কাটোয়া দুর্গাদাসী চৌধুরানী গার্লস হাই স্কুল : মাধ্যমিকে তিন কৃতির শিক্ষা প্রতিষ্ঠান

সাংবাদিক শিবপ্রিয় দাশগুপ্তের কলামে ‘আমাদের ইস্কুল’ – পর্ব ২১

২০২৩ মাধ্যমিকের তিন কৃতি দেবদত্তা, সামরিন ও শমীতা

০১২ থেকে ধারাবাহিক ভাবে ভালো ফলাফলের ঐতিহ্য বহন করে চলেছে পূর্ব বর্ধমানের কাটোয়া দুর্গাদাসী চৌধুরানী গার্লস হাই স্কুল (Katwa DDC Girls’ High School)। তবে, পুরোনো সব রেকর্ড ভেঙে ২০২৩-এর মাধ্যমিকে এই স্কুল থেকে মাধ্যমিকে প্রথম হয়েছে দেবদত্তা মাঝি। শুধু তাই নয়, এই স্কুল থেকে এবার মাধ্যমিক পরীক্ষা সপ্তম ও অষ্টম স্থানও পেয়েছে সামরিন আখতার ও শমীতা প্রামাণিক নামে আরও দুই ছাত্রী। ছাত্রীদের এই সাফল্যে গর্বিত স্কুলের প্রধান শিক্ষিকা কবিতা সরকার সহ পুরো স্কুল। এবার কাটোয়া দুর্গাদাসী চৌধুরানী গার্লস হাই স্কুল গড়ে ওঠার নেপথ্য কাহিনিতে আসা যাক।

সময়টা ১৯২০। কাটোয়া থানার সামনে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল কাটোয়া দুর্গাদাসী চৌধুরানী গার্লস হাই স্কুল। কাটোয়ার তৎকালীন জমিদার স্বর্গীয় গোলাপ চাঁদ সাহা তাঁর কন্যা দুর্গা দাসী চৌধুরানীর নামে এই স্কুলের জমি দান করেছিলেন। একটি শিলালিপি পাওয়া যায় তাতে লেখা ছিল, বাবু গোবিন্দ চাঁদ সাহা কর্তৃক দুর্গা দাসী চৌধুরানী স্কুলটি স্থাপিত, বাংলার ১৩৩৩ অথবা ইংরেজির ১৯২০ সালে। 

বর্তমান স্কুল ভবন

ধীরে ধীরে স্কুলটি বড়ো হতে থাকে। স্থানাভাব শুরু হয়। তার পর কাটোয়া থানার সামন থেকে স্কুলটি স্টেশনের সামনে কাছারি রোডে চলে আসে। স্কুলের বর্তমান জায়গাটি দান করেন স্থানীয় কমলবাঁশী দেবী, তিনি হলে ডাঃ এস কে রায়ের মা। কাছারি রোডের স্কুলে যাওয়ার জন্য রাস্তার কয়েক গজ জমি দান করেন ক্ষুদিরাম মুখার্জি ও জঙ্গল দত্ত। বর্তমানে স্কুলটি স্কুল ভবনটি তৈরি শুরু হয় কমলবাঁশী দেবীর দেওয়া জমিতে। তখন স্কুলের পরিচালন সমিতির সম্পাদক ছিলেন ডাঃ এস কে রায়। ১৯২৭ সালে থানার সামনে থেকে কাছারি রোডের সামনে চলে আসে দুর্গাদাসী চৌধুরানী গার্লস হাই স্কুলটি। স্কুল তৈরির এই ইতিহাস জানালেন স্কুলের বর্তমান প্রধান শিক্ষিকা কবিতা সরকার। তিনি ১৯৯০ সালে এই স্কুলে সহকারী শিক্ষিকা হয়ে কাজে যোগ দেন। তারপর সহকারী প্রধান শিক্ষিকা এবং বর্তমানে প্রধান শিক্ষিকা পদে কাজ করছেন। তিনি বলেন, “আমি কাটোয়ার বাসিন্দা নই। কর্মসূত্রে এই স্কুলের প্রধান শিক্ষিকা। আমি যতদূর এই স্কুলের ইতিহাস জানি, তাই জানালাম।”

স্কুলে ২৪টি শ্রেণি কক্ষ। ছাত্রী সংখ্যা পঞ্চম থেকে দ্বাদশ শ্রেণি পর্যন্ত ২৭০০-এর কাছাকাছি। স্কুল ভবনটি তিনতলা। এক তলা, দোতলায় ক্লাস হয়। তিনতলায় ল্যাবরেটরি রয়েছে। উচ্চমাধ্যমিকে বিজ্ঞান ও কলা বিভাগে পড়ানো হয়। পদার্থ, রসায়ন, জীববিদ্যা ও ভূগোলের ল্যাবরেটরি আছে।

প্রধান শিক্ষিকা কবিতা সরকার বলছিলেন, “আমাদের যা ছাত্রী সংখ্যা সেই অনুপাতে শ্রেণি কক্ষ কম। ক্লাস করতে অসুবিধা হয়। তার উপর শৌচালয় পর্যাপ্ত নয়। জায়গার অভাবে স্কুল ভবন নির্মাণের আনুদানের টাকা এলেও আমরা কাজটা করতে পারি না কারণ নতুন ভবন, শৌচাগার তৈরির জন্য আমাদের জায়গার সত্যিই অভাব। সরকার থেকে গ্রাউন্ড ফ্লোরে টয়লেট নির্মাণ করতে বলে কিন্তু আমাদের সেই জায়গা কোথায়? সব চেয়ে সমস্যা হয় জুন, জুলাই, অগস্ট, সেপ্টেম্বর মাসে। এই সময় পঞ্চম থেকে দ্বাদশ সব শ্রেণির ছাত্রীরা স্কুলে আসে। এমনকী রোজ যখন স্কুল ছুটি হয়, এক সঙ্গে এতো জন ছাত্রী স্কুল থেকে বের হওয়াতেও সমস্যার সৃষ্টি হয়। স্কুলে স্থায়ী শিক্ষিকা ৪২ জন, ৫ জন প্যারা টিচার, নন টিচিং স্টাফ ৪ জন। ছাত্রী -শিক্ষিকার অনুপাত সঠিক নেই, শিক্ষিকার সংখ্যা কম। ক্লাস করতে সমস্যা হয়।”

শিক্ষিকারা

এই বছর কাটোয়া দুর্গা দাসী চৌধুরানী গার্লস হাইস্কুলের তিন ছাত্রী মাধ্যমিকে প্রথম, সপ্তম ও অষ্টম স্থান পেয়েছে। ২০২৩-এর মাধ্যমিকে প্রথম হয়েছে দেবদত্তা মাঝি, প্রাপ্ত নম্বর ৬৯৭। সপ্তম হয়েছে সামরিন আখতার, প্রাপ্ত নম্বর ৬৮৬। অষ্টম হয়েছে শমীতা প্রামাণিক, প্রাপ্ত নম্বর ৬৮৫। 

স্কুলের এই ফলাফল নিয়ে রীতিমতো গর্বিত প্রধান শিক্ষিকা। তাঁর কথায়, “আমাদের স্কুলের মাধ্যমিকে প্রথম দশে থাকার এটাই প্রথম বছর নয়। ২০১২ থেকেই আমাদের স্কুল মাধ্যমিকে প্রথম দশের মধ্যে থাকছে। এর আগে ২০১২ সালে আমাদের স্কুল থেকে সৌমী বসু অষ্টম হয়। ২০১৪ সালে ষষ্ঠ হয় সায়ন্তী মণ্ডল এবং সপ্তম হয়েছিল পারিজাত দত্ত। ২০২০ সালে ঊর্যশী মণ্ডল নবম স্থান পায় ওই একই বছরে শ্রীপর্ণা দশম স্থান লাভ করে। ২০২২ সালে শ্রেয়সী মজুমদার দশম স্থান পায় মাধ্যমিকে। এবার ৬৮২ নম্বর পেয়েছে আরও এক ছাত্রী। ৬৭৯ পেয়েছে আরও দুজন। কাজেই প্রথম ২০ জনের হিসেব করলে আমাদের স্কুলের আরও ছাত্রীর নাম উঠে আসতো। এখন তো প্রথম ২০-র তালিকা তৈরি হয় না। তবে আমাদের এতো কিছু থেকেও স্কুলে যথাযথ খেলার মাঠ নেই। এটা সত্যিই একটা সমস্যা।” তিনি আরও বলেন, “কাটোয়ার একদিকে নদিয়া, একদিকে মুর্শিদাবাদ, একদিকে বীরভূম। তাই সংলগ্ন জেলার মেয়েরাও আমাদের স্কুলে পড়তে আসে। কাছাকাছি গ্রাম থেকেও মেয়েরা এখানে পড়তে আসে। তবে আমাদের মেয়েরা পড়াশোনায় ভালো। অন্য স্কুলে পড়লেও ওরা ভালো ফলই করত। আমি আমাদের ছাত্রীদের নিয়ে খুবই গর্বিত।”

প্রধান শিক্ষিকা কবিতা সরকার বলছিলেন, “আমাদের যা ছাত্রী সংখ্যা সেই অনুপাতে শ্রেণি কক্ষ কম। ক্লাস করতে অসুবিধা হয়। তার উপর শৌচালয় পর্যাপ্ত নয়। জায়গার অভাবে স্কুল ভবন নির্মাণের আনুদানের টাকা এলেও আমরা কাজটা করতে পারি না কারণ নতুন ভবন, শৌচাগার তৈরির জন্য আমাদের জায়গার সত্যিই অভাব। সরকার থেকে গ্রাউন্ড ফ্লোরে টয়লেট নির্মাণ করতে বলে কিন্তু আমাদের সেই জায়গা কোথায়? সব চেয়ে সমস্যা হয় জুন, জুলাই, অগস্ট, সেপ্টেম্বর মাসে। এই সময় পঞ্চম থেকে দ্বাদশ সব শ্রেণির ছাত্রীরা স্কুলে আসে। এমনকী রোজ যখন স্কুল ছুটি হয়, এক সঙ্গে এতো জন ছাত্রী স্কুল থেকে বের হওয়াতেও সমস্যার সৃষ্টি হয়।

২০২৩-এর মাধ্যমিক পরীক্ষায় অষ্টম স্থানাধিকারী শমীতা প্রামাণিকের বাবা স্কুল শিক্ষক। কাটোয়া থেকে বদলি হয়ে তিনি কলকাতায় এসেছেন। শমীতাকেও কলকাতায় চলে আসতে হয়েছে। তাই কাটোয়া দুর্গা দাসী চৌধুরানী গার্লস হাইস্কুলে তাঁর আর একাদশ শ্রেণিতে ভর্তি হওয়া হয়নি। পদার্থ বিদ্যা নিয়ে গবেষণা করার ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা আছে শমীতার। বাবার কর্মসূত্রে এই বদলি খুবই যন্ত্রণাদায়ক ছিল তার কাছে। শমীতা বলছে, “ফাইভ থেকে আমি দুর্গা দাসী চৌধুরানী গার্লস হাইস্কুলে পড়ছি। আমার অনেক স্মৃতি রয়েছে ওই স্কুলের সঙ্গে। নতুন স্কুলে আবার সব নতুন করে শুরু করতে হবে।” 

তবে মাধ্যমিকে প্রথম স্থানাধিকারী দেবদত্তা মাঝি এবং সপ্তম সামরিন আখতার, দুজনেই জানিয়েছে বিজ্ঞান নিয়ে দুর্গা দাসী চৌধুরানী গার্লস হাইস্কুলেই ভর্তি হবে তারা। দেবদত্তার ইচ্ছে আইআইটিতে ইঞ্জিনিয়ারিং পড়বে। সামরিন ভবিষ্যতে ডাক্তার হওয়ার ইচ্ছে প্রকাশ করেছে। সামরিনের বাবাও পেশায় শিক্ষক।

কৃতি তিন জনই পঞ্চম শ্রেণি থেকে এই স্কুলে পড়ছে। তবে এখন ওদের দল থেকে আলাদা হয়ে যাচ্ছে শমীতা। এটা শমীতার কাছে যেমন দুঃখের তেমনই দুঃখের দেবদত্তা ও সামরিনের কাছেও। দেবদত্তার কথায়, “স্কুলের বারান্দাতেই খেলতাম। কত স্মৃতি। স্কুলের শিক্ষিকারা আমাদের পড়াশোনার জন্য সব রকমের সাহায্য করেছেন। তবে লাইব্রেরিতে বই আরও বেশি থাকলে আমার ভালো লাগত।” দেবদত্তা বেহালা শিখেছেন। অষ্টম শ্রেণিতে উঠে চর্চা বন্ধ রেখেছেন লেখা পড়ায় বাড়তি সময় দেওয়ার জন্য। দেবদত্তার বাবা কলেজে অধ্যাপনা করেন আর মা দুর্গা দাসী চৌধুরানী গার্লস হাইস্কুলেরই শিক্ষিকা।

দেবদত্তার মার্কশিট

সপ্তম স্থানাধিকারী সামরিন আখতার বলছিল, “স্কুলে ফাইভ থেকে এইট পর্যন্ত সব অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ করেছি। তার পর লকডাউন হল। খুব খারাপ সময় গেছে। স্কুলে যেতে পারিনি অনেকটা সময়। অনলাইনে ক্লাস হয়েছে। আমি আবৃত্তি করতাম। সরস্বতী পুজোয় স্কুলে যেতাম। শিপ্রা ম্যাডামের কথা মনে আছে, তিনি আমাদের বাংলা পড়াতেন। আমি যখন এইটে পড়ি তখন অবসর নেন। আমার মাধ্যমিকের ফল শুনে শিপ্রা ম্যাডাম আমায় ফোন করে আশীর্বাদ করেছেন।”
স্কুলের শিক্ষিকাদের সঙ্গে ছাত্রীদের এই রকম আত্মিক সম্পর্ক বজায় থাকলে একটা স্কুল স্বল্প পরিকাঠামো নিয়েও সাফল্যের শীর্ষে যে পৌঁছতে পারে, দুর্গা দাসী চৌধুরানী গার্লস হাইস্কুল তার উৎকৃষ্ট উদাহরণ।

__________________
তথ্য সূত্র: কবিতা সরকার, প্রধান শিক্ষিকা, কাটোয়া দুর্গা দাসী চৌধুরানী গার্লস হাইস্কুল
ছবি: সংগৃহীত
*কলকাতা, শহরতলি বা জেলার কোনও না কোনও স্কুলের সঙ্গে জুড়ে রয়েছে গর্বের ইতিহাস রয়েছে, রয়েছে প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার বুনিয়াদি গল্প। এবার সেদিকেই ফিরে তাকিয়ে চলছে নতুন ধারাবাহিক ‘আমাদের ইস্কুল’। সমস্ত পর্ব পড়তে
এখানে ক্লিক করুন। চোখ রাখুন প্রতি বুধবার সন্ধে ৬টায়, শুধুমাত্র বঙ্গদর্শনে।      
    

Developed by DXDasia