দক্ষিণ এশিয়ায় প্রথম ‘প্রাইড ওয়াক’-এর সাক্ষী ছিল খাস কলকাতা

১৯৯৯ সালে ২ জুলাই মাত্র ১৫ জন হাঁটলেন কলকাতার রাস্তায়, পরনে হলুদ জামা

১৯৬৫ সালে লাইফ নেচার লাইব্রেরির “আর্লি ম্যান” ভল্যুমে একটি ছবি প্রকাশিত হয়। পঁচিশ মিলিয়ন বছর ধরে চলে আসা সংক্ষিপ্ত মিছিলের একটি ছবি। ছবিতে একদম বাঁ পাশে দেখা যায় চার হাত পায়ে ভর দিয়ে সামনে এগিয়ে চলা একটি লোমশ প্রাণীকে, যে ধীরে ধীরে ছবির মাঝখানে এসে দ্বিপদী হয়ে উঠেছে। পরবর্তীতে তার গায়ের পশম নিশ্চিহ্ন হয়ে হাতে উঠে আসে তীক্ষ্ণ পাথুরে হাতিয়ার। এই দ্বিপদী মানব আরও কিছুদূর হেঁটে এসে আধুনিক মানুষে পরিণত হয়, যার শিরদাঁড়া সটান, দৃষ্টি সুদূরপ্রসারী।

এরও আগে, কোনো একদিন দু-পায়ে হাঁটার স্বপ্ন নিয়ে জল থেকে ধীর লয়ে ডাঙায় উঠে এসেছিল মানুষের কোনো এক পূর্বপ্রাণ। সে চলা ছিল স্বেচ্ছায়, সে চলা ছিল মুক্তির প্রতি। আরেকটু ভালো থাকার স্বপ্ন দেখা ঠিক সেরকম এক পথচলার, সেই রকম এক মিছিলের সাক্ষী হয়েছিল কলকাতা শহর, ১৯৯৯ সালের জুলাই মাসে।

১৯৯৯-এর কলকাতা, তখনও তাকে সারা পৃথিবী ‘ক্যালকাটা’ নামে ডাকে। ঘরের কোণায় স্বমহিমায় বাস করে ল্যান্ডফোন। তখনও মাঝেমধ্যে ডাকবাক্সের পেট ফুলে ওঠে চিঠিতে। ইন্টারনেটের নাম শুনেছে হাতেগোনা কয়েকজন। সেবছরই মে মাসে ভারতের উত্তরে কার্গিল সীমান্তে কামান গর্জে উঠবে। কেনিয়ার বিরুদ্ধে সেঞ্চুরি করে জীবনে প্রথমবার আকাশের দিকে শ্রদ্ধার ব্যাট উঁচু করবেন সচিন তেন্দুলকর। সেই ১৯৯৯-এর ফেব্রুয়ারি মাসে, মহাত্মা গান্ধির প্রখ্যাত ডান্ডি অভিযান থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে হায়দরাবাদ শহরের “ইয়ারিয়াঁ” সম্মেলনে ওয়াইস খান এক মিছিলের পরিকল্পনা করবেন। যার নাম দেওয়া হবে, Friendship walk, 99। পৃথিবীর বিভিন্ন শহরে, বিশেষত মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে, ১৯৬৯ সালের স্টোনওয়াল দাঙ্গাকে স্মরণ করে এরকম পদযাত্রা বা মার্চ প্রতিবছর আয়োজিত হয়েছে। কিন্তু ভারতে সেরকম কিছু তখনও কল্পনাতীত। সদ্যমুক্তিপ্রাপ্ত দীপা মেহেতার “ফায়ার” ছবিটি অধিকাংশ ভারতীয়কে ক্ষুব্ধ করেছে। যেখানে সমপ্রেমী মূল দুই চরিত্রের নাম “রাধা” ও “সীতা”।

পৃথিবীর বিভিন্ন শহরে, বিশেষত মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে, ১৯৬৯ সালের স্টোনওয়াল দাঙ্গাকে স্মরণ করে এরকম পদযাত্রা বা মার্চ প্রতিবছর আয়োজিত হয়েছে। কিন্তু ভারতে সেরকম কিছু তখনও কল্পনাতীত। সদ্যমুক্তিপ্রাপ্ত দীপা মেহেতার “ফায়ার” ছবিটি অধিকাংশ ভারতীয়কে ক্ষুব্ধ করেছে। যেখানে সমপ্রেমী মূল দুই চরিত্রের নাম “রাধা” ও “সীতা”।

কিন্তু ব্যতিক্রম কলকাতা শহর। সেখানে “ফায়ার”কে ঘিরে সেরকম কোনো আগুনের আঁচ দেখা যায়নি, তাই দেশের অন্যান্য শহর বাদ সাধলে, কলকাতা শহরকে এই পথচলার জন্য বেছে নেওয়া হল। স্থির হল, শহরের রাস্তায় নেমে সবাইকে জানানো হবে, সমপ্রেম প্রকৃতিবিরুদ্ধ নয়। সমপ্রেমী মানুষ এই সমাজের বুক থেকেই জন্মায়। আর পাঁচটা প্রেমের মতো সমপ্রেমেও কোনো পাপ নেই। পরিকল্পনায় মেতে উঠলেন আদিত্য মোহনত, অপর্ণা ব্যানার্জি, ওয়াইস খান, রফিকুল হক দোজাহ, পবন ঢাল, রাজর্ষি চক্রবর্তী, শান্তনু গিরি, সুশান্ত প্রামাণিক ও অন্যান্যরা। ঠিক হল, ১৯৯৯ সালের ২ জুলাই, শহরের বুকে হেঁটে হেঁটে তাঁরা প্রেমের খবর ছড়িয়ে দেবেন চারদিকে। যে প্রেমে জন্মগত লিঙ্গপরিচয় কোনো বাধা হয়ে ওঠে না। যে প্রেম শুধুমাত্র বংশধারা বজায় রাখায় মগ্ন নয়। শহরের বুকে এসে পৌঁছলেন ব্যাঙ্গালোরের এলজিবিটি ইন্ডিয়ার আহ্বায়ক ওয়াইস খান, এছাড়া সতীশ, নিতিন। হামসফর ট্রাস্টের অশোকের সঙ্গে এলেন নবারুণ, জসমীর। দার্জিলিং থেকে এলেন প্রণয়, কার্শিয়ং থেকে এলেন প্রশান্ত, বাটানগর থেকে মানস। কলকাতায় তাঁদের জন্য অপেক্ষা করছিলেন কাউন্সেল ক্লাবের রঞ্জন, ইন্টিগ্রেশন কলকাতার পবন, এছাড়া আদিত্য, চিত্রা ও প্রমুখ।

বিষয়টি তখন স্পর্শকাতর, তাই স্থির করা হল নির্বিঘ্নে, অনুচ্চকিত এক মিছিল শহরের উত্তর, মধ্য ও দক্ষিণের মোট সাতাশটি জায়গা ছুঁয়ে যাবে। জনা তিরিশের এক তালিকা তৈরি হল, কিন্তু ২ জুলাইয়ের বৃষ্টিভেজা সকালে, সাকুল্যে পনেরো জন এসে পৌঁছলেন সমস্ত ভয় ও জড়তাকে উপেক্ষা করে। সবার গায়ে সেদিন বন্ধুত্বপূর্ণ হলুদ রঙের জামা, মুখে বুলি, “Don’t think straight. Think people.” সংবাদমাধ্যমের প্রতিক্রিয়ার কথা মাথায় রেখে কোনো সাংবাদিককে এই মিছিলের খবর দেওয়া হয়নি। তবু সঙ্গে ছিলেন “টাইমস অফ ইন্ডিয়া”র এক সাংবাদিক। কিছুদূর যাওয়ার পর দলটি দুইভাগে ভাগ হয়ে উত্তর ও দক্ষিণ কলকাতার বিভিন্ন এনজিও এবং অন্যান্য মানবাধিকার সংগঠনের কাছে গেল। পবন ঢাল পরে স্মৃতিচারণ করেছেন, আজ থেকে বাইশ বছর আগে ২ জুলাইয়ের সেই সকালে তাঁরা যখন রাজ্য মানবাধিকার কমিশনের অফিসে গিয়ে নিজেদের বক্তব্য জানিয়েছিলেন, সেখানে উপস্থিত জুনিয়র অফিসার হতচকিত হয়ে পড়েছিলেন, কারণ সমপ্রেম সম্পর্কে তাঁর কোনো ধারণাই ছিল না। গে, লেসবিয়ান, বাইসেক্সুয়াল শব্দগুলি যেন তিনি জীবনে প্রথম শুনছিলেন। ভরা বাদলের মধ্যে ছাতা মাথায়, জল কাদা থেকে বাঁচাতে প্যান্ট গুটিয়ে, হাতে নিরাপদ সঙ্গম সম্পর্কে সচেতনতা মূলক পোস্টার, লিফলেট নিয়ে, কেবল চৌদ্দটি জায়গায় পৌঁছনো সম্ভব হল। এর মধ্যে খবর ছড়িয়ে পড়তে বিভিন্ন সংবাদমাধ্যম অনুযোগ করল কেন তাঁদের এই মিছিলের কথা জানানো হয়নি। ফলতঃ প্রাক মুঠোফোন যুগে, এই মিছিলের খুবই অল্প ছবি ক্যামেরায় তোলা রইল। কবিতার মতো এই মিছিল শেষ হল জর্জ ভবনের সামনে। সেখানে এক সাংবাদিক সম্মেলন আয়োজন করা হয়েছিল। সংবাদমাধ্যমের অনুরোধে এক প্রতীকী মিছিলে ফের হাঁটলেন পবনরা, সেই ছবি প্রকাশিত হল পরেরদিনের সংবাদপত্রে।

ফ্রেন্ডশিপ ওয়াকের খবর ছড়িয়ে পড়ল দেশে বিদেশে। দক্ষিণ এশিয়ায় প্রথম প্রাইড ওয়াক বলে একেই গণ্য করা হল। পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্ত থেকে ইমেল, চিঠি পেতে লাগলেন ওয়াইস, পবনরা। ফ্রেন্ডশিপ ওয়াকের খবর ঘর থেকে বাইরে টেনে আনলো আরও আরও মুখচোরা, বঞ্চিত, একঘরে, ভিন্নযৌনতার মানুষদের। এরপর বিশ্বায়নের যুগ এলো। ধীরে ধীরে ভারতের অন্যান্য শহরেও একটা দুটো করে রামধনু মিছিল দেখা যেতে লাগলো। প্রতিবছর গর্বের জুন মাসকে ঘিরে অগুনতি রামধনু পতাকা ভারতের আকাশে উড়ল। আরও বহু “ভারতীয় প্রাইড মার্চে” বছরের পর বছর পা মেলালেন সমপ্রেমী, বিষমপ্রেমী, রূপান্তরকামী ও আরও সমস্ত ভিন্ন যৌনতার মানুষেরা। অবশেষে, ফ্রেন্ডশিপ ওয়াকের প্রায় কুড়ি বছর পর, ২০১৮ সালের ৬ সেপ্টেম্বর ৩৭৭ ধারা বিলুপ্ত করে সমপ্রেমী সঙ্গমকে অপরাধমুক্ত করা হল।

কলকাতা শহরের কপালে কেবল মিছিল লেখা। মিছিল কখনও মোমবাতি হাতে, মিছিল কখনও মৌন, আবার মিছিল হয়তো স্লোগানে স্লোগানে মুখরিত। মিছিল অর্জনের, মিছিল বিসর্জনের। মিছিল কলরবের, মিছিল গৌরবের। লাইফ নেচার লাইব্রেরির “আর্লি ম্যান” ভল্যুমের সেই ছবির একদম ডানদিকে থাকা আধুনিক মানুষটির পথচলা এখনও শেষ হয়নি। আজ থেকে বাইশ বছর আগে পনেরো জন মানুষ যে পথচলা শুরু করেছিলেন, সেই পথেই সে সমানাধিকারের দাবিতে সমপ্রেমী বিবাহের রাষ্ট্রীয় মান্যতার জন্য হেঁটে চলেছে। সে জানে কেবলমাত্র সামনে এগিয়ে গেলেই একদিন সমান আকাশের সেই পৃথিবীতে পৌঁছানো যাবে, যেখানে ভালোবাসা সত্যিই গোলাপে ফোটে।

______

তথ্যঋণঃ https://www.firstpost.com/living/friendship-99-revisiting-indias-first-pride-march-in-kolkata-on-its-20th-anniversary-6898311.html, https://friendshipwalk20.wordpress.com/, https://feminisminindia.com/2019/07/04/celebrating-20-years-of-friendship-walk-kolkata/, মৌসুমী ভৌমিক

ছবিঋণঃ ফ্রেন্ডশিপ ’৯৯ আর্কাইভ

Developed by DXDasia