প্রমাণ করলেন, লর্ড কার্জন মিথ্যাবাদী
ব্রিটিশ সরকার তখন বঙ্গভঙ্গের প্রস্তুতি নিচ্ছে। কলকাতা জুড়ে এক চাপা উত্তেজনা। জাতীয় কংগ্রেসের মধ্যে চলছে পুরোনো নরমপন্থী আর নতুন চরমপন্থী নেতাদের সংঘাত। বিপ্লবী আন্দোলনও বাংলায় বেশ সক্রিয়।
১৯০৫ সালের ১১ ফেব্রুয়ারি। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে আয়োজিত হল সমাবর্তন। প্রথম বাঙালি উপাচার্য স্যার গুরুদাস বন্দ্যোপাধ্যায় হাজির রয়েছেন মঞ্চে। কলকাতার বিশিষ্ট ব্যক্তিরা দর্শকের আসনে আমন্ত্রিত। তাঁদের সামনে বক্তৃতা দিতে উঠলেন ব্রিটিশ ভারতের গভর্নর জেনারেল লর্ড জর্জ ন্যাথানিয়েল কার্জন।
বঙ্গভঙ্গের দৌলতে লর্ড কার্জনের নাম বাঙালির কাছে পরিচিত। প্রশাসক হিসেবে তিনি ছিলেন অত্যন্ত দক্ষ। কাজে নিযুক্ত হয়েই আমলাতন্ত্রকে ঢেলে সাজান। জমি থেকে যাতে কৃষকদের উৎখাত না করা যায়, সেজন্য পদক্ষেপ নেন বেশ কিছু। ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়াল স্থাপনের উদ্যোগ নিয়েছিলেন তিনিই। তবে দুটি কারণে তাঁর শাসনকাল বিতর্কিত হয়ে আছে – শিক্ষানীতি এবং বঙ্গভঙ্গ। অন্যান্য সাম্রাজ্যবাদী ইংরেজের মতো তিনিও মনে করতেন, এশিয়ার লোকেদের চেয়ে ইউরোপীয়রা বহুগুণে শ্রেষ্ঠ। বুদ্ধিবৃত্তি, সংস্কৃতি, যুক্তিবোধ, মননশীলতা – সব ক্ষেত্রেই। “White man’s burden”-এর তত্ত্বে ছিলেন আস্থাশীল। অর্থাৎ মনেপ্রাণে বিশ্বাস করতেন, ইউরোপীয়দের দায়িত্ব হল ভারতীয়দের মতো ‘অসভ্য’দের শাসন করে সভ্য ও মার্জিত বানিয়ে তোলা।
কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাবর্তনে বক্তৃতার মাঝখানে লর্ড কার্জন বললেন, “প্রাচ্যবাসীর চেয়ে পাশ্চাত্যের বাসিন্দারা সত্যকে অনেক বেশি সমাদর করেন।” সভায় হাজির থাকা ভারতীয়রা অপমানিত বোধ করলেন। কিন্তু প্রতিবাদে সোচ্চার হলেন না কেউ। তবে একজন ছিলেন ব্যতিক্রম। ভগিনী নিবেদিতা। জন্মসূত্রে তিনি ভারতীয় নন, আইরিশ। কিন্তু মনের গভীর থেকে ভারতীয়দের ভালোবাসতেন। স্বামী বিবেকানন্দের শিষ্যত্ব নিয়ে সমুদ্র পেরিয়ে আসেন এদেশের সেবা করবেন বলে।
লর্ড কার্জনের বক্তৃতা শুনে ভগিনী নিবেদিতা ফেটে পড়েন রাগে আর অপমানে। ঠিক করলেন, পালটা জবাব দিতেই হবে। স্যার গুরুদাস বন্দ্যোপাধ্যায়কে নিয়ে সেদিনই চললেন ইম্পিরিয়াল লাইব্রেরি। যাকে আমরা ন্যাশানাল লাইব্রেরি নামে চিনি এখন। লর্ড কার্জনের লেখা ‘Problems of the East’ বইটি নিবেদিতা খুঁজে বের করলেন। সেখানে কার্জন লিখেছিলেন, কোরিয়ার বিদেশ দপ্তরের প্রেসিডেন্টের কাছে তিনি নিজের বয়স বাড়িয়ে বলেছেন। রাজপরিবারে নিজের বিয়ের সম্ভাবনা নিয়েও মিথ্যে ইঙ্গিত করেছেন। কার্জনের মিথ্যাচারের অমোঘ প্রমাণ এই বই।
তখন বাগবাজারে থাকতেন ভগিনী নিবেদিতা। কাছেই অমৃতবাজার পত্রিকার অফিস। সেই রাতেই সম্পাদক শিশিরকুমার ঘোষের সঙ্গে দেখা করলেন তিনি। লর্ড কার্জনের বক্তৃতার আপত্তিকর অংশ এবং সেই বইয়ের মিথ্যা বিবৃতি পাশাপাশি রেখে একটি প্রতিবাদী লেখা দিলেন ছাপার জন্য। ১৩ ফেব্রুয়ারি অমৃতবাজারের প্রথম পৃষ্ঠায় ছদ্মনামে সেটি প্রকাশিত হয়। পড়ে দেশবাসী লর্ড কার্জনের বিরুদ্ধে ক্ষোভে ফেটে পড়েন। কার লেখা, তা নিয়ে জল্পনা হতে থাকে। এক ইংরেজ সাংবাদিক মন্তব্য করেন, “কোনও অসাধারণ স্মৃতিশক্তিধর হিন্দু এটি লিখেছেন।” ১৪ ফেব্রুয়ারি দ্য স্টেটসম্যান পত্রিকায় আবার বের হল সেই প্রতিবাদপত্র।
১২ তারিখ স্টেটসম্যান পত্রিকার সম্পাদকীয়তে প্রথম কার্জনের ওই বক্তৃতার প্রতিবাদ করা হয়েছিল। তখন নিয়মিত সেই পত্রিকায় লিখতেন নিবেদিতা। মাঝেমাঝে তাঁর লেখা সম্পাদকীয়ও প্রকাশিত হত। সেদিনের প্রকাশিত সম্পাদকীয়টি র্যাটক্লিফের লেখা বলে মনে করেন গবেষকরা। তবে র্যাটক্লিফের সঙ্গে নিবেদিতার অন্তরঙ্গ বন্ধুত্বের কথা অনেকেই জানতেন। সহজেই অনুমান করা যায়, এই সম্পাদকীয়ের পিছনে ছিল ভগিনী নিবেদিতার হাত। ১৪ ফেব্রুয়ারি আবার লর্ড কার্জনের বক্তৃতা নিয়ে স্টেটসম্যানে ‘এক্স’ ছদ্মনামে একটি পত্রপ্রবন্ধ লেখেন নিবেদিতা। যার নাম, “The Highest Ideas of Truth”।
এরপর অন্যান্য পত্রপত্রিকায় কার্জনের বিরুদ্ধে লেখা শুরু হল। সারা ভারতে ছড়িয়ে গেল প্রতিবাদ। কলকাতার টাউন হলে এক বিশাল সভা হয় কার্জনের বক্তৃতাকে নিশানা করে। অন্যান্য শহরেও বিশিষ্ট মানুষেরা প্রতিবাদসভার আয়োজন করেন। বলা যেতে পারে, এভাবেই বঙ্গভঙ্গ বিরোধী আন্দোলনের সলতে পাকানোর কাজ শুরু করেছিলেন ভগিনী নিবেদিতা।
তথ্যঋণ – শঙ্করীপ্রসাদ বসু, প্রব্রাজিকা মুক্তিপ্রাণা, ডঃ অচিন্ত্যকুমার মাইতি।