১৮৮০ সালে শেষবার কামারপুকুর গিয়েছিলেন রামকৃষ্ণ
রামকৃষ্ণ পরমহংসের ভিক্ষামাতা ধনী কামারিনীর পিতৃকুলের কোনো এক ব্যক্তিকে দিয়ে স্থানীয় শাসনকর্তা মানিকরাজা একটি পুকুর খনন করিয়েছিলেন, যা 'কামারদের পুষ্করিণী' নামে পরিচিত ছিল। অনুমান এর থেকেই কামারপুকুর নামটির উদ্ভব। যদিও সবাই তা মনে করে না। অনেকের মতে, কামারপুকুর গ্রামের আদি নাম ছিল সুখলালগঞ্জ। গ্রামের আদি জমিদার সুখলাল গোস্বামীর নামেই নাকি এই নাম। সুখলালগঞ্জ, শ্রীপুর, মুকুন্দপুর, মধুবাটী ও কামারপুকুর — এই পাঁচখানি ছোটো গ্রামের মধ্যে শেষ অবধি কামারপুকুর নামটিই রয়ে যায়।
১৮৩৬ থেকে ১৮৫৩ সাল পর্যন্ত প্রায় সতেরো বছর রামকৃষ্ণ কামারপুকুরে ছিলেন। পরে দক্ষিণেশ্বরে চলে যান। কিন্তু মাঝেমধ্যেই কামারপুকুরে এসে থাকতেন। পরে প্রায় প্রতিবছরই বিশেষত বর্ষা ও শরৎকালে তিনি কামারপুকুরে এসে কাটাতেন। অনুমান ১৮৮০ সালে তিনি শেষবার কামারপুকুরে আসেন। সে সময় কামারপুকুরে তিনি ছিলেন প্রায় আটমাসের মত।
১৮৮৬ সালের ৭ ফেব্রুয়ারি ‘শ্রীশ্রী রামকৃষ্ণকথামৃত’-র রচয়িতা শ্রী’ম কামারপুকুর দর্শনে যান। রামকৃষ্ণ তখন অসুস্থ।
শ্রী’ম কামারপুকুর ঘুরে এসেছেন শুনে, রামকৃষ্ণ খুব খুশি হলেন। তিনিও শ্রী’ম-র সঙ্গে কামারপুকুরে যাওয়ার ইচ্ছা প্রকাশ করলেন। কিন্তু সেই ইচ্ছা পূর্ণ হওয়ার আগেই রামকৃষ্ণের মহাপ্রয়াণ ঘটে।
শ্রী’ম অবশ্য তারপরেও প্রায় আট-ন'বার কামারপুকুর যান। এমনকি তিনি কামারপুকুরেই স্থায়ীভাবে বসবাসের কথাও চিন্তা করেন। কিন্তু কামারপুকুরকে 'ম্যালেরিয়ার ডিপো' আখ্যা দিয়ে মা সারদা শ্রী'মকে কামারপুকুরে বসবাসের অনুমতি দেননি।
রামকৃষ্ণের মৃত্যুর পর সারদা দেবী অনেক অভাব-অনটন সহ্য করেও কামারপুকুরে অনেকটা সময় কাটিয়েছিলেন।
১৮৮৯ সালে স্বামী বিবেকানন্দ কামারপুকুরে এসেছিলেন। স্বামীজী একবার বলেছিলেন, ‘যারা ভাগ্যবান তারাই সেইসব মানে, কামারপুকুরে ঠাকুরের জন্মভূমি দর্শন করতে পায়।’
সারদা মা'র সাথে গিরিশ ঘোষ কামারপুকুরে কাটিয়েছিলেন বেশ কিছুটা সময়।
রামকৃষ্ণের জন্মস্থানের ঠিক উপরেই তৈরী হয়েছে শ্রীরামকৃষ্ণ মন্দির। রামকৃষ্ণের মূর্তি নির্মাণের সময় নির্বাচিত ভাস্কর মূর্তিটি নিখুঁত ভাবে তৈরি করার জন্য ঠাকুরের দৈহিক উচ্চতা জানতে চান। একবার রামকৃষ্ণ কোট পরে রাধাবাজারের ‘বেঙ্গল ফটোগ্রাফার’ নামে এক ষ্টুডিওতে ফটো তুলিয়েছিলেন। যে কোটটি বেলুড় মঠে সংরক্ষিত ছিল। সূর্য মহারাজ ওরফে স্বামী নির্ব্বাণানন্দ বেলুড় মঠে সংরক্ষিত সেই কোটটি থেকে অনুমান করেন ঠাকুরের উচ্চতা মোটামুটি ৫ ফুট ৯ ইঞ্চি। সেটি শিল্পীকে জানালে শিল্পী সেই অনুপাতেই মূর্তিটি গড়েন ।
এই মন্দিরটির শিল্প পরিকল্পনা করেন বিখ্যাত চিত্রশিল্পী নন্দলাল বসু। নির্মাণ দেখাশোনার ভার ছিল মার্টিন বার্নের ইঞ্জিনিয়ার গোপেন্দ্রনাথ সরকারের ওপর । আর পাথর খোদাই-এর কাজ করেছিলেন সুদক্ষ শিল্পী নৃসিংহ হাজরা । ঠাকুরের মূর্তি এবং বেদী তৈরি করেন সেসময়ের বিখ্যাত শিল্পী মণি পাল ।
মন্দিরটির প্রতিষ্ঠা হয় ১৯৫১ সালের ১১ই মে। জন্মগ্রহণের সময়টির স্মারক রূপে শ্বেতপাথরের বেদীর সামনে ঢেঁকি, চুল্লি ও প্রদীপ খোদাই করা হয়। এখানে সকাল-সন্ধ্যা পূজা, আরতি ও ভোগ হয় এবং প্রতি সন্ধ্যায় স্তোত্রপাঠ ও সঙ্গীতানুষ্ঠান হয়। মন্দিরের কাছেই ঠাকুরের নিজের হাতে পোঁতা আম গাছটির দেখা মেলে আজও।
কুটিরের কাছেই রয়েছে একটি প্রাচীন শিব মন্দির। শোনা যায়, ঠাকুরের মা চন্দ্রামণি দেবীর এক অদ্ভুত দর্শন ও অনুভুতির কথা । একদিন তিনি এই শিব মন্দিরের সামনে দাঁড়িয়ে ধনী কামারিনীর সঙ্গে কথা বলছেন। সেসময় হঠাৎ তিনি দেখতে পান যে মন্দির থকে একটি জ্যোতি এসে তাঁর শরীরের ভিতর প্রবেশ করল। সাথেসাথে তিনি মূর্ছিত হয়ে পড়েন এবং পরে অনুভব করেন যে তাঁর গর্ভসঞ্চার হয়েছে। আর এর পরই জন্ম হয় রামকৃষ্ণের।
রামকৃষ্ণের বাবা ক্ষুদিরাম চট্টোপাধ্যায়ের প্রতিবেশী ছিলেন মধু যুগী। বালক গদাধরকে তিনি অত্যন্ত স্নেহ করতেন। এই মধু যুগীর পিতা রামানন্দ যুগী, একবার তীর্থ ভ্রমণে বের হন এবং ফিরে এসে একটি শিবমন্দির প্রতিষ্ঠা করেন। শিবের নাম শান্তিনাথ। পরে এই মন্দিরটিই 'যুগীদের শিবমন্দির' নামে পরিচিতি লাভ করে।
কামারপুকুরের জমিদার ছিলেন লাহাবাবুরা। তাদের দুর্গামণ্ডপের সামনে যে নাটমন্দির বা আটচালা ছিল, সেখানে সকাল ও সন্ধ্যা দু'বেলা একটি পাঠশালা বসত। যা 'লাহাদের পাঠশালা' নামে পরিচিত ছিল। গ্রামের ছোট ছেলেমেয়েদের বিদ্যা দান করার জন্যই লাহাবাবুরা এই পাঠশালা চালু করেছিলেন। যখন গদাধরের বয়স পাঁচ তখন সে এই পাঠশালার ছাত্র ছিল। প্রথমে যদুনাথ সরকার এবং পরে রাজেন্দ্রনাথ সরকার এই পাঠশালার পণ্ডিত ছিলেন। পাঠশালায় পড়াশুনা করা ছাড়াও এই সময় বালক গদাধর শিব সেজে অভিনয় করতেন।
পাঠশালার সামান্য দূরে লাহাদের বিষ্ণুমন্দিরটি অবস্থিত। এটি দেখতে অনেকটা দালানের মতো। অনুমান, লাহা বংশীয় জগন্নাথ লাহা অষ্টাদশ শতকে এই মন্দিরটি নির্মাণ করেছিলেন। শোনা যায়, বালক গদাধরের যখন পাঠশালায় পড়াশোনা করতে ভাল লাগত না, তখন তিনি এখানে এসে মা কালীর মূর্তি আঁকতেন ও ধ্যান করতেন।
(ঋণ: বেলুড় মঠ। রামকৃষ্ণ মঠ ও মিশন, কামারপুকুর। বেদান্ত সোসাইটি)