লিটল হলেও ভাবনায় বৃহৎ, লিটল ম্যাগাজিন মেলা ২০২৩-এর মাঠ থেকে…

৩৫০ লিটল ম্যাগাজিন এবং ৫০০ কবির সম্মিলন

লিটল ম্যাগাজিন। বিশ্ব সাহিত্যে যার মূল্য অপরিসীম। লিটল ম্যাগাজিন আস্ত একটি আন্দোলন। সে তার সমস্ত জেদ আর অহংকার নিয়ে যুগের পর যুগ এগিয়ে চলেছে গুটি গুটি পায়ে৷ কে তার পাশে রইল, কে এলো-গেলো; এসব হিসেব লিটল ম্যাগাজিন রাখে না। কারণ তার নিজস্ব একপ্রকার যাপন আছে। কবি ভাস্কর চক্রবর্তী যেমন কবিতাযাপন প্রসঙ্গে লিখেছিলেন, বিখ্যাত বিখ্যাত আর বিখ্যাত হওয়ার মধ্যে একটা অশ্লীলতা আছে। লিটল ম্যাগাজিন বাঁচে, তাকে বাঁচতে হয় প্রজন্মের পর প্রজন্ম। টিকিয়ে রাখেন প্রবীণ থেকে তরুণ থেকে অতি-তরুণরা। 

পুরোনো মেজাজ নিয়ে ফিরল পশ্চিমবঙ্গ বাংলা আকাদেমি আয়োজিত সাহিত্য উৎসব ও লিটল ম্যাগাজিন মেলা ২০২৩। স্থানঃ নন্দন-রবীন্দ্র সদন চত্বর। গতকাল অর্থাৎ ১১ জানুয়ারি থেকে মেলা শুরু হল, চলবে আগামী ১৫ জানুয়ারি দুপুর ২টো থেকে রাত ৮টা পর্যন্ত। পশ্চিমবঙ্গ, ত্রিপুরা, আসাম এবং বাংলাদেশের ৩৫০ লিটল ম্যাগাজিনের সম্ভার, পাঁচশোরও বেশি কবি-লেখকের সম্মিলন, তাঁদের গল্প ও কবিতাপাঠ, নানান বিষয়ে মনোজ্ঞ আলোচনা, গ্রন্থ প্রকাশ এবং গগনেন্দ্র প্রদর্শশালায় আয়োজিত মাইকেল মধুসূদন দত্ত বিষয়ক একটি প্রদর্শনী এবছরের লিটল ম্যাগাজিন মেলার অন্যতম আকর্ষণ।

পুরোনো মেজাজ নিয়ে ফিরল পশ্চিমবঙ্গ বাংলা আকাদেমি আয়োজিত সাহিত্য উৎসব ও লিটল ম্যাগাজিন মেলা ২০২৩। স্থানঃ নন্দন-রবীন্দ্র সদন চত্বর। গতকাল অর্থাৎ ১১ জানুয়ারি থেকে মেলা শুরু হল, চলবে আগামী ১৫ জানুয়ারি দুপুর ২টো থেকে রাত ৮টা পর্যন্ত।

‘দেশ’ পত্রিকায় ১৯৫৩ সালের মে মাসের একটি সংখ্যায় ‘সাহিত্য পত্র’ প্রবন্ধে বুদ্ধদেব বসু লিখেছিলেন, “এক রকমের পত্রিকা আছে, যা আমরা রেলগাড়িতে সময় কাটাবার জন্য কিনি, আর গন্তব্য টেশনে নামার সময় ইচ্ছে করে গাড়িতে ফেলে যাই, যদি না কোনো সতর্ক সহযাত্রী সেটি আবার আমাদের হাতে তুলে দিয়ে বাধিত ও বিব্রত করেন। আর এক রকমের পত্রিকা আছে যা স্টেশনে পাওয়া যায় না, ফুটপাথে কিনতে হলেও বিস্তর ঘুরতে হয়, কিন্তু যা একবার আমাদের হাতে এলে আমরা চোখ বুলিয়ে সরিয়ে রাখি না, চেয়ে দেখে আস্তে আস্তে পড়ি, আর পড়া হয়ে গেলে গরম কাপড়ের ভাঁজের মধ্যে ন্যাপথলিনগন্ধী তোরঙ্গে তুলে রাখি, জল, পোকা আর অপহারকদের আক্রমণ থেকে বাঁচাবার জন্যে।”

এই ধরনের পত্রিকাই আসলে লিটল ম্যাগাজিন। এটাই লিটল ম্যাগাজিনের অহংকার। অনলাইনের যুগেও অনেক পত্রিকা অত্যন্ত যত্নের সঙ্গে প্রকাশ করে চলেছেন বহু মূল্যবান সংখ্যা। লিটল ম্যাগাজিন লাইব্রেরি ও গবেষণা কেন্দ্রের কর্ণধার সন্দীপ দত্ত কলকাতার এই ঐতিহ্যবাহী লিটল ম্যাগাজিন মেলা প্রসঙ্গে জানাচ্ছেন, “১৯৯৮ সালের মে মাসে আমার প্রস্তাবে বাংলা আকাদেমির উদ্যোগে ১৯৯৯ সালের ৯ জানুয়ারি লিটল ম্যাগাজিন মেলার পথ চলা শুরু। এই লিটল ম্যাগাজিন মেলার প্রদীপে প্রথম সলতে জ্বালিয়েছিলেন কিংবদন্তি অন্নদাশংকর রায়।”

গতকাল একতারা মুক্তমঞ্চে লিটল ম্যাগাজিন মেলা উদ্বোধন করেন কবি দেবদাস আচার্য এবং সাহিত্যিক অমর মিত্র। প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন রাষ্ট্রমন্ত্রী ইন্দ্রনীল সেন। সভামুখ্য হিসেবে ছিলেন রাজ্যের শিক্ষামন্ত্রী এবং পশ্চিমবঙ্গ বাংলা আকাদেমির সভাপতি ব্রাত্য বসু।

লিটল ম্যাগাজিন সম্মান পেল রবিন ঘোষ সম্পাদিত ‘বিজ্ঞাপনপর্ব’ এবং গৌতম ঘোষ দস্তিদার সম্পাদিত ‘রক্তমাংস’ পত্রিকা।

সাহিত্য উৎসবে এবছর বাংলা আকাদেমি কর্তৃক সুধা বসু এবং বিভা চট্টোপাধ্যায় স্মারক সম্মানে ভূষিত হলেন যথাক্রমে অগ্রজ দেবারতি মিত্র এবং জহর সেন মজুমদার। আলপনা আচার্য স্মারক সম্মান পেলেন শিবাশিস মুখোপাধ্যায়, লীলা রায় স্মারক সম্মান পেলেন শৌভিক দে সরকার, শক্তি চট্টোপাধ্যায় স্মারক সম্মান পান সম্রাজ্ঞী বন্দ্যোপাধ্যায়। বাংলা আকাদেমি মধুপর্ণী স্মারক সম্মান পান বারিদবরণ ঘোষ। এছাড়াও লিটল ম্যাগাজিন সম্মান পেল রবিন ঘোষ সম্পাদিত ‘বিজ্ঞাপনপর্ব’ এবং গৌতম ঘোষ দস্তিদার সম্পাদিত ‘রক্তমাংস’ পত্রিকা।

 

শুধু মুশকিল একটাই, আজকাল লিটল ম্যাগাজিন সম্পাদকরা পত্রিকার নতুন সংখ্যা ছাপার চেয়ে বই প্রকাশে তুলনামূলক বেশি মন দিয়েছেন। নতুন বই যতটা আছে, পত্রিকা তত নেই।

প্রবীণ-নবীন কবি, গল্পকার, সম্পাদকের ভিড়ে নতুন ছন্দে মুখরিত নন্দন চত্বর। স্টলে চেয়ার পাওয়া নিয়ে খানিক ঝামেলা চলছে, পত্রিকায় লেখা মনোনীত হয়নি দেখে খানিক অভিমান করছেন তরুণ কবি, কবিতা পাঠের নিমন্ত্রণ না পেয়ে কেউ গোঁসা করছেন, পুরোনো বন্ধুকে দেখে কেউ ঝাঁপিয়ে পড়লেন বন্ধুর কাঁধে, কেউ স্টল না পেয়ে এ প্রান্ত থেকে সে প্রান্ত ফেরি করছেন স্বপ্নের পত্রিকা… এসব যদ্দিন থাকবে, লিটল ম্যাগাজিনেও প্রাণ থাকবে তদ্দিন। সমস্ত হাইরাইজ আর কংক্রিট পার করে লিটল ম্যাগাজিন থেকে যাবে মাটির হৃদয়ের চাষে-আবাদে। শুধু মুশকিল একটাই, আজকাল লিটল ম্যাগাজিন সম্পাদকরা পত্রিকার নতুন সংখ্যা ছাপার চেয়ে বই প্রকাশে তুলনামূলক বেশি মন দিয়েছেন। নতুন বই যতটা আছে, পত্রিকা তত নেই। অধিকাংশ লিটল ম্যাগাজিন এখন প্রকাশনা সংস্থায় পরিণত হওয়ায় লিটল ম্যাগাজিনের দাপট কমেছে নাকি একই আছে, সে আলোচনা সাপেক্ষ। তবে অনেকেই নতুন সংখ্যা প্রকাশ করেননি, অথচ নতুন বই সাজানো রয়েছে টেবিলে বা স্টলে।

____

ছবি – প্রতিবেদক

Post Tags
Developed by DXDasia