Kolkata Literary Meet 2024 : মাইকেল মধুসূদন দত্তের জন্ম-দ্বিশতবর্ষ

২৫ জানুয়ারি ছিল মধুসূদন দত্ত-র দ্বিশতবর্ষের জন্মদিন

গত ২৩ জানুয়ারি থেকে ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়াল হল-এ চললো টাটা স্টিল কলকাতা লিটারারি মিট ২০২৪ (Tata Steel Kolkata Literary Meet 2024)। চললো ২৭ জানুয়ারি পর্যন্ত। যাঁরা বইপ্রেমী, ভালোবাসেন সংস্কৃতির নানান দিক, তাঁদের কাছে এই উৎসব এক অনাবিল আনন্দ, প্রাণের আরাম আর ভাবনার সমৃদ্ধি। এই উৎসবে ইংরেজি ভাষার পাশাপাশি অনুষ্ঠিত হয় একাধিক বাংলা অধিবেশন। এ বছর উৎসবে, ২৫ জানুয়ারি মাইকেল মধুসূদন দত্ত’র জন্ম-দ্বিশতবর্ষ (Michael Madhusudhaner Dwishatabarsho) পূর্তির দিন একটি মনোজ্ঞ ও প্রাসঙ্গিক আলোচনা করেন যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগের অধ্যাপক সুকান্ত চৌধুরী এবং বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের অধ্যাপক বিশ্বজিৎ রায়।

বিদ্যাসাগর সেসময়ে একটি বক্তৃতায় যা বলেছিলেন তার সারাংশ হলো, ‘সংস্কৃতের ছাত্ররা যদি ভালো করে ইংরেজি শেখে, তাহলে খুব ভালো ভাবে বাংলা পড়তে পারবে’। এই যে তিনটি ডায়মেনশন-কে মেলানোর কথা তখন বলা হয়েছিল, তার সর্বোৎকৃষ্ট উদাহরণ হয়তো মাইকেলই।

বিপুল বৈচিত্র্যের মধ্যে দিয়ে গোটা বিশ্বকে দেখার মতো বিস্মিত দৃষ্টি যাঁর ছিল, তাঁকে বাংলা সাহিত্যের ‘ঝড়ের পাখি’ বলা হয়। মাইকেল মধুসূদন দত্ত। পূর্বে জন্মে যেভাবে তিনি পশ্চিমকে দুহাত বাড়িয়ে গ্রহণ করেছেন আবার পশ্চিমকে মিশিয়েছেন পুবের সঙ্গে। পশ্চিমে তখন জ্ঞান-বিজ্ঞানের চর্চা হচ্ছে, যে চর্চা খুলে দিচ্ছে একটার পর একটা নতুন দিগন্ত, তা চুম্বকের মতো আকর্ষণ করেছিল মাইকেলকে। কলকাতা ব্রিটিশ ভারতের রাজধানী হিসেবে মর্যাদা ধরে রাখতে পেরেছিল ১৯১১ সালের ৩১ ডিসেম্বর অবধি। এই সময় কলকাতা হয়ে উঠেছিল নতুন এক সভ্যতার পীঠ। ১৭৭৪ থেকে ১৮২০ পর্যন্ত নতুন আর পুরাতনের মধ্যে অদ্ভুত এক টানাপোড়েন চলেছিল। কিছু বিদ্বজন এই নতুন আর পুরোনোকে মেলানোর জন্য এগিয়ে এসেছিলেন। তাঁদের চিন্তার কেন্দ্র হয়ে দাঁড়িয়েছিল হিন্দু কলেজ (অধুনা প্রেসিডেন্সি বিশ্ববিদ্যালয়)। কলকাতায় শুরু হল রেনেসাঁ। সেটা অদ্ভুত ভাবেই হলো। 

সেসময় দেখা গেছিল, ঊনিশ শতকের গোড়ার দিকে ইংরেজরা সংস্কৃত, আরবি ভাষার শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের জন্য বিনিয়োগ করছে আর ভারতীয়রা উদ্যোগ নিয়েছিল পাশ্চাত্যবিদ্যার প্রতিষ্ঠান নির্মাণের জন্য। বিদ্যাসাগর সেসময়ে একটি বক্তৃতায় যা  বলেছিলেন তার সারাংশ হলো, ‘সংস্কৃতের ছাত্ররা যদি ভালো করে ইংরেজি শেখে, তাহলে খুব ভালো ভাবে বাংলা পড়তে পারবে’। এই যে তিনটি ডায়মেনশন-কে মেলানোর কথা তখন বলা হয়েছিল, তার সর্বোৎকৃষ্ট উদাহরণ হয়তো মাইকেলই। ‘পলিম্যাথ’ মধুসূদন একাধিক ভাষা জানতেন, বিভিন্ন বিদেশি ভাষায় তিনি যে সাহিত্য পড়েছিলেন, একই সম্ভাবনা তিনি বাংলা ভাষাতেও পেয়েছিলেন। তাঁর চিঠিতে সে উল্লেখ মেলে। “ভাষার ডায়মেনশন নিয়ে, প্রাচ্য-পাশ্চাত্যের মিলন নিয়ে যদি ব্রিটিশ-পরবর্তী ভারত গুরুত্ব দিতো তাহলে দেশ আজ অন্য জায়গায় থাকতো” অধ্যাপক সুকান্ত চৌধুরীর বক্তব্যে উঠে আসে এই সময়োচিত দিকটি।

মাতৃভাষা শেখার পর, খুব ছোটোবেলাতেই তাঁর মা-কে কৃত্তিবাসী রামায়ণ পড়ে শোনাতেন। মধুসূদন ছিলেন তীব্র আবেগপ্রবণ, যা তাঁর সাহিত্য-ভাষায় প্রতিফলিত হয়েছে বারবার। যখন তিনি ইংরেজিতে বায়রন পড়ছেন, নিজেকে তাঁর সঙ্গে মেলানোর চেষ্টা করতেন। মধুসূদনের বাংলা লেখার সময়সীমা দীর্ঘ নয়। প্রথমা স্ত্রী’র সঙ্গে বিচ্ছেদের পর মাদ্রাজ থেকে কলকাতায় আসা নতুন প্রেমের টানে। বাংলায় ফিরে আসার পর একদম নতুন আঙ্গিকে মাতৃভাষায় নাটক লিখতে শুরু করলেন। ইংরেজদের মঞ্চনাটকে তিনি ঢুকিয়ে দিলেন বাংলাভাষা। নাটকই হয়ে উঠেছিল তাঁর বাংলা সাহিত্যসৃষ্টির সিংহদ্বার। নাটকের জন্য পুরাণ, ইতিহাস থেকে গল্প নিলেও তাঁর ভাবনার কেন্দ্রে থাকতো ব্যক্তি মানুষ। যেমন, কর্ণেল জেমস টড (Colonel James Tod)-এর ‘রাজস্থান’ থেকে গল্প নিয়ে তিনি ‘কৃষ্ণকুমারী’র মতো নাটক লিখেছেন। অনেকেই তখন জাতীয়তাবাদ জাগিয়ে তুলতে টডের ‘রাজস্থান’ পড়তে চাইতেন। মধুসূদন তাঁর ‘কৃষ্ণকুমারী’-তে দেখাচ্ছেন, রাজস্থানে আসলে রাজারা একটি মেয়েকে দখল করার জন্য, প্রায় খেয়োখেয়ি করছে। এবং মেয়েটি তারা শেষপর্যন্ত দখল করতে পারে না। মধুসূদন জোর দিয়েছিলেন ওই মেয়েটির মনস্তত্ত্বে। শুধু এটাই নয়, তাঁর লেখা বীরাঙ্গনা-র মতো পত্রকাব্যে মেয়েরা নিজেদের কথা প্রকাশ্যে বলেছিল। মধুসূদনের আজীবনের লেখাপত্রের দিকে নজর দিলে দেখা যাবে, যে ব্যক্তি হিসেবে মেয়েদের জায়গা খুব গুরুত্বপূর্ণ। অধ্যাপক বিশ্বজিৎ রায় এদিন আলোচনা করেন মাইকেল মধুসূদন দত্ত -সৃষ্ট সাহিত্যের এই উল্লেখযোগ্য দিকটি। 

প্রসঙ্গত, ২০১২ সালে চালু হওয়া টাটা স্টিল কলকাতা লিটারারি মিট, সাহিত্য এবং সহযোগী সাংস্কৃতিক দিকগুলোকে (যেমন নাচ, গান এবং থিয়েটার) উদযাপন করে। আলোচনা, কর্মশালা, বই উন্মোচন, নাটক, নাচ, আবৃত্তি এবং সংগীতানুষ্ঠান পাঁচদিন ধরে চলে নানা কিছু। এই লিটারারি মিট শুধু কলকাতা নয়, সমগ্র দেশের মেধাবী, সাংস্কৃতিক প্রতিভাকে একই মালায় গাঁথে।

এই উৎসবে বিভিন্ন সময় অংশগ্রহণকারী লেখকদের তালিকায় আছেন, নোবেল বিজয়ী অভিজিৎ ব্যানার্জী এবং ভেঙ্কি রামকৃষ্ণান, পল বিটি এবং ইয়ান মার্টেলের মতো বুকার পুরস্কার বিজয়ী। এই উৎসবকে আলোকিত করেছেন রাসকিন বন্ড, আন্দ্রে অ্যাসিমান, অমিতাভ ঘোষ এবং রামচন্দ্র গুহের মতো ব্যাক্তিত্ব্ররা। অংশগ্রহণ করেছেন অভিনেতা নাসিরুদ্দিন শাহ, পঙ্কজ কাপুর এবং বিনয় পাঠক; হিন্দুস্তানি শাস্ত্রীয় সঙ্গীতজ্ঞ আমজাদ আলী খান, সুজাত খান। বিগত বছরগুলোয় ছিলেন সদ্য প্রয়াত রাশিদ খান। ভারতীয় শাস্ত্রীয় নৃত্যশিল্পী মল্লিকা সারাভাই এবং অদিতি মঙ্গলদাস কয়েক বছর ধরে এই সাহিত্য সভায় পারফর্ম করেছেন। 

Developed by DXDasia