কাশ্মীরের জঙ্গিরা কি এবার নিজেদের মধ্যেই লড়বে?

পরোক্ষে মুসার সুবিধা করে দেওয়ার মধ্যেও বিপদের একটা সম্ভাবনা কিন্তু থেকেই যাচ্ছে

কাশ্মীরের জঙ্গিরা কি এবার পরষ্পরের সঙ্গে লড়াই করবে? এই প্রশ্নটা ধীরে ধীরে প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠছে। আর সেইসঙ্গেই উঠছে আর একটা প্রশ্ন। তা হল ভারতীয় রাষ্ট্র কি মওকা বুঝে পরোক্ষে এই লড়াই উস্কে দেওয়ার চেষ্টা করে চলেছ?

এরকম লড়াই বিভিন্ন জঙ্গি সংগঠনের মধ্যে হয়েই থাকে। বিভিন্ন মাওবাদী জঙ্গিরা একসময় নিজেদের মধ্যে লড়াই করতে। এম সি সি–র সঙ্গে পি ডব্লু–র এমন লড়াই বহুদিন হয়েছে। পরে আবার ওই দুই সংগঠন মিলে সি পি আই (মাওবাদী) তৈরি করেছিল। আফগানিস্তান বা পাকিস্তানে মুজাহিদদের মধ্যেকার লড়াই কোনও বিরল ঘটনা নয়। তালিবানরা কাবুলে ক্ষমতায় এসেছিল অন্য মুজাহিদদের বিরুদ্ধে লড়ে। কিন্তু কাশ্মীরী জঙ্গি সংগঠনগুলোর মধ্যে ঝগড়াঝাঁটি থাকলেও একে অন্যকে খুন করা পর্যন্ত ব্যাপারটা অতীতে গড়ায়নি। এখন গড়াতে চলেছে। প্রাক্তন হিজবুল জঙ্গি জাকির মুসাকে ‘ভারতের এজেন্ট’ বলে পোস্টার পড়েছে কাশ্মীরে। বিশেষ করে সোপিয়ান জেলায়। হিজবুল মুজাহিদিনের সেই পোস্টারে বলা হয়েছে, মুসাকে তাড়া করে খুন করুন! কারণ, সে কাশ্মীরিদের হত্যায় ভারতীয় সেনার সঙ্গে সহযোগিতা করেছে। উর্দুতে পোস্টার লিখে তাতে মুসার ছবি দিয়ে কাশ্মীরের বিভিন্ন এলাকায় সেঁটে দেওয়া হয়েছে। বলা হয়েছে, মুসা বিরাট টাকার বিনিময়ে অত্যাচারী ভারতের কাছে কাশ্মীরের মানুষের স্বার্থ বিক্রি করে দিচ্ছে।

মুসার ওপর এত রাগ কেন হিজবুলের? কারণ, গত মে মাসে সে হিজবুল ছেড়ে আল কায়দায় যোগ দিয়েছে। বুরহান ওয়ানির ঘনিষ্ঠ সহযোগী মুসাকে (আসল নাম ‌জাকির রশিদ ভাট) কাশ্মীর লড়াইয়ের নেতা বলে ঘোষণা করেছিল হিজবুল। বুরহান ওয়ানির মৃত্যুর পর কাশ্মীরে যে জনপ্রতিরোধ গড়ে উঠেছিল, তার নেতৃত্ব দেওয়ার দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল জাকির মুসাকে। তারপর থেকেই মুসার ছত্রছায়াতেই বেড়ে উঠছিল কাশ্মীরের জঙ্গি কার্যকলাপ। কিন্তু ধীরে ধীরে সে কাশ্মীরে ধর্মীয় জেহাদের পথে চলে যায়। উপত্যকার বিচ্ছিন্নতাবাদী নেতারা রাজনৈতিক সমাধানের কথা বলে মানুষকে ভুল পথে নিয়ে যাচ্ছেন, এই অভিযোগ করে হুরিয়ত নেতাদের মেরে ল্যাম্পপোস্টে ঝুলিয়ে দেওয়ার হুমকি দিয়েছিল মুসা। এই নিয়ে হিজবুলের সঙ্গে তার বিরোধ বাধে। মুসা বুঝিয়ে দেয়, আল কায়দা যেভাবে সারা বিশ্বের সমস্ত মুসলিমদের জন্য জেহাদের কথা বলছে, সেই আদর্শেই সে বিশ্বাসী।

এক সময় মহম্মদ বিন লাদেনকে আশ্রয় দিলেও আল কায়দা এখন পাকিস্তানের কাছে শত্রু। কারণ এই সংগঠনের রাশ পাক গোয়েন্দা সংস্থা আই এস আই–এর হাতে নেই। কণামাত্রও নেই। তা ছাড়া আছে আমেরিকার ভয়। কিন্তু হিজবুল মুজাহিদিন পুরোপুরি পাক–নিয়ন্ত্রিত। কাজেই তৎক্ষণাৎ হিজবুলকে বলা হয়, মুসাকে বার করে দিতে। সেই খবর পৌঁছতেই হিজবুল ছেড়ে আল কায়দায় যোগ দেওয়ার কথা জানায় মুসা। এখন মুসা বা তার এখনকার অনুগামীদের বিরুদ্ধে সেনাবাহিনী কিন্তু তেমন কোনও ব্যবস্থা নিচ্ছে না। আল কায়দা ভয়ঙ্কর সংগঠন হলেও ভারতে তার তেমন কোনও প্রভাব নেই। কাজেই হিজবুলের প্রভাব মুসা খাটো করতে পারলে তাতে লাভ ভারতেরই। অনেক সময়েই একটি বিপদের মোকাবিলা করতে এইভাবে অন্য ভাবী বিপদের সুবিধা করে দেওয়া হয় (যেমন এক সময় হাজি মস্তানের প্রভাব কমাতে তরুন দাউদ ইব্রাহিমকে সাহায্য করেছিল মুম্বাই পুলিশ)। ইচ্ছাকৃতভাবে এই কৌশল নেওয়া হয়েছে কিনা, জানা নেই। শুধু একথা জানা আছে যে একের পর এক হিজবুল কমান্ডার এখন খুন হচ্ছে সেনাদের হাতে।

ফলে হিজবুল পড়ে গিয়েছে সমস্যায়। তাদের নেতাদের ধারণা হয়েছে, মুসা ভারতীয় সেনাকে গোপনে সাহায্য করছে। তাই তারা মরিয়া হয়ে মুসার বিরুদ্ধে প্রচার শুরু করছে। পারলে তাকে খুনও করবে তারা। কিন্তু সেইটা ভারতীয় সেনা হতে দেবে না বলে অনেকের ধারণা। কিন্তু সত্যিই যদি এভাবে কাঁটা দিয়ে কাঁটা তোলার কৌশল নেওয়া হয়ে থাকে, তাহলে ভবিষ্যতে বিপদ ঘনাবে কি না, জানা নেই। সোমবার রাজধানী দিল্লি থেকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে আল কায়দা জঙ্গি সামিউর রহমানকে। ৪ বছর ধরে আল কায়দার সঙ্গে যুক্ত সে।  জঙ্গি দমন কার্যকলাপের সঙ্গে যুক্ত মার্কিন সাংসদ কয়েকদিন আগেই মন্তব্য করেছিলেন, ভারত ও বাংলাদেশে সক্রিয় হয়ে উঠছে আল কায়দা। তারপরেই এই আল কায়দা জঙ্গি ধরা পড়েছে যে মায়ানমারে জিহাদের জন্য উত্তর–পূর্বাঞ্চল ও বাংলাদেশ থেকে লোক জোগাড়ের চেষ্টা করছিল। কাজেই পরোক্ষে মুসার সুবিধা করে দেওয়ার মধ্যেও বিপদের একটা সম্ভাবনা কিন্তু থেকেই যাচ্ছে। 

Developed by DXDasia