তিনি বাংলার নারীমুক্তি আন্দোলনের এক অবিস্মরণীয় নেত্রী
বেথুন কলেজে বিএ পরীক্ষায় তিনি মেয়েদের মধ্যে প্রথম হয়ে লাভ করেছিলেন পদ্মাবতী স্বর্ণ পদক। তারপর ইংরেজিতে এমএ পড়তে ভর্তি হলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে। তখন সেই বিশ্ববিদ্যালয়ে ছেলের সঙ্গে মেয়েদের পড়ার কোনো ব্যবস্থা ছিল না। তাঁর মেধার কথা কথা বিবেচনা করে উপাচার্য ড. হার্ট তখন বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার বিশেষ অনুমতি দিয়েছিলেন তাঁকে।
তিনি লীলা নাগ। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম ছাত্রী। ১৯২৩ সালে এমএ সম্পূর্ণ করেছিলেন তিনি। ছাত্রাবস্থায় বিপ্লবী কর্মকাণ্ড এবং নারী আন্দোলনে যুক্ত হয়ে পড়েছিলেন। নারীশিক্ষা প্রসারের উদ্দেশ্যে ১৯২৩ সালে গড়ে তুলেছিলেন দীপালি সঙ্ঘ। এই সংগঠনের উদ্যোগে বেশ কিছু মেয়েদের স্কুল গড়ে ওঠে। মুসলিম নারীদের শিক্ষাতেও তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিলেন। তিনি প্রতিষ্ঠা করেছিলেন নারী আত্মরক্ষা ফান্ড, যেখানে মেয়েদের মার্শাল আর্ট এবং শরীরচর্চার প্রশিক্ষণ দেওয়া হত। তাঁর পরিকল্পনায় ‘ছাত্রীভবন’ নামে একটি ছাত্রী-আবাসিকা চালু হয় কলকাতায়। লবণ সত্যাগ্রহের সময়ে গড়ে তোলেন ঢাকা মহিলা সত্যাগ্রহ কমিটি। ঢাকা শহর এবং জেলায় জেলায় ঘুরে তিনি লবণ আইন ভঙ্গ করেন। তাঁর সম্পাদিত ‘জয়শ্রী’ পত্রিকা হয়ে উঠেছিল নারী আন্দোলনের এক গুরুত্বপূর্ণ মুখপত্র।
খুব ছোটোবেলায় তিনি বাড়িতে দেখেছেন, বিলিতি কাপড় বর্জন করে বঙ্গলক্ষ্মীর মোটা কাপড় পড়ছে তাঁর পরিবার। বিপ্লবী ক্ষুদিরাম বসুর ফাঁসি হলে তাঁদের বাড়িতে পালিত হয়েছিল অরন্ধন। এভাবেই তাঁর মনে ছোটোবেলাতেই দেশপ্রেমের আগুন জ্বলে উঠেছিল। তিনি শ্রীসঙ্ঘ নামের এক বিপ্লবী দলের সদস্য হয়েছিলেন অল্প বয়সেই। ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামে অংশ নিয়ে বহুবার তিনি কারাবরণ করেছেন। ১৯৩৯ সালে লীলা নাগ বিয়ে করেছিলেন বিপ্লবী অনিল রায়কে। সেই থেকে তাঁর নাম হয় লীলা রায়। ফরোয়ার্ড ব্লক গঠনে অনিল রায় এবং লীলা রায় ছিলেন সুভাষচন্দ্র বসুর সহযোগী। সেই দলের সাপ্তাহিক মুখপত্র ‘ফরোয়ার্ড ব্লক’-এর সম্পাদনার দায়িত্ব পালন করেছিলেন লীলা। কলকাতা ও নোয়াখালির দাঙ্গায় তিনি ত্রাণকার্যে অংশ নিয়েছিলেন। দাঙ্গার সময়ে নোয়াখালিতে তিনি গান্ধিজির সঙ্গে দেখা করেন। লীলা রায় ভালো গান গাইতেন, ছবি আঁকতেন, সেতার বাজাতেন।
১৯৪৬ সালে বাংলা থেকে ভারতীয় গণপরিষদের সদস্য নির্বাচিত হন লীলা রায়। ভারতীয় সংবিধানের খসড়া তৈরিতে অবদান রেখেছিলেন তিনি। দেশভাগের পর তিনি পশ্চিমবঙ্গে চলে এসেছিলেন। তাঁর রাজনৈতিক ও সামাজিক কাজকর্ম এক নতুন গতি পেয়েছিল স্বাধীন ভারতে।
তথ্যসূত্র – কালের কণ্ঠ, রোদ্দুরে।