কলকাতার ঐতিহ্যবাহী ‘মোহনস বুকস অ্যান্ড ম্যাগাজিনস’

প্রাতিষ্ঠানিক বিদ্যে ছিল না ঠিকই কিন্তু বই পড়তে খুব ভালোবাসতেন মোহন তিওয়ারি

০২১ সত্যজিৎ রায়ের জন্মশতবর্ষ, আর এই বিশেষ বছরেই যবনিকা পতন হল কলকাতার ঐতিহ্যবাহী বইয়ের দোকান—৯২ বছর বয়সী মোহন তিওয়ারির সাধের ‘মোহনস বুকস অ্যান্ড ম্যাগাজিনস’এর। ধর্মতলার লাইটহাউস সিনেমার বিপরীতে এই বইয়ের দোকানেই একসময় ঘণ্টার পর ঘণ্টা সময় কাটাতেন সত্যজিৎ সহ কলকাতার তাবড় তাবড় আলোকচিত্রীরা।

কোভিডের কারণে দীর্ঘদিন দোকান বন্ধ থাকার পর গত সপ্তাহ ছিল দোকানটির অন্তিম লগ্ন। কতশত স্মৃতিবিজড়িত এই বইয়ের দোকান বন্ধ হয়ে সেখানে তৈরি হবে নতুন পোষাক-বিপণনী। জায়গা খালি করে দেওয়ার তাড়া থাকায় দোকানের যাবতীয় বই বিশাল ছাড়ে বিক্রি করে দেওয়া হয়। প্রতিষ্ঠাতা মোহন তিওয়ারির ছেলে গোপাল তিওয়ারি বলছিলেন, রায়বাবু ঘনঘন আমাদের দোকানে আসতেন, মনের সুখে দীর্ঘক্ষণ ধরে বিভিন্ন বইপত্র ঘেঁটে দেখতেন, কখনও কখনও নন-ফিকশন পড়তেন আর দোকানে নতুন স্টক এলেই ঝাঁপিয়ে পড়তেন। খুবই খারাপ লাগছে, আমরা সেই ‘লেগেসি’ বজায় রাখতে পারলাম না।”একটা সময় ছিল যখন দেশ-বিদেশের জনপ্রিয় প্রকাশনা এবং ‘রেয়ার কালেকশন’ মোহনের দোকানে এলেই নিমেষের মধ্যে তা উধাও হয়ে যেত। অধ্যাপক থেকে শুরু করে চলচ্চিত্র নির্মাতা, বিজ্ঞাপন-ব্যক্তিত্ব নিউমার্কেট চত্বরে এলেই এই দোকানে ঢুঁ মারতেন। তাঁদের কাছে মোহনের বই দোকান ছিল ‘হিডেন ট্রেজার’। কলেজ পড়ুয়ারাও নিয়মিত যেত মোহনের দোকানে। অনলাইনে বই কেনা-পড়ার জোয়ার আসার পর থেকে তাদের যাতায়াত কমতে শুরু করে। “ই-বুক ঘরানার সঙ্গে প্রতিযোগিতা করাটা খুব কঠিন কাজ ছিল আমাদের জন্য” বলেন মোহনস কর্তৃপক্ষ।

গোপাল তিওয়ারির কথায়, “শহরের এত নামী মানুষ… সৌমিত্র চ্যাটার্জী থেকে অপর্ণা সেন আমাদের দোকানে আসতেন। সব ধরণের বইয়ের জোগান থাকত আমাদের দোকানে। কলকাতা সেই পরিবেশ হারিয়েছে অনেকদিনই, তাই জীবনধারণের জন্য দোকান বন্ধ করে দেওয়া ছাড়া আমাদের আর কোনও বিকল্প উপায় ছিল না।”

মোহন তিওয়ারি জন্মগ্রহণ করেন ব্রিটিশ-অধীন ভারতে উত্তরপ্রদেশের বালিয়া জেলায়। বেশিদূর লেখাপড়া করার সুযোগ পাননি। ১৯৪৩ সালে কাজের খোঁজে কলকাতায় আসেন। কাজ না পেয়ে চৌরঙ্গি ট্রাফিক পয়েন্ট বরাবর খবরের কাগজ বিক্রি শুরু করেন। খবরের কাগজ থেকে তাঁর ভালোবাসা তৈরি হয় বইপত্রের প্রতি। একটা দেওয়ার আলমারি সঙ্গে নিয়ে গ্র্যান্ড হোটেলের কাছে এক চিলতে একটি স্টল দেন তিনি।ব্রিটিশ-আমেরিকান ম্যাগাজিনের সঙ্গে বিভিন্ন ইংরেজি বই বিক্রি শুরু করেন। সেই ছোট্ট বইয়ের স্টলটিই পরে বড় আকারে ‘মোহনস বুকস অ্যান্ড ম্যাগাজিনস’-এ পরিণত হয়। প্রাতিষ্ঠানিক বিদ্যে ছিল না ঠিকই কিন্তু বই পড়তে খুব ভালোবাসতেন মোহন। সবকিছু ভুলে সারাক্ষণ বইতেই ডুবে থাকতেন। এমনকি সেকারণে ইংরেজিও শিখেছিলেন।

 

ব্রিটিশরা ভারত ছাড়ার পর, কলকাতা শিক্ষা-সংস্কৃতি-শিল্পচেতনার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছিল এবং মোহনের বইপত্র অনেকের কাছেই সেরা বন্ধু হয়ে উঠেছিল। গোপাল তিওয়ারির কথায়, “শহরের এত নামী মানুষ… সৌমিত্র চ্যাটার্জী থেকে অপর্ণা সেন আমাদের দোকানে আসতেন। সব ধরণের বইয়ের জোগান থাকত আমাদের দোকানে। কলকাতা সেই পরিবেশ হারিয়েছে অনেকদিনই, তাই জীবনধারণের জন্য দোকান বন্ধ করে দেওয়া ছাড়া আমাদের আর কোনও বিকল্প উপায় ছিল না।” তবে…

চিরতরে বন্ধ হয়ে গেলেও কলকাতার ইতিহাস এবং ঐতিহ্যের সঙ্গে চিরকাল জুড়ে থাকবে ‘মোহনস বুকস অ্যান্ড ম্যাগাজিনস’।  

 

Post Tags
Developed by DXDasia