কাঁঠালিয়ার পুলিশ পুতুল

পুতুলের আড়ালে বেঁচে রইলেন বঙ্গ মুলুকের বিখ্যাত দারোগারা

বাংলায় যত কিসিমের পুতুল মেলে তা আর কোথাও মেলে না। সেসব হরেক নামের হরেক চেহারার পুতুল হাতে নিয়ে ছোটোদের মন উদাস হয়। কিন্তু গাঁ-বাংলার সবুজ ঘেরা দেশে ছোটদের মন নিয়ে যারা কারবার করেন তাঁদের আবার বাহারি নিয়ম। ছোটদের গল্পে বা ছড়ার আড়ালে তাঁরা লুকিয়ে রাখতে ভালবাসেন ইতিহাসের সরব উপাদান। যেমন আছে- ‘সোনা ঘুমালো পাড়া জুড়ালো/ বর্গী এল দেশে/ বুলবুলিতে ধান খেয়েছে/ খাজনা দেব কিসে।’ এটি একটি ছড়া যার আড়ালে ঢুকে গেল বঙ্গমুলুকে বর্গীদের গল্প। চোখের সামনে ভেসে ওঠে তেপান্তরের মাঠ পেরিয়ে আসা এক সুঠাম পুরুষ, মাথা কামানো ভাস্কর পণ্ডিতের ছবি। এই ধরনের পুতুলও আছে বাংলায়। এই রকম একটি পুতুল পেতে গেলে আমাদের যেতে হবে আজিমগঞ্জ কাটোয়া লাইনের রেলপথে কাঁঠালিয়া গ্রামে।

জেলাবর্গের হিসাবে কাঁঠালিয়া গ্রামটি মুর্শিদাবাদের অন্তর্গত। প্রান্তিকে বর্ধমান। কাঁঠালিয়া গ্রামের কুম্ভকার সম্প্রদায় যে সব পুতুল বানান তাতে ধরা পড়ে গ্রাম্য জীবনের এক নিবিড় অন্দরমহল। যেমন  মা-মেয়ের চুল বেঁধে দিচ্ছে, গ্রামের মেয়েরা মিলে জাঁতা পেশাই করছে, গোয়ালিনি বাড়ি বাড়ি গিয়ে দুধ দিচ্ছে অথবা ছোট্ট শিশুকে রোদে ফেলে মা তেল মাখাচ্ছে। এই সবের পাশাপাশি রয়েছে একেবারে অন্য ধরনের পুতুল। তাঁদেরকে গ্রামের মানুষজন জানে ‘পুলিশ পুতুল’ নামে। এই পুলিশেরা লালটুপি মাথায় দিয়ে টগবগিয়ে ঘোড়া পিঠে চড়ে কিংবা সমীহ করার মত হাতির পিঠে চড়ে গ্রামে টহল দেয়। এমন বেগবান ধাওয়া করা পুতুল প্রসঙ্গ জিজ্ঞাসা করলে কাঁঠালিয়ার পুতুল শিল্পী সাধন পাল ও তাঁর পরিবারের সদস্যরা জানালেন এইগুলি ‘দারোগা পুতুল’। মাথায় লালটুপি দেওয়া পুলিশ দারোগা। বাপ-ঠাকুরদাদার আমল থেকেই কিংবা তারও কিছু আগে থেকেই দারোগাদের ছবি মনে মনে এঁকে নিয়ে এমন পুতুল তৈরি করা শুরু হয়েছিল।

সেকালের দুর্লভ নথিপত্রে আজও পাওয়া যায় বাংলা পুলিশের কার্যকলাপের নানা হদিস। দারোগাদের নামধাম, বীরকাহিনি আজও সেই সব নথিতে সোনার জলে লেখা। এই সব দারোগাদের একজন হলেন ‘বাঁকাউল্লা’। ইংরেজ সরকারের নথিতে ‘বরকতউল্লা’। ভদ্রবংশীয় এক চতুর বাঙালি। ঠগি কমিশনের ফাইলে লেখা আছে এই চতুর দারোগার নানা কীর্তি। বাংলা মুলুক তখন হাতির পিঠে, ঘোড়ার পিঠে চড়ে দাপিয়ে বেড়াচ্ছে আরে বহরে বেড়ে ওঠা কোম্পানি বাহাদুরের পুলিশ। ততদিনে লর্ড  কর্নওয়ালিস নতুন পুলিশি ব্যবস্থা চালু করে দেশিয় জমিদারদের হাত থেকে পুলিশি ক্ষমতা কেড়ে নিয়েছেন। কারণ তাঁর কাছে গোপন সূত্রে খবর ছিল বাংলার জমিদারেরা ঠগিদের অন্যতম পৃষ্ঠপোষক হয়ে উঠেছেন। বিশেষ করে গামছা বাঁধা ঠগিদের পৃষ্ঠপোষক ছিলেন এই জমিদারবর্গ। ঠগি-ডাকাতদের জন্য বাংলার গ্রামের পর গ্রাম যখন নিদ্রাহীন তখন এই রকম সময় ব্রিটিশ পুলিশে ইংরেজ  ছাড়াও বাঙালিদের ভিড়।

পাবনার বৈদ্যনাথ মুখোপাধ্যায়, সাহাবাদে আলিজাম্মা খাঁ, যশোরের দেলওয়ার আলি, মুর্শিদাবাদে ওসমান আলি, মুঙ্গেরে ড্যানিয়াল ক্যাভানাগ, চট্টগ্রামে এ.ডি.রোজারিও, দার্জিলিং শহরে ডি. অসকিন, ২৪ পরগণায় নবকৃষ্ণ ঘোষ আর হুগলীতে সেই মুন্সি বাঁকাউল্লা। এছাড়া গৌড়দাস বসাক, গিরিশচন্দ্র বসু, চন্দ্রশেখর রায় এবং বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের বাবা যাদবচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়রা সেদিন ঠগি এবং ডাকতদের ত্রাস। আর পুলিশের যানবাহন বলতে ঐ হাতি আর ঘোড়া। সেসব দেখলে সাধারণ মানুষেরও বুক কেঁপে যায়। বুকে বেল্ট, কোনও কোনও দারোগার চোখে সুরমা, রাজপুত রাজাদের মত তাঁ-দেওয়া গোঁফ আর মাথায় লাল টুপি সব মিলিয়ে এক অন্য রাজ মহিমা।

সেইসব দিন আজ ইতিহাস। অপরাধ তার অপরাধীর চেহারায় এসেছে রূপবদলের নতুন ছাপ। কিন্তু আজও কাঁঠালিয়ার গ্রামের সাদা রঙের, অভ্র মেশানো, লাল কালো ছোপের দাগের পুতুলে বেঁচে রইলেন ঠগি ও ডাকাত দমনের ইতিহাসের বাঙালি হিরোরা। যথা- বাকাউল্লা, চন্দ্রশেখর, বৈদ্যনাথ, যাদবচন্দ্র, আলিজিম্মা বা ব্রিটিশের আসকিন’রা।

Developed by DXDasia