে রবীন্দ্রনাথের মনে হয় বিষয়টি নিয়ে তাঁর মুখ খোলা উচিত। প্রতিক্রিয়ায় তিনিও পাল্টা প্রবন্ধ লেখেন।
এ কথা জলের মতো পরিষ্কার, যে বাঙালি মুসলমান জলকে ‘পানি’ বললে, স্নানকে ‘গোসল’ বললে হিন্দু বাঙালিরা এখনও চেপে হাসেন অথবা নাক কুঁচকে যায়। অথচ, রাজনৈতিক স্বার্থসিদ্ধির জন্য যখন জোর করে বাংলা ভাষার ‘বিকৃত’ ব্যবহার করা হয় অথবা অন্য ভাষা চাপিয়ে দেওয়ার চেষ্টা চলে, তাদের কানেও লাগে না মনেও লাগে না। এমন কোনও সভ্য ভাষা নেই যে নানা জাতির সঙ্গে নানা ব্যবহারের ফলে বিদেশি শব্দ কিছু-না-কিছু আত্মসাৎ করেনি। বহুকাল মুসলমানের সংস্রবে থাকাতে বাংলা ভাষাও অনেক পারসি শব্দ এবং কিছু কিছু আরবি স্বভাবতই গ্রহণ করেছে। বস্তুত বাংলা ভাষা যে বাঙালি হিন্দু-মুসলমান উভয়েরই আপন, তার স্বাভাবিক প্রমাণ ভাষার মধ্যে প্রচুর রয়েছে। ‘মক্তব-মাদ্রাসার বাংলা ভাষা’য় রবীন্দ্রনাথ লিখলেনঃ
“যত বড়ো নিষ্ঠাবান হিন্দুই হোক-না-কেন ঘোরতর রাগারাগির দিনেও প্রতিদিনের ব্যবহারে রাশি রাশি তৎসম ও তদ্ভব মুসলমানী শব্দ উচ্চারণ করতে তাদের কোনো সংকোচ বোধ হয় না। এমনকি, সে-সকল শব্দের জায়গায় যদি সংস্কৃত প্রতিশব্দ চালানো যায় তা হলে পণ্ডিতী করা হচ্ছে বলে লোকে হাসবে। বাজারে এসে সহস্র টাকার নোট ভাঙানোর থেকে হাজার টাকার নোট ভাঙানো সহজ। … ‘সমনজারি’ শব্দের অর্ধেক অংশ ইংরেজি, অর্ধেক পারসী, এর জায়গায় ‘আহ্বান প্রচার’ শব্দ সাধু সাহিত্যেও ব্যবহার করবার মতো সাহস কোনো বিদ্যাভূষণেরও হবে না। ‘মেজাজটা খারাপ হয়ে আছে’, এ কথা সহজেই মুখ দিয়ে বেরোয় কিন্তু যবনিক সংসর্গ বাঁচিয়ে যদি বলতে চাই ‘মনের গতিকটা বিকল কিংবা বিমর্ষ বা অবসাদগ্রস্ত হয়ে আছে’ তবে আত্মীয়দের মনে খটকা লাগবে। নেশাখোরকে যদি ‘মাদকসেবী’ বলে বসি তা হলে খামখা তার নেশা ছুটে যেতে পারে। বদমায়েসকে ‘দুর্বৃত্ত’ বললে তার চোট তেমন বেশি লাগবে না। এই শব্দগুলো যে এত জোর পেয়েছে তার কারণ বাংলা ভাষার প্রাণের সঙ্গে এদের সহজে যোগ হয়েছে।”
আরও পড়ুন: ব্রিগেডের জনতরঙ্গ
এই শব্দগুলো অর্থাৎ, ‘জারি’, ‘মেজাজ’, ‘নেশাখোর’, ‘বদমায়েস’, কোনোটিই বাংলা শব্দ নয়। এরকরম অনেক শব্দই বাংলা না হয়েও বাংলা ভাষায় দিব্যি মানিয়ে নিয়েছে। শুধু, ‘বাংলা ভাষা বাঁচাও কমিটি’র ঘাঁটি গড়তে গিয়ে অনেকেই ভুলে যান বা ভুলিয়ে দিতে চান সেইসব ভাষার বুৎপত্তি। ভিন্ন ভিন্ন ভাষার প্রয়োজন ও তার ব্যবহার আগেও ছিল, এখনও আছে। সমস্যা দেখা দেয় তখনই, যখন ভাষার সঙ্গে নিরবিচ্ছিন্নভাবে জড়িয়ে থাকা ব্যক্তি স্বাধীনতা খর্ব করা হয়, রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে বাক স্বাধীনতা কেড়ে নেওয়া হয়, ক্ষমতায়নের জন্য যেকোনও একটি ভাষাকে নির্বাচন করা হয়।
তথ্যসূত্রঃ
বাংলা শব্দতত্ত্বঃ রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

