প্রেম তবু নামহীন গোত্রহীন

প্রেম দিবসে বঙ্গদর্শনের বিশেষ লেখা ৩ : সুমন সাধু

ল কি তোমার কোনো ব্যথা বোঝে? সেই কোন স্কুলবেলায় শঙ্খ ঘোষ যাদবপুরের চৌহদ্দি পেরিয়ে আমাদের মফস্বলে পৌঁছে গিয়েছিলেন অবলীলাক্রমে। জীবনবিজ্ঞানের শরীর আঁকতে আঁকতে আমার বারবার মনে পড়ে যেত এই অনন্ত বাক্য, জল কি তোমার কোনো ব্যথা বোঝে? মফস্বলে কলেজপাড়া, স্কুলমোড়, বাসস্ট্যান্ড আর আমাদের ওই কাঁচাপাকা বাড়িটার কাছে যেতে যেতে দেখা হয়ে যেত এক ছায়ার সঙ্গে। নিঃশব্দে প্রেম এসেছিল বুঝি। আর বয়সন্ধিতে প্রথম চাক্ষুষ। সেই যে একবার মনের তানপুরা বেজে উঠেছিল, আর তাকে ছাড়া গেল না। প্রেমে পড়া যেন প্রাত্যহিক জীবনের অংশ হয়ে গেল। প্রেম থাকলে জীবন বড়ো হয়ে ওঠে। অনুভূতির শব্দসাঁকো পার করে আমিই তখন সাত রাজার ধন মালিক, সুন্দরী রানি, গাছের ফুল, বনপাহাড়ি রাস্তা। জীবন তখন সব পেয়েছির দেশ। জীবন যখন শুকায়ে যায়, করুণাধারায় এসো – এক জীবনে কত বাঁক, কত দেখা, কত পরিচিতি, কত লোক হাসানো, কত রঙ্গতামাশা, কত যৌন চাহিদা, কত প্রেম আর কতই বা চাওয়া-পাওয়ার হাতছানি। তার কতটুকু জানা হয় আমাদের! ‘প্রেম’ – যে শব্দের মধ্যে লুকিয়ে রহস্যের অনন্ত ঘেরাটোপ। তাকে উদ্ধার করি রোজ।

স্কুলের মাঠ ভর্তি হাফপ্যান্ট। আড়চোখ। খেলার নাম করে রোজকার মাঠ। প্রথম গ্রিটিংস কার্ডে আঁকা লাল হৃদয়। বিকেলে ভোরের সাইকেল। প্রথম ধরেছে কলি আমার মল্লিকা বনে…। কলি ঝরে গেল বছর ঘুরতেই। এক গ্রাম থেকে আরেক গ্রাম, এক শহর থেকে অন্য শহর। প্রেম হারিয়ে গেল কিছু না বলেই।

প্রেম মানে ঠাকুমা। প্রতি দুপুরে ঠাকুরঘরে অবলীলাক্রমে ঢুকে যেতেন এক মুসলমানি যুবক ও তাঁর গান। নজরুলের শ্যামাসংগীত-আবহে ঠাকুমা গুনগুন গলা মেলাচ্ছে। ঠাকুমার চোখে জল। ভক্তিতে নাকি প্রেমে? বুঝতে বুঝতেই একদিন ঠাকুমা মরে গেল বরের দেওয়া শেষ শাড়িটি পরে। তারপর আর কোনো ঠাকুরঘরের দুপুরে নজরুল গাইলেন না শ্যামাসংগীত। শুধু প্রতিটা ভাঙা সিঁড়ি, রংচটা দেওয়াল, নারায়ণের সিংহাসন আর শুকিয়ে যাওয়া দুব্বো যে গোপন প্রেমের সাক্ষী রইল সত্তরটা বছর, ক্রমশ মিলিয়ে গেল। আমার জীবনেও এল গোপন প্রেমের কবিতা। স্কুলের মাঠ ভর্তি হাফপ্যান্ট। আড়চোখ। খেলার নাম করে রোজকার মাঠ। প্রথম গ্রিটিংস কার্ডে আঁকা লাল হৃদয়। বিকেলে ভোরের সাইকেল। প্রথম ধরেছে কলি আমার মল্লিকা বনে…। কলি ঝরে গেল বছর ঘুরতেই। এক গ্রাম থেকে আরেক গ্রাম, এক শহর থেকে অন্য শহর। প্রেম হারিয়ে গেল কিছু না বলেই।

প্রান্তিক শব্দের মানে বোঝার আগেই একদিন হঠাৎ জীবনে প্রান্তিক এল। জনমানবহীন রেল স্টেশন। মাঠের আল ধরে আমরা কয়েকজন হেঁটে যেতাম কোচিংয়ে। আলপথে ছড়িয়ে দিতাম জীবনের যত প্রেম। সেই প্রথম নাম না জানা কারোর প্রেমে পড়া। ঠিকানা জানি না, কাজকম্ম জানি না, অথচ তার কালো শরীর আমায় ঘামিয়ে দিত। প্রায় এক বছর চললো এই নির্বাক আলাপ। চোখাচোখি। হাসি বিনিময়। প্রান্তিককে ফেলে আমি এসে পড়লাম বড়ো শহরে। কলকাতায়। তারপর ঝুলি শূন্য করে নিজেকে উজাড় করে দিলাম। কলকাতা আমায় আপন করে নিল নিজ স্বভাবে।

মন কেমন আর স্বপ্নে আসা প্যারিসের অ্যাভিনিউ ভিক্টর হুগো কেমন দড়াম করে স্বপ্নভঙ্গ করল। চোখ খুলে দেখি নাভিতে হাত, ঠোঁটে হাত, বুকে হাত, হাতে হাত। একটা মানুষের কতগুলো হাত থাকলে তাকে ঠিক মানুষ লাগে!

স্বভাবেরও একরকম অভাব থাকে। সে অভাব দিনে দিনে বেড়েছে। কিন্তু জীবন থেমে থাকেনি। অভাবের ডানা কেউ ছাঁটতে পারেনি। রামকৃষ্ণ মিশনের হস্টেল থেকে যাদবপুরের বারান্দা – প্রেমের নতুন স্বাদ। মিথ্যের ভিতর কত সত্যি! কত মানুষের আনাগোনা! কত ডেটিং অ্যাপ! প্রতি দুপুরে টানটান বিছানার চাদর কুচকে যাওয়া! কত চোখ! কত স্নান! কত হাতের স্পর্শ! কত স্বমেহন! এতিম করে দিয়ে পালালো যারা, তাদের বুকে মাথা রেখে সংসার সংসার খেলা! এক জীবনে অনেক স্বপ্ন আমরা দেখেছি। স্বপ্ন দেখতে দেখতে আমাদের বয়স কমে যায়। চোখ ক্রমশ নেশা হয়। সে চোখে আর ঘুম আসে না। তাল কাটে। লতা লতা লতার মতো তিনবার ইকো হয় বিদ্রোহের চুমু। এই তিনের মধ্যে থাকে সত্য। ‘হাতের ওপর হাত রাখা সহজ নয়/ সারাজীবন বইতে পারা…’ সহজ নয়। নীলাভ কুয়াশার রূপে মুগ্ধ হয়ে আমার প্রেম বহুবার পৌঁছে গিয়েছিল দার্জিলিংয়ের কোনো এক গলিপথে। উঁচু নিচু সে পথ। সে পথ ধরে এগিয়েছে শহুরে নিয়ন আলো। গন্তব্যহীন। যেমন সীমার মাঝে অসীম। অনতিদূরের অন্ধকার থেকে আবছা হেঁটে আসছিল বিরহী প্রেমিক। এক হাতে লাল ছাতা, অন্য হাতে টিফিনবক্স। গন্তব্যহীন তার যাওয়া। চোখাচোখি হতেই সে আমার হাতে তুলে দিয়েছিল সিগারেটের দৃশ্যমান কাউন্টার। ধোঁয়ার তুফান উড়িয়ে সে আমার দিকে অপলক। এ দৃষ্টির মাঝে সেদিন বর্ষা নেমেছিল। অথচ আমাদের চোখ ভেজেনি। ইশারায় বলেছিল সিগারেটের শেষ টানটা দিতে৷ কিছু বলতে না পারাও বুঝি প্রেম! নামহীন গোত্রহীন। সব প্রেমেরই যে মেয়াদ থাকতে হবে, কে বলেছে!

 

অবিরাম এক বসন্তবেলায় সমুদ্র আছড়ে পড়েছিল। পথচলতি সমুদ্র পাড়ে যা যা কুড়িয়ে-বাড়িয়ে পেলাম, মন ভরল না। মন কেমন আর স্বপ্নে আসা প্যারিসের অ্যাভিনিউ ভিক্টর হুগো কেমন দড়াম করে স্বপ্নভঙ্গ করল। চোখ খুলে দেখি নাভিতে হাত, ঠোঁটে হাত, বুকে হাত, হাতে হাত। একটা মানুষের কতগুলো হাত থাকলে তাকে ঠিক মানুষ লাগে! ভাবতেই ভাবতেই আমাদের ঘাড়ে বসে মনোরম যন্ত্রণা। আমরা রমাপদ চৌধুরীর হারানো খাতায় হারিয়ে যাই, ঋতুপর্ণর ফার্স্ট পার্সেন পড়ে কাঁদি, জীবনানন্দের কলকাতা ছাড়ছি পড়ে চলে যাই দিগ্বিদিক জ্ঞানশূন্য মফস্বল, আনন্দ শংকরের সুরের মূর্ছনায় আমরা আবার সমুদ্রে গিয়ে পড়ি। আমরা ভেসে থাকি। আমরা ডুবি না। আমরা কাছে আসি। আমরা পৃথিবীর দীর্ঘ চুম্বনে হাঁসফাঁশ করি। আমরা দূরে যাই। আমরা আমরা আমরা…

আমাদের সকলের প্রেম সম্ভাবনাময় কিংবা পৃথিবীর সমস্ত মানসিক অশান্তির নাম প্রেম।

____
প্রেম দিবসে বঙ্গদর্শনের বিশেষ লেখা | সুমন সাধু | Valentine's Day | ভ্যালেন্টাইন্স ডে

Developed by DXDasia