‘কিতনা বদনসীব জফর দাফন কে লিয়ে/দো গজ জমিন ভি মিলনা চুকি ক্যোয়ি ইয়ার মে’
পুরো নাম আবুল মুজাফ্ফর সিরাজুদ দীন মুহাম্মদ বাহাদুর শাহ গাজী। ভারতের শেষ মোগল সম্রাট ২৪ অক্টোবর ১৭৭৫ সাল দিল্লির লালকেল্লায় তাঁর জন্ম এবং ৭ নভেম্বর ১৮৬২ সালে রেঙ্গুনে মৃত্যু। তিনি সম্রাট দ্বিতীয় আকবর শাহ (১৮০৬-১৮৩৭) ও সম্রাজ্ঞী লাল বাঈ-র দ্বিতীয় পুত্র। তাঁর বংশতালিকা বিশতম স্তরে গিয়ে মোগল সাম্রাজ্যের প্রতিষ্ঠাতা জহিরুদ্দীন মুহম্মদ বাবরের সাথে মিশেছে।
দ্বিতীয় বাহাদুর শাহ ‘জাফর’ নামে সর্বাধিক পরিচিত। পিতার মৃত্যুর পর ১৮৩৭ সালে দিল্লির সিংহাসনে বসেন তিনি। মোগল সম্রাট দ্বিতীয় শাহ আলম (১৭৫৯-১৮০৬) এবং পিতা সম্রাট দ্বিতীয় আকবর শাহ উভয়ের মত দ্বিতীয় বাহাদুর শাহ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির পেনশনভোগী ছিলেন। তিনি বাত্সরিক ১ লক্ষ টাকা ভাতা পেতেন। পিতার মতই নিজের এবং মোগল খানদানের মর্যাদা ও ভরণ-পোষণের জন্য ভাতা বৃদ্ধির যথেষ্ট চেষ্টা করেন কিন্তু হিন্দুস্থানের বাদশাহ উপাধি পরিত্যাগ ও লালকেল্লার বাইরে গিয়ে সাধারণ নাগরিকের জীবন-যাপনের শর্ত মেনে নেননি। এছাড়া দিল্লির সিংহাসনের উত্তরাধিকারী মনোনয়ন নিয়েও ইংরেজদের সাথে সম্রাটের মনোমালিন্য চলছিল। দিল্লির সম্রাটের মর্যাদা ক্ষুণ্ন করতে ইংরেজ কোম্পানি নানাভাবে উদ্যোগী হয়। ক্ষমতা, প্রতিপত্তি ও সম্পদ এক কথায় সব হারিয়ে দিল্লির নামেমাত্র সম্রাট হয়ে ইংরেজদের দয়ার পাত্র হয়ে প্রাসাদের চার দেয়ালের মধ্যে জীবন কাটাতে লাগলেন। অমর্যাদা ও দুঃখ ভুলে থাকার জন্য মোগল সম্রাট লেখালেখির জীবন বেছে নেন। তিনি সারাক্ষণ শায়ের-মুশায়রা ও গজলে নিমগ্ন থাকতেন, লালকেল্লায় বসাতেন সাহিত্য-সংগীতের জলসা। উর্দু-ফারসি সাহিত্যের শ্রেষ্ঠ বিদগ্ধ সমাজ সম্রাটের আহ্বানে সাড়া দিতেন। সম্রাট নিজেও কাব্যচর্চা করতেন, লিখতেন নিজের জীবনের কষ্ট ও বিষাদে ভরা গজল-শায়ের। মানবতাবাদী, দেশপ্রেমিক, অসাম্প্রদায়িক ও সুফী কবি বাহাদুর শাহ তাঁর কবিতার প্রতিটি ছত্রে দুঃখ ও বিষাদের সাথে ফুটিয়ে তোলেন দেশ ও জাতির পরাধীনতার গ্লানির কথা।
উমর দরাজ মাঁগকে লায়েথে চারদিন
দো আবজুমে কট গয়ে, দো ইন্তেজার মে।
(চার দিনের জন্য আয়ু নিয়ে এসেছিলাম। দুটি কাটল প্রত্যাশায় আর দুটি অপেক্ষায়)
সিপাহী বিদ্রোহ-পরবর্তী সময়ে, ১৮৫৮ সালের ৭ অক্টোবর বৃদ্ধ সম্রাট, সম্রাজ্ঞী জিনাত মহল, দুই শাহজাদা, শাহজাদী, আত্মীয় ও ভৃত্যদের নিয়ে ব্রিটিশ সৈন্যরা দিল্লি ত্যাগ করে, ৯ ডিসেম্বর জাহাজে রেঙ্গুন পৌঁছোয়। ক্যাস্টেন নেলসন ডেভিসের বাসভবনের ছোট্ট গেরেজে সম্রাট ও তাঁর সঙ্গীদের বন্দী জীবন শুরু হয়। সম্রাট শুতেন একটি পাটের দড়ির খাটিয়ায়, মাতৃ-পিতৃভূমি ভারত থেকে বহুদূরে রেঙ্গুনের মাটিতে চরম অমর্যাদা, অনটন ও দুঃখের মধ্যে জীবনের শেষ দিনগুলো কাটান। পক্ষাঘাতে আক্রান্ত হন সম্রাট। চার বছরের বিড়ম্বনাময় জীবনের অবসান ঘটে ১৮৬২ সালের ৭ নভেম্বর শুক্রবার ভোর ৫টায়। অতি গোপনীয়ভাবে দাফন কাজ সম্পন্ন করা হয়, ঘিরে দেয়া হয় বাঁশের বেড়া দিয়ে। ইংরেজদের ধারণা ছিল একসময় বাঁশের বেড়া বিলীন হবে, ঘাস গোটা কবরকে আচ্ছাদিত করে ফেলবে। কোথায় শেষ মোগল সম্রাট শায়িত আছেন তা চিহ্ন কেউ খুঁজে পাবে না। ইংরেজরা জানত ভারতবাসীর মনে সম্রাট বাহাদুর শাহ জাফরের মর্যাদা কতটুকু। সম্রাটের প্রিয়তমা স্ত্রী জিনাত মহল মারা যান ১৮৮৬ সালের জুলাইতে, সম্রাটের পাশে হয়েছে তাঁর কবর। এ দুটি কবর হয়েছে দেশপ্রেমিকদের তীর্থস্থানে।
যতটুকু তথ্য পাওয়া যায়, সম্রাট ও সম্রাজ্ঞীর কবরের চিহ্ন চার দশক ধরে সকলের অজ্ঞাতে থেকে যায়। ১৯০৩ সালে কিছু মুসলিম জিয়ারতকারী প্রথমবারের মত সেখানে যান। সম্রাট ও সম্রাজ্ঞীর কবর খুঁজে বের করার চেষ্টা করে তাঁরা ব্যর্থ হন। এ প্রচেষ্টা অব্যাহত থাকে। কর্তৃপক্ষের অনুমতি পেতেও অনেক সময় চলে যায়। বহু বছর পর আসল কবর খুঁজে পান সম্রাটের ভক্ত অনুরাগীরা। ঘোষণা দিয়ে, ভারতব্যাপী প্রচারণা চালিয়ে, কমিটি গঠনপূর্বক অর্থ সংগ্রহ করে প্রিয় সম্রাট ও সম্রাজ্ঞীর কবরের উপর সমাধি তৈরি করা হয়। যুগ যুগ ধরে সে সমাধি পরিণত হয় ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামী, রাষ্ট্রনায়ক ও আপামর মানুষের তীর্থস্থানে। দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের সময় পরাধীনতার শৃঙ্খল ভাঙার আজীবন সংগ্রামী নেতাজী সুভাষচন্দ্র বসু এই সমাধি প্রাঙ্গণে দাঁড়িয়ে আজাদ হিন্দ ফৌজ নিয়ে ‘দিল্লি চলো’ ঘোষণা দেন। পরবর্তীকালের স্বাধীন ভারত, পাকিস্তান ও বাংলাদেশের রাষ্ট্রনায়করা রেঙ্গুন সফরে গিয়ে শেষ মোগল সম্রাটের সমাধি পরিদর্শন করতে ভোলেননি। পরিদর্শন বইতে লিখে দেন সম্রাটের উদ্দেশ্যে শ্রদ্ধাস্বরূপ ক’টি লাইন।
সম্রাটের ইচ্ছা ছিল স্বদেশের মাটিতে পূর্বপুরুষদের সমাধির পাশে স্থান পেতে। জন্মভূমির প্রতি ছিল প্রচণ্ড অনুরাগ। গ্লানি মোচন প্রচেষ্টার দায়ে তাঁকে যেমন নির্বাসনে পাঠানো হয়েছে, চার সন্তানাদি, মোগল বংশধর ও স্বাধীনতা প্রিয় সিপাহীদের হত্যা করা হয়েছে তেমনি হত্যাবশিষ্টরা ভারতবর্ষের আনাচে-কানাচে পালিয়ে বেড়াচ্ছেন। স্বদেশে ফিরে যেতে পারা কিংবা সেখানকার মাটিতে জীবনের শেষ বিশ্রাম নেওয়ার কোনো আশাই পূরণ হবার নয়। ভারাক্রান্ত হৃদয়ের কথাগুলো ভগ্নপ্রায় ভবনের দেয়ালে লিখে রেখে যান। তেমনই একটাতে লেখেন মৃত্যুর পর দাফনের জন্য স্বদেশের মাটিতে দু’গজ মাটি না মেলার করুণ আকুতি-
মরণে কে বা’দ ইশক মেরা বা আসর হুয়া
উড়নে লাগি হ্যায় খাক মেরি ক্যোয়ি ইয়ার মে;
কিতনা বদনসীব জফর দাফন কে লিয়ে
দো গজ জমিন ভি মিলনা চুকি ক্যোয়ি ইয়ার মে।
(ঋণ – দৈনিক ইত্তেফাক)