চেনা কলকাতা ও বাংলা বদলাচ্ছে, এ বদল ভালো নয়…

আমাদের ইতিহাস, সংস্কৃতি প্রশ্নের মুখে

বিগত আটচল্লিশ ঘণ্টা আমাদের চেনা কলকাতা শহর তথা রাজ্যটাকে বেশ খানিক অচেনা করে দিয়েছে।

ভোটের বাজার। কেন্দ্রে সরকার গড়ার ভোট। দেশের ইতিহাসে সবচাইতে বেশি টাকা খরচ করে (আমেরিকার ভোটেও নাকি খরচ এর ধারে-কাছে পৌঁছয় না) নির্বাচন করাচ্ছে নির্বাচন কমিশন। ফলে উত্তেজনা, হাওয়া গরম তো থাকবেই। তার ওপর, বাঙালি বরাবর রাজনীতি-সচেতন জাতি। আমরা চায়ের পেয়ালাতেই তুফান তুলি আর ভোট এলে তো… তবু, নির্বাচনের চেনা আবহেও অচেনা লাগছে শহর কলকাতাকে। গোটা পশ্চিমবঙ্গকেই।

মঙ্গলবার রাতে বিদ্যাসাগর কলেজে দুষ্কৃতিদের হাতে ভাঙা পড়ল বিদ্যাসাগরের মূর্তি। বিদ্যাসাগরের মূর্তি তো নিছক একটা মূর্তি নয়। এই মানুষটির সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে আপামর বাঙালির আধুনিক হয়ে ওঠার ইতিহাস, বর্ণের সঙ্গে পরিচয়ের স্মৃতি। বাংলা ভাষা, গদ্য, মাতৃভাষায় শিক্ষা, নারীশিক্ষা সবই তাঁর কাছে ঋণী। ধর্মের অন্ধ নিগড় ছিঁড়ে একটা জাতিকে এগিয়ে যাওয়ার পথ দেখিয়েছিলেন যে মানুষটি, তাঁর মূর্তি ভাঙা মানে সেই ইতিহাসটাকেই আক্রমণ করা। এর আগেও নকশাল আমলে কলেজ স্কোয়ারে বিদ্যাসাগরের মূর্তি ভাঙা হয়েছিল। কিন্তু সেটা লোকচক্ষুর আড়ালে। এমনভাবে, আছড়ে ভাঙা হয়নি আক্রোশ উপুড় করে। এই আক্রোশ নানাকিছু প্রমাণ করে।

কারা মূর্তি ভেঙেছে, তারা ভিন রাজ্যের আনুষ কিনা, তারা আদৌ বিদ্যাসাগরকে চিনত কিনা—এ নিয়ে তোলপাড় চলছে। উত্তর যাই হোক, বিদ্যাসাগরের মূর্তি ভাঙা পড়াটা খুবই প্রতীকী এমন সময়ে দাঁড়িয়ে। দিনে দিনে ধর্মীয় শোভাযাত্রায় অস্ত্রপ্রদর্শন, ধর্মের বয়ান নিয়ে উত্তপ্ত হচ্ছে রাজ্য। পারস্পরিক দোষারোপ চলছে। ধীরে ধীরে পশ্চিমবঙ্গের সবচাইতে জোরের জায়গা, গৌরবের জায়গাগুলিই আবছা হয়ে আসছে সেই টানাপোড়েনে। আমরা ভুলে যাচ্ছি, বাংলা সত্যিই ভারতবর্ষের মেধা, সংস্কৃতির একটি উজ্জ্বল কেন্দ্র। এখানেই জন্ম নিয়েছিলেন চৈতন্যদেব। বর্ণাশ্রম প্রথার বেড়া ভেঙে প্রেম-ভক্তিরসে প্লাবিত করেছিলেন এই ভূখণ্ডকে। রাধাকৃষ্ণ-আল্লা-খোদা-সাঁই একাকার হয়ে আছে এখানকার বাউল-ফকির-সহজিয়াদের গানে, চর্যায়। হোক না ইংরেজদের পরিকল্পনাপ্রসূত, তবু আধুনিকতার নবজাগরণে গোটা দেশকে আলো দেখিয়েছিল এই বাংলাই। সতিদাহ প্রথা রোধ করতে রুখে দাঁড়িয়েছিলেন বঙ্গসন্তান রামমোহন। গোটা দেশের মহামান্যরা ছাপার অক্ষরে মহাকাব্য পড়া যখন শুরুই করতে পারেননি, তখনই রাবণ-মেঘনাদকে নায়ক করে ‘মেঘনাদবধ কাব্য’ লিখে ফেলেছিলেন মধুসূদন। সাহিত্য-সংস্কৃতিতে নতুন নতুন পথ আবিষ্কার করেছে বাংলার মানুষ। বিজ্ঞানে ভারতকে আন্তর্জাতিক দুনিয়ার কাছে চিনিয়েছেন জগদীশচন্দ্র বসু, প্রফুল্লচন্দ্র রায়, সত্যেন্দ্রনাথ বসুরা। ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলনের নেতৃত্বেও বাংলাই বারবার প্রথম সারিতে। আর, রবীন্দ্রনাথের কথা বাদই রাখলাম। গোটা দেশ এই ভূখণ্ডের কাছে ঋণী।

এই বাংলার কেন্দ্র শহর কলকাতাতেই এখন ভাঙা পড়ে বিদ্যাসাগরের মূর্তি। কলেজের সামনে বাইক পোড়ে, তাণ্ডব চলে। নির্বাচন কমিশন বেনজিরভাবে ৩২৪ ধারা জারি করার নির্দেশ দেয়। নির্বাচন কমিশনের ভূমিকা নিয়ে হাজারো প্রশ্ন তোলার সময়েও আমরা ভুলে যাই স্বাধীন ভারতের প্রথম নির্বাচন কমিশনারও একজন বাঙালি—সুকুমার সেন। সদ্য স্বাধীনতা পাওয়া একটা হতদরিদ্র দেশেও সফল নির্বাচন পরিচালনা করেছিলেন যিনি। দলদাসত্বের অভিযোগ ওঠেনি। আমরা সেই ইতিহাসও ভুলে গেছি।

প্রার্থীদের প্রচারের সময় কতখানি কমল, তা আসলে গৌণ। দেশের একটি অঙ্গরাজ্যের ওপর কমিশনের এই সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দেওয়া আসলে রাজ্যের গণতন্ত্রের ওপরে একটা আঘাত। সেই আঘাতের প্রেক্ষাপটে যে ঘটনাক্রমগুলি রয়েছে, তার বিচার কারা করবে? বাইরের লোক এসে গণ্ডগোল করেছে বললেও, সেই গণ্ডগোল ঘটেছে তো আমাদের প্রিয় শহরের বুকেই। এই তাণ্ডবের জমিটা তো প্রস্তুত করে দিয়েছি আমরাই। সুযোগ করে দিয়েছি এমন সব বয়ানকে আগ্রাসী হয়ে ঝাঁপিয়ে পড়তে বাংলার বুকে। রাজনৈতিক অশান্তি আগেও বহু দেখেছে এই রাজ্য। কিন্তু, এই ঘটনার চরিত্র খানিক আলাদা। বাংলার ইতিবাচক সংস্কৃতি, উদার-উন্মুক্ত পরিবেশ এখন প্রশ্নের মুখে।

রবিবার শেষ দফার ভোট। গণতান্ত্রিক অধিকার প্রয়োগ করতে রোদ উপেক্ষা করে বুথের বাইরে লাইন দেবেন শহরবাসী। ভোট যাকেই আমরা দিই না কেন, আমাদের যেন মাথায় থাকে এই ক্ষয়ের বাস্তবতাটি। চেনা বাংলার এই বদল কি কাঙ্ক্ষিত আমাদের? যে আলোর দিকে আমাদের হাঁটতে শিখিয়েছিলেন বিদ্যাসাগর, তাঁর মূর্তি ভেঙে ফেলে পিছনের দিকেই ফের মুখ ফেরাচ্ছি না তো আমরা? দেরিতে হলেও এই ভুল হয়তো একদিন ভাঙবে। ইতিহাস সাক্ষী, তার মধ্যে ক্ষতি হয়ে যাবে অনেক।

আমাদের ইতিবাচক, সমৃদ্ধ ইতিহাসটির কথা তাই একবার ভাবি চলুন। এখনো সময় আছে।    

 

Developed by DXDasia