আব্বাস উদ্দীন ১৯৩১ সাল থেকে ১৯৪৭ সাল পর্যন্ত কলকাতায় বসবাস করেন
আব্বাস উদ্দীন আহমদ ১৯০১ সালের ২৭ অক্টোবর তৎকালীন ভারতের কুচবিহার জেলার তুফানগঞ্জ মহকুমার বলরামপুরে জন্মগ্রহণ করেন। পিতা জাফর আলী আহমেদ ছিলেন জজ আদালতের আইনজীবী। একজন আইনজীবী হিসেবে সন্তানকেও গড়ে তুলতে চেয়েছিলেন আইনজীবী হিসেবে। কিন্তু শৈশব থেকেই গানে গানে তানে তানে পথ চলতেন আব্বাস উদ্দিন আহমদ। প্রচণ্ড এক ভালোবাসা ছিল তাঁর গানের প্রতি। গানের সঙ্গে তাঁর নিবিড় সম্পর্ক। এসব দেখে দেখে পিতা জাফর আলী আহমদও রাজি হন। সন্তানের গানের সুরে মুগ্ধ হন তিনি। আব্বাস উদ্দিন তুফানগঞ্জ স্কুল থেকে এন্ট্রান্স এবং পরে কুচবিহার কলেজ থেকে আইএ পাস করেন। এরপর সংগীত চর্চাকে পেশা হিসেবে গ্রহণ করেন। এক পর্যায়ে তার সাথে পরিচয় হয় কাজী নজরুল ইসলাম, ইন্দুবালা, জগত ঘটক, কাজী মোতাহার হোসেন, ওস্তাদ আলাউদ্দিন খাঁ, আঙ্গুরবালা সহ অসংখ্য শিল্পীর সাথে। কাজী নজরুল ইসলামের অনুপ্রেরণায় বেশ কিছু গান(ঠুমরী, গজল) রচনা করেছিলেন। কাজী নজরুল ইসলাম রচিত “ও মন রমজানের ওই রোজার শেষে এলো খুশীর ঈদ’’ গানটি আব্বাস উদ্দিনের কণ্ঠে মারাত্মক জনপ্রিয়তা পেয়েছিল। আইনজীবী পিতার সঙ্গীত শিল্পী পুত্র আব্বাস উদ্দিন আহমদ প্রথম জনসম্মুখে গান করেন তার শিক্ষাঙ্গনের সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে।
আব্বাসউদ্দিনই প্রথম ভাওয়াইয়াকে রেকর্ড করে সকলের সামনে উপস্থাপন করেন। তার প্রথম রেকর্ডকৃত গান হল -‘ওকি গাড়িয়াল ভাই কত রব আমি পন্থের দিকে চায়া রে…’ এবং ‘ফান্দে পড়িয়া বগা কান্দে রে…’। তবে এর আগে আর একটি ভাওয়াইয়া তিনি রেকর্ড করেছিলেন। কিন্তু গ্রামোফোন কোম্পানির চাওয়ায় গানের বাণীর পরিবর্তন আনতে হয়েছিল। মূল গান ছিল –
‘তোরষা নদীর ধারে ধারে ও
দিদিলো মানসাই নদীর পারে
ওকি সোনার বঁধু গান করি যায় ও
দিদি তোরে কি মোরে
কি শোনেক দিদিও’।।
পরিবর্তন করে সে গান গাওয়া হলো-
‘তোরষা নদীর পারে পারে ও
দিদিলো মানসাই নদীর পারে
ওকি সোনার বঁধু গান গেয়ে যায় ও
দিদি তোর তরে কি মো তরে
কি শোনেক দিদিও’।।
এর পরে চরম মর্মবেদনায় পড়েন আব্বাস উদ্দিন, বিশেষ করে এই গান রেকর্ড করে । তিনি তার লেখা ‘আমার শিল্পী জীবনের কথা’ বইতে এ বিষয়ে লেখেন- “খরস্রোতা ছোট্ট পাহাড়ি নদী তোরষা – কুচবিহারের পাদমূল ধৌত করে তরতর বেগে চলেছে। তারি তীরে তীরে গান গেয়ে চলেছে মোষের পিঠে করে দোতারা বাজিয়ে মেষ-চালক মৈশালের দল। তাদের কণ্ঠের সুর ছেলেবেলার আমার কণ্ঠে বেঁধেছিল বাসা। তাদের মুখের ভাষাই আমার মাতৃভাষা। মাতৃভাষাকে অবিকৃত রেখে গান দিতে পারলাম না। মনে জেগে আছে ক্ষোভ।
তবে আব্বাস উদ্দিন পরের রেকর্ড ‘ওকি গাড়িয়াল ভাই’ ও ‘ফান্দে পড়িয়া বগা কান্দে’ গান দু’টি অবিকৃত রেখেই করতে সমর্থ হন। ‘ফান্দে পড়িয়া বগা কান্দে রে…’ যখন রেকর্ড আকারে বের হয় তখন সে সময়কার হিজ মাস্টার্স ভয়েস প্রচার-পুস্তিকায় লেখা হয়-
“পল্লী-গীতি রাজ্যের দুয়োরানী এই ভাওয়াইয়া গানকে সর্বপ্রথম আব্বাস সাহেবই আদর করে রাজ-অন্তঃপুরে ডেকে আনলেন। তখন আমরা মুগ্ধ হয়ে দেখলাম উপেক্ষিত দুয়োরাণীর রূপ-শ্রী সুয়োরানীর চেয়ে ত’ কম নয়! এবং তার চেয়ে মুগ্ধ হলাম তার নিতান্ত সরল হৃদয়ের মাধুরীতে! এর জন্য সমগ্র রসিকজনের অভিনন্দনের মালা পাওয়া উচিত পল্লী দুলাল আব্বাস সাহেবের। বহু দুর্লভ ভাওয়াইয়া গান তিনি সংগ্রহ করে আপনাদের সামনে উপহার দিয়েছেন।”
সেই যে শুরু, তারপর থেকে আর পেছনে ফেরা নয়। আব্বাস উদ্দিন ভাওয়াইয়াকে নিয়ে গেছেন অনেক দূর। দেশ থেকে দেশান্তরে। সেই সাথে বিভিন্ন রাজনৈতিক সভায় গান গেয়ে বাঙালিদের উদ্বুদ্ধ করতেন। গাইতেন ‘ওঠরে চাষী জগতবাসী, ধর কষে লাঙল’। শুধু ভাওয়াইয়া গানই নয় তিনি বাংলা ইসলামী গানেরও শ্রষ্ঠা । কাজি নজরুল ইসলামকে দিয়ে লিখিয়ে নিয়েছিলেন বাংলা ইসলামিক গজল। আজও সকলের কণ্ঠে ওঠে ‘ও মন রমজানের ঐ রোজার শেষে এলো খুশির ঈদ’। এ ছাড়াও উর্দু, জারি, সারি, ভাটিয়ালি, মুর্শিদি, দেহতত্ত্ব, মার্সিয়া, পালাগান গেয়েছেন।
তিনি কাজী নজরুল ইসলাম, জসীমউদ্দীন, গোলাম মোস্তফা প্রমুখের ইসলামি ভাবধারায় রচিত গানেও কণ্ঠ দিয়েছেন। আব্বাস উদ্দিন ছিলেন প্রথম মুসলমান গায়ক যিনি আসল নাম ব্যবহার করে এইচ এম ভি থেকে গানের রেকর্ড বের করতেন। রেকর্ডগুলো ছিল বাণিজ্যিক ভাবে ভীষণ সফল।তাই অন্যান্য হিন্দু ধর্মের গায়করা মুসলমান ছদ্মনাম ধারণ করে গান করতে থাকে।
আব্বাস উদ্দীন ১৯৩১ সাল থেকে ১৯৪৭ সাল পর্যন্ত কলকাতায় বসবাস করেন। প্রথমে তিনি রাইটার্স বিল্ডিংয়ে ডিপিআই অফিসে অস্থায়ী পদে এবং পরে কৃষি দপ্তরে স্থায়ী পদে কেরানির চাকরি করেন। এ কে ফজলুল হকের মন্ত্রিত্বের সময় তিনি রেকর্ডিং এক্সপার্ট হিসেবে সরকারি চাকরিতে প্রবেশ করেন। চল্লিশের দশকে আব্বাস উদ্দিনের গান পাকিস্তান আন্দোলনের পক্ষে মুসলিম জনতার সমর্থন আদায়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। আব্বাস উদ্দিন আহমদ এর পিতা জাফর আলী আহমদ ছিলেন বিপুল ধনসম্পদের অধিকারী। কিন্তু সবকিছু ছেড়ে আব্বাস উদ্দিন ১৯৪৭ সালে দেশ বিভাগের দিনই ভারতের কোলকাতা থেকে ঢাকায় চলে আসেন। ঢাকায় এসে তিনি সরকারের প্রচার দপ্তরে এডিশনাল সং অর্গানাইজার হিসেবে চাকরি করেন। পাকিস্তানের প্রতিনিধি হিসেবে ১৯৫৫ সালে ম্যানিলায় দক্ষিণ-পূর্ব এশীয় সংগীত সম্মেলন, ১৯৫৬ সালে জার্মানিতে আন্তর্জাতিক লোকসংগীত সম্মেলন এবং ১৯৫৭ সালে রেঙ্গুনে প্রবাসী বঙ্গ সাহিত্য সম্মেলনে তিনি যোগদান করেন। যিনি স্বপ্ন দেখতেন স্বাধীন-সার্বভৌম রাষ্ট্রের। যে জন্য তিনি জীবনের সোনালী সময় ব্যয় করেছেন, মানুষকে স্বাধীনভাবে বাঁচতে উদ্বুদ্ধ করেছেন গানে গানে। তিনি চলে আসেন স্বাধীন রাষ্ট্রে-সকল ধনসম্পদ ত্যাগ করে শূণ্যহাতে স্ত্রী, সন্তানদের নিয়ে।
ঢাকায় স্থায়ী হয়েই তিনি এ দেশের মানুষকে গানের দিকে উদ্বুদ্ধ করতে থাকেন। প্রত্যন্ত এলাকায় ঘুরে ঘুরে সংগীত চর্চা কেন্দ্র খোলার ব্যবস্থা করেন। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে সাংস্কৃতিক সমাবেশসহ নানা অনুষ্ঠানে ভাওয়াইয়াকে পৌঁছে দিয়েছেন ভাওয়াইয়া সম্রাট আব্বাস উদ্দিন।
শুধু গানই নয় আব্বাসউদ্দিন আহমেদ মোট ৪টি বাংলা চলচ্চিত্রে অভিনয় করেন। সিনেমাগুলো হলো ‘বিষ্ণুমায়া ’ (১৯৩২), ‘মহানিশা’ (১৯৩৬), ‘একটি কথা’ এবং ‘ঠিকাদার’ (১৯৪০)। ঠিকাদার সিনেমাতে আব্বাস উদ্দিন একজন কুলির ভূমিকায় অভিনয় করেছিলেন। ধারণা করা হয় যে তিনি এর চেয়ে বেশি সংখ্যক চলচ্চিত্রে অভিনয় করলেও তা উল্লেখ করেননি। কারণ সেই চরিত্রগুলো তেমন উল্লেখযোগ্য ছিল না। এসব সিনেমাতে তিনি গানও করেছিলেন। তখনকার দিনে মুসলমান ব্যক্তির সিনেমা করা ছিল একটা ব্যতিক্রম ঘটনা।
আব্বাস উদ্দীনের রচিত একমাত্র গ্রন্থ ‘আমার শিল্পী জীবনের কথা’ প্রকাশিত হয় ১৯৬০ সালে। সংগীতে অবদানের জন্য তিনি মরণোত্তর প্রাইড অব পারফরমেন্স (১৯৬০), শিল্পকলা একাডেমী পুরস্কার (১৯৭৯) এবং স্বাধীনতা দিবস পুরস্কারে (১৯৮১) ভূষিত হন। এছাড়াও আরও অনেক পুরস্কার ও সম্মাননায় তাঁকে বিভিন্ন সময় ভূষিত করা হয়।
১৯৫৯ সালের ৩০ ডিসেম্বর বুধবার সকাল ৭ টা ২০ মিনিটে তিনি চির বিদায় নেন।