চিনা বস্ত্রের সেরা বিশেষজ্ঞের সম্মান পেয়েছিলেন ঠাকুরবাড়ির এই মেয়ে

মামা সুভো ঠাকুরের বস্ত্র শিল্প সংরক্ষণের কাজ তাঁকে মুগ্ধ করে

রবি ঠাকুরের (Rabindranath Tagore) আশ্চর্য পরিবার। প্রতি সদস্যই যেন ঝলমলে রত্ন। গল্প বলতে বসলে সে কথা সুতোয় বোনা রত্নের মালা দেখলে চমক লাগবে। রবীন্দ্রনাথের তিরোধানের পরেও তাঁর পরিবারের পরবর্তী প্রজন্ম প্রতিভার ধ্বজা নিয়ে এগিয়ে চলেছিল। ঠাকুর বংশের মেয়েরা প্রতি যুগে প্রতি সময় আধুনিক, সময়ের থেকে এগিয়ে।

মেয়েটির নাম কৃষ্ণা (Krishna Riboud)। দ্বিজেন্দ্রনাথ ঠাকুরের ছেলে সুধীন্দ্রনাথের মেয়ে এনা রায়ের কন্যা। ঢাকায় জন্ম হলেও পরে তিনি বাবা মায়ের সঙ্গে চলে এসেছিলেন কলকাতায় (Kolkata), লোয়ার সার্কুলার রোডের বাড়িতে। সে বাড়িতে সবসময় বইত আনন্দের হাওয়া। সাহিত্য, শিল্পের দখিনা বাতাস বইত সে বাড়িতে। সামাজিক এক দায়বোধ থেকে কৃষ্ণার পরিবার যুক্ত হয়ে পড়েছিলেন স্বাধীনতা আন্দোলনের সঙ্গে। কৃষ্ণার মামা সৌমেন্দ্রনাথের রাজনৈতিক ক্রিয়াকলাপ প্রভাবিত করেছিল তাঁকে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পটভূমিতে সে ছিল এক অস্থির সময়। কৃষ্ণার ব্যক্তিগত জীবনেও তখন নেমে এসেছিল বিপর্যয়। তাঁর বাবা রাজেন রায়ের আকস্মিক মৃত্যু কৃষ্ণার জীবনের গতিপথ বদলে দিল। বাবার ছায়া সরে যাওয়া যেকোনো মেয়ের জীবনে অসম্ভব যন্ত্রণার। কিন্তু কৃষ্ণার অন্তরে ছিল ঠাকুরবাড়ির উত্তরাধিকার। তাই এই তীব্র শোক কৃষ্ণার জীবনের গতিপথ পরিবর্তন করে দিল। লোরেটো কনভেন্টের ছাত্রী কৃষ্ণার লেখাপড়ায় অমোঘ আকর্ষণ তাঁর জীবনে শোকের উপশম হয়ে এল।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের (Sceond World War) পর কৃষ্ণা স্কলারশিপ পেয়ে চলে গেলেন আমেরিকায়। ম্যাসাচুসেটস ওয়েলসলি কলেজে ভর্তি হলেন রাশিয়ান ভাষা ও দর্শন পড়তে। সেখানে অনেক গুণী মানুষের সংস্পর্শে এলেন তিনি। রাশিয়ান ভাষার অধ্যাপক ভ্লাদিমির নভোকভ, পাশ্চাত্য দর্শনের সম্পর্কে জানলেন অ্যালবার্ট আইনস্টাইনের থেকে। আইনস্টাইনের সঙ্গে বন্ধুত্ব ছিল কৃষ্ণার মামা সৌমেন্দ্রনাথের। ফলে আইনস্টাইনের প্রত্যক্ষ স্নেহ পেয়েছিলেন কৃষ্ণা। কৃষ্ণার সৌভাগ্য হয়েছিল আইনস্টাইনের (Albert Einstein) বেহালা বাজানো শোনার। কঠিন সব দার্শনিক তত্ত্ব বোঝানোর জন্য আইনস্টাইন কৃষ্ণাকে বেহালা বাজিয়ে শোনাতেন। লুই কেলগ ছিলেন কৃষ্ণার পারিবারিক বন্ধু। লুই কেলগের কাছে তিনি ছিলেন মেয়ের মতো। বিদেশে অনেক যোগাযোগ লুই কেলগের জন্য সম্ভব হয়েছিল। তাঁর সঙ্গেই কৃষ্ণা গিয়েছিলেন স্বামী প্রভবানন্দের কাছে। মনের ভিতর আধ্যাত্মিক শক্তির প্রভাব অনুভব করেছিলেন কৃষ্ণা। বাবাকে হারিয়ে মেয়েটির মনে যে আশ্রয়হীনতা তৈরি হয়েছিল, আশ্চর্যভাবে পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তের পিতৃপ্রতিম অনেক ব্যক্তিত্ব বিভিন্ন সময় ছায়া দিয়েছেন, শক্তি দিয়েছেন কৃষ্ণাকে। কৃষ্ণা নিজের অন্তরে শক্তি অনুভব করেছিলেন। নাহলে কেমন করে তিনি মানসিক সাহচর্য দেবেন জাঁ রিব্যুঁকে?

আইনস্টাইনের প্রত্যক্ষ স্নেহ পেয়েছিলেন কৃষ্ণা। কৃষ্ণার সৌভাগ্য হয়েছিল আইনস্টাইনের বেহালা বাজানো শোনার। কঠিন সব দার্শনিক তত্ত্ব বোঝানোর জন্য আইনস্টাইন কৃষ্ণাকে বেহালা বাজিয়ে শোনাতেন।

অত্যন্ত ধনী পরিবারের সন্তান ছিলেন জাঁ রিব্যুঁ। যুদ্ধের তিক্ত অভিজ্ঞতা তাঁকে মনখারাপের আঁধারে নিয়ে গিয়েছিল। তিনিও আধ্যাত্মিকতার আলোয় মনের তৃপ্তি খুঁজে পেতে চাইছিলেন। এই সময় তাঁর সঙ্গে দেখা হল ঠাকুরবাড়ির এই বিদুষী কৃষ্ণার সঙ্গে। দুটি ভিন্ন দেশের সম্পূর্ণ অপরিচিত মানুষের মনের মিল হল। দুজনে দুজনকে ভালোবাসলেন। স্বামী প্রভবানন্দের আশীর্বাদ নিয়ে জাঁ রিব্যুঁকে বিয়ে করার সিদ্ধান্ত নিলেন। সেই সময় এই সিদ্ধান্ত নেওয়া খুব সহজ ছিল না। তবে প্রতি মানুষের ভাগ্য নির্দিষ্ট হয়ে থাকে। কাজেই এক ক্যাথলিক যাজক বিয়ে দিলেন কৃষ্ণা এবং জাঁ রিব্যুঁর। প্রাচ্য ও প্রতীচ্য মিলে গেল এই পরিণয়ে। দুটি অভিজাত এবং শুভ সংস্কার সম্পন্ন পরিবারের মিলন অনেক শুভ কর্মের জন্ম দেবে।

বিয়ের পর কৃষ্ণা নিউইয়র্ক (New York) থেকে চলে গেলেন ফ্রান্সে (France)। অসম্ভব বন্ধু বৎসল এই রিব্যু দম্পতির ঘরে বসত চাঁদের হাট। সেই আমলের শিল্পী সাহিত্যিকদের বৈঠক বসত তাঁদের বাড়িতে। আড্ডায় রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বরাও আসতেন। কিন্তু এর ফলে রাজনৈতিক জটিলতা তাঁদের জীবনকে প্রভাবিত করতে শুরু করেছিল। কাজেই রিব্যুঁ সিদ্ধান্ত নিলেন আবার তাঁর দেশে ফিরে যাবেন। এই প্রত্যাবর্তন শিল্প সাহিত্য জগতে এক বিপ্লব এনেছিল। কৃষ্ণা এবং জাঁ রিব্যুঁ শিল্পী সাহিত্যিকদের স্বাধীন চিন্তা প্রকাশের ক্ষেত্র তৈরি করেছিলেন। তাঁদের প্যারিসের ফ্ল্যাট, লিয়ঁর প্রাসাদ, অ্যারিজোনা ডেজার্টের বাড়ি হয়ে উঠেছিল শিল্প সাহিত্যের বড়ো প্ল্যাটফর্ম। কৃষ্ণার প্যারিসের ফ্ল্যাটের পিছন দিকে একটা মস্ত বাগান ছিল। কৃষ্ণা সেই বাগানকে ‘ওরিয়েন্টাল প্যারাডাইজ’ করে তুললেন। শুরু হল ঠাকুরবাড়ির মেয়ের এক নতুন যাত্রা। ইন্দিরা গান্ধি (Indira Gandhi), সত্যজিৎ রায়ের (Satyajit Ray) মতো ভারতীয় ব্যক্তিত্বও ছিলেন কৃষ্ণার বন্ধু। ভারতীয় সংস্কারের যে বীজ অন্তরে নিয়ে কৃষ্ণা বিদেশে গিয়েছিলেন, তা মহীরুহ হবে ধীরে ধীরে।

বার দশেক চিন দেশে গিয়েছিলেন কৃষ্ণা। কারণ বস্ত্রশিল্পের প্রাচীন গল্প লুকিয়েছিল চিন দেশে। এই বিষয়ে প্রথম গবেষণাপত্র প্রকাশিত হয়েছিল ১৯৭০ সালে। পৃথিবীর বিভিন্ন জায়গার বস্ত্রে ভারতীয় নকশা, প্রভাব খুঁজে বার করেছিলেন তিনি। ১৯৭৯ সালে এই রিব্যুঁ দম্পতির বিপুল পরিমাণে পোশাক সংগ্রহ নিয়ে একটি প্রতিষ্ঠান স্থাপিত হয় AEDTA নামে।

বিদেশে বস্ত্রশিল্প নিয়ে কাজ করেছিলেন কৃষ্ণা। এই কাজ তাঁকে গুণী সমঝদার মহলে চিরস্মরণীয় করে রেখেছে। তবে এই কাজে তাঁর প্রেরণা ছিলেন সুভো ঠাকুর। পঞ্চাশের দশকে ভারতে এসে মামা সুভো ঠাকুরের বস্ত্র শিল্প সংরক্ষণের কাজ তাঁকে মুগ্ধ করে। তাঁর ছিল অফুরন্ত প্রাণশক্তি। রীতিমতো গবেষণা করে এই কাজে মগ্ন হয়েছিলেন কৃষ্ণা। বার দশেক চিন দেশে গিয়েছিলেন কৃষ্ণা। কারণ বস্ত্রশিল্পের প্রাচীন গল্প লুকিয়েছিল চিন (China) দেশে। এই বিষয়ে প্রথম গবেষণাপত্র প্রকাশিত হয়েছিল ১৯৭০ সালে। পৃথিবীর বিভিন্ন জায়গার বস্ত্রে ভারতীয় নকশা, প্রভাব খুঁজে বার করেছিলেন তিনি। ১৯৭৯ সালে এই রিব্যুঁ দম্পতির বিপুল পরিমাণে পোশাক সংগ্রহ নিয়ে একটি প্রতিষ্ঠান স্থাপিত হয় AEDTA নামে। এই প্রতিষ্ঠানে বস্ত্রশিল্প বিষয়ে সবরকম গবেষণা ও অনুসন্ধান করার ব্যবস্থা ছিল। কুড়ি বছর ধরে কৃষ্ণার ব্যক্তিগত সংগ্রহ, গ্রন্থাগার  ব্যবহারের সব সুযোগ ছিল এই প্রতিষ্ঠানে। প্যারিসে এত বড়ো সংগ্রহশালা প্রতিষ্ঠার সিংহভাগ কৃতিত্ব কৃষ্ণার। লাসার মনেস্ট্রির বস্ত্রখণ্ডের গূঢ় আধ্যাত্মিক সঙ্কেত, বৈষ্ণব বস্ত্রে ইসলাম প্রভাব ইত্যাদি চমকপ্রদ তথ্য খুঁজে পাওয়া খুব সহজ কাজ নয়। কৃষ্ণার গবেষণাপত্র এই বিষয়ে এক মূল্যবান দলিল।

কৃষ্ণার সম্মান ও পুরস্কারের সংখ্যাও নেহাত কম নয়। ফ্রান্সের লিজিয়ন অফ অনার (Legion of Honour), শোভ্যালিয়া অফ আর্টস অ্যানড লেটার্স ইত্যাদি পুরস্কার ছাড়াও পৃথিবীর বহু বিশ্ববিদ্যালয়ে বক্তৃতা দিয়েছিলেন কৃষ্ণা। চিনা বস্ত্রের সেরা বিশেষজ্ঞের সম্মান পেয়েছিলেন কৃষ্ণা। পৃথিবীর একদেশের বস্ত্রে অন্য দেশের প্রভাব ছিল কৃষ্ণার উৎসাহের বিষয়। এছাড়াও অনেক দুর্লভ বস্ত্র সংগ্রহ করেছিলেন তিনি। এই গভীরতায় সত্যিই রবি ঠাকুরের পারিবারিক  উত্তরাধিকারকে বহন করে নিয়ে গিয়েছিলেন কৃষ্ণা। অথচ জীবন ও ভাগ্য বারবার তাঁকে বিপন্ন করেছে। স্বামী ও সন্তান হারিয়ে জীবনের প্রান্তরে একা দাঁড়িয়েছেন একটা সময়। তবু স্তব্ধ হয়নি তাঁর পথ চলা। বিদেশে তাঁকে বস্ত্রশিল্পের সম্রাজ্ঞীর মর্যাদা দেওয়া হয়। তাঁর মৃত্যুর পর এই দায়িত্ব গ্রহণ করেছিলেন তাঁর পৌত্র টমাস। কৃষ্ণার আন্তর্জাতিক এই কর্মপ্রবাহ কৃষ্ণাকে অমরতা দিয়েছে। ঠাকুরবাড়ির মেয়েরা ফিনিক্স পাখি। কষ্টের আগুন থেকে আবার মেলে দেয় উড়াল ডানা। কালের মন্দিরা বেজে ওঠে। এগিয়ে চলে ঠাকুরবাড়ির উত্তরাধিকার। 

সহায়ক গ্রন্থঃ
ঠাকুরবাড়ির অন্দরমহল, চিত্রা দেব

Developed by DXDasia