
কলকাতায় প্রথম কলিম শরাফীর শতবর্ষ উদযাপন
কলিম শরাফী (Kalim Sharafi) নামটার সঙ্গে বর্তমান কলকাতার বুদ্ধিজীবী ঠিক কতটা পরিচিত? কিছুজন নামটুকু শুনে থাকতে পারেন, তবে ওইটুকুই। মানুষটির কর্মজীবন, মেধা ও শিল্পের প্রতি চরম নিষ্ঠার কাহিনি পশ্চিমবাংলার প্রায় কেউই মনে রাখেনি বা সচেতনভাবে ভুলে গেছে। কিন্তু কেন? তিনি ওপার বাংলার মানুষ বলে? তাহলে তো বলতে হয়, তিনি জীবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ সময় এপারেও কাটিয়েছেন, তাহলে? তার থেকেও বড়ো কথা, শিল্পীর দেশ-কাল-ধর্মীয় পরিচয় দিয়ে বেঁধে রাখার চেষ্টা আগেও হয়েছে, সম্ভব হয়নি, কলিম শরাফীর ক্ষেত্রেও সেটি সম্ভব নয়।
কলিম সাহেবের জন্ম বীরভূমে। গানের তালিম দক্ষিণীতে। যুক্ত ছিলেন প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ রাজনীতির সঙ্গে দীর্ঘদিন। আইপিটিএ-র সঙ্গে যুক্ত হয়ে দীর্ঘদিন গেয়েছেন গণসংগীত। ২০২৪ কলিম শরাফীর জন্মশতবর্ষ।
রামকৃষ্ণ মিশন ইনস্টিটিউট অফ কালচার (গোলপার্ক)-এ শতদল আয়োজিত কলিম শরাফীর জন্মশতবর্ষ উদযাপন
ছোটোবেলায় মা-কে হারিয়েছেন যখন কলিম ক্যালকাটা মাদ্রাসায় পড়তে শুরু করলেন। কিছুদিনের মধ্যেই জড়িয়ে পড়েন হলওয়েল আন্দোলনের সঙ্গে। ১৯৪২ সালে ভারত ছাড়ো আন্দোলনে সক্রিয় ভূমিকা নেন এবং গ্রেপ্তার হওয়ার পর সিউড়ি জেলে প্রথম ও একমাত্র মুসলিম বন্দি হিসেবে কারারুদ্ধ থাকেন। সেই সময় সিউড়ি জেলে প্রাক্তন রাষ্ট্রপতি প্রণব মুখোপাধ্যায়ের পিতা কামদাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়, রবীন্দ্রনাথের নাতনি নন্দিতা কৃপালনি, দিনকর কৌশিক প্রমুখরা ছিলেন কলিমের জেলসঙ্গী। জেলে বসেই গান শুরু করেন কলিম, রবীন্দ্রনাথের গান।
কলিম সাহেবের জন্ম বীরভূমে। গানের তালিম দক্ষিণীতে। যুক্ত ছিলেন প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ রাজনীতির সঙ্গে দীর্ঘদিন। আইপিটিএ-র সঙ্গে যুক্ত হয়ে দীর্ঘদিন গেয়েছেন গণসংগীত। ২০২৪ কলিম শরাফীর জন্মশতবর্ষ।
এর পরবর্তীকালে খুব ঘনঘন বাঁক নিয়েছে কলিমের জীবন। কাকাবাবু, অর্থাৎ কমরেড মুজাফ্ফর আহমেদের সঙ্গে আলাপ এবং ঘনিষ্ঠতা হয় কলিমের, যুক্ত হন বাম রাজনীতির সঙ্গে। শান্তিনিকেতনে পড়তে চাইলেও পড়তে পারেননি, সম্ভবত তাঁর রাজনৈতিক যোগের কারণেই। শেষ করেননি ডাক্তারি পড়াও। আইপিটিএ-র সঙ্গে যুক্ত হন, গণসংগীত রেকর্ডিংও করেন। শম্ভু মিত্র, তৃপ্তি মিত্র প্রমুখ যখন কমিউনে থাকতেন, তখন তাঁদের উদ্যোগে অশোক মজুমদার নাট্য সম্প্রদায় (পরবর্তীতে বহুরূপী নাট্যদল) তৈরি হয়। এই দলে শম্ভু-তৃপ্তির সঙ্গে যে কজন প্রতিষ্ঠাতা সদস্য ছিলেন তাঁদের মধ্যে কলিম শরাফী অন্যতম। ১৯৪৭-এর ১৫-১৬ অগাস্ট দাঙ্গার সময়ে হাওড়ার রামরাজাতলা থেকে পালিয়ে কলিম আশ্রয় নেনে দেবব্রত বিশ্বাসের বাড়ির খাটের তলায়। এমনই বিচিত্র জীবন ছিল কলিম শরাফীর। পরিচালক মৃণাল সেন বলেছিলেন, হঠাৎ করে শুনতে পেলাম কলিম নাকি মুসলমান। তাই তাঁর কাজ পেতে সমস্যা হচ্ছে। দাঙ্গাবিধ্বস্ত কলকাতা-য় কাজের সুযোগ না পেয়ে পাকিস্তানে চলে যেতে বাধ্য হন বীরভূমের ছেলে কলিম।
১৯৫১ সালে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে চলে যেতে হয় শিল্পীকে, তবে সেখানেও জীবন খুব একটা সহজ ছিল না তাঁর। সর্বক্ষণ রাষ্ট্রের নজরদারির মুখোমুখি থাকতে হয়েছে কলিম-কে। ঢাকা রেডিওতে কলিম শরাফীর গাওয়া রবীন্দ্রনাথের গান-এর উপর নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়। চট্টগ্রামে গিয়ে বিদেশি কোম্পানিতে কাজ নিলেন, খুললেন সাংস্কৃতিক সংস্থা। চিত্র পরিচালনা, প্লেব্যাক, গণসঙ্গীত প্রভৃতি বিভিন্ন শিল্পমাধ্যম নিয়ে কাজ করতে থাকেন, তবে মূল কাজ সবসময়েই রবীন্দ্রসংগীতকে কেন্দ্র করেই। বাংলাদেশ স্বাধীন হবার সময় তিনি লন্ডনে। দেশে ফিরে বাকি জীবন রবীন্দ্রসংগীত প্রচার-প্রসার ও শিক্ষাতেই নিমগ্ন থেকেছিলেন। লিখেছেন আত্মজীবনী ‘স্মৃতি অমৃত’ ও ‘ভরা থাক স্মৃতি সুধায়’। জীবনে অনেক কাজ করলেও এবং একটা সময়ের পর অনেক সম্মাননা পেলেও দেশ ও রাষ্ট্রের দ্বারা হয়তো বিভিন্ন ক্ষেত্রে বারবার ধাক্কা খেয়েছেন কলিম শরাফী। বলা যায়, প্রায় একইভাবে ভারত এবং ভারত ভাগ হয়ে পূর্ব পাকিস্তান গঠন হওয়ার পর বাংলাদেশ রাষ্ট্রের স্বাধীনতা সংগ্রামের লড়াইতে অংশগ্রহণ করেছিলেন, কিন্তু হিন্দু-মুসলমান দ্বন্দ্ব ও আরও বিভিন্ন কারণে তাঁকে ছাড়তে হয়েছিল নিজের মাতৃভূমি ভারত তথা পশ্চিমবঙ্গ, আবার পূর্বপাকিস্তানও যে তাঁকে খুব সাদরে গ্রহণ করেছিল এমনও নয়। তবে তিনি বিশ্বাস রেখেছিলেন সেই অমোঘ বাণীতে – “অস্থির হয়ো না; শুধু, প্রস্তুত হও”।
গত ১৩ জুন, রামকৃষ্ণ মিশন ইনস্টিটিউট অফ কালচার (গোলপার্ক)-এর শিবানন্দ হলে শতদল আয়োজিত ‘অ্যাডভোকেট নির্মলেন্দু বন্দ্যোপাধ্যায় স্মারক সভা’-র তৃতীয় বর্ষে কলিম শরাফীর জন্মশতবর্ষ উদযাপন অনুষ্ঠানের সুরও এই তারেই বাঁধা ছিল, “অস্থির হয়ো না; শুধু, প্রস্তুত হও”। অন্তর্যামী ভুবনেশ্বরকে স্মরণ করে সুমিত্রা চট্টোপাধ্যায়ের নেতৃত্বে ‘কোরক’-এর উদ্বোধনী সংগীত দিয়ে এই অনুষ্ঠানের সূচনা হয়। অনুষ্ঠানের পরবর্তী পর্যায়ে কলিম শরাফীকে নিয়ে নিশাত জাহান রানা নির্মিত তথ্যচিত্র ‘পথে পথে দিলাম ছড়াইয়া’-র বিশেষ প্রদর্শন হয়। আলোচনা সভার বক্তা হিসাবে উপস্থিত ছিলেন পরিচালক ও প্রকাশক নিশাত জাহান রানা, অধ্যাপক সবুজকলি সেন এবং সংগীতশিল্পী অলক রায়চৌধুরী, কথা-সমন্বয়ে শিশির রায়। রানা জানান, ছাত্রাবস্থায় ক্যাসেটে কলিমের গান শুনে তাঁর সঙ্গে প্রথম পরিচয় ঘটে। বেশ কিছু বছর পরে ‘গণ সাহায্য সংস্থা’ থেকে কলিম শরাফীকে সম্মাননা প্রদানের মধ্যে দিয়ে ব্যক্তিগত পরিচয় ও ঘনিষ্ঠতা হয় নিশাত জাহান রানার এবং তখনই ঠিক হয় তথ্যচিত্র নির্মাণের বিষয়টি। এই তথ্যচিত্রের সঙ্গে ক্যামেরার সামনে ও পিছনে জড়িয়ে রয়েছে মৃণাল সেন, খালেদ চৌধুরী, প্রণব গুহঠাকুরতার নাম।
রামকৃষ্ণ মিশন ইনস্টিটিউট অফ কালচার (গোলপার্ক)-এ শতদল আয়োজিত কলিম শরাফীর জন্মশতবর্ষ উদযাপন
গত ১৩ জুন, রামকৃষ্ণ মিশন ইনস্টিটিউট অফ কালচার (গোলপার্ক)-এ শতদল আয়োজিত ‘অ্যাডভোকেট নির্মলেন্দু বন্দ্যোপাধ্যায় স্মারক সভা’-র তৃতীয় বর্ষে কলিম শরাফীর জন্মশতবর্ষ উদযাপন অনুষ্ঠানের সুর বাঁধা ছিল: “অস্থির হয়ো না; শুধু, প্রস্তুত হও”।
অধ্যাপক সবুজকলি সেন মূলত কলিম এবং রাষ্ট্রের সম্পর্ক নিয়ে কথা বলেন। তাঁর কথায় রাষ্ট্র সব সময় মুক্তমনা মানুষের উপর খর্গ নামিয়ে আনে। ভারত ও পূর্ব পাকিস্তান, উভয় দেশেই কলিমকে যেভাবে বাধার মুখোমুখি হতে হয়েছে, তা হয়তো এই কথাটিকেই প্রমাণ করে। অধ্যাপক সেনের কথায় বারবার উঠে এসেছে ‘ওরা আমাদের গান গাইতে দেয় না’ থেকে ‘বিধির বাঁধন’ কাটার প্রসঙ্গ। রবীন্দ্রসংগীত ও কলিমের গান সম্পর্কে অলক রায়চৌধুরী বলেন, এখন রবীন্দ্রনাথের গানের তীব্র দুঃসময়। দুঃসময় যে সবে শুরু হয়েছে তা নয়, অনেকদিন ধরেই এই দুঃসময় চলছে, রবীন্দ্রনাথের গান নিয়ে যথেচ্ছচার হচ্ছে। এবং তার বিরুদ্ধে শিল্পীদের সে অর্থে কোনো প্রতিবাদ নেই। এই দুঃসময়ের মধ্যেও কলিম শরাফী ছিলেন এক অসম্ভব মেধার পরিচয়। রবীন্দ্র গানের অবক্ষয়ের বিপরীতে প্রচণ্ড শিল্পীত প্রতিবাদ ছিল কলিম শরাফীর গান। এদিনের অনুষ্ঠান শেষ হয় অরুণ গঙ্গোপাধ্যায়ের গানের মধ্যে দিয়ে।
রাষ্ট্র ও শিল্পীর দ্বন্দ্ব বহুযুগের। রাষ্ট্র বারবার চেয়েছে শিল্পীর কণ্ঠরোধ করতে, শিল্পীকে কোনো একটা পক্ষে (হিন্দু-মুসলিম, দলিত-স্মার্ত, শিক্ষিত-অশিক্ষিত) দাগিয়ে দিতেকি। কিন্তু ইতিহাস সাক্ষী, রাষ্ট্র এই কাজে বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই সফল হয়নি। কলিম শরাফী এইরকমই একজন দৃপ্ত শিল্পী, যিনি নিজের গান ও দর্শন নিয়ে গভীর রেখাপাত করেছেন বাংলা সংস্কৃতি জগতে। জন্মশতবর্ষে কলকাতায় তাঁকে নিয়ে এই একটি অনুষ্ঠান ছাড়া আর প্রায় কোনো অনুষ্ঠানই হয়নি, যদিও তিনি তাঁর জীবনের একটি বিশেষ অংশ কাটিয়েছেন এই কলকাতাতেই। পশ্চিমবঙ্গের বাঙালি আর কতকাল আত্মবিস্মৃত থাকবে?
